ঢাকা, রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২০, ২৫ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৮ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৪ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০১ এএম

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র বাংলাদেশি হত্যা, অপহরণ, অনুপ্রবেশ, ভারতীয়দের ঠেলে দেয়া ইত্যাদি অপকর্ম ও অপরাধ সাম্প্রতিকালে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ক’দিন আগে লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফ এক কৃষককে তার খেত থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এর আগে ঠাকুরগাঁও সীমান্তে অপর একজনকে গুলি করে হত্যা করেছে। এরও কয়েকদিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে দু’জকে হত্যা করেছে। ফেলানীর বর্বর হত্যাকান্ডের কথা কারো অজানা নেই। কাঁটাতারের বেড়ায় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ফেলানীর হত্যাকান্ডের ঘটনা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক নিন্দা ও সমালোচনার মুখে পড়ে। সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বেরোয়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সবচেয়ে বেশি মানুষ নিহত হয়। এজন্য বিএসএফ’ই দায়ী। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, অতঃপর বিএসএফ’র হত্যাকান্ড কমবে। কিন্তু সে ধারণা সত্য হয়নি। আগের মতোই বিএসএফ অবলীলায় পাখির মতো বাংলাদেশিদের হত্যা করছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য মতে, গত ১০ বছরে বিএসএফ ৪৫৫ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। একই সময়ে ৬৫ জনকে আহত করেছে এবং অপহরণ করেছে ৫১৮ জনকে। বিএসএফ কীরকম, বেপরোয়া, এ পরিসংখ্যান থেকেই তার পরিচয় পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী ভারতীয়দের আচরণও বিএসএফ’র মতো লক্ষ করা যায়। তারা সশস্ত্র হয়ে দলবেঁধে এসে মাছ ধরে নিয়ে যায়, ফসল কেটে নিয়ে যায়, গবাদি পশু নিয়ে যায়। এসময় তারা গুলি ছুঁড়তে, এমনকি হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। মাঝেমধ্যেই এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। তাদের ছত্রচ্ছায়া ও সহযোগিতা দেয় বিএসএফ। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, গত ১৬ অক্টোবর রাজশাহীতে বাংলাদেশের পানিসীমায় অনুপ্রবেশ করে ভারতীয় জেলেরা মাছ শিকারে লিপ্ত থাকার সময় বিজিবি’র হাতে গ্রেফতার হয়। তাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে বিএসএফ। তখন উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে, এতে একজন বিএসএফ সদস্য নিহত হয়। বিএসএফ’র ঔদ্ধত্য কতটা সীমাহীন, বিজিবি’র কাছ থেকে ধৃত জেলেদের জোর করে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা তার প্রমাণ বহন করে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বিএসএফ’র সাম্প্রতিক ঘাতক-নাশক তৎপরতায় ভারত সরকারের বাংলাদেশ-বিরোধী মনোভাবেরই প্রতিফলন রয়েছে। ভারতের নাগারিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে বাংলাদেশের মনোভাব খুব ইতিবাচক নয়। কারণ, ভারত যাই বলুক, এই দুই আইনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হওয়ার আশঙ্কা যে বাংলাদেশের রয়েছে তা দিবালোকের মতই স্পষ্ট। এ নিয়ে বাংলাদেশ তার উদ্বেগের কথা ভারতকে জানিয়েছে। ভারত তাতে কান না দেওয়ায় অন্তত তিনজন মন্ত্রীর ভারত সফর বাংলাদেশ স্থগিত করেছে। ভারত এতে ক্ষুব্ধ হতে পারে, যার প্রকাশ অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সীমান্তেও ঘটছে বলে অনুমিত হয়।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যে ঠিক আগের অবস্থানে নেই, সেটা নানা ঘটনায় বুঝা যাচ্ছে। সীমান্ত হত্যা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, এর আগে দেয়া তার প্রতিক্রিয়া থেকে সেটা সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, ভারত সীমান্তহত্যা বন্ধে যে অঙ্গীকার করেছে, তা রক্ষা করেনি। ভারতের আঁতে ঘা লাগার মতো কথাই তিনি বলেছেন, যদিও তার সত্যতা প্রশ্নাতীত। সরকার যতই ভারত ভারত করুক, যতই অকৃত্রিম বন্ধুত্বের কথা সোচ্চার করুক এবং ভারতের সব চাওয়া অবলীলায় পূরণ করে সম্পর্কের উচ্চতা প্রদর্শন করুক, ভারত তাতেও কিন্তু সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না। গতকাল দৈনিক ইনকিলাবে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। ওই খবরে জানা গেছে, আইন মন্ত্রণালয়ের দু’জন শীর্ষ কর্মকর্তা লেজিসলেটিভ ও ড্রাফটিং বিভাগের সচিব নরেন দাস ও যুগ্মসচিব কাজী আরিফুজ্জামান এবং ভারতের ডেপুটি হাই কমিশনার বিশ্বদ্বীপ দে’র মধ্যে ঢাকার একটি হোটেলে নৈশভোজের নামে একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে দেশের অভ্যন্তরীণ স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। খবরে একটি ব্রিফকেস বিনিময়ের কথা বলা হয়েছে। ব্রিফকেসটি নরেন দাস ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশনার বিশ্বদ্বীপ দে’র কাছে হস্তান্তর করেন। ব্রিফকেসটিতে সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি রয়েছে, এমন তথ্যই খবরে জানানো হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ওই দুই কর্মকর্তার সঙ্গে ভারতীয় হাই কমিশনের যোগাযোগ ও সম্পর্ক কীভাবে হলো খবরে তার বিবরণ আছে। আইন মন্ত্রণালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রের বা সরকারের অনেক গোপন বিষয় এখানে থাকে। এসবের গোপনীয়তা সুরক্ষা করা কর্মকর্তাদের পবিত্র দায়িত্ব। অথচ তাদের মধ্যে ওই দু’জন কর্মকর্তা ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে বৈঠক করে সেই দায়িত্বের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার কূটনৈতিক আচরণের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে অননুমোদিত বৈঠক করেছেন। এ ব্যাপারে একটি অনুপুংঙ্খ তদন্ত হওয়া জরুরি বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। এর আগে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগ দেবপ্রসাদ সাহা নামের একজন পুলিশ কনস্টেবলকে আটক করা হয়। এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকায় আগে আরো দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দুই সরকারই দাবি করে থাকে, দু’ দেশের পরস্পারিক সম্পর্ক অন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের মডেল। এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এ সম্পর্ক। আমরা দেখেছি, গত ১১ বছরে ভারত বাংলাদেশের কাছে যা চেয়েছে বাংলাদেশ বিনা প্রশ্নে তা দিয়ে দিয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে ভারত যেভাবে বাংলাদেশের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ তা-ই দিয়েছে। ট্রানজিটের নামে ভারত বাংলাদেশের বুক চিরে করিডোর নিয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুবিধা পেয়েছে। বাণিজ্য সুবিধার তো কথাই নেই। বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক ভারতীয়ের চাকরির ব্যবস্থা পর্যন্ত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে কিছুই পায়নি। বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে সবকিছু এক তরফা পেয়েও ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে বিশ্বাস করে না। এ কারণে সে তার নিজস্ব উদ্যোগে বাংলাদেশের গোপন তথ্য সংগ্রহ করছে সংগোপনে। হয়তো আরো অনেক কিছু করছে। বাংলাদেশকে এ বিষয়টি যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে আমলে নিতে হবে। চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। দেশবৈরী সকল ষড়যন্ত্র ও তৎপরতা রুখে দিতে হবে। দেশবিরোধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তার সঙ্গে ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনারের বৈঠকের ব্যাপারে দ্রুত তদন্ত করে জনগণকে অবহিত করতে হবে। দেশ-জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যে কোনো মূল্যে সংরক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র আপোস ও অবহেলার অবকাশ নেই।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
jack ali ১৬ জানুয়ারি, ২০২০, ৫:২৯ পিএম says : 0
O'Allah punish Modi and his army and bsf.
Total Reply(0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন