ঢাকা, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬, ০১ রজব ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

দুনিয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ আখেরে রেহাই পাবেন না

মোহাম্মদ আবদুল গফুর | প্রকাশের সময় : ২৩ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০২ এএম

যখন আজ লিখতে বসছি তখন চলছে ঢাকার দুই সির্টি নির্বাচনের বিভিন্ন দলের প্রচার-প্রচারণার পালা। যদিও অনেক দলই এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে, তবুও সবাই জানেন নির্বাচনে প্রধান মূল প্রতিদ্ব›িদ্বতা হবে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কিনা, এ নিয়ে রয়েছে জনগণের মধ্যে নানা আশঙ্কা।

এ আশঙ্কা অমূলক নয়। যারা সাংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক তাদের জানা থাকার কথা, যখন থেকে সংবিধান সংশোধন করে দলীয় সরকারের অধীনে সকল জাতীয় নির্বাচনের বিধান চালু করে তারপর থেকে বিরোধী দলের পক্ষে নির্বাচনে জয়লাভ করা বন্ধ হয়ে গেছে। এবারও যে সেরকম আশঙ্কা রয়েছে ষোল আনা, তা মাথায় রেখেই প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে শুধুমাত্র এটা প্রমাণ করতে যে, জনগণ দেখুক, জনমত বিএনপির পক্ষে থাকা সত্তে¡ও সরকারের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ায় পথে বাধা সৃষ্টি করার কারণে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হচ্ছে না।

এ কারণে নির্বাচনের আগেই শাসক দলের দুই নম্বর নেতা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মত নেতা দম্ভভরে বলতে পারছেন, নিশ্চিত পরাজয় জেনেই বিএনপি নেতারা আবোল তাবোল বলছেন। ঠিক এরকম একটা কথা অতীতে বিএনপির আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন বয়কট সম্পর্কে বলেছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বিএনপির বয়কট করা একটা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় এক হিসাবে ভালই হয়েছে, সংসদে তাদের আবোল তাবোল বক্তৃতা শুনতে হচ্ছে না।

এর অর্থ হলো, সংসদে দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপির কোন নেতা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসে সরকারের বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য দিলে তাকে আবোল তাবোল অর্থাৎ অর্থহীন বলে গণ্য করতে হবে। এর অন্য অর্থ হলো, আওয়ামী লীগ চায়না দেশে কোন সরকারবিরোধী দল নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি হিসাবে জাতীয় সংসদে আসুক। এ মনোভাব কিন্তু আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রে বিশ্বাসের প্রমাণ বহন করে না।
আসলে আওয়ামী লীগ যে আদৌ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিশ্বাস করে না, তার বহু প্রমাণ আছে। বাংলাদেশের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের জানা থাকার কথা যে, যে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান আমলে প্রথম বিরোধী দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে, বাংলাদেশে আমলের সেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন প্রথম সরকারের আমলেই দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একমাত্র একটি সরকারী দল রেখে দেশে একদলীয় বাকশালী শাসনব্যবস্থা কায়েম করে।

পরবর্তীকালে কিছু দু:খজনক ঘটনার মধ্যদিয়ে দেশে একদলীয় বাকশালী শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হলেও, এক পর্যায়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে সামরিক ক্যুর মাধ্যমে উৎখাত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে বসেন তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সে সময় সারাদুনিয়াকে অবাক করে দিয়ে ঐ সামরিক ক্যুর প্রতি সমর্থন জানিয়ে বসেন দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলের নেত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

এরপর দেশে শুরু হয় জেনারেল এরশাদের সুদীর্ঘ সামরিক স্বৈরশাসনের পালা। এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এবং অন্যান্য দল বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলন শুরু করে দিলেও আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন পর্যন্ত এসব আন্দোলন থেকে দূরে সরে থাকেন। ফলে রাজনীতিতে নবাগতা হয়েও বেগম খালেদা জিয়া আপোষহীন নেত্রী হিসাবে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এভাবে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী আন্দোলন বিশেষ জোরদার হয়ে উঠলে, এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন।
আরও পরে দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদ বিরোধী আন্দোনে যোগ দেন। এছাড়া দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশে একটি নতুন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবীতে একমত হন। শুধু তাই নয়, এই নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে যাবতীয় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে ও একমত হন দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা।

যেমনটা আশা করা গিয়েছিল নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়। নির্বাচন চলাকালে সাংবাদিকদের সাথে আলোপচারিতাকালে এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন আমি সকল জেলার খবর নিয়েছি। নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। আপনারা লক্ষ্য রাখবেন, ভোটে হেরে গিয়ে কেউ যেন আবার এর মধ্যে কারচুপি আবিষ্কার না করে।

নির্বাচন শেষ ভোট গণনা শেষ হলে জানা গেল, আওয়ামী লীগ নয়, নির্বাচনে জয়ী হয়েছে বিএনপি। এতে শেখ হাসিনা অবলীলাক্রমে বলে ফেললেন, নির্বাচনে সূ² কারচুপি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কেউ তাঁর এ অবাস্তব কথার গুরুত্ব না দেয়ায় বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হলো। সংসদে বিরোধী দলের প্রধান নেত্রী হলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদ শেষে প্রধানত: সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার দাবীর মুখে নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারে অধীনে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে আওয়ামী লীগ জয়ী হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়।

বাংলাদেশের বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থা যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অনুকূল, তা প্রমাণিত হয়। এই ব্যবস্থাধীনে দেশে পরপর বেশ কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল পরপর জয়ী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ লাভ করেন। কিন্তুু এই সুন্দর ব্যবস্থাও এক পর্যায়ে পচিয়ে ফেলা হয়। এরপর একবার আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচিত দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়।

এরপর সেই যে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে তার আর কোন পরিবর্তনের সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতেও দেখা যাচ্ছে না। ফলে আওয়ামী লীগের দুই নম্বর নেতা সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মুখে সদম্ভ উক্তি শোনা যাচ্ছে, পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিএনপির নেতারা আবোল তাবোল বকছেন।

আসলে আওয়ামী লীগ যে অবাধ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়, তার প্রথম প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আমলে যখন সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একমাত্র একটি সরকারী দল রেখে দেশে একদলীয় বাকশালী শাসনব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। প্রকৃত পক্ষে আওয়ামী লীগ এখনও একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় বিশ্বাসী। যদিও লোক-দেখানোর লক্ষ্য গণতন্ত্রের মহড়া দিয়ে চলেছে।

আমাদের এ বক্তব্যের প্রমাণ হিসাবে আমরা একাধিক প্রমাণ দিতে পারি। এর প্রথমটি হচ্ছে ঠুনকো মামলার অজুহাতে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দী করে রেখে তাকে সুপরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া। এলক্ষ্যে বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দী করে রেখে তাঁর স্বাধীন ইচ্ছা মোতাবেক চিকিৎসার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা।

এর ফলে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী যিনি অতীতে একাধিকবার অবাধ নির্বাচনে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনার সুযোগ পান তাকে ঠুনকো অজুহাতে একটি মামলার আসামী হিসাবে বন্দী করে রেখে তাঁর স্বাধীন ইচ্ছা মোতাবেক চিকিৎসা করতে না দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। গত সোমবারের দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার প্রকাশিত একটি খবরে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। খবরটির শিরোনাম ছিল : ‘খালেদা জিয়া বমি করছেন : চিকিৎসক বলছেন ভালো আছেন’। অর্থাৎ সরকার খালেদা জিয়ার অসুস্থতার জন্য এমন চিকিৎসক দিয়েছেন যিনি সরকারের ইচ্ছা পূরণ তথা তাঁর মৃত্যুর নিশ্চিত ব্যবস্থা করতে পারেন।

এখানে প্রশ্ন ওঠে, মানুষ বমি করে যখন তার শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে যায়। সেই অবস্থায়ও খালেদা জিয়া ভাল আছেন বলে মিথ্যা আশ্বাস দিতে পারেন যে চিকিৎসক, বুঝতে হবে, তাঁকে এই অমানবিক উদ্দেশ্যেই খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, বর্তমান সরকার দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের নেত্রী এবং একাধিকবার অবাধ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত বেগম খালেদা জিয়াকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার সাথে সাথে দেশে গণতন্ত্রকেও হত্যা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

দেশে অবাধ গণতন্ত্র থাকলে বিএনপি তো দূরের কথা, কোন ক্ষুদ্র রাজনৈতিক দলের প্রতিও অবজ্ঞা প্রদর্শন করতে পারতো না। দেশের বর্তমান শাসক দল আওয়ামী লীগ যে কোন প্রকারে দেশের প্রধান বিরোধী দলের অস্তিত্ব মুছে ফেলার লক্ষ্যে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে এমন নিষ্ঠুর অমানুষিক ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছেন।

পরিশেষে আমরা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের প্রতি বিনীত আহŸান জানাবো, সরকারের নেতৃত্বে থাকার তুচ্ছ লক্ষ্যে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি অমানুষিক আচরণ করা থেকে যতদ্রæত বিরত থাকবেন ততই আপনাদের ভবিষ্যৎ কল্যাণময় হবে। কারণ পৃথিবীতে কোন ব্যক্তি বা দলই চিরস্থায়ী নয়, সকলকেই একদিন না একদিন দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে এবং যেতে হবে এমন এক পবিত্র সর্বশক্তিমান সত্ত¡ার কাছে যার বিচার থেকে কেউ রেহাই পাবে না।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (6)
কাজী হাফিজ ২৩ জানুয়ারি, ২০২০, ১:২৪ এএম says : 0
কিন্তু যারা ক্ষমতায় থাকে তারা এটা তো ভূলে যায়।
Total Reply(0)
জাবের পিনটু ২৩ জানুয়ারি, ২০২০, ১:২৫ এএম says : 0
এটা চরম সত্য কথা হলেও কেউ তা মনে রাখে না। ক্ষমতার মোহ তে সব ভুলে যায়।
Total Reply(0)
মেহেদী ২৩ জানুয়ারি, ২০২০, ১:২৫ এএম says : 0
জি স্যার সহমত। আখেরে তো অবশ্য খেসারত দিতে হবে। কিন্তু তারাতো তা মনে করে না।
Total Reply(0)
কামাল ২৩ জানুয়ারি, ২০২০, ১:২৬ এএম says : 0
ইনশায়াল্লাহ দুনিয়াতেই তাদের কটোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
Total Reply(0)
jack ali ২৩ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:১১ পিএম says : 0
InshaaAllah this government will go to hell... O' Allah we are suffering to much. Remove so called democracy and install a government who will rule our country by the Divine Law.
Total Reply(0)
** হতদরিদ্র দীনমজুর কহে ** ২৩ জানুয়ারি, ২০২০, ৮:৫৫ এএম says : 0
আসলে কে শুনবে হক কথা।
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন