ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২০, ২৪ চৈত্র ১৪২৬, ১২ শাবান ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস

| প্রকাশের সময় : ২৬ মার্চ, ২০২০, ১২:০২ এএম

আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস আজ স্বাধীনতার ৪৯তম বর্ষ অতিক্রম করে ৫০তম বর্ষে পদার্পণ ঘটলো ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার সূচনা করে। হানাদার বাহিনীর এই হামলা ও গণহত্যার বিরুদ্ধে তখনই দুর্বার প্রতিরোধ শুরু হয়ে যায়। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে বেতারে ঘোষিত হয় মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তার এই ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে ও লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ ৯ মাসের মরণপণ সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশমাতৃকা হানাদার মুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শাহাদাত বরণ করেন, অসংখ্য মানুষ আহত হন, বহু মা-বোন সম্ভ্রমহারাহন, সম্পদ-সম্পত্তির বেশুমার ক্ষতি হয়। এত কিছুর বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা, যার প্রতীক্ষায় যুগযুগ ধরে অপেক্ষায় ছিল দেশের মানুষ। স্বাধীনতা যে কোনো জাতির জন্য পরম আকাঙ্খার বিষয়, আত্মপ্রতিষ্ঠার অধিকার, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন, অর্থনৈতিক মুক্তি, বৈষম্যের অবসান ইত্যাদি ছিল স্বাধীনতার লক্ষ্য। এইসব লক্ষ্য অর্জনের প্রত্যাশা নিয়েই জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং বিপুল ত্যাগ ও মূল্যে স্বাধীনতার স্বপ্নের বন্দরে উপনীত হতে সক্ষম হয়েছিল। শুরুতেই স্বাধীনতার তিনটি মৌলিক লক্ষ্যের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছিল। এই তিনটি মৌলিক লক্ষ্য হলো, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং সাম্য, এর সঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার, সুশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়গুলোও তপ্রোতভাবে সংযুক্ত ছিল।

আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করতে চলেছি। এ বছর স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততমজন্মদিন স্মরণে মুজিববর্ষ উদযাপিত হচ্ছে। সমৃদ্ধ দেশগঠনই বঙ্গবন্ধু ও লাখো মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন ছিল। সেই লক্ষ্য এখনো অনেক দূরে। এখন পর্যন্ত এই অঙ্গীকার-প্রতিজ্ঞা কথারকথাই হয়ে আছে রাজনীতি এখনো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানমূলক ধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উল্টো দোষারোপের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। গণতন্ত্র এখনো সোনার হরিণ। সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ, মানবিক মর্যাদা ও সাম্য নিখোঁজ প্রায়। অর্থনৈতিক মুক্তি সুদূর পরাহত। সবচেয়ে গভীর উদ্বেগের বিষয় এই যে, সা¤প্রতিক বছরগুলোতে জাতিকে বিভক্ত করার এক সর্বনাশা তৎপরতা চলছে। জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই স্বাধীনতা অর্জন সম্ভবপর হয়েছিল। বলা হয়, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা অনেক কঠিন। স্বাধীনতা তখনই সুরক্ষিত থাকে যখন জাতি ইস্পাতকঠিন ঐক্যে দৃঢ়বদ্ধ থাকে। যারা জাতিকে বিভক্ত করতে তৎপর তারা মূলত স্বাধীনতাকে অরক্ষিত করে তুলছে। স্বাধীনতা সুরক্ষিত করা এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। আমাদের রাজনীতি, নির্বাচন, শাসন ইত্যাদিতে কর্তৃত্ববাদী মনোভাব আমরা বিশেষভাবেপ প্রত্যক্ষ করছি, এটা জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক গভীর উদ্বেগময় অশনিসংকেত। ক্ষমতা যখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় এবং ক্ষমতার জন্য কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা যখন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন জাতির ভবিষ্যত নিয়ে শংকা জাগা স্বাভাবিক। বলা হয়, জনগণই দেশের মালিক, ক্ষমতার উৎস, অথচ বাস্তবতা হলো, জনগণের মালিকানা হাতছাড়া হয়ে গেছে। তারা আর এখন ক্ষমতার উৎস নয়। দেশে এখন একতরফা ও জোর-জবরদস্তিমূলক শাসন চলছে। এ ধরনের শাসনে জনগণের প্রত্যাশিত উন্নয়ন ও মঙ্গল সাধিত হতে পারেনা। দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিও দ্রæতায়িত হতে পারেনা।

একদিকে জাতির জনকের শততমজন্মবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের মহামারী, কোটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর আশঙ্কার মধ্য দিয়ে এবারে স্বাধীনতা দিবস পালিত হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের সতর্কতার জন্য সব জাতীয় অনুষ্ঠানসূচি বাতিল করা হয়েছে। জনপ্রশাসনের সহায়তার জন্য সারাদেশে সেনা নামানো হয়েছে। এরপরও স্বস্তি ও নিরাপত্তায় অনিশ্চিয়তা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ও ঘরবন্দি মানুষ ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরনের বেইল-আউট তহবিলের পরিকল্পনা করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত নির্দেশনার কথা অর্থমন্ত্রী আগেই জানিয়েছিলেন। সেই সাথে তিনি মানবিক কারণে কারাবন্দী বিএনপি নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে ৬ মাসের অন্তবর্তিকালীন জামিনে মুক্তি দিয়েছেন। এটা একটা বহুপ্রত্যাশিত যুগান্তকরি সিদ্ধান্ত। তাঁর এই মানবিক অবস্থানে জাতীয় রাজনীতিতে ঐক্য ও ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা দেখা দিয়েছে। অনেক দেরিতে হলেও এই সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে আমরা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। করোনা ভাইরাস একদিকে যেমন বিশ্বমানবতার জন্য এক অশনিসংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে, একইভাবে এই মহাবিপদ পুরো মানবজাতিকে আবারো একই বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব এন্থনিও গুতেরেস সব যুদ্ধ ও বৈরীতার অবসান ঘটিয়ে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলার আহŸান জানিয়েছেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনে জাতীয় ঐক্য দেখতে চাই। আমাদের জাতি বিশ্বে সংগ্রামী জাতি হিসেবে নন্দিত। এ জাতির অন্তর্গত মানুষ শতশত বছর ধরে জাতীয় প্রতিষ্ঠা, স্বশাসন ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই-সংগ্রাম ও যুদ্ধ করেছে তার অতীত অত্যন্ত উজ্জ্বল। জাতির ইতিহাসের মধ্যেই প্রেরণা রয়েছে, দিক-নির্দেশনা রয়েছে, ঐক্যবদ্ধ জাতি স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল, ঐক্যবদ্ধ জাতিই তার আকাঙ্খা ও প্রত্যাশাকে বাস্তবায়িত করতে পারে। জাতির জনক জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ সম্পন্ন করে যেতে পারেননি। তার অসস্পন্ন কাজ সম্পন্ন করার দায় বর্তেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর। জাতিকে ফের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করতে হবে সব ধরনের দুর্নীতি, অপকর্ম ও অপরাধ নির্মূল করতে হবে। এ কাজের জন্য এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। এ ব্যাপারে একটা গণজাগরণ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। আজকের স্বাধীনতা দিবসে করোনাভাইরাসের মত প্রাণঘাতি মহামারী ও দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য ও পরমকরুনাময় আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করি।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন