ঢাকা, রোববার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৮ জামাদিউস সানি ১৪৪১ হিজরী

ধর্ম দর্শন

মুমিনের জীবনে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব ও উপকারিতা

মুফতী পিয়ার মাহমুদ | প্রকাশের সময় : ২৩ জানুয়ারি, ২০২০, ১২:০২ এএম

পূর্ব প্রকাশিতের পর

আর মুরীদ বা আত্মশদ্ধির পথের পথিকের কাজ হলো নিজ শায়খ বা পীর সাহেবের সে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী আমল করতে থাকা। সে অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করা। তাহলেই এই মেহনতের সুফল পাওয়া যাবে। নতুবা আশার গোঢ়ে বালি পড়বে বৈ কি?

আত্মার চিকিৎসার মাধ্যম

তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধির বেশ কিছু মাধ্যম রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বর্ণনা করা হলো।

১. আল্লাহর যিকর: আত্মার চিকিৎসার একটি অন্যতম মাধ্যম হলো, যিকরুল্লাহ। এ ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিয়ে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক বস্তুকেই পরিষ্কার করার যন্ত্র আছে। [আত্মাকে পরিষ্কার করারও যন্ত্র আছে] আর আত্মাকে পরিষ্কার করার যন্ত্র হলো আল্লাহর যিকর। বস্তুত আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষাকারী হিসাবে যিকরের চেয়ে অধিক প্রভাবশালী আর কোনো বস্তু নেই। [শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস: ৫১৯; কানযুল উম্মাল, হাদীস:১৭৭৭] অন্য বর্ণনায় এসেছে, যিকরুল্লাহ আত্ম্ার রোগ মুক্তির মহৌষধ। [কানযুল উম্মাল, ১/২১২,হাদীস:১৭৫১] সাহাবী আবূ দারদা রা. বলেন, প্রত্যেক জিনিস পবিত্র করার একটি যন্ত্র আছে। আত্মা সমূহকে পবিত্র করার যন্ত্র বা মাধ্যম হলো আল্লাহর যিকর। [শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস: ৫১৯] তো যত বেশী মাওলায়ে পাকের যিকরে নিজেকে লিপ্ত রাখা হবে দিল ততই পরিষ্কার হবে। দিলের রোগ-ব্যধি দূর হবে। নেক আর কল্যাণে ভরে উঠবে হৃদয় জগত। ফলে হৃদয়ে আসবে ইতমিনান আর প্রশান্তি। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, ‘শোনো! আল্লাহর যিকর দ্বারাই দিলে ইতমিনান বা প্রশান্তি আসে।’ [রাদ:২৮]

২. বেশি বেশি ইস্তিগফার পাঠ করা

তাযকিয়ার আরেকটি মাধ্যম হলো, বেশি বেশি ইস্তগফার করা। ইস্তিগফারও দিলকে পরিষ্কার করে। হাদীস শরীফে ইস্তিগফারকে দিলের পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি ও পবিত্রতার মাধ্যম বলা হয়েছে। সাহাবী আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, তামা ও লোহার ন্যায় অন্তরেও মরিচা পড়ে। এই মরিচা পরিষ্কার করার মাধ্যম হলো ইস্তিগফার। [আদ দুআ, তাবরানী, হাদীস: ১৭৯১, আল মুজামুছ ছাগীর, তাবরানী, হাদীস: ৫০৯; আল মুজামুল আওসাত, হাদীস:৬৮৯৪] ইস্তিগফারের মাধ্যমে দিল পরিষ্কার করার আসল কারণ হলো গুনাহের জন্য মানব যখন অনুতাপ ও অনসুচণার সাথে ইস্তিগফার করবে, তখন লজ্জার কারণে অন্তরে আপনা আপনি নরমী ও কোমলতা সৃষ্টি হবে এবং আল্লাহর বড়ত্ব ও নিজের অপারগতা অনুভব হবে। এই অনুভূতি আত্মশুদ্ধির পথে অধিক কার্যকর কৌশল। তাই যিকরের সাথে সাথে বেশি বেশি ইস্তিগফার চালু রাখা উচিত।

৩.নেককারদের সুহবত

তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধির জন্য আল্লাহ ওয়ালাদের সুহবত অসাধারণ ক্রিয়া করে থাকে। আকীদা ও জাহেরী আমল দুরস্ত হয়। অন্তরে

এক নতুন অবস্থা অনুভূত হয়, যা ইতিপূর্বে ছিলো না। যে অবস্থার প্রতিক্রিয়া এই হয় যে, প্রতিনিয়ত ইবাদতের প্রতি আগ্রহ, গুনাহের প্রতি ঘৃণা ও আকীদা-বিশ্বাসের দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায়। [ইসলাহী নিসাবে সংযুক্ত তালীমুদ্দীন:৪৫৩] এ জন্য আল্লাহ ওয়ালাদের সুহবত গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো। [তাওবা:১১৯] মূলত এরুপ হিদায়াত দিয়ে আল্লাহ তাআলা এই দিকে নির্দেশনা করেছেন যে, আমলে ছালেহার প্রতি শওক ও আগ্রহ এবং পাপাচারের প্রতি অনীহার যোগ্যতা অর্জন করার জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দাদের সান্যিধ্যে সময় কাটানো এবং তাদের ফয়েয ও বরকতের আচল শক্তভাবে আকড়ে ধরাও আত্মশুদ্ধির অত্যন্ত উপকারী মাধ্যম।

৪. কামিল পীরের সুহবত

অভিজ্ঞতা বলে আত্মশুদ্ধি বা দিলের পবিত্রতা কেবল কিতাব মুতালাআ ও জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার সঞ্চয় করার দ্বারা অর্জিত হয় না।

এর জন্য প্রয়োজন আল্লাহর মারেফত প্রাপ্ত ও নৈকট্য লাভকারী সাধকদের সুহবত ও তাঁদের পরামর্শ মুতাবিক জীবন পরিচালনা করা। আর এ জন্য জরুরী হলো, মানুষ যেভাবে দৈহিক রোগ-ব্যধির সুচিকৎসার জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ ডাক্তার খোঁজে বের করে নিজেকে তার নিকট সোপর্দ করে দেয় এবং তার প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চলে ও বিধি-নিষেধ পুরোপুরি মেনে আরোগ্য লাভ করে; ঠিক সেভাবে আত্মিক রোগ-ব্যধির সুচিকিৎসার জন্যও অভিজ্ঞ ডাক্তার খোঁজা উচিত। দিলের ভিতর লুক্কায়িত সু²াতিসু² রোগ-ব্যধির চিকিৎসা নিজে নিজে কোনো ব্যক্তি করতে পারে না। নফস ও শয়তানের ধোঁকা এত সু² ও সুপ্ত যে মানুষ নিজে তা বুঝতে পারে না। অনেক সময় এমনও হয় যে, সে যেটাকে ইবাদত মনে করছে তাই তার দীনী তরক্কী ও উন্নতির পথে প্রধান অন্তরায়। এ জাতীয় রোগ-ব্যধি কেবল একজন হক্কানী ও কামির পীরই ধরতে পারে এবং তার সুচিকিৎসা দিতে পারে।

কাামিল পীরের পরিচয়

এখন কথা হলো, কামিল পীর হওয়ার দাবিদার তো অনেক মানুষই করে থাকে। এমন দাবীদার অতীতেও ছিল। বর্তমানেও ঢের আছে। তো আমরা চিনবো কিভাকে যে, কে শায়খে কামিল বা কামিল পীর আর কে বাতিল বা ভন্ড পীর? মুজাদ্দিুল মিল্লাত হাকীমুল

উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী রহ. কামিল পীর চেনার ১০টি আলামত ও গুণ বর্ণনা করেছেন। যার মাঝে এই ১০টি আলামত ও গুণ পাওয়া যাবে, তিনিই শায়খে কামিল বা কামিল পীর। আর যে পীরের মাঝে এগুলো পাওয়া যাবে না তিনি বাতিল বা ভন্ড পীর আলামতগুলো হলো, ১. প্রয়োজন পরিমাণ ইলমে দীনের অধিকারী হতে হবে। তা কিতাব পড়ে হোক বা আলিমদের সুহবতে থেকে হোক। যেন ভ্রান্ত আকীদা ও ভ্রান্ত আমল থেকে তিনি নিজেও নিরাপদ থাকতে পারেন এবং মুরীদদেরকেও নিরাপদ রাখতে পারেন। নতুবা এই প্রবাদে পরিণত হবে ‘নিজেই পথ ভ্রষ্ট, অন্যকে কি পথ দেখাবে’। ২. তার আকীদা-বিশ্বাস, আমল-আখলাক ও স্বভাব-চরিত্র শরীআত সম্মত হতে হবে। ৩. দুনিয়ার লোভ না থাকতে হবে এবং কামিল হওয়া দাবী না করতে হবে। কারণ এটিও দুনিয়ারই একটি অংশ। ৪. কোনো কামিল পীরের নিকট কিছু দিন সুহবত গ্রহণ করেছেন, এমন হতে হবে। ৫. সমকালীন হক্কানী উলামা-মাশায়েখ ও বুযুর্গগণ তাকে যোগ্য ও ভালো মনে করেন। ৬. সাধারণ মানুষের তুলনায় সমঝদার দীনদার লোকেরা তার অধিক ভক্ত ও আকৃষ্ট। ৭. তার সিংহভাগ মুরীদ শরীআতের অনুসারী এবং তাদের মধ্যে দুনিয়ার লোভ নেই। ৮. তিনি আন্তরিকভাবে নিজের মুরীদদেরকে তালীম দেন এবং তাদের সংশোধন কামনা করেন। মুরীদদের মাঝে খারাপ কিছু দেখলে বা শুনলে তাদেরকে ধড়-পাকড় করেন। তাদের মর্জি মুতাবিক ছেড়ে দেন না। ৯. তার সুহবতে কিছুদিন বসার দ্বারা দুনিয়ার ভালোবাসা হ্রাস পায় এবং আল্লাহর ভালোবাসা বৃদ্ধি হয়। ১০. তিনি নিজেও যাকির ও আমলকারী। কারণ নিজে আমল না করে অন্যকে আমলের তালীম দিলে তাতে বরকত হয় না। [ইসলাহী নিসাবে সংযুক্ত কাসদুস সাবীল ও তালীমুদ্দীন:৮০১-৮০২, ৪৫৬]
কামিল পীর হওয়ার জন্য অলৌকিক কোনো কিছু প্রকাশ পাওয়া জরুরী নয়

যার মাঝে উপরোক্ত আলামতগুলো পাওয়া যাবে তিনি একজন শায়খে কামিল ও হক্কানী পীর। তাঁর থেকে কোনো কারামত বা অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পায় কিনা, তাঁর কাশফ হয় কি না, অথবা তিনি দুআ করলে কবূল হয় কি না, গোপন ও বভিষ্যতের বিষয়ে জানতে পারেন কি না, আধ্যাতিক শক্তি দ্বারা কোনো কিছু করতে পারে কি না? এভাবে তাঁর তাওয়াজ্জুহতে মানুষ ছটফট করে কি না? ইত্যাদি তালাশ করার প্রয়োজন নেই। কারণ কামিল পীর বা ওলী হওয়ার জন্য এগুলো থাকা জরুরী নয়। মূলত এসব কর্মকান্ড নফসের সাথে সম্পৃক্ত। যা সাধনা করলে বৃদ্ধি পায়। সাধনা করলে যে কারো দ্বারাই এ ধরনের কর্মকান্ড প্রকাশ পেতে পারে। একজন কাফেরের দ্বারাও প্রকাশ পেতে পারে। [ইসলাহী নিসাবে সংযুক্ত কাসদুস সাবীল ও তালীমুদ্দীন:৮০১-৮০২, ৪৫৬] পরম দয়ালু আল্লাহর মেহেরবানীতে কোনো যুগেই উল্লেখিত গুনের অধিকারী ওলী-আওলীয়া ও আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত বান্দাগণের অনুপস্থিতি ছিল না। সর্ব যুগেই এ সকল গুণের অধিকারী ওলী-আওলিয়া ও পীর-দরবেশ পর্যাপ্ত পরিমাণে উপস্থিত ছিল। আল হামদুল্লিাহ! হাল-যামানায়ও উল্লেখিত গুনের অধিকারী এমন আনেক বুযুর্গ ও কামিল পীর আমাদের সামনে উপস্থিত আছেন, যাদের সুহবতে থেকে লাখ লাখ মুমিন-মুসলমান তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধির মেহনতে লেগে আছেন এবং নিজেদের আখলাক-চরিত্র ও ভিতর-বাহির সংশোধন করে আলোকিত ও পরিশুদ্ধ মানষে পরিণত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। তাই তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধির জন্য কামিল পীর-মুরশিদগণের হেদায়াতী আঁচল মজবুতভাবে আকড়ে ধরে রাখা একজন মুমিনের অবশ্য কতর্ব্য। এতে সংশোধন হবে তার আখলাক-চরিত্র। পরিশুদ্ধ হবে ভিতর-বাহির। সহজ হবে ইবাদত ও আনুগত্যের রাস্তা। মিলবে মাওলায়ে পাকের রেযা ও সন্তুষ্টি। সর্বোপরি পরকালে পাওয়া যাবে অনাবিল সুখ-শান্তি ও অবারিত নিয়ামতরাজীর ঠিকানা জান্নাত এবং মুমিনের কাঙ্খিত নিয়ামত দিদারে ইলাহী। তাই আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধির প্রকৃত পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করে আখলাক-চরিত্র সংশোধন এবং ভিতর-বাহির পরিশুদ্ধ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

 

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন