ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০, ২২ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৫ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

লবণ নিয়ে বিপাকে চাষিরা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ৫ মার্চ, ২০২০, ১২:০০ এএম

চাষীদের কাছে পর্যাপ্ত লবন থাকা স্বত্তেও আমদানি করা হচ্ছে লবন। আর লবন আমদানির কারণে দেশীয় চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। বিক্রি করতে না পেরে তাদের মাথায় হাত। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের কৃষকদের কথা বিবেচনা না করেই আমদানির অনুমতি দিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। এমনকি বিসিক বা শিল্প মন্ত্রাণালয়ের সঙ্গেও আমদানির বিষয়টি সমন্বয় করেনি বলেও জানা গেছে। সাধারণত উৎপাদন কম হলে আমদানি করা হয়। অথচ এ বছর পর্যাপ্ত উৎপাদন স্বত্তেও আমদানির সিদ্ধান্ত দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। যে সিদ্ধান্তে চাষীরা লবন বিক্রি করতে না পেরে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। সূত্র মতে, দর্ঘিদিন থেকে নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশের লবন শিল্প। অনেকেই এই শিল্প থেকে অন্য ব্যবসায় মন দিয়েছেন।
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লবনের দাম কমে গেছে। তাই ক্রেতা নেই লবণের। চাষীরা তাই মাঠেই স্তুপ করে রেখেছে লবণ। এভাবে উৎপাদিত হাজার হাজার মণ লবণ মাঠেই পড়ে আছে। টেকনাফের অধিকাংশ মানুষ এখন লবণ চাষে যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু লবণের দাম কমে যাওয়ায় তাদের দুর্দিন চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, একটি চক্র লবণ নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা লবণ আমদানি করতে লবণ শিল্পের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। তাই সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন ভুক্তভোগী চাষিরা।
চাঁদপুরের লবণ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লোকসান, ব্যাংক ঋণের অভাবসহ নানা কারণে ৪০টি লবণ ফ্যাক্টরির মধ্যে ইতোমধ্যে মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৩৮টি। ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন প্রায় ২ হাজার শ্রমিক। এখন যারা লবন চাষ করছেন তারাও লবন বিক্রি করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন।
সূত্র মতে, চলতি বছরে দেশের মোট চাহিদার চেয়ে বেশি লবন উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু তার পরও বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে লবন আমদানি হচ্ছে। এমনকি দেশিয় বাজারের চেয়ে বেশি দামে লবন আমদানি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, তাদের কাছে যে পরিমাণ লবণ উদ্বৃত্ত রয়েছে তা দিয়ে আরও অন্তত দুই মাসের চাহিদা মিটবে। মাঠে ও মিলে পড়ে রয়েছে অন্তত ৬ লাখ মেট্রিকটন অবিক্রীত লবণ। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী লবণের সংকট দেখিয়ে দাম বৃদ্ধির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
তাদের অভিযোগ দেশের লবণ খাতকে ধ্বংস করে আমদানি নির্ভরতা বাড়াতে এই গুজব রটানো হয়েছে। এদের চিহ্নিত করে দ্রæত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির বলেন, অসাধু ও দেশের স্বার্থবিরোধী কিছু মিল মালিক লবণের নামে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সোডিয়াম সালফেট বিদেশ থেকে আমদানি করে বাজার সয়লাব করে ফেলেছে। বন্ড লাইসেন্স, কাস্টিং সল্ট ইত্যাদি নামে লবণ আমদানি করছে একটি শ্রেণি।
লবণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের বাজারে পর্যাপ্ত লবন রয়েছে। এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় লবনের উৎপাদনও বেশি।
মিল মালিকরা বলেন, মাঠে ও মিলে পড়ে রয়েছে অন্তত ৬ লাখ মেট্রিকটন অবিক্রীত লবণ। কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কালোবাজারিরা বিদেশ থেকে লবণ আমদানির কারণে দেশীয় লবণ খাত মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না। পিছিয়ে যাচ্ছে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ খাত। এই ধারা অব্যাহত থাকলে সামনের মৌসুমে লবণ চাষিরা মাঠে যাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক) সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে কক্সবাজারের অন্য উপজেলার ন্যায় টেকনাফেও লবণ উৎপাদন শুরু হয়। এ উপজেলায় তিন হাজার একর জমিতে উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন অসংখ্য চাষি-শ্রমিক। গত বছর শুধু টেকনাফ উপজেলায় ১ লাখ সাড়ে ১৪ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়। সরকার সারাদেশে ভোক্তা ও শিল্পখাতের এ চাহিদার বিপরীতে বিসিক লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার টন। আবহাওয়া অনুক‚লে থাকায় চলতি মৌসুমে লবণ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সীমান্তের নাফ নদের কিনারায় সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ ও হীলায় দেড় হাজার একর জমিতে লবণের স্ত‚প পড়ে আছে। প্রতিটি স্ত‚পে ৪০-৫০ মণ করে লবণ। এছাড়া টেকনাফ উপজেলায় সদর, হোয়াইক্যং ও শামলাপুর ইউনিয়নে আরও দেড় হাজার একর জমিতে লবণের উৎপাদন হয়েছে। ইতিমধ্যে গুটা উপজেলায় চলতি মৌসুমে উৎপাদিত ৫’শ মণ লবণ পড়ে আছে মাঠে ও গর্তে। মো. শরীফ হোসেনের ৭০ হাজার টন, মো. সালামের ৫০ হাজার টন, মো. শফিক মিয়ার ৩০ হাজার টন, হাফেজ উল্লাহর ২৫ হাজার টন, মো. সেলিমের ২০ হাজার টন লবণ উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া আরও ৫ শতাধিক চাষির উৎপাদিত হাজার হাজার মণ লবণ মাঠে পড়ে আছে। এসব লবণের মূল্য পড়ে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন লবণ চাষিরা।
সাবরাংয়ের লবণ চাষি মোহাম্মদ শরীফ হোসেন বলেন, মিল মালিক তথা বড় বড় কোম্পানিগুলো লবণের দাম কমিয়ে দেওয়ায় মাঠপর্যায়ের চাষিরা দেউলিয়া হয়ে যাবে। ধার-দেনা করে লবণ চাষ করেন চাষিরা। এতে লাভ দূরে থাক, বিনিয়োগ করা টাকাই উঠাতে পারছেন না। পানির দামেও বিক্রি করা যাচ্ছে না লবণ। উৎপাদন যত বেশি হচ্ছে, লবণের দামও তত কমছে। আমার উৎপাদিত ৭০ হাজার টন লবণ মাঠের গর্তেই পড়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতি একরে লবণ মাঠে খরচ পড়েছে ৫০ হাজার টাকা। ইতিমধ্যে লবণ বিক্রি করে একর প্রতি ১০ হাজার টাকাও পাওয়া যায়নি। চলমান দরে লবণ বিক্রি করা যাচ্ছে না। ফলে অবিক্রিত লবণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
লবণচাষি সেলিম ও সালাম জানান, শীতকাল থেকে তারা লবণ চাষ শুরু করেন। বৃষ্টি শুরু হলে চাষ বন্ধ হয়ে যায়। এ বছর পর্যাপ্ত রোদ ও কম বৃষ্টিপাত থাকায় লবণ উৎপাদন ভালো হয়েছে। কিন্তু এখন হঠাৎ লবণের দাম কমে গেছে। ডিলাররা লবণের দাম প্রায় অর্ধেক বলছেন। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে চাষিদের। অন্য বছর প্রতিমণ লবণ যেখানে বিক্রি হতো ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায়, সেখানে বর্তমানে দাম দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা।
জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা লবণচাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শফিক মিয়া জানান, বর্তমানে মাঠে পলিথিন দিয়ে রাখা হয়েছে হাজারো মণ লবণ। মধ্যস্বত্বভোগীরাও সিন্ডিকেট করে লবণের দাম কমিয়ে দেওয়ায় এ অবস্থা হয়েছে। কিন্তু লবণের ন্যায্যমূল্য নিয়ে কেউ ভাবছেন না। একন লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করেও দাদনের টাকা পরিশোধ করা যাবে না।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক) টেকনাফের ইনচার্জ মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, ইতিমধ্যে এখানে ৩৪ হাজার মণ লবণ উৎপাদন হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় লবণ উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু লবণের দাম কম হওয়ায় চাষিরা হতাশ। এ বিষয়টি কর্তৃপক্ষেকে জানানো হয়েছে।##

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন