ঢাকা, সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৯ জামাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

দেশ বিরাজনীতিকরণের পথে কেন এগিয়ে যাচ্ছে

তৈমূর আলম খন্দকার | প্রকাশের সময় : ২০ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০১ এএম

সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী নিম্ন আদালত থেকে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত বিচারিক কাজে ৩৭ বছর (তার মধ্যে প্রায় ১৬ বছর হাইকোর্টের বিচারপতি) নিয়োজিত থাকার পর গত ৮ জানুয়ারি তার সর্বশেষ কর্মদিবসে বিদায়ী সম্ভাসনে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘বিচার বিভাগ নিয়ে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনগণের এই দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়ন করতে হবে।’ বিচারিক কাজে নিয়োজিত ৩৭ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন বিচারপতির অবসরলগ্নে বিচার বিভাগ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে মন্তব্যটা কী দাঁড়ায়? দ্রæব সত্য যে, জনগণের জন্যই বিচারিক ব্যবস্থা, সভ্যতার প্রথম শর্ত ন্যায়ভিত্তিক বিচার। ফলে প্রশ্ন উঠে, সর্বস্তরের জনগণের মনের ভাষা কি বিচার বিভাগ হৃদয়ঙ্গম করে? হাইকোর্টে টাকার বিনিময়ে কজ লিস্টের সিরিয়াল উঠানামার কথা ইতোপূর্বে গ্রাম পর্যায়ে চায়ের দোকানেও আলোচনা হতো, এখন তা নিয়ন্ত্রণ হয়েছে। ফলে উচ্চ আদালতের বিচারপ্রার্থীরা কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। কিন্তু এফিডেফিট ও কোর্টের আদেশ ছাড় করানোর বিষয়টি প্রধান বিচারপতির জবানীতে প্রকাশ পেয়েছে যে, সিসি ক্যামেরা লাগিয়েও তিনি তা (কোর্টের প্রশাসনিক ঘুষ প্রথা) নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। জনমনে বিশেষ করে বিচার প্রার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে যে, বিচারপতি নিয়োগ যেমন রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়ে আসছে, অনুরূপ বিচারিক বেঞ্চ গঠন হয়ে থাকে রাজনৈতিক বিবেচনায়। কোন সরকারের আমলে কোন বিচারপতি নিয়োগ হয়েছেন তাও বেঞ্চ গঠনে বিবেচনা করা হয় বলে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিতে অর্থাৎ পাবলিক পারসেপসনে ধরা পড়ে, যা নিয়ে কোর্ট প্রাঙ্গনে আলোচনায় প্রতিনিয়তই চাউর হয়। বিচার প্রার্থীরাও নিজ মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করে। তবে ক্ষমতায় পালাবদল বা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জনগণের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও হাইকোর্ট বা উচ্চ আদালত আছে বলেই জনগণ আশ্রয়ের একটি স্থান খুঁজে পাচ্ছে। অন্যথায় আমলানির্ভর সরকার জনগণের অধিকারকে নিষ্পেশিত করার আরো অধিক সুযোগ পেতো। বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, বিচার বিভাগ সম্পর্কে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি যদি মূল্যায়ন করতে হয় তবে বর্ণিত বিষয়গুলিও আলোচনায় আসে বৈ কি!

ইতোপূর্বে ‘পরশ্রীকাতরতা’র বিষয়টি আলোচনা-পর্যালোচনায় ইতি টানতে পারিনি বলে বিষয়টি নিয়ে একটু আলোকপাত করতে হলো। দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ যদি মানুষকে তাড়িত, ব্যথিত, উৎসাহিত, অনুপ্রাণিত বা আত্ম সমালোচিত না করে তবে মনুষ্যগুণাবলী মানব জীবনে যা ধারণ করার কথা, তা পরিস্ফুটিত হয় না। ব্যক্তি জীবনে একজন মানুষ কি উদাসীন থাকবে নাকি তাকে হতে হবে চিন্তাশীল? একজন মানুষের ব্যক্তি ইচ্ছা-অভিলাষ থাকতে পারে, কিন্তু এর সীমারেখা কতটুকু পর্যন্ত সম্প্রসারিত হতে পারে? এটাও এখন মানুষের দৃষ্টিসীমায় থাকার কথা, যদি না থাকে তবে মানুষরূপী দেহটি তার জিঘাংসা চরিতার্থ করার জন্য একটি নেকড়ে বাঘের চেয়েও হিং¯্র হয়ে উঠতে পারে।

মন-মানসিকতার দিক থেকে অনেকে উল্টো পথের যাত্রী। একটি গাভীর দুধ ও মাংস মানুষের জন্য উৎকৃষ্ট ও পুষ্টিকর খাদ্য। চামড়া দ্বারা সে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। গোবর জ্বালানি বা সার হিসাবে ব্যবহার করে। প্রাচীন যুগ থেকে একটি গাধা মানুষের বাহন হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অথচ কাউকে গরু-গাধা হিসাবে সম্বোধন করলে রাগান্বিত হয়, অপমানিত বোধ করে, প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করে। অন্যদিকে কাউকে বাঘ বা বাঘের বাচ্চা বলে সম্বোধন করলে খুশি হয়, সম্মানিত ও গর্ভবোধ করে। অথচ বাঘ মানুষের কোনো প্রত্যক্ষ উপকারে লাগে না। বাঘের গতি যেমন তীব্রতর, হিং¯্রতাও রয়েছে অনুরূপ। তারপরও হিং¯্র পশুর নামে নামকরণ করলে মানুষ খুশি হয়। অন্যদিকে, অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে হিং¯্র পশুর নামে যেমন- লায়ন ক্লাব, ইন্টারন্যাশনাল। বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম টাইগার নামে পরিচিত।

আমাদের সমাজে একজন খুনী খুন করে আত্মতৃপ্তি লাভ করে, অথচ তাকে খুনী বলা যায় না। খুনীকে প্রকাশ্যে খুনী বলে সম্বোধন করলে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আরেকটি খুন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, শত শত খুন করলে পায় বীর উপাদি, একটি খুনের জন্য প্রাপ্ত হয় ফাঁসির দড়ি।

স্বার্থ ও আদর্শে যদি সংঘাত বাঁধে তখন মানুষ কোনটাকে বেছে নেয়? অবশ্যই স্বার্থকে বেছে নেয়, স্বার্থের সাথে কোনো সংঘাত করে না, বরং সাংঘর্ষিকতা সৃষ্টি করে আদর্শের সাথে। তখন ব্যক্তি জীবনের পরিবর্তে আর্দশ স্থান করে নেয় শুধুমাত্র আদর্শলিপির পাতায় বা কোনো বক্তৃতার মঞ্চে বা ধর্মগুরুর ধর্মসভায়। কিন্তু কর্মজীবন বা ব্যক্তিজীবনে আদর্শের সাথে যারা সংঘাতে জড়ায় না তাদের সংখ্যা এতোই ক্ষুদ্র যা দেখতে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্য লাগে। তবে কণ্ঠ ভোটে আদর্শ হেরে গেলেও আদর্শের একটি গৌরব আছে, যা স্বার্থপর বা পরশ্রীকাতরদের জন্য একটি আতঙ্ক। রাতের আঁধার হোক বা সূর্যের আলোতেই হোক স্বার্থপরতা বা পরশ্রীকাতরতা কোনদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে নাই, এটাই মনের সান্ত¦না তাদের নিকট যারা বারংবার জীবন যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে, অভাবের তাড়নায় বা অন্য কোনো কারণে। পরশ্রীকাতর মানসিকতাসম্পন্ন সমাজ ব্যবস্থায় বিবেকবান মানুষগুলি যন্ত্রণার সাগরে কাতরাচ্ছে, কিন্তু আপোস করছে না এবং এটাই তাদের গৌরব।

আমাদের সমাজে একটা প্রবাদ চালু রয়েছে যে, ‘উপকারের প্রতিদান পাওয়া যায় না।’ অর্থাৎ যার থেকে উপকার পায় বা সহযোগিতা পায় তার ক্ষতি করাও একটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। এর পিছনের কারণও স্বার্থ এবং স্বার্থ। স্বার্থের প্রশ্নে মানবসমাজ একেবারেই অন্ধ। এ অন্ধত্ব নিবারণের জন্য যে অনুশীলনের প্রয়োজন, বর্তমান সমাজব্যবস্থা তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

গত বছরটিকে বিরাজনীতিকরণের বছর বলে মন্তব্য করেছে একটি জাতীয় পত্রিকা। অন্যদিকে দেশ দিনে দিনে বিরাজনীতিকরণের দিকে এগুচ্ছে, এটা সাধারণ নাগরিকদেরও ধারণা। কিন্তু কেন? মানুষ কি রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, নাকি রাজনীতিবিদরা গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে? যে রাজনৈতিক দল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করে সে দলে কি আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অনুশীলন আছে? রাজনৈতিক দলের সংবিধান কি মূলত কার্যকর রয়েছে? তৃণমূল থেকে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাট ফর্ম কীভাবে তৈরি হতে হয়, অনুরূপ অনুশীলনের দাবি কি কোনো রাজনৈতিক দল জোর গলায় করতে পারবে? দলের মূল নেতাকে ঘিরে রাখা নিকটস্থ নেতাদের আনুগত্যের প্রতিযোগিতা চলে বটে, তবে সে আনুগত্য দলীয় আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নয়, বরং নিজের মৃত্যুর পর ছেলেটা যেন এমপি-মন্ত্রী হতে পারে, তার পথ সুগম করার জন্য। দলে যখন ক্র্যাকডাউন হয় তখন কথিত অতিঅনুগতদের খুঁজে পাওয়া যায় না এবং এটাই সুবিধাভোগী ও সুবিধাবাদী রাজনীতির চরিত্র। ফলে দেশের রাজনীতি দিন দিন বিরাজনীতিকরণের দিকে এগুচ্ছে। ফলে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে জনগণকে। কারণ, রাজনৈতিক আন্দোলনই জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তনসহ শাসক দলের বিভিন্ন অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের একমাত্র উপায়।

জনগণের সাংবিধানিক অধিকার আদায়ের যে সংগঠন তাই রাজনৈতিক দল। ক্ষমতায় যাওয়াই একটি রাজনৈতিক দলের একমাত্র টার্গেট থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। ক্ষমতায় যাওয়ার টার্গেটি অবশ্যই থাকতে হবে, তবে দলের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীবাহিনী থাকা দরকার, যারা গড়ে উঠবে শুধুমাত্র আদর্শভিত্তিক। আদর্শভিত্তিক কর্মীবাহিনী থেকে নেতৃত্ব বের করে আনতে হবে। আদর্শের পরিবর্তে নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে বা পূর্ব রাত্রে কোরবানির হাটের মতো নেতা কেনাবেচার পথ বন্ধ করার জন্য আদর্শভিত্তিক একটি কর্মীবাহিনী গঠন করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নাই। এ পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলগুলি হাটে না বিধায় দল যখন বিপদে পড়ে তখন সুবিধাবাদী-সুবিধাভোগী চক্রদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। একটি রাজনৈতিক দল অর্থের নিকট বিক্রি হতে পারে না এবং দলের কর্মী থেকেই নেতৃত্ব সৃষ্টি করার অনুশীলন দল করবে, এটাই একজন আদর্শবান রাজনৈতিক কর্মীর প্রত্যাশা।

একটি আদর্শ জাতি গঠন ও জাতিসত্ত¡া বিনির্মাণে রাজনৈতিক দলগুলির আদর্শিক ভ‚মিকা থাকা উচিৎ। অন্যথায় আদর্শভিত্তিক কর্মীবাহিনী গড়ে উঠবে না। আদর্শভিত্তিক কর্মীবাহিনী ছাড়া যে দলই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হোক না কেন, তাতে চুরি, ছেছড়ামী, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, পুকুরচুরি, সাগরচুরি, অবৈধ দখল এবং জাতিসত্ত¡া হরণ করা চলতেই থাকবে। ক্ষমতায় পালাবদল হবে বটে, কিন্তু ভাগ্যাহত মানুষদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না, ভাগ্যবানরা আরো সৌভাগ্যবান হবে, দরিদ্ররা আরো হতদরিদ্র হতে থাকবে। তখন ক্ষমতা হবে সেবার নয় বরং শাসন ও শোষণের হাতিয়ার, রাজনৈতিক দল হবে শোষকদের পৃষ্ঠপোষক বা দুর্বৃত্তদের সম্মেলনস্থল বা ক্লাব জাতীয় সংগঠন। তারা কর্মীদের ব্যবহার করে বা করবে টিস্যু পেপারের মতো এবং রাজনীতিপ্রেমিক কর্মীরা অন্ধের মতো ব্যবহার হতেই থাকবে, ইতোপূর্বে যেমনিভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করার জন্য নিবেদিত কর্মীদের অন্ধ হলে হবে না, নিজেদের পথ নিজেদেরই খুঁজতে হবে।
লেখক: কলামিস্ট ও আইনজীবী

 

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন