ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১০ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

নদ-নদী বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ১৭ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০২ এএম

দেশের নদ-নদীর করুণ দশা পরিবেশ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র, কৃষিকাজ এবং দেশের মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে চরম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষায় বন্যা, শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতা দেশের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় গতি হারিয়ে নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ছে। একদা যে নদী খর¯্রােতা ও পানিতে টইটুম্বুর ছিল, সেই নদী নাব্য হারিয়ে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীর বুক জুড়ে বালু চর জেগেছে, মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। দেশের অধিকাংশ নদ-নদীর এখন এমনই করুণ অবস্থা। অথচ এ থেকে মুক্ত হওয়া বা নদীগুলো বাঁচিয়ে রাখার তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। এ পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশ যে এক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে, তাতে সন্দেহ নেই। এখনই তার আলামত টের পাওয়া যাচ্ছে। দেশের নদ-নদীর শোচনীয় হওয়ার ক্ষেত্রে মূলত প্রতিবেশী ভারতের বৈরী পানিনীতি যে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে, তা সকলেরই জানা। ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে ৫৪টি ভারত হয়ে বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার মধ্যেই এই সমস্যা নিহিত। যুগ যুগ ধরে ভারত তার অংশের নদ-নদীতে ইচ্ছামতো বাঁধ, গ্রোয়েন ও আন্তঃনদী সংযোগের মাধ্যমে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে চলেছে। আন্তর্জাতিক রীতি-নীতির তোয়াক্কা না করেই তারা এ কাজ করে যাচ্ছে। ভারতের এই বিরূপ আচরণের কারণে বাংলাদেশ অংশের নদ-নদীগুলো দিন দিন মরে যাচ্ছে। পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে বহু দেন-দরবার, আলাপ-আলোচনা এবং চুক্তি হলেও, ভারত তা কখনোই খুব বেশি গুরুত্ব দেয়নি। এখনও দিচ্ছে না। পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়টি আলাপ-আলোচনা, মৌখিক আশ্বাস এবং চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তার এ আচরণ যে দাদাগিরি এবং স্বেচ্ছাচারী তা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। এক ধরণের আক্রোশমূলকও। যেন বাংলাদেশকে বর্ষায় পানিতে ডুবিয়ে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য করে মারতে হবে। বাংলাদেশকে ন্যায্য পানির হিস্যা দেয়ার ক্ষেত্রে দেশটি সবসময়ই নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে আসছে। এক তিস্তা চুক্তি নিয়ে কত টালবাহানা করছে। নানা অজুহাতে করব, করছি বলে ঝুলিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে তার সব স্বার্থই বাংলাদেশের কাছ থেকে থেকে আদায় করে নিচ্ছে। বন্দর ব্যবহারের সুবিধা, ট্রানজিট, বিদ্যুৎ রপ্তানি, উচ্চ হারের সুদে ঋণ দেয়াসহ হেন কোনো স্বার্থ নেই, যা সে আদায় করেনি। এমনকি মানবিকতার কারণ দেখিয়ে ফেনী নদী থেকে পানি তুলে নিচ্ছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ কোনো কিছুই পাচ্ছে না। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এখন এমন ধারণা প্রবল ‘আমরা ভারতকে কেবল দিয়েই যাচ্ছি, বিনিময়ে কিছুই পাচ্ছি না।’

দুই.
বাংলাদেশে এক ফারাক্কার প্রভাব কতটা ভয়াবহ রূপ হতে পারে, তা পদ্মা ও তার সংশ্লিষ্ট নদ-নদীগুলোর করুণ চিত্র দেখলেই বোঝা যায়। প্রমত্তা পদ্মা স্বাভাবিক স্রোত হারিয়ে বহু আগেই নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। তার বুকে জেগে উঠা চড়ে ধান চাষ হয়। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচ দিয়ে গাড়ি চলাচল করতে দেখা যায়। গঙ্গানির্ভর পদ্মার শাখা-প্রশাখা নদ-নদী পানিশূন্য হয়ে অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩৭ শতাংশ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহৎ অংশে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়া থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, শিল্প, বনজ, মৎস্যসম্পদ ধংস, লবনাক্ততা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির অভাব, জীববৈচিত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পানির অভাবে তলদেশ ভরাট হয়ে নদীর পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। গঙ্গা সেচ প্রকল্প, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনসহ অন্যান্য এলাকা হুমকির মুখে রয়েছে। ফারাক্কার প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিম এবং পশ্চিমাঞ্চলের ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটারে বসবাসরত প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পানির অভাবে এক চতুর্থাংশ কৃষিজমি পরিত্যক্তভূমিতে পরিণত হবে। বছরে কৃষি, শিল্প, মৎস্য ও নৌ পরিবহন খাতে আর্থিক ক্ষতি হবে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে ঘন ঘন বন্যা দেখা দেবে এবং গঙার গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যাবে। বর্তমানে তার প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ফারাক্কা যে বাংলাদেশে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে, তা পঞ্চাশ দশকেই তৎকালীন পাকিস্তান সরকার উপলব্ধি করতে পেরেছিল। এ নিয়ে ভারতের সাথে ১৯৫১ সাল থেকে সমঝোতা প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাতে কোন ফল হয়নি। স্বাধীনতার পর ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন ৯০টিরও বেশি বৈঠক করে। তাতেও কোন লাভ হয়নি। ১৯৭৫ সালে ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ভারত পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ১১ হাজার থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি ফিডার ক্যানাল চালু না করার শর্তে প্রত্যাহার করতে পারবে বলে বাংলাদেশ রাজী হয়। ভারতের পরীক্ষামূলক এই পানিপ্রত্যাহার আর পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ৩১ মে থেকে পুরোপুরি ৪০ হাজার কিউসেক পানি নিয়মিত প্রত্যাহার শুরু করে। ভারতের এই কথা না রাখা বাংলাদেশের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। শষ্ক ও বর্ষা উভয় মৌসুমে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভারত এবং অন্যান্য দেশের অভিন্ন নদ-নদীর পানির যুক্তিসঙ্গত বন্টনের সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিতে পাশ হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, যৌথ নদীর দেশগুলো পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত গড়িমসি ও টালবাহানার মাধ্যমে জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্ত পাশ কাটিয়ে যায়। তারপরও ভারতের সাথে পুনরায় ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি পাবে, এ নিশ্চয়তার মাধ্যমে পাঁচ বছর মেয়াদী একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ১৯৮২ সালে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেও ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত কয়েক দফা স্বল্পমেয়াদে চুক্তি বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৮৯ সাল থেকে ভারত আর নতুন করে চুক্তি করতে আগ্রহ দেখায়নি। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর তৎকালীন এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেব গৌড়ার মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষর হয়। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের অসহযোগিতা ও চুক্তি পুরোপুরি মেনে না চলায় সমস্যা রয়েই গেছে।

তিন.
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে সমুদ্রের নোনা জল নদ-নদীর মাধ্যমে ভূ-ভাগে প্রবেশ করে সুপেয় পানি ধীরে ধীরে লবনাক্ত হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ বিশ্বে সুপেয় পানির পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানি প্রাপ্যতা হ্রাস এবং চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুপেয় পানি ‘নেক্সট অয়েল’-এ পরিণত হবে। মূল্যবান তেল সম্পদের মতো হবে। যেসব দেশে পর্যাপ্ত সুপেয় পানি থাকবে, তারা বিশ্বের ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। জাতিসংঘের বিশ্ব পানি উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক দশকে বিশ্বে জনপ্রতি সুপেয় পানি শতকরা ৩০ ভাগ হ্রাস পাবে। পানি হবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু এবং রাজনীতির হাতিয়ার। প্রভাবশালী দেশগুলো তাদের ইচ্ছামতো পানি প্রত্যাহার শুরু করবে। এতে তৃতীয় বিশ্বের দেশসহ অনেক দেশে তীব্র পানি সংকট দেখা দেবে। বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সেরাগেলদিন ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন, ‘বিংশ শতকের অনেক যুদ্ধ হয়েছে তেল নিয়ে, একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধ হবে পানি নিয়ে-যদি না আমরা পানি ব্যবস্থাপনার একটি সুষ্ঠু সমাধানের পথ বের করতে পারি। তিনি বলেছেন, পানি সমস্যা যুদ্ধের দিকে ঠেলে না দিয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া উচিত।’ স্বাধীনতার পর থেকে পানি নিয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলেও ভারতের অনীহা ও নানা অজুহাতে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশটির সদিচ্ছার অভাবে বাংলাদেশ সাফল্যের মুখ দেখেনি। স্বাধীনতার ৪৮ বছরে বাংলাদেশের মানুষ বুঝে গেছে, ভারত বাংলাদেশের ন্যায্য দাবীর প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন করছে না, ভবিষ্যতেও করবে না। এ বাস্তবতা মেনেই আমাদের নিজেদের ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে। এ কথা অনস্বীকার্য, ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের পাশাপাশি নদ-নদী পানিশূন্য হয়ে পড়ার ক্ষেত্রে আমরা নিজেরাও অনেকাংশে দায়ী। বছরের পর বছর ধরে দখল, দূষণ ও ভরাটের মাধ্যমে নদ-নদীর সর্বনাশ করে চলেছি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও জাতীয় নদী রক্ষা আন্দোলন তাদের নদী পর্যবেক্ষণ এক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, দেশের ৪৩ ভাগ নদীর নাব্য হ্রাস, ১১ ভাগ দূষণের শিকার আর ২৮ ভাগ নদী দখল হয়ে গেছে। তারা ৫৭টি নদী ৮৬ বার পর্যবেক্ষণ করে এ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ছোট বড় ২৩০টি নদীর মধ্যে ১৭৫টিই এখন মৃত। প্রতি বছর একটি-দুটি করে মরে যাচ্ছে। গত ৪৮ বছরে ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথের মধ্যে ১৮ হাজার কিলোমিটার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নদী বিধৌত দেশের নদ-নদীর মরে যাওয়া বা মেরে ফেলার কার্যক্রম অব্যাহতভাবে চলছে। বাঁচানোর কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। কিছু কিছু নদ-নদীতে ড্রেজিং হচ্ছে ঠিকই, তবে তা লোক দেখানোর মতো হয়ে পড়েছে। অথচ প্রতি বছরই কোনো না কোনো নদী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নদীর এই মৃত্যু বা বিলুপ্তির সাথে মানবিক বিপর্যয়ের শঙ্কা এবং দেশের অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। ভারতের বিরূপ আচরণের মাঝেও তার সাথে যৌথ নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করে বিশ্ব স¤প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণ সময়ের দাবী। এর বিকল্প নেই। এই ব্যারেজ নির্মিত হলে গঙ্গানির্ভর ৪৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় যে পানিস্বল্পতা রয়েছে, তা পূরণ হয়ে সার্বিক পরিস্থিতি বদলে যাবে। ১৬টি নদীর নাব্যতা ফিরে আসবে। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের জীবনমান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে কয়েকগুণ। গঙ্গা নির্ভর সেচযোগ্য ১৫ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭০ হেক্টর এলাকা বৃদ্ধি পেয়ে হবে ১৭ লাখ ৯০ হাজার ৩৮২ হেক্টর। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বর্ষাকালে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে যায়, যা কোনও কাজে লাগানো যায় না। এ প্রকল্পের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমের জন্য পানি আটকে রাখা যাবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি ধারণযোগ্য একটি বিশাল জলাধার সৃষ্টি হবে। এই জলাধার চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাংখা থেকে রাজবাড়ির পাংশা পর্যন্ত ১৬৫ কিলোমিটার নদীতে পানি ধরে রাখবে। পরবর্তীতে চাহিদা অনুযায়ী ব্যারেজ থেকে ছাড়া হবে। এই পানি দিয়ে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, পাবনা, রাজশাহী জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় চাষাবাদ করা যাবে। ১৯ লাখ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে। এই পানি হবে আর্সেনিকমুক্ত ও সুপেয়। শুধু তাই নয়, ২.১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ব্যারেজটির উপর দিয়ে যাবে রেললাইন, সড়ক, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ফাইবার অপটিক্যাল লাইন। পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে উৎপাদন করা যাবে ৭৬.৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ২.৪ লাখ মেট্রিকটন। বর্তমানে উৎপাদিত খাদ্যশস্য ১ কোটি ১৮ লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিকটন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হবে ১ কোটি ৪৫ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ গঙ্গা ব্যারেজ নির্মিত হলে ফারাক্কার যে কুফল বাংলাদেশকে যুগের পর যুগ ভোগ করতে হচ্ছে, তার সমাধান যেমন হবে তেমনি কয়েক কোটি মানুষের জীবনমান এবং অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রগতি অনেক বৃদ্ধি পাবে। দুঃখের বিষয়, এই গঙ্গা ব্যারেজ নির্মাণেও ভারত আপত্তি করে বসেছে। বলেছে, এতে তার সমস্যা হবে। অর্থাৎ ভারত পানিও দেবে না, আবার আমাদের নিজেদের সমস্যা সমাধানও করতে দেবে না। তার এই আচরণ সরকারও মেনে নিচ্ছে। এর চেয়ে পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে!

চার.
নদ-নদী বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এখনই ব্যাপক উদ্যোগ নিতে হবে। সমন্বিত কর্মসূচীর মাধ্যমে একটি কার্যকর নদী ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অপরিহার্য। ভরাট হয়ে যাওয়া নদ-নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং প্রক্রিয়া জোরদার এবং পানির রিজার্ভ বেসিন গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। পানির রিজার্ভ গড়ে তোলার একটি অনন্য উদ্যোগ ছিল খাল খনন কর্মসূচী। কার্যকর এ কর্মসূচী কোন সরকারই অব্যাহত রাখেনি। অব্যাহত রাখলে একদিকে যেমন পানির রিজার্ভ বৃদ্ধি পেত, তেমনি বন্যায় প্লাবন এবং শুষ্ক মৌসুমে নদ-নদীর পানিশূন্যতা অনেকাংশেই রোধ করা যেত। এ কর্মসূচীটি পুনরায় চালু করা দরকার। দখলকৃত নদ-নদী উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কোন বিবেচনাতেই দখলদারদের রেহাই দেয়া দেয়া যাবে না। ১৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ কেন ও কি কারণে বিলুপ্ত হয়েছে, এখন কি অবস্থায় রয়েছে, তা এলাকাভিত্তিক সমীক্ষার মাধ্যমে চিহ্নিত করে কিভাবে পুনরায় সচল করা যায় এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। বলা প্রয়োজন, দিন দিন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সাথে পানির চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিপুল জনগোষ্ঠীর পানির চাহিদা পূরণ করতে নদ-নদীর নাব্যতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিলুপ্ত নদী পুনরায় সচল করতে হবে। ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর থেকে চাপ কমাতে হবে। তা নাহলে পানির অভাবে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি মানবিক বিপর্যয়েরও শঙ্কা রয়েছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
darpan.journalist@gmail.com

 

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন