ঢাকা, রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৬, ১০ শাবান ১৪৪১ হিজরী

মহানগর

ইউএস ট্রেড শো : বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ

হাসান সোহেল | প্রকাশের সময় : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, ৯:০০ পিএম

বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাজারের শীর্ষ নাম যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের দেশ। আর তাই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য প্রতিশ্রুতিশীল সুযোগ সৃষ্টি করছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বাংলাদেশে সফলভাবে কাজ করছে এবং এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। বৈচিত্র্যময় খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করছে। যার মধ্যে আছে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ উৎপাদন, আর্থিক সেবা, অবকাঠামো, কৃষিবাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, কনসাল্টিং সেবা, বেসামরিক বিমান চলাচলসহ নানাবিধ খাত।

সূত্র মতে, বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের ৯ শতাংশের বেশি হয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। গত অর্থবছরে এই বাণিজ্যের আকার ছিল ৯ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসও বাংলাদেশে পণ্য ও সেবা রপ্তানি এবং এখানে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিতে কাজ করছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছরই বাংলাদেশে ইউএস ট্রেড শো’র আয়োজন করছে। আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স (অ্যামচেম) এবং বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাস এর যৌথ উদ্যোগে ১৯৯২ সাল থেকে এই ট্রেড শো শুরু হয়।

ট্রেড শো’র আয়োজক অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিভিন্ন পণ্য ও সেবা দেশের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের কাছে তুলে ধরতে এই ‘ট্রেড শো’। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ ও সুযোগ তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে প্রতিবছরই এই আয়োজন করা হয় বলে উল্লেখ করেন সৈয়দ এরশাদ আহমেদ। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছে, একক দেশের ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না। তাই এখন থেকে আমাদের রফতানির বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিতে হবে।

দেশের তৈরি পোশাক, চামড়াসহ বেশ কিছু রফতানিমুখী পণ্যের প্রধান গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে পেপসিকো, কোকাকোলা, শেভরনের মতো বিখ্যাত আমেরিকান কোম্পানিগুলো দেশে ব্যবসা করছে। ইউএস ট্রেড শো দু’দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন আয়োজক বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসের ডেপুটি চীফ অব মিশন জোয়্যান ওয়াগনার।

বাংলাদেশী ভোক্তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব উচ্চ মানের, সর্বাধুনিক আমেরিকান পণ্য ও সেবা সরবরাহ করতে পারে, ট্রেড শোতে সেগুলো তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে ‘ইউএস ট্রেড শো’ বাংলাদেশের প্রশংসনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের অবদান তুলে ধরবে।

বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি বাজারের শীর্ষ গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য আরও বিকাশের প্রত্যাশায় বুধবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ঢাকায় শুরু হয়েছে ২৭তম ‘ইউএস ট্রেড শো-২০২০’। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী এ ‘ট্রেড শো’ উদ্বোধন করেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন।

ইউএস ট্রেড শো দু’দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন শিল্পমন্ত্রী। নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৫২তম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০১৯ সালে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ছিল উল্লেখ করে শিল্পমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাণিজ্য ঘাটতি ধীরে ধীরে কমে আসছে।

শিল্পমন্ত্রী জানান, শিল্পনীতি ২০১৬-এ দেশের সর্বত্র বিশেষত রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বিশেষ ইনসেন্টিভ ও সুবিধা রয়েছে। নীতিতে জ্বালানি, অবকাঠামো, যোগাযোগ, কৃষি ব্যবসা, আইসিটি, শিক্ষা, পর্যটন, রিয়েল এস্টেটসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রচুর সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপশি দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে বাণিজ্য ব্যবস্থার উদারীকরণ করা হয়েছে এবং নন-শুল্ক বিধিনিষেধকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়েছে। এছাড়াও শিল্পমন্ত্রী দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে দু’দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্য পারস্পরিক যোগাযোগ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান ।

সরেজমিনে ‘ট্রেড শো’ ঘুরে দেখা গেছে, আমদানিকারক ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তেরি বিভিন্ন পণ্য ও সেবা ক্রেতা-দর্শনার্থীদের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিভিন্ন খাদ্যপণ্য নিয়ে ‘ট্রেড শো’তে অংশ নিয়েছে ইউএস ফুড মার্ট। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. আখতারুজ্জামান খান ইনকিলাবকে বলেন, আমারা যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও বেভারেজসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করি। ইউএস থেকে আমদানিকৃত পণ্যগুলো এখানে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের কাছে তুলে ধরছি, পাশাপাশি বিক্রিও করছি।

মো. আখতারুজ্জামান খান বলেন, বাজারে নকল পণ্যে সয়লাব। আমরা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি করি। এটি শতভাগ আসল পণ্য। ট্রেড শো ছাড়াও অনলাইন, ফেসবুকে অর্ডার করলে এসব পণ্য পৌঁছে দেয়া হয়। পাশাপাশি ঢাকার বনানীর নিজস্ব শো-রুমে পণ্যগুলো বিক্রি করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কেক্সট্রন কোম্পানির তৈরি বেল-এর হেলিকপ্টার বিক্রি করে ট্রানসনিক কমিউনিকেশন লি.। প্রতিষ্ঠানটির বিপণন কর্মকর্তা মামুনুল হাসান আকাশ ইনকিলাবকে বলেন, ট্রানসনিক কমিউনিকেশন হেলিকপ্টার বিক্রির পাশাপাশি হেলিকপ্টার মেরামতসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে বিক্রি করে। তিনি বলেন, এখন আমাদের কাছে দুটি মডেল বেল-৪২৯ ও বেল-৪০৭ জিএক্সআই হেলিকপ্টার রয়েছে। এর মধ্যে সাতজন যাত্রী বহনকারী বেল-৪২৯ এর দাম সাড়ে ৭ মিলিয়ন ডলার এবং পাঁচজন যাত্রী বহনকারী বেল-৪০৭ জিএক্সআই এর দাম ৫ মিলিয়ন ডলার। আগামী জুনে আরও একটি নতুন বেল ৫০৫ হেলিকপ্টার আসছে। যার মূল্য ২ মিলিয়ন ডলার।

মামুনুল হাসান আকাশ বলেন, দেশে দিন দিন হেলিকপ্টারের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে যাত্রী সংখ্যাও। এখন বেক্সিমকো গ্রুপ, স্কয়ার এয়ার, সিকদার গ্রুপ, মেঘনা, ইমপ্রেস অ্যাভিয়েশন, পিএইচপি গ্রুপসহ অনেকে বাণিজ্যিকভাবে হেলিকপ্টারের ব্যবসা করছে। এখন বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। তাই ট্রেড শোর মাধ্যমে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আমাদের পণ্য ও সেবার তথ্য তুলে ধরছি।

অ্যামচেমের সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ পাশে আছে বলেই আমরা টেকনোলজিতে এগিয়ে যাচ্ছি। ট্রেড শোতে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন নতুন টেকনোলজি ও আইডিয়া নিয়ে এসেছে। আমাদের দেশের কোম্পানি আরএফএল, তারা নতুন একটি প্লাস্টিক তৈরি করেছে যা হাইটেক এবং কম দামে বিক্রি করছে। হাইটেক পণ্য বাজারে আনতে হলে নতুন টেকনোলজির বিকল্প নেই।

গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি মন্তব্য করে সৈয়দ এরশাদ বলেন, চীন কয়েক ধরনের পণ্য তৈরি করে। ওই সব পণ্য যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে রফতানি করে। এখন আমাদের ওইসব বাজারে ঢুকতে হলে জানতে হবে তাদের চাহিদা কী? কীভাবে যাব? এটি বের করতে হলে গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমাদের দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির কথা উল্লেখ করে কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আমাদের মানব সম্পদ রয়েছে। কিন্তু দক্ষ মানব সম্পদের অভাব। এক্ষেত্রে আমাদের কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বৈচিত্র্যময় শিল্পখাতে বিদ্যমান বিশাল সম্ভাবনার সন্ধানের জন্য সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে রাসায়নিক, প্লাস্টিক, চামড়া, সিরামিক, অটোমোবাইল, খাদ্য এবং অন্যান্য অনেক শিল্প স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এই সুযোগ কাজে লাগানোর আহবান জানান।

আয়োজক সূত্রে জানা যায়, ‘ট্রেড শো’তে এবার জ্বালানী, কৃষি-যান্ত্রিকীকরণ এবং খাদ্য ও পানীয় খাতসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশে সক্রিয় ৪৮টি প্রতিষ্ঠান ৭৮টি স্টলে তাদের পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করছে। পাশাপাশি শো’র দ্বিতীয় দিনে আগামীকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা, যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়ন, বেসরকারি খাতে যুক্ত হওয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য বিষয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে।

‘ইউএস ট্রেড শো’ চলবে আগামী ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত চলবে এই শো। প্রবেশ ফি ৩০ টাকা। তবে শিক্ষার্থীরা ইউনিফর্ম পরে অথবা পরিচয়পত্র দেখিয়ে বিনামূল্যে প্রবেশ করতে পারবেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন