ঢাকা, বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২০, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ১৩ শাবান ১৪৪১ হিজরী

ধর্ম দর্শন

মিরাজের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ১৯ মার্চ, ২০২০, ১২:০৩ এএম

“পবিত্র তিনি যিনি নিয়ে গেছেন একরাতে নিজের বান্দাকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশকে তিনি বরকতময় করেছেন। যাতে তাকে নিজের কিছু নির্দেশন দেখান। আসলে তিনিই সব কিছুর শ্রোতা এবং স্রষ্টা।” (সূরা বনী ইসরাঈল : ১)
মিরাজ সর্বশ্রেষ্ট ও সর্বশেষ রাসূল (সা.) এর প্রতি আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের এক অনন্য মুজিযা। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এক একজন নবী রাসূলকে তাদের পদমর্যাদা অনুসারে পৃথিবী ও আকাশের অদৃশ্য রাজত্ব দেখিয়ে দিয়েছেন এবং বস্তুগত অন্তরালের পর্দা সরিয়ে দিয়ে চর্ম চক্ষু দিয়ে এমন সব জিনিস প্রত্যক্ষ করিয়েছেন, যে গুলোর উপর ঈমান বিল গায়েব আনার জন্য তাদের নিযুক্ত করা হয়েছিল। এভাবে একজন দার্শনিক, যিনি আন্দাজ অনুসারের ভিত্তিতে কথা বলেন, তার মর্যাদা থেকে একজন নবীর মর্যাদা পৃথক হয়ে যায়, কারণ নবীগণ যা বলেন তা চাক্ষুষ দর্শনের ও সরাসরি জ্ঞানের ভিত্তিতে বলেন। কাজেই তারা জনগণের সামনে এই মর্মে সাক্ষ্য দিতে পারেন যে, তারা এসব কথা জানেন ও এ সব কিছু তাদের স্বচক্ষে দেখা জলজ্যান্ত সত্য। শবে মেরাজের ঘটনাও রাসূল এর জিন্দেগির এক অসামান্য ঘটনা যার দ্বারা রাসূল হিসেবে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় বহুগুণে।
শবে মেরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনাবলী : হাদিসের বর্ণনা অনুসারে শবে মেরাজের ঘটনা হিজরতের এক বছর আগে সংগঠিত হয়। নবী (সা.) মক্কায় প্রকাশ্য দাওয়াত দানের ১২ বছর অতীত হয়ে গিয়েছিল। মুশরিকগণ ইসলামের বিরোধিতা করার হেন চক্রান্ত ও প্রচেষ্টা বাকি রাখেনি। তারপরও বিরোধীদের সব প্রচেষ্টা ছাপিয়ে এই সত্য আদর্শের আওয়াজ মক্কার প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল। মক্কায় এমন একদল লোক তৈরি হয়ে গিয়েছিল যে, তারা দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য যে কোন ত্যাগ করতে প্রস্তুত এবং রাসূল (সা.) এর জন্য যে কোন ঝুঁকি গ্রহণেও তারা রাজি, এমনি একটি সময়ে রাসূল (সা.) কে আল্লাহ মিরাজের মতো একটি বিশাল ঘটনার জন্য কবুল করে নেন। কুরআনের তুলনায় হাদীসে এই ঘটনাটি বেশি বিস্তারিত এসেছে। ২৫ জন সাহাবার বর্ণনায় মিরাজের ঘটনাটি এসেছে। উম্মে হানী (রা.) এর বর্ণনা অনুযায়ী মিরাজের ঘটনাটি এভাবে এসেছে-
একদিন রাতে আল্লাহর রাসূল তাহাজ্জুদ আদায়ের উদ্দেশ্যে ওযু করতে বের হলেন। এমন সময় জিবরাঈল (আ:) তাকে উঠিয়ে বোরাক নামক বাহনে চড়িয়ে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত নিয়ে যান। সেখানে তিনি আম্বিয়া (আ:) এর সাথে নামায পড়েন। তারপর জিবরাঈল (আ:) তাকে ঊর্ধ্ব জগতে নিয়ে চলেন। এবং আকাশের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন নবী (আ:) এর সাথে দেখা হয়। অবশেষে, উচ্চতার সর্বশেষ স্তরে পৌঁছে তিনি নিজের রবের সামনে হাজির হন। এ উপস্থিতির সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ সহ পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করার চূড়ান্ত আদেশ জানানো হয়। এরপর রাসূল (সা.) আবার বায়তুল মাকদিসের দিকে ফিরে আসেন। সেখান থেকে মসজিদে হারামে ফিরে আসেন। এ সফরকালীন সময়ে রাসূল (সা.) কে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানো হয়। জাহান্নামে কোন ধরনের পাপের জন্য কোন ধরনের শাস্তি দেয়া হবে, তার বেশ কিছু প্রতীকী নমুনা রাসূল (সাঃ)কে দেখানো হয়। বিভিন্ন হাদীস সমূহে এই ঘটনাগুলোর বিস্তারিত বিবরণ এসেছে।
শিক্ষা ও তাৎপর্যে শবে মেরাজ : বর্তমান সময়ে শবে মেরাজ এর ঘটনা থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় যা হতে পারে-আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের অসীম ক্ষমতার উপর নিঃশঙ্ক চিত্তে বিশ্বাস স্থাপন করা। মহান আল্লাহ্ চাইলে সবকিছুই পারেন এবং তার ক্ষমতা অপরিসীম। এই চেতনাকে মাথায় রেখে আল্লাহ্কে ভয় করে, সার্বক্ষণিক আল্লাহ্র চিন্তা করে সব কাজ করা। রাসূল (সা.) এর মর্যাদাকে উপলব্ধি করে পরিপূর্ণভাবে সিরাত অনুসরণ। মহান আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে সরাসরি গায়েবি নিদর্শন দেখে জবানপ্রাপ্ত এই বান্দার উম্মত হিসেবে রাসূল (সা.)কে পূর্ণাঙ্গভাবে নিজ জীবনের আদর্শ বানানো। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের অস্তিত্ব, জান্নাত, জাহান্নাম এর মতো বিষয়গুলো যা আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান নয়, সে গুলোতে পরিপূর্ণভাবে ঈমান আনা এবং এতে কোন প্রকার সন্দেহ না রাখা। বনী ইসরাঈলের ১৪টি মূলনীতি ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার মূল মেনিফেস্টো হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ১৪টি মূলনীতির মাধ্যমে যে বিষয়গুলো আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে তা হলো-বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন, ইয়াতীমদের সাথে আচরণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নীতিমালা। বিশেষ করে তাদের অধিকারের ব্যাপারগুলো খুবই স্পষ্টভাবে এসেছে। আল্লাহর দাসত্ব ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব করলে মুমিন জিন্দেগী বরবাদ হতে বাধ্য। সে কারণে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য সব সত্তার ইবাদত করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সম্পদ ব্যবহারের সুষম নীতিমালা দিয়ে দেয়া হয়েছে এবং অপচয় ও কৃপণতা উভয়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যভিচারের সাথে সহায়ক সব ধরনের উপকরণ, পথ, পন্থা, মাধ্যমকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রিযিকের ব্যাপারে আল্লাহ্র উপর ভরসা এবং রিযিকের জন্য জন্ম নিয়ন্ত্রণকে হারাম করা হয়েছে। অনুমান নির্ভর কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে, যা সবধরনের ভুলের সূত্রপাত করে। নিরপরাধ ব্যক্তিকে হত্যা, যা কিনা চূড়ান্ত পর্যায়ের বিপর্যয় সৃষ্টি করে তা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। লেন-দেন, বেচাবিক্রির ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা, অনৈতিকতার সব পথ রুদ্ধ করে ওজনে কম-বেশি করাকে হারাম করা হয়েছে। পারস্পারিক সম্পর্ক রক্ষা, সম্পর্কের হক আদায়ের অন্যতম মূল শর্ত ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি রক্ষার উপর জোরালোভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অহংকার সকল ধরনের অরাজকতার মূল উৎস। দাম্ভিক মানুষ সর্বদাই মানুষের সাথে ভুল আচরণ করে। অহংকার করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। মিরাজের এই ঘটনা যখন আল্লাহর রাসূল (সা.) সকালে উঠে বর্ণনা করেন লোকদের কাছে, তখন মুশরিকরা নানা ধরণের ঠাট্টা বিদ্রুপ করা শুরু করে। এমনকি অনেক মুমিন ব্যক্তিদের মনেও ঘটনার সত্যতা ঘিরে সংশয় দেখা দেয়। কিন্তু হযরত আবুবকর (রা.) ও তাঁর মতো কিছু সাহাবা ঘটনা শোনামাত্রই বিশ্বাস করলেন। মুশরিকদের অনেকে রাসূল (সা.)কে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত পথের নানা কিছু জিজ্ঞেস করলেন, নানা ধরনের প্রশ্ন করে রাসূল (সা.) কে বিব্রত করতে চাইলো কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল এত নিখুঁতভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন, যে এটা প্রমাণিত হয় যে তিনি এই ভ্রমর করেছিলেন। মিরাজের এই ঘটনার পর সূরা বনী ইসরাঈল নাযিল হয়। মিরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনার আলোকে বেশকিছু মূল নীতিমালা এই সূরায় উঠে এসেছে- সূরা বনী ইসরাঈলে বর্ণিত ১৪টি মূলনীতি :
১. আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো সত্তার ইবাদত না করা। ২. পিতামাতার সাথে উত্তম ব্যবহার, দোয়া করার নীতি। ৩. আত্মীয়, মিসকিন ও মুসাফিরের অধিকার রক্ষা। ৪. অপব্যয় না করা। ৫. আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন ও মুসাফিরের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হলেও তাদের প্রতি নরম ভাষায় কথা বলা। ৬. কৃপণতা, অপব্যয় দু’টো অভ্যাসই পরিত্যাগ করা। ৭. দারিদ্র্যের অভাবে সন্তান হত্যা না করা। ৮. যিনা না করা, যিনা বা ব্যভিচারের কাজে উৎসাহ তৈরি হয় এমন সব উপায় উপকরণকে বর্জন করা। ৯. বিনা কারণে কাউকে হত্যা করা যাবে না। আত্মহত্যাও করা যাবে না। ১০. ইয়াতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা যাবে না। ১১. প্রতিশ্রæতি রক্ষা করা। ১২. ওজনে কমবেশি না করা। ১৩. অনুমানের ভিত্তিতে কাজ না করা, সঠিক জ্ঞানের ভিত্তিতে কাজ করা। ১৪. দম্ভ ভরে পৃথিবীতে বিচরণ না করা অর্থাৎ অহংকারী না হওয়া।
রাসূল (সা.) মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় যাওয়ার অল্প কিছুদিন আগেই শবে মিরাজের ঘটনা সংগঠিত হয়। আর তখনই সূরা বনী ইসরাঈলের এই আয়াতসমূহ নাযিল হয়।
মিরাজের কয়েকটি প্রেক্ষাপট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: মক্কাবাসীর প্রবল অত্যাচারে জর্জরিত ছিল তখন রাসূল (সাঃ) এর মন-প্রাণ-অন্তর। এ সময়ে মিরাজের ঘটনাটি ছিল রাসূল (সা.) এর জন্য মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ব্যাপারে আশাবাদ তৈরি, ইসলাম বিজয়ের আত্মবিশ্বাস অর্জনের এক অনবদ্য নিয়ামক। মুসলমানদের পরীক্ষা করাও ছিল মিরাজের ঘটনার একটি উদ্দেশ্য। অনেক দুর্বল চিত্ত মুমিন মিরাজের ঘটনা বিশ্বাস করতে পারেনি। কিন্তুু আবু বকর (রা.) ও তাঁর মতো সাচ্চা মুমিমনরা শোনামাত্রই আল্লাহ্র এই বিস্মময়কর মুজিযার প্রতি ঈমান আনেন। মিরাজের ঘটনার পর বনী ইসরাঈলের বর্ণিত ১৪ টি মূলনীতি ছিল ইসলামের সমাজ বিনির্মাণের মূল মেনিফেস্টো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান সহ মূল কিছু ইসলামের বিধান মিরাজের ঘটনার সময় নাযিল হয়। জান্নাত, জাহান্নামসহ আল্লাহ্র সাথে কথা বলার সুযোগ প্রাপ্তির, নবী-রাসূলগণদের সাথে দেখা করার সুযোগ, এগুলো প্রত্যেকটি ছিল রাসূল (সা.) এর জ্ঞান, গায়েবি কিছু বিষয় চাক্ষুষ দেখার এক বিরল অভিজ্ঞতা যা তার নবুয়্যাতী জ্ঞান ও সেই সাথে নবুয়্যাতের সত্যতা প্রমাণিত করার এক বিশাল উৎস ছিল।
শবে মেরাজের এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি অলৌকিক ঘটনার কাহিনী নয়। বরং মুমিন জীবনের জন্য চরম শিক্ষণীয় একটি নিদর্শন। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের চরম ক্ষমতার ছোট্ট একটি নিদর্শন থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। শবে মেরাজের এই ঘটনায় রাসূল (সা.) জাহান্নামের এক একটি দলের অপরাধ ও শাস্তির যে ঘটনাগুলো চাক্ষুস করেন, শুধু সেগুলোও যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে আল্লাহর শাস্তির ভয়েও এই সমাজের প্রত্যেকটি ভুল-ত্রু টি ও অপরাধ সংশোধিত হতে বাধ্য।
পবিত্র মাহে রমজান মাস আসতে আর খুব বেশি দেরি নেই। রমজানের প্রাক্কালে শবে মেরাজের দিনটির তাৎপর্য ও শিক্ষা আমাদের রমজানের প্রস্তুতিকে করবে আরো সুন্দর ও সুশৃঙ্খল। তাই আসুন মিরাজের শিক্ষাকে নিজে মেনে চলি, অন্যকেও মেনে চলার আহবান জানাই। ঈমানের ছিদ্রপথগুলো বন্ধ করে গড়ে তুলি তাকওয়ার চেতনায়, ঈমানের প্রেরণায় এক সুসংবদ্ধ ঈমানী প্রাসাদ।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন