ঢাকা, রোববার, ০৭ জুন ২০২০, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ১৪ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ক্রেতা সঙ্কটে শেয়ারবাজার

সুশাসন ও আস্থার অভাব

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৫ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০০ এএম

পতনের একেবারে নিম্স্তনরে নেমেছে দেশের শেয়ারবাজার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্সসহ সব ধরনের সূচক নেমেছে ভিত্তি পয়েন্টের নিচে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই অবস্থা। ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি ডিএসইএক্স সূচক চালু হওয়ার দিন ছিল ৪০৫৬ পয়েন্ট। গতকাল প্রায় আট বছর পর ডিএসইএক্স সূচক দাঁড়িয়েছে ৪০৩৬ পয়েন্ট। অর্থাৎ সূচক তার শুরুর দিনের চেয়ে নিম্নে অবস্থান করছে। তবে সূচক প্রায় পাঁচ বছরের কম হলেও অধিকাংশ শেয়ারের দাম নয় বছর আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। গতকাল লেনদেন শেষে সূচকটির অবস্থান হয় চার হাজার ১২৩ পয়েন্ট। এদিন আবারও ৮৭টি পয়েন্ট কমল সূচকটি। নতুন বছরে ২৬ হাজার ১৫৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা মূলধন হারিয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসই। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি লেনদেনের শুরুতে ডিএসই’র বাজার মূলধন ছিল ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। অব্যাহত দরপতনের কারণে গতকাল তা ৩ লাখ ১৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। জানুয়ারি মাসে লেনদেন হওয়া ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সাত দিনই সূচক ছিল নিম্নমুখী। এই সময়ে ডিএসই‘র প্রধান সূচক কমেছে ৪১৬ পয়েন্ট। আর গত এক বছরের ব্যবধানে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে এক লাখ কোটি টাকা। গত বছরের ১৪ জানুয়ারি ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল চার লাখ ১৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা।

শেয়ারবাজারে এমন ভয়াবহ দরপতনের কবলে প্রতিনিয়ত পুঁজি হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। পুঁজি হারিয়ে বিক্ষুব্ধ একদল বিনিয়োগকারী দরপতনের প্রতিবাদে গতকালও মতিঝিলের রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে। এদিকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালদেশের শেয়ার বাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে ‘জরুরি’ বৈঠক ডেকেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আগামী ২০ জানুয়ারি রাজধানীর দিলকুশায় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)-এর কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

শেয়ারবাজারে ভয়াবহ দরপতন হলেও তার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। পতনের প্রবণতা দেখে অনেকেই বিস্মিত। তবে তারা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট আর সুশাসনের অভাবে শেয়ারবাজারে এই দুরবস্থা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারে যে বড় দরপতন হচ্ছে এর কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বিনিয়োগকারীরা হুজুগে শেয়ার বিক্রি করছেন। অনেক ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম এখন অনেক নিচে নেমে গেছে।
ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, বাজারের মূল সমস্যাগুলো আমরা চিহ্নিত করতে পারলেও তার সমাধান হয়নি। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। গ্রামীণফোনের সমস্যার সমাধান হয়নি। এতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর শেয়ারের যে দরপতন হয়েছে, তাতে আমাদের কিছু করার ছিল না। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতা ছাড়া বাজারের এ পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণ কষ্টকর।

বিনিয়োগকারীদের পুঁজি হারানোর আর্তনাদে উত্তাল অবস্থায় রয়েছে দেশের শেয়ারবাজার। যেকোন মূল্যে পুঁজিবাজারকে ভালো করার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগি বিনিয়োগকারীরা। এ ব্যাপারে বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি একেএম মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বাংলাদেশে সবকিছুর দাম বাড়ে কিন্তু শেয়ারবাজারের দাম বাড়ে না বরং দিনের পর দিন রসাতলে যাচ্ছে। এর আগে অনেক বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে আত্মহত্যা করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিটাও তেমন দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সরকার সব দিকে উন্নয়নের জোয়ার দেখালেও শেয়ারবাজারকে ভালো করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড পাবলিক পলিসি বিভাগের প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান বলেন, বাজারের ওপর অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন যে তারা আর কোনো ভরসা পাচ্ছেন না। সর্বশেষ ডিএসইর এমডি নিয়োগ নিয়ে বোর্ড সভায় যে ঘটনা ঘটছে তাও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এটা অশনিসংকেত। কেন যেন বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, ডিএসই প্রতিযোগিতা করে দুঃশাসন নিয়ে আসছে বিনিয়োগকারীদের জন্য।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমেছে। এদিন ডিএসইতে মাত্র ৩২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট দাম বাড়ে। বিপরীতে কমেছে ২৯৩টির আর ৩০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৮৭ পয়েন্ট কমেছে। এর আগের দিন এ সূচকটি কমে ৮৮ পয়েন্ট। এর আগে গত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক কমে ২৬১ পয়েন্ট। এতে শেষ আট কার্যদিবসে সূচকটি কমল ৪১১ পয়েন্ট। এমন পতনের কবলে পড়ে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচকটি শুরুরও নিচে নেমেছে। প্রধান মূল্য সূচকের থেকেও করুণ দশা বিরাজ করছে ডিএসইর অপর সূচকগুলোর। বাছাই করা কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ অনেক আগেই শুরুর নিচে নেমেছে। এক হাজার ৪৬০ পয়েন্ট নিয়ে ২০১৩ সালের ২৭ জানুয়ারি চালু হওয়া সূচকটি এখন এক হাজার ৩৬১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। গতকাল এ সূচকটি কমেছে ২৬ পয়েন্ট। ডিএসইর আরেক সূচক ‘ডিএসই শরিয়াহ্’। ইসলামী শরিয়াহ্ ভিত্তিক পরিচালিত কোম্পানি নিয়ে ২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি এ সূচকটি যাত্রা শুরু করে। শুরুতে এ সূচকটি ছিল ৯৪১ পয়েন্টে। গতকাল লেনদেন শেষে সূচকটি ২২ পয়েন্ট কমে ৯০৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে বৃহৎ বা বড় মূলধনের কোম্পানির জন্য চলতি বছরে ‘সিএনআই-ডিএসই সিলেক্ট ইনডেক্স (সিডিএসইটি)’ নামে নতুন সূচক চালু করে ডিএসই। বছরের প্রথমদিন ১ জানুয়ারি থেকে অফিসিয়ালি ডিএসইর ওয়েবসাইটে সূচকটি উন্মুক্ত করা হয়। ৪০টি কোম্পানি নিয়ে শুরু হওয়া সূচকটির ভিত্তি ভ্যালু ধরা হয় ১০০০ পয়েন্ট। তবে এখন সূচকটি ৮১১ পয়েন্টে নেমেছে। সবকটি মূল্য সূচকের এমন উল্টোযাত্রায় প্রতিনিয়ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েই চলেছে।

গতকাল ডিএসইতে ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দরপতন হয়েছে, তার মধ্যে ১৪৫টিরই দাম কমেছে তিন শতাংশের ওপরে। পাঁচ শতাংশের ওপরে দাম হারিয়েছে ৫৭টি প্রতিষ্ঠানের। আর ছয় শতাংশের ওপরে দাম কমেছে ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের। এমন দাম কমার পর অনেক বিনিয়োগকারী এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি করতে পারেননি।
এহতেশামুজ্জামান নামের এক বিনিয়োগকারী বলেন, আমি যেসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেছি প্রতিদিন তার দাম কমছে। দাম কমার পরও কিছু কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করতে পারছি না। একটি কোম্পানির শেয়ার ৮ শতাংশ দাম কমিয়েও বিক্রি করতে পারিনি। শুধু আমি একা নয়, অনেকের এখন এমন অবস্থা। ৮-৯ শতাংশ দাম কমিয়েও অনেক কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করা যাচ্ছে না।

এদিকে শেয়ারের ক্রেতা সংকটে বাজারে দেখা দিয়েছে লেনদেন খরা। গত বছরের ৫ ডিসেম্বরের পর ডিএসইর লেনদেন আর চারশ কোটি টাকার ঘর স্পর্শ করতে পারেনি। বাজারে লেনদেনের পরিমাণ দুইশ থেকে তিনশ কোটি টাকার ঘরে আটকে রয়েছে। গতকাল লেনদেন হয়েছে ২৬২ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ২৮৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

অপরদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) দুরবস্থায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। বাজারটির সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ২৭৪ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ২৯৫ পয়েন্টে। লেনদেন হয়েছে ৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। লেনদেন অংশ নেয়া ২৪৪ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম বেড়েছে ২১টির, কমেছে ২০৩টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২০টির।

জরুরি বৈঠক ডেকেছে অর্থ মন্ত্রণালয় :
পুঁজিবাজারের অস্থিরতার মধ্যে এ নিয়ে ‘জরুরি’ বৈঠক ডেকেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আগামী ২০ জানুয়ারি দুপুরে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপ-সচিব ড. নাহিদ হোসেনের সই করা এক চিঠি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পুঁজিবাজার উন্নয়নে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে অংশীজনের মতবিনিময় সভার প্রস্তাবনার যথাযথ বাস্তবায়নকাজ সমন্বয় ও তদারকির জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের গঠিত কমিটি এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনার জন্য আগামী ২০ জানুযারি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হবে। কমিটির আহŸায়ক অতিরিক্ত সচিব মাকসুরা নূরের সভাপতিত্বে দুপুর ২টায় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের পরিচালনা পর্ষদ কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. মাসুদ বিশ্বাস, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমান, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের এমডি এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।

মামলা উপেক্ষা করে রাস্তায় বিনিয়োগকারীরা :
মামলার ভয়কে দূরে ঠেলে শেয়ারবাজারের ভয়াবহ দরপতনের প্রতিবাদে মতিঝিলে অবস্থিত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আগের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন বিনিয়োগকারীরা। গতকাল দুপুরে ‘বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ’র ব্যানারে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ থেকে বরাবরের মতো বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের পদত্যাগসহ কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানানো হয়। এর আগে দরপতনের প্রতিবাদে দিনের পর দিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ করায় গত ২৭ আগস্ট ডিএসইর পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন