ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৩ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকার প্রভাব হারানোর আলামত দেখা যাচ্ছে

মোবায়েদুর রহমান | প্রকাশের সময় : ১৪ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০১ এএম

২০০৩ সালে আমেরিকা যখন ইরাক আক্রমণ করে তখন বাংলাদেশের সমগ্র জনমত ছিল ইরাক, বিশেষ করে ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম হোসেনের পক্ষে। তাই মার্কিন হামলার পরেই বাংলাদেশের অনেক স্থানে, বিশেষ করে দেয়ালগাত্রে এবং পোস্টারে লেখা হয়, ‘বাপের বেটা সাদ্দাম’। তবে যুদ্ধের ফলাফল কী হবে সেটি বোদ্ধা মহলের অজানা ছিল না। কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরাশক্তির বিরুব্ধে একটি আরব দেশের জয়লাভ ছিল অসম্ভব। এছাড়া আমরা লক্ষ করেছি, এ ধরনের যুদ্ধে কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের পক্ষে কোনো অমুসলিম রাষ্ট্র এগিয়ে আসেনি। মুসলিম রাষ্ট্র একাই যুদ্ধ করেছে এবং পরাজিত ও ধ্বংস হয়েছে। আর একটি উল্লেখযোগ্য এবং সার্বজনীন বৈশিষ্ট হলো এই যে, আমেরিকা আজ যার বন্ধু কাল অবশ্যই তার শত্রু। তুরস্ক ছিল আমেরিকার অকৃত্রিম মিত্র। আমেরিকার উস্কানিতে তুরস্কে আদনান মেন্দারিসের মন্ত্রিসভার ১৬ জন সদস্যকে তুর্কী সেনাবাহিনী খুন করে তাদের লাশ সাজিয়ে রেখেছিল। আজ সেই তুরস্ক এরদোগানের নেতৃত্বে ভয়ঙ্কর মার্কিন বিরোধী। ইরানের রেজা শাহ পাহলবি যখন শাহানশাহ্ ছিলেন, তখন ইরানকে মনে হতো আমেরিকার পোষ্যপুত্র। আয়াতুল্লাহ খোমেনি এবং বর্তমানে আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বাধীন ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। গোলাম মোহাম্মদ, ইস্কান্দার মির্জা, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী প্রমুখের নেতৃত্বে পাকিস্তান ছিল আমেরিকার দাসানুদাস। সেই একই পাকিস্তান ইমরান খানের নেতৃত্বে আমেরিকার কব্জা থেকে অনেকটা বেরিয়ে এসেছে। আফগানিস্তানে যখন রুশ দখলদারিত্ব ছিল তখন সেই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তালেবানদের সাহায্য করেছিল আমেরিকা। সেই আমেরিকা ২০০১ সালে আফগানিস্তান আক্রমণ করে এবং বীর আফগানেদেরকে চুরমার করে দেয়। এই মার্কিনিরাই জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাশিকোতে অ্যাটম বোমা মেরেছিল এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল। আজ সেই জাপান আর আমেরিকা ঘনিষ্ঠ মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ। আর কত উদাহরণ দেব? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল হিটলারের জার্মানির বিরুদ্ধে। আজ সেই জার্মানি আমেরিকার রণসঙ্গী। এসব দেখে অনেকেই বলে থাকেন, আমেরিকা যে রাষ্ট্রের বন্ধু সে রাষ্ট্রের শত্রুর প্রয়োজন পড়ে না।

দুই
ইরানের বিষয়টি ভিন্ন। ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের শাহানশাহ রেজা শাহের পতনের পর ইমাম আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে ইসলামি হুকুমাত কায়েম হয়। আয়াতুল্লাহর নয়া প্রশাসন কঠোর মার্কিন বিরোধী নীতি গ্রহণ করে। সুদীর্ঘ ৩১ বছর পার হলো, ইরান মার্কিন বিরোধী নীতি অনুসরণ করেছে। একদিনের জন্যও এই নীতির ব্যাত্যয় ঘটেনি। এমনকি, যে ইরাকের সাথে ইরান দীর্ঘ ৯ বছর যুদ্ধে লিপ্ত ছিল সেই ইরাকি পার্লামেন্ট ইরাক থেকে সমগ্র মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের আহবান জানিয়েছে। শনিবারের পত্রিকায় দেখলাম, মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করার জন্য ইরাক আমেরিকাকে গত শুক্রবার ১০ জানুয়ারি বলেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সমগ্র তেল সম্পদের উপর আমেরিকার শকুনের চোখ। সৌদি আরব বহুদিন থেকেই তাদের কব্জায়। তারপর তার চোখ পড়ে ইরানি তেল সম্পদের ওপর। রেজাশাহ পাহলবিকে ক্ষমতায় রেখে আমেরিকা দিব্যি ইরানের তেল লুণ্ঠন করেছিল। কিন্তু ১৯৫১ সালে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইরানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে এই সম্পদ লুণ্ঠনে প্রথম বাধা আসে। ক্ষমতায় এসে মোসাদ্দেক বৃটিশ তেল কোম্পানি অ্যাংলো ইরানিয়ান ওয়েল কোম্পানির কাগজপত্র অডিট করতে চান। তিনি আরও চান ইরানি তেলের মওজুদের ওপর বিদেশিদের যে একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে। কিন্তু বিদেশি কোম্পানি ইরানের গণতান্ত্রিক সরকারের সাথে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করে। তখন মোসাদ্দেক ইরানের তেল জাতীয়করণ করতে চাইলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম ১৬ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে উৎখাতের চেষ্টা করে। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন হ্যারি এস, ট্রুম্যান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সামরিক অভ্যুত্থানে গররাজি হন। অতঃপর ক্ষমতায় আসেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক জেনারেল আইসেন হাওয়ার। ঐ দিকে বৃটেনে ক্ষমতায় আসেন আরেকজন সমরবিদ উইনস্টন চার্চিল। বৃটেন-মার্কিনের নতুন দুই রাষ্ট্রনায়ক সামরিক অভ্যুত্থান পরিকল্পনায় সম্মতি জ্ঞাপন করেন। ফলে ১৯৫৩ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থান পরিচালনায় ইরানের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক উৎখাত হন। ইঙ্গ-মার্কিন চক্র শাহানশাহ রেজা শাহ পাহলবিকে আরও ক্ষমতা দিয়ে নিজেদের পুতুল বানান। পরবর্তী ২৩ বছর ইরানের গোয়েন্দা বাহিনী সাভাকের মাধ্যমে নিষ্ঠুর দমন নীতির মাধ্যমে দেশ চালান। অতঃপর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খামেনীর ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে শাহানশাহর পতন ঘটে।

তিন
তারপর থেকে ইসলামি বিপ্লবের নেতারা ইরান শাসন করছেন। ইরানের শাসনতন্ত্র মোতাবেক দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা দেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর আয়াতুল্লাহ খামেনি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হয়েছেন। ইরানের বর্তমান সরকারের নীতি হলো আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রভাবলয় সংকুচিত করা। সেই সঙ্গে তার প্রভাববলয় বিস্তার করা।

ওপরের এই সুদীর্ঘ আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা সাথে ইরানের বিরোধ নতুন কিছু নয়। মোসাদ্দেক আমল থেকে যে বিরোধের উৎপত্তি সেই বিরোধ আজও চলে আসছে এবং আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ইরান কীভাবে তার উদ্দেশ্য সাধন করবে? আমেরিকা পৃথিবীর একমাত্র সুপার পাওয়ার। আমেরিকার সাথে সরাসরি যুদ্ধে ইরানের জয় লাভের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এবার যদি যুদ্ধে জড়াতো তবে ইরান চুরমার হয়ে যেতো, যেমন চুরমার হয়ে গেছে ইরাক, যেমন ধ্বংস হয়ে গেছে আফগানিস্তান। সুতরাং ইরান এবার হটকারী পলিসি না নিয়ে, বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। মার খেয়ে মার হজম করেনি, আবার ২২টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা করে ইরান প্রমাণ করেছে যে মার্কিন টার্গেটে হামলা করার সাহস তার আছে এবং এই হামলা করে ইরান পৃথিবীতে তার সামরিক ও কূটনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকার প্রভাব সরানোর পথ কী? ইরান ধীরে ধীরে সেই পথে অগ্রসর হচ্ছে। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে ইরান যে গতিতে অগ্রগতি সাধন করছিল সেই গতি শ্লথ হয়। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, সামরিক ক্ষেত্রেও। ইরান বিভিন্ন দেশ থেকে যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ করে, নিজেকে শক্তিশালী করছিল। নিষেধাজ্ঞার ফলে সেই অস্ত্র সংগ্রহও শ্লথ হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে জঙ্গী বিমানের ক্ষেত্রে। আধুনিক জঙ্গী বিমানে যথা এফ-১৫, এফ-১৬, এমইউ ৩০ ইত্যাদি বিমান তার অস্ত্রভান্ডারে নাই। এই ঘাটতি পূরণের জন্য ইরান নিজেই অস্ত্র প্রযুক্তি অর্জনে মনোনিবেশ করে। এসব অস্ত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ক্ষেপণাস্ত্র। ইরান বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। তাই ইরানি সৈন্য বাহিনীর একজন জেনারেল বলেছেন যে, ইরানের ২২টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাব যদি আমেরিকা দিতো তাহলে ইরান ৫ হাজার মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়তো। তার এই উক্তি থেকে বোঝা যায়, তার ভান্ডারে যথেষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র মওজুদ আছে।

২০১৫ সালে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি করে ইরান অ্যাটম বোমা বানানো থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়। কিন্তু ২০১৮ সালে আমেরিকা ঐ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পর ঐ চুক্তি অকার্যকর হয়ে গেছে। এখন আর অ্যাটম বোমা বানানোর পথে ইরানের কোনো বাধাই রইলো না। এখন ইরানের প্রয়োজন কিছু সময়ের। সময় পেলে ইরান দ্রুত গতিতে পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার গড়ে তুলবে। ইতোমধ্যেই ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরানো অত্যন্ত কঠিন ছিল। কারণ সামরিক এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আমেরিকা এখনও বিশে^র এক নম্বর পরাশক্তি। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া আবার জড়িত হয়েছে। আমেরিকা প্রচন্ড হামলা করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে প্রায় উৎখাত করেছিল। এই পর্যায়ে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে রাশিয়া, তুরস্ক এবং ইরান। তারা বাশার আল আসাদের পক্ষ নেয়। ফলে আসাদ আজও সিরিয়ার ক্ষমতায় আছেন। শহিদ সোলাইমানির স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী সিরিয়া, ইরাক এবং ইয়েমেনে ইরান তার অনুগত মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তুলেছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ এখন সম্পূর্ণভাবে ইরানের অনুগত। এই সব মিলিশিয়া দিয়ে ইরান আমেরিকার বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ চালাবে। এভাবে ইরান সময়ের আবর্তনে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সেনা বাহিনীকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলবে।
journalist15@gmail.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (6)
মোহাম্মাদ সালাহ্ উদ্দিন রাড়ি ১৪ জানুয়ারি, ২০২০, ১:২৫ এএম says : 0
হারাতেই হবে।
Total Reply(0)
Patwary Chandpur ১৪ জানুয়ারি, ২০২০, ১:২৫ এএম says : 0
eta e howa uchit
Total Reply(0)
Mohammad Didarul Alam ১৪ জানুয়ারি, ২০২০, ১:২৭ এএম says : 0
কবি শেখ সাদি, ওমর খৈয়াম, হাফিজ সিরাজির দেশ ইরান। শিয়া ও সুন্নি ব্যাপার নয়। ঐতিহ্যগতভাবে আমরা ইরানকে ভালবাসি। এটা ঠিক যে ইরানকে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ঘোলাটে রাখছে ইসরাইলিচক্র। এই ইসরাইলিচক্রের অন্যতম সদস্য আমেরিকা চাচ্ছে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাদের সৈন্য ও অস্ত্রের ব্যবসা যাতে জমজমাট থাকে। ইসরাইলও যেন লাভবান হয়। তাছাড়া ইরাক তথা মধ্যপ্রাচ্য থেকে যাতে সৈন্য প্রত্যাহার করতে না হয়। এখানে ইউক্রেনের বিমানটি পরিস্থিতির স্বীকার। তবে বিষয়টি খোদ ইরানকে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যাতে এই বিমানটি বিধ্বস্তের বেলায় আসলে কি ঘটেছে !
Total Reply(0)
Амена Хан ১৪ জানুয়ারি, ২০২০, ১:২৭ এএম says : 0
বৃটিশরা বরাবরই যুদ্ধের উস্কানিতে থাকে,শুরুতে কিছুদিন দেখা যায় আর সম্পদ ভাগাভাগির সময় লাভজনক জায়গায় থাকে।
Total Reply(0)
G M Zabir ১৪ জানুয়ারি, ২০২০, ১:২৭ এএম says : 0
আমেরিকার অস্ত্র বিক্রি কমে যাবে। ইরানের একটি মিসাইল ধংষ করতে পারলো না।
Total Reply(0)
Sekender Ali ১৪ জানুয়ারি, ২০২০, ১:২৮ এএম says : 0
মধ্যপ্রাচের দ্বন্দ ও সংঘাতের একমাত্র কারন,, আমেরিকা ও রাশিয়ার অস্ত্র ব্যবসা।
Total Reply(0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন