ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮ আশ্বিন ১৪২৭, ০৫ সফর ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

সঙ্কট মোকাবেলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে

| প্রকাশের সময় : ৯ মার্চ, ২০২০, ১২:০২ এএম

চীন থেকে করোনাভাইরাস এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় একশটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক না থাকায় বিশ্বের সর্বত্র দেখা দিয়েছে ব্যাপক উদ্বেগ, শংকা ও আতংক। প্রাণঘাতী করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখের ওপরে। তবে আশার খবর এই যে, আক্রান্তদের মধ্যে ৫০ হাজারের বেশী সুস্থ্য হয়ে ঘরে ফিরে গেছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তরফে বলা হয়েছে, এ ভাইরাসে আরো বিপুল সংখ্যক মানুষের আক্রান্ত ও অনেকের মৃত্যুর আশংকা রয়েছে। একে বিশ্বের এক নম্বর শত্রæ হিসাবে চিহিৃত করে সংস্থা সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। করোনা অভাবিত মানবিক ক্ষতির পাশাপাশি অভূতপূর্ব আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। করোনার কারণেই বিশ্ব অর্থনীতি আর একটি মহামন্দার সম্মুখীন বলে অর্থনীতিবিদরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এর প্রভাবে ইতোমধ্যে উৎপাদন, উন্নয়ন, বাণিজ্য, পর্যটন ইত্যাদিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে শুরু করেছে। দিন যত যাচ্ছে, প্রতিক্রিয়াও তত গভীর ও বিস্তৃত হচ্ছে। করোনা যে সব দেশকে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকারে পরিণত করবে বলে বলা হচ্ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আল্লাহপাকের অশেষ মেহেরবাণীতে এ ভাইরাসের অস্তি্ত্ব এখনো বাংলাদেশে দেখা যায়নি। কেউ এতে আক্রান্ত হয়নি। এ প্রসঙ্গে আইইডিসিআর’র পরিচালক প্রফেসর ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গত শনিবার বলেছেন, এটি বিভিন্ন দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিবেশি দেশগুলোতে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশে এখনো এর উপস্থিতি পাওয়া না গেলেও যে কোনো সময় এটি দেশে প্রবেশ করতে পারে। এই যখন বাস্তবতা, তখন বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সে সম্পর্কে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের ধারণা ব্যক্ত করতে শুরু করেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এক পর্যালোচনায় বলেছে, করোনার কারণে জিডিপি ১.১ শতাংশ কমে যেতে পারে, যার অর্থ ৩০০ বিলিয়ন ডলার প্লাস অর্থনীতির ৩.০২ বিলিয়ন ডলার মুছে যাবে বা ছাঁটাই হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, প্রায় ৯ লাখ কর্মজীবী তাদের কাজ হারাবে। আংকটাডের এক প্রতিবেদনে চীনে কাঁচামাল রফতানি ২ শতাংশ হারে কমলে বিশ্বের ২০টি দেশের কী ক্ষতি হবে, তা উল্লেখ করে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, এতে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। চীনে রফতানি ২ শতাংশ নয়, ইতোমধ্যে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমবে প্রায় ১৪ কোটি ডলার।

ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নেই, চীন আমাদের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন-অংশীদারই নয়, আমাদের রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ইত্যাদির প্রধান যোগানদাতাও। এব্যাপারে আমরা চীনের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। গার্মেন্ট আমাদের রফতানি আয়ের প্রধান খাত। এর অন্তত ৫০ শতাংশ আমদানি চীন থেকে হয়ে থাকে। চামড়া ও আসবাবপত্র শিল্পের ক্ষেত্রেও আমাদের চীনের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশী। রফতানি আয়ের তিন চতুথাংশের বেশি আসে গার্মেন্ট থেকে। সুতরাং স্পষ্ট করেই, বলা যায়, চীন থেকে আমদানি কমে যাওয়ায় আমাদের রফতানি ও রফতানি আয়ে ধস নামবে। এর পরিধি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে আলামত মোটেই সুবিধাজনক নয়। বিজিএমইএ’র সভাপতি ড. রুবানা হক জানিয়েছেন, চীন থেকে কোনো কাঁচামাল আমদানি করা যাচ্ছে না। সব ধরনের শিপমেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। এই সংকট গার্মেন্টশিল্পকে ভয়াবহ বিপদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আরো ৩-৪ মাস এই সংকট অব্যাহত থাকলে কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবো আমরা। বলা বাহুল্য, গার্মেন্ট শিল্পের অবস্থা এমনিতেই ভালো নয়। বিভিন্ন কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। হাজার হাজার কর্মী বেকার হয়ে পড়েছে। এখনো অনেক কারখানার অবস্থা শোচনীয়। যে কোনো সময় এগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে গার্মেন্টপণ্য রফতানি থেকে আয় অব্যাহতভাবে কমছে। চলতি বছর জুলাই-ফেব্রæয়ারি সময়ে গার্মেন্টপণ্য থেকে আয় হয়েছে ১৮৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫.৫৩ শতাংশ কম। রফতানিলক্ষ্যের চেয়ে রফতানি কম হয়েছে ১৩.৪৫ শতাংশ। সামগ্রিক রফতানিতেও এই ধারার প্রতিফলন রয়েছে। ওদিকে আমদানিকারকরাও তাদের আমদানি কমিয়েছে। এইসঙ্গে মূল্যও কমাচ্ছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে করোনাভাইরাসকেন্দ্রিক সংকট দেখা দিয়েছে। এমতাবস্থায়, গার্মেন্টপণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের রফতানি কোন পর্যায়ে নেমে আসতে পারে, তা কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়।

গার্মেন্টপণ্যের ক্ষেত্রে চীন বিশ্বে অপ্রতিদ্ব›দ্বী। করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাব হওয়ায় তার সব ধরনের পণ্যের মতো গার্মেন্টপণ্যের রফতানিও কমেছে। পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে সামনের দিনগুলোতে রফতানি আরো কমবে। ওদিকে গার্মেন্টপণ্যের শক্ত প্রতিদ্ব›দ্বী ভিয়েতনাম এবং উঠতি প্রতিদ্ব›দ্বী কম্বোডিয়া করোনার কারণে গভীর সংকটে পড়েছে। এই তিন দেশের বাজার এখন নড়বড়ে। এর সুযোগ বাংলাদেশ কিংবা বাংলাদেশের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো নিতে পারে। ভারত এক্ষেত্রে অবশ্যই একটি শক্তিশালী দেশ। এছাড়া রয়েছে শ্রীলংকা। শ্রীলংকার ব্যাপারে জানা গেছে, তার রফতানি আয় কমেছে এবং কমছে। ভারতের খরব এর চেয়ে ভালো হওয়ার কথা নয়। অন্যান্য রফতানিকারী দেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যে কারণেই হোক, কোনো দেশের বাজার হাতছাড়া হলে তা প্রতিযোগী দেশগুলোর দখলে চলে যায়। বাংলাদেশের বাজার বাড়ানোর সুযোগ দেখা দিলেও কতটা বাড়াতে পারবে, সেটাই প্রশ্ন। শিল্প, রফতানি ও বাজারের এখন যা অবস্থা তাতে বাজার বাড়ানো কঠিন। পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে অন্যান্যর হারানো বাজারের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশ দখলে নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এ জন্য সরকার, বিজেএমইএ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংগঠনকে এক সঙ্গে বসতে হবে। শিল্প ও রফতানির বিষয় নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে হবে। সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহিৃত করতে হবে। অত:পর সমস্যার দ্রুত সমাধান এবং সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর্থ-বাণিজ্যিক ক্ষেত্র ছাড়া উন্নয়ন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে করোনাজনিতসংকট বা পরিস্থিতি মোকাবিলায়ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন