ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১০ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

আন্তর্জাতিক সংবাদ

অভাবের তাড়নায় সন্তান পরিত্যাগ করছে যে দেশের মানুষ

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২ মার্চ, ২০২০, ১২:৩৬ পিএম

''শিশুদের পরিত্যাগ করা নিষিদ্ধ'', ভেনেজুয়েলার সড়কের পাশের দেয়ালজুড়ে এই বার্তা লিখে রেখেছেন শিল্পী এরিক মেহিকানো। রাজধানী কারাকাসে তার অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের কাছাকাছি একটি ময়লার স্তূপে সদ্যজাত একটি শিশু পাওয়ার পর তিনি এই উদ্যোগ নেন। মেহিকানো বলছেন, তিনি মানুষজনকে সতর্ক করতে চান যে, ভেনেজুয়েলায় এমন কিছু অব্যাহতভাবে ঘটছে, যা আগে কখনোই স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়নি। দেশটির অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে তলানিতে যাচ্ছে। প্রতি তিনজন ভেনেজুয়েলানের মধ্যে অন্তত একজন নূন্যতম পুষ্টিমানের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে জাতিসংঘ খাদ্য কর্মসূচীর একটি গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে।

অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেকে জন্মনিরোধ কিনতে পারেন না, ফলে অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণের ঘটনা ঘটছে। গর্ভপাত বিরোধী আইনের কড়াকড়ির কারণে নারীদের সামনে বিকল্পও খুব কম।

একটি দাতব্য সংস্থা ২০১৮ সালে জানিয়েছে যে, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সড়কে বা আবাসিক ভবনের প্রবেশ দ্বারে শিশুদের রেখে যাওয়ার মতো ঘটনা অন্তত ৭০% বেড়ে গেছে। ভেনিজুয়েলার সরকার এ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের কোন সরকারি তথ্য উপাত্ত প্রকাশ করেনি।

কিন্তু সমাজকর্মী এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বিবিসি বলছে, তারা নিশ্চিত করেছেন যে, পরিত্যাগ করা শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে অনানুষ্ঠানিকভাবে দত্তক নেয়ার সংখ্যাও।

অভাবী শিশুদের খাবার জোগাতে ভেনেজুয়েলায় গড়ে উঠেছে সামাজিক খাবার ব্যবস্থা
কারাকাসের অন্যতম দরিদ্র এলাকাগুলোর একটিতে শিশুদের রক্ষা কাউন্সিলের সদস্য হিসাবে কাজ করেন নেলসন ভিলাসমিল। তিনি বলছিলেন, বিশৃঙ্খল আর সামান্য তহবিলের অভাবে বেপরোয়া পিতা-মাতারা 'শর্টকাট' পথ বেছে নেন। যেমন শিশু টমাসের (আসল নাম নয়) গল্পটি এরকম একটি ঘটনা। তার জন্ম হয়েছিল কারাকাসের একটি দরিদ্র মাতার ঘরে, যিনি মনে করেছিলেন যে, শিশুটিকে বড় করে তোলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। যে স্ত্রীরোগবিশারদের সামনে টমাসের জন্ম হয়, তিনি সহায়তা করতে রাজি হন।

তিনি বলছেন, এটাই প্রথম ঘটনা নয় যে, কোনো মা তার শিশুকে বড় করতে অপারগ বোধ করেন। ''তবে প্রথম যখন শিশুকে মাতৃদুগ্ধ পান করান, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা মন বদলে ফেলেন। কিন্তু সবসময় সেটা ঘটে না আর সেজন্যই একটি সমাধান খুঁজে বের করা দরকার।''

তিনি তার একজন রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। চল্লিশ বছর বয়েসী তানিয়া (আসল নাম নয়) নামের সেই নারী একটি সন্তান নেয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন, কিন্তু গর্ভধারণ করতে পারছিলেন না।

প্রথমে তিনি টমাসকে দত্তক নেয়ার কথা ভাবেন। পরে সিদ্ধান্ত বদলে তার বন্ধু এক দম্পতির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন, যারা টমাসকে নিজের সন্তান হিসাবে গ্রহণ করতে রাজি হন।

কোন সন্দেহ তৈরি যাতে না হয়, সেজন্য তাদের শিশুটির দ্রæত জন্ম নিবন্ধন করতে হতো। ফলে তানিয়া কর্মকর্তাদের আড়াইশো ডলার ঘুষ দেন, যাতে তারা আসল মায়ের নামের বদলে সেই বন্ধুর নাম টমাসের মা হিসাবে তালিকাভুক্ত করে।

সম্পদ এবং দারিদ্র্য কীভাবে পাশাপাশি থাকে, তার উদাহরণ ভেনেজুয়েলা। পশ্চিম গোলার্ধে প্রমাণিত তেল মজুত এ দেশেই সবচেয়ে বেশি। গ্যাস সম্পদেও এই দেশ অনেক সমৃদ্ধ, বিশ্বের নবম বৃহত্তম প্রমাণিত গ্যাস মজুত আছে এ দেশেই, দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে এটি বৃহত্তম। কয়লা সম্পদ তুলনায় কম হলেও তার মজুতও উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আছে লোহা, বক্সনাইট, সোনা, নিকেল ও হীরা। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে ভেনেজুয়েলার এই সমৃদ্ধিই তার কাল হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গোষ্ঠী এ থেকে লাভবান হয়েছে, দেশের জিডিপি, মাথাপিছু আয়, রপ্তানি বাণিজ্য- সবকিছুই বেশ রঙিন হয়েছে, কিন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য তার সুফল তৈরি হয়নি দীর্ঘকাল।
সম্পদসমৃদ্ধ এই দেশে, চাভেজ সরকার ক্ষমতার আসার আগে, ১০০ জনের ৬৬ জনই প্রচলিত ‘দারিদ্র্যসীমা’র নিচে পড়েছিল। দেশের এই সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির, তার সহযোগী ছিল দেশি ধনিকেরা। ১৯৯৮ সালে চাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর দেশের এই ক্ষমতা ভারসাম্যের আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা নেন, সিমন বলিভারের বিপ্লবী ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করেন দেশে জনক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে, নাম দেন বলিভারিয়ান বিপ্লব। সব প্রতিকূলতার মধ্যে চাভেজের প্রথম দশকে ভেনেজুয়েলার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো কমিউনাল কাউন্সিল, যা জনগণকে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সাংগঠনিক কাঠামো দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে চাভেজ বিদ্যমান রাষ্ট্রের সমান্তরাল রাষ্ট্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কৃষিভূমি মালিকানায় কিছু হাত দিয়েছিলেন, দেশের সম্পদের ওপর সর্বজনের মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা সংস্কার শুরু করেছিলেন। শহরের ভূমি সংস্কারের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছিল। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হিসেবে ‘খাদ্য, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা সর্বজনের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা’ নির্ধারণ করে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও শুরু হয়েছিল। যে পরিবর্তনগুলো তিনি নিয়েছিলেন সেগুলো হলো : ১. সরকারের নীতি, কর্মসূচি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের সঙ্গে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সংযোগ স্থাপিত হওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি। ২. দেশের নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ- প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, তেল কোম্পানিসহ সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য থেকে মুক্ত করা। ৩. দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জাতীয় মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করা। ৪. তেল-গ্যাসসহ প্রাকৃতিক সম্পদ কোম্পানির মুনাফা বাড়ানোর বদলে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে ব্যবহার করা। ৫. উন্নয়ন ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে নারী, গরিব, আদিবাসী ও তরুণদের জায়গা তৈরি করা এবং ৬. বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বহুজাতিক কোম্পানি, যুক্তরাষ্ট্রসহ সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে পারস্পরিক মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংহতি গড়ে তোলা। ঋণের জন্য কোনো দুর্বল দেশ যেন এদের ওপর নির্ভরশীল না হয়, সে জন্য ঋণের তহবিল গঠন করা। কিউবা ও বলিভিয়ার সঙ্গে দৃঢ় ঐক্য গড়ে লাতিন আমেরিকায় পাল্টা ক্ষমতার ভিত্তি নির্মাণ।

সুতরাং খুব বোধগম্য কারণেই এই সরকারের সঙ্গে কনোকোফিলিপস, মনসান্টোসহ বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির বিবাদ তৈরি হয়, বিশ্বের বৃহৎ আর্থিক সংস্থা বড় ব্যবসা হারায়, যুক্তরাষ্ট্র তাই প্রথম থেকেই ‘একনায়ক’ চাভেজবিরোধী প্রচারণা চালাতে থাকে। চাভেজ সরকার একের পর এক তাদের আক্রমণ, চক্রান্ত ও অন্তর্ঘাত মোকাবিলা করে অগ্রসর হয়েছে। গরিব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে নিয়ে ক্রমান্বয়ে পাল্টা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর মধ্য দিয়েই এই চেষ্টা চলেছে। দারিদ্র্য অনুপাত দুই-তৃতীয়াংশ কমে যায়। গরিব মানুষের জীবনে যে পরিবর্তন হয়, তা শুধু দারিদ্র্য পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা যাবে না। কিন্তু কোনো দেশ যদি নিজের সম্পদের ওপর নিজে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যদি জনস্বার্থকে প্রধান করে উন্নয়ন-দর্শন সাজাতে চায়, তাহলে বিশ্বের লুটেরা দুর্বৃত্তরা খেপে ওঠে। তাদেরই নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

তাই ২০০২ সালের এপ্রিল মাসে হুগো চাভেজবিরোধী সামরিক অভ্যুত্থান হয়। বলাই বাহুল্য, লাতিন আমেরিকায় এ রকম ঘটনা বহু। যেমন পরিচিত ৯/১১-এর ১৮ বছর আগে ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর লাতিন আমেরিকার চিলিতে মার্কিন সন্ত্রাসী গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পৃষ্ঠপোষকতায় সামরিক বাহিনী যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের বিরুদ্ধে। এই নির্বাচিত প্রেসিডেন্টও জনসমর্থন নিয়ে চিলিকে বদলে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিতে যাচ্ছিলেন। এসব কর্মসূচির অন্যতম ছিল মার্কিনকেন্দ্রিক বহুজাতিক সংস্থাগুলোর দাপট ও শৃঙ্খল থেকে চিলির সম্পদ ও মানুষকে মুক্ত করা, জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে ভূমি সংস্কারসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ। ভেনেজুয়েলার মতো এখানেও একটি ছোট কিন্তু ক্ষমতাশালী ধনিকশ্রেণি তৈরি হয়েছিল, যাদের স্বার্থ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ একাকার ছিল। তাই এই দুই দলের উদ্যোগে বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রথমে নানা সংকট এবং কিছু সংগঠিত বিক্ষোভ দাঁড় করানো হয়েছিল।

১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ জেনারেল পিনোশের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। এরপর গণহত্যা এবং নিষ্ঠুরতম নির্যাতনে চিলির কত মানুষ নিশ্চিহ্ন ও ছিন্নভিন্ন হয়েছে, তার হিসাব এখনো শেষ হয়নি। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে এ রকম নৃশংসতার ছাপ বহু। কিন্তু ইতিহাস বারবার একইভাবে ফিরে আসে না। ২০০২ সালে সামরিক বাহিনীর অস্ত্র আর আক্রমণ অস্বীকার করে কারাকাসের রাজপথ ভরে গেল গরিব নারী-পুরুষে। সারা দেশে গণঅভ্যুত্থানের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। আরও শক্তিশালী হয়ে চাভেজ ক্ষমতায় ফিরলেন।
কিন্তু ২০১৩ সালে চাভেজের অকাল মৃত্যুর পর সংকট তৈরির সুযোগ বাড়ল। মাদুরো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। কিন্তু তখন থেকে বিশ্বজুড়ে তেলের দামের অস্বাভাবিক পতন ভেনেজুয়েলার জন্য বড় বিপদ নিয়ে এল। ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি প্রধানত তেলনির্ভর, সেই আয় থেকেই শিক্ষা, চিকিৎসা, আশ্রয়, খাদ্যনিরাপত্তাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির খরচ নির্বাহ করা হতো। তেলের দাম দ্রæত কমে যাওয়ায় সব কর্মসূচিই ক্ষতিগ্রস্ত হলো। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ল। দেশ–বিদেশের বহুমুখী বিরুদ্ধতা, অর্থনীতির একমুখিতা, বৈশ্বিক বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাদুরো সরকার যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি। সেই সুযোগে ভেনেজুয়েলা পুনর্দখলে সক্রিয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের আড়ালে বহুজাতিক পুঁজি, যাদের এখানে ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জনপন্থী নীতির কারণে।

মার্কিন মদদে জনশত্রুরা সংকটের সুযোগে, মিডিয়ার সমর্থনে বহু মানুষকে তাদের পক্ষে আনতে সক্ষম হয়েছে। তারা এখন রাস্তায়। রাস্তায় চাভেজ-মাদুরোর পক্ষের মানুষেরাও। মার্কিন ও বহুজাতিক পুঁজির স্বার্থ দেখতে সক্ষম এ রকম সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় মরিয়া বিশ্ব দুর্বৃত্তরা। বিশ্বের বহু দেশের মতো এই দেশ আবারও দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি, সহিংসতা, লুণ্ঠন ও স্বৈরতন্ত্রে প্রবেশের হুমকির মধ্যে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন