ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৫ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী

ধর্ম দর্শন

অপরাধ বনাম করোনাভাইরাস : প্রেক্ষিত শর’ঈ নির্দেশনা

মুফতি মোঃ আবদুল্লাহ | প্রকাশের সময় : ৩ এপ্রিল, ২০২০, ১২:০৩ এএম

পূর্ব প্রকাশিতের পর
একখানা দীর্ঘ হাদীসে এসেছে- প্রিয়নবী (স) ইরশাদ করেন: একদা আমি শায়িত ছিলাম আমার কাছে দু’জন ফিরিশতা আসেন। তাঁরা আমাকে একটি বিশাল শক্ত পাহাড়ে নিয়ে গেলেন। আমাকে বললেন : চড়–ন! ----- তারপর বললেন ঃ
“অতঃপর আমাকে আরও নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে দেখতে পাই এমন একটি সম্প্রদায় যাদের দেহ ফুলে-ফেটে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে এবং পায়খানার দুর্গন্ধের চেয়েও বিকট-বিশ্রী দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আমি সঙ্গীদ্বয়েক জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? তারা জবাব দিলেন: এরা হচ্ছে যিনাকারী-ব্যভিচারী নারী-পুরুষের দল”। আত্তারগীব ঃ খ-৪, পৃ. ৩১১।
হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবন আব্বাস (র) নবী করীম (স) থেকে বয়ান করেছেন ঃ
“কোন জনপদে ব্যভিচার ও সুদের মতো অপরাধ (ব্যাপকহারে) প্রকাশ্যে চলতে থাকে তখন তাদের ওপর মহান আল্লাহ্র আযাব অবতীর্ণ করা হালাল হয়ে যায়”। প্রাগুক্ত ঃ পৃ. ৩১৬।
ব্যভিচার হচ্ছে অপরাধের জাগতিক শাস্তির অন্যতম, কোন সম্প্রদায়ের লোকজন যখন ব্যাপকভাবে যিনাকর্মে জড়িয়ে পড়ে তখন তাদের ওপর মহামারী আকারে অভাব-অনটনের শাস্তিও নাযিল করা হয়। ইমাম আহমদ (র) হযরত আমর ইবনুল আস (রা) সূত্রে উদ্ধৃত করেন যে,
“আমি মহানবী (স)-কে ইরশাদ করতে শুনেছি, যে জনপদের মধ্যে ব্যভিচার প্রকাশ্যরূপ লাভ করে তাদেরকে অবশ্যই দুর্ভিক্ষ ও মূল্যবৃদ্ধির শাস্তিতে পেয়ে বসবে। আর যে সম্প্রদায়ের লোকজন ঘুষের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়বে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং তারা কাপুরুষ ও ভীতু সম্প্রদায়ে পরিণত হবে”। আল-বাছায়ির ফী তাযকীরিল আশয়িক খ-১, পৃ. ৮৫৮; সুরাট-গুজরাট।
অভাব-দুর্ভিক্ষের এক প্রকার হচ্ছে, ফল-ফসল, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী প্রয়োজন মতো সরবরাহ বা উৎপাদন-উৎপন্ন না হওয়া। অভাব-দুর্ভিক্ষের দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে ফল-ফসল উৎপন্ন বা উৎপাদন যথেষ্ট রয়েছে, এবং সরবরাহও যথেষ্ট রযেছে কিন্তু তারপরও দুর্মূল্যতার কারণে তা ক্রেতা সাধারণের নাগালের বাইরে হওয়া।
ব্যাভিচার অপরাধের আরেকটি অন্যতম জাগতিক মন্দ শাস্তি হচ্ছে ব্যভিচারের আধিক্য দারিদ্র নিয়ে আসে। যেমন- মুসনাদের বায্যারে একটি বর্ণনা রয়েছে- “যখন ব্যভিচার অপরাধ প্রকাশ্যরূপ নেয় তখন তার পরিণতিতে সংশ্লিষ্টদের দারিদ্র ও মিস্কীনীতে পেয়ে বসে”। প্রাগুক্ত।
হযরত আনাস (রা) প্রিয়নবী (স) থেকে বর্ণনা করেন, “ব্যভিচারে অভ্যস্থ ব্যক্তির উদাহরণ হচ্ছে মূর্তিপূজকের ন্যায়”। অত্তারগীব: খ-৪ পৃ.৩১৬। অর্থাৎ যতদিন পর্যন্ত সে উক্ত কুকর্ম চালিয়ে যাবে বা নেশায় থাকবে ততদিন সে নামে মুসলমান হলেও কার্যত মুশরিকদের কাতারের একজন হিসেবে গণ্য হতে থাকবে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনি মাসউদ (রা) প্রিয়নবী (স) হতে বর্ণনা করেন, “জনৈক ব্যক্তি নবীজী (স)-কে প্রশ্ন করল ঃ “মহান আল্লাহর কাছে কোন্টি সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসাবে গণ্য”? নবীজী (স) জবাব দিলেন ঃ “যে মহান আল্লাহ্ তোমাকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে বা অন্য কিছুকে সমান্তরালে করে দেয়া অর্থাৎ ‘শিরক’ হচ্ছে সবচেয়ে বড় অপরাধ”। প্রশ্ন¦কারী পুনঃ প্রশ্ন করল ঃ তারপর কোন্টি সবচেয়ে বড় অপরাধ? নবীজী (স) জবাব দিলেন ঃ
“তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করা যে সে তোমার খাবারে ভাগ বসাবে অর্থাৎ অভাবের ভয়ে”। লোকটি আবার প্রশ্ন করল ঃ তারপর কোন্টি সবচেয়ে বড় অপরাধ? এবার নবীজী (স) জবাব দিলেন ঃ
“তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে তোমার যিনা-ব্যভিচারে জড়িয়ে পড়া”। নবীজী (স)-এর উক্ত কথোপকথন শেষ হতে না হতেই মহান আল্লাহ্ তাঁর সমর্থনে পবিত্র আয়াত নাযিল করে দিলেন-
“তারাই হচ্ছেন মহান আল্লাহর খাছ বান্দা যারা তাঁর সঙ্গে অন্যদের ডাকে না; যাদেরকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতে তিনি নিষেধ করেছেন তারা তাদেরকে হত্যা করে না এবং তারা যিনা-ব্যভিচারেও লিপ্ত হয় না”। মিশকত ঃ পৃ. ১৬, ১৭; রেজা একাডেমী, মুম্বাই-৩, ভারত।
ব্যভিচার অপরাধের অন্যতম একটি বিষফল হচ্ছে ঃ এর কারণে সঠিক বংশধারা বা যথাযথ বংশ-পরস্পরা বিনষ্ট হয়ে পড়ে। যেসব শিশু ব্যভিচারের ফল তাদেরকে ‘হারামজাদা’ নামে চি‎‎‎হ্ণিত করা হয়, তাদের যথাযথ লালন-পালন করা হয় না, সমাজ-সংসারে তাদের উন্নত আসন বা মর্যাদা দেয়া হয় না। এমনকি সংশ্লিষ্টরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে তেমন নবজাতকদের অহরহ মেরে ফেলছে, ডাষ্টবিনে নিক্ষেপ করছে, নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে ইত্যাদি নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যভিচার অপরাধের অন্যতম আরেকটি মারাত্মক বিষফল হচ্ছে যিনাকারী অপরাধী যেভাবে অন্যের মা-বোন-ভগ্নির ইজ্জত বিনষ্ট করে থাকে একইভাবে তার আত্মীয়-স্বজন-নিকটজনদের প্রতি তেমন অবিচার সংঘটিত হয়ে থাকে। তারই একটি বাস্তব ঘটনা ‘আল-বাছায়ির’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে-
“মদীনা শরীফে একজন ভিস্তি বা পানি বহনকারী ব্যক্তি ধার্মিক ও পরহেযগারীতে প্রসিদ্ধ ছিল। সে একদা জনৈকা মহিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল। ওই মহিলাও নামডাকে এক বাক্যে পূণ্যবতী হিসেবে পরিচিত ছিল। এক পর্যায়ে ওই মহিলা ভিস্তিওয়ালার কাছে পানি চাইল। ঘটনাক্রমে মহিলার পরিধেয় কাপড়ের অংশ বিশেষ তখন মাটিতে ঝুলছিল। সে মহিলাকে বলল, আপনার কাপড় উঠান। মহিলা কাপড় উঠাতে গিয়ে কিছুটা মাটিতে ঝুঁকলেন আর অমনিতেই ভিস্তিওয়ালা মহিলার পাছায় নিজ হাত দ্বারা স্পর্শ্ব করে বসল। বেচারী মহিলা অত্যন্ত বিস্মিত হল এবং মনে মনে বলতে আরম্ভ করল: “এমন পরহেযগার লোকটি কি করল! বিগত ১০-টি বছর ধরে তার সততা-তাকওয়া-পরহেযগারীর সুনাম শুনে আসছি! অথচ সে আজকে এমন আচরণ করল! এক পর্যায়ে মহিলা নির্বাক হয়ে নিজ গৃহে বসে পড়ল। স্বামী যখন বাসায় পা রাখল, নিজ স্বামীকে শান্ত-শিষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করল, আজকে আপনার কোথায় কি ঘটেছে তা আমাকে খুলে বলুন! এক পর্যায়ে স্বামী বলল: “না তেমন কিছু ঘটেনি তবে ---------। খড়ি কুড়াতে গিয়ে খুব সুন্দরী একজন আরবী মহিলাকে একা পেয়ে তার পাছায় হাত রেখেছিলাম। এতে মহিলা সঙ্গে সঙ্গে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্” বলে উঠেছে! এবং তা শুনে স্ত্রী বলল: “হাত লাগানোর বিনিময়ে হাত লাগানো হয়েছে! তুমি যদি আরেকটু বাড়তে তাহলে তোমার স্ত্রীর প্রতিও ভিস্তিওয়ালা আরেকটু অগ্রসর হত”। আলবাছায়ির ঃ প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৪৬।
প্রিয় পাঠক! আমাদের উক্ত দীর্ঘ আলোচনার উদ্দেশ্য হল এটি প্রমাণ করা যে, করোনা ইত্যাদির অনুরূপ মহামারী প্রকৃতির ব্যাপক রোগ-বালাই সংঘটিত হবার মূল কারণ হল, আলোচিত পাপকর্মসমূহের আধিক্য ও ব্যাপকভাবে তাতে জড়িয়ে পড়া।
করোনা’ মহামারী
এ পর্যায়ে আমরা মূল আলোচ্য ‘করোনা ভাইরাস’ তথা মহামারী বিষয়টির প্রতি আলোকপাত করছি:
করোনা ভাইরাস: পত্র-পত্রিকা ও প্রচার মাধ্যম থেকে জানা যায়, করোনা এক ধরনের সংক্রাম ভাইরাস বা ব্যাধি। ভাইরাসটি পশু/পাখি/প্রাণী (প্রথম আক্রান্ত দেশ চীনাদের ধারণা মতে, প্রথমে তা মাছ বা মাছ-বাজার) হতে সংক্রামিত হয়ে থাকে। আবার আক্রান্ত রোগির কাছ থেকেও সংক্রমিত হতে পারে।
কিভাবে ছড়ায়? তার জবাবে বলা হয়:
(১) আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি কাশির মাধ্যমে;
(২) আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে;
(৩) পশু-প্রাণী/পাখি বা গবাদি পশুর মাধ্যমে। তবে পবিত্র কুরআন ও রাসূল স. এর নিম্নােক্ত হাদীসগুলোর প্রতি গভীরভাবে মনোযোগ দিয়ে যদি দেখি, তা থেকে কি বোঝা যায়:
১। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: “বল, আল্লাহ আমাদের জন্য যে বালা মুসিবত লিখে রেখেছেন, তা ছাড়া কোন কিছুই আমাদেরকে স্পর্শ করবে না (সূরা তাওবা : ৫১)। অনুরূপ আরও অনেকগুলো আয়াত পবিত্র কুরআনে বিদ্যমান।
২। হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী স. ইরশাদ করেছেন- “রোগের কোন সংক্রমণ নেই; সফরের কোন অশুভ আলামত নেই; পেঁচার মধ্যেও কোন অশুভ আলামত নেই। তখন এক বেদুঈন বললো, হে আল্লাহ্র রাসূল! তা হলে আমার এ উটের এ অবস্থা কেন হয়? সেগুলো যখন চারণভূমিতে থাকে সেগুলো যেন মুক্ত হরিণের পাল। এমন অবস্থায় চর্মরোগাগ্রস্ত উট এসে সেগুলোর পালে ঢুকে পড়ে এবং সেগুলোকেও চর্মরোগে আক্রান্ত করে ফেলে। মহানবী স. বললেন, তা হলে প্রথমটিকে চর্ম রোগাক্রান্ত কে করলো?”(সহীহ বোখারী: হাদীস নং-৫৭১৭)
৩। “আমাদের জন্য আল্লাহ্ যা নির্দিষ্ট করেছেন, তা ছাড়া আমাদের কিছুই হবে না” শিরোনামে ইমাম বুখারী র. যে অনুচ্ছেদটি আলোচনা করেছেন, তাতে এ হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন-
“হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি একদা রাসূলুল্লাহ্ স.-কে মহামারী প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। মহানবী স. জবাবে বললেন, এটা হচ্ছে আল্লাহ্র এক আযাব। আল্লাহ্ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা তার ওপর প্রেরণ করেন। আল্লাহ্ তা‘আলা এটা মুসলমানের জন্য রহমতে পরিণত করে দেন। প্লেগাক্রান্ত শহরে কোন বান্দা যদি এ বিশ্বাস নিয়ে ধৈর্যধারন করে সেখানেই অবস্থান করে, সেখান থেকে বের না হয় যে, ‘আল্লাহ্ তার জন্য যা ভাগ্যে লিখেছেন, তা ব্যতীত কিছুই তাকে স্পর্শ করবে না’; তা হলে সে একজন শহীদের অনুরূপ সওয়াব লাভ করবে”(সহীহ বুখারী: খ-১০, পৃ.১২৬-১২৭; সম্পাদনা পরিষদ, ইফা, ঢাকা; সংস্করণ-২০০৫খ্রি.+মুসলিম শরীফ: খ-৪, পৃ-৪৪৮, ইফা+ইমদাদুল ফাতাওয়া: খ-১, পৃ-৭৮২; মাকতাবা দারুল উলূম, করাচী)।
মূল হাদীসে যেহেতু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওই মহামারীতে মারা যাক বা না যাক; তেমন কিছু উল্লেখ নেই; তাই বলা যায়, মারা গেলে তো অবশ্যই শহীদ বলে গণ্য হবে। আর মারা না গেলেও, সে তার ঈমান-বিশ্বাসের ওপর অটল থাকায় একজন শহীদের সমান সওয়াব পেয়ে যাবে।
৪। রাসূল স. ও সাহাবাগণ হিজরত করে মদীনা শরীফ পৌঁছার সময় এবং তারও পূর্বে যুগ যুগ ধরে মদীনার বিভিন্ন অঞ্চল মহামারী উপদ্রুত এলাকা হিসাবে পুরো আরব দেশে প্রসিদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে রাসূল স. এর দু‘আর বরকতে তা মহামারী হতে মুক্ত থাকে। যেমন ইমাম বুখারী র. উদ্ধৃত করেছেন, “রাসূলুল্লাহ্ স. বলেন, হে আল্লাহ্! আপনি শায়বা ইবন রাবী‘আ, উতবা ইবন রাবী‘আ এবং উমায়্যা ইবন খাল্ফের প্রতি লা‘নত বর্ষণ করুন; যেমনিভাবে তারা আমাদেরকে আমাদের মাতৃভূমি থেকে বের করে মহামারীর দেশে ঠেলে দিয়েছে (এর পর রাসূল স. নিম্নে আলোচিত ৪র্থ দু‘আটি পাঠ করেন)। আর আপনি এর অন্যতম মহামারী (বিষাক্ত) জ্বরকে জুহফা’র দিকে স্থানান্তরিত করে দিন! হযরত আয়েশা রা. বলেন, আমরা যখন মদীনায় এসেছিলাম তখন তা ছিল আল্লাহ্র যমীনে সর্বাপেক্ষা অধিক মহামারীর স্থান” (পৃ. ২৩৩ ও ২৫৮; প্রাগুক্ত)।
অনুরূপ অর্থজ্ঞাপক আরো অনেকগুলো হাদীস সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলোতে রয়েছে।
উক্তসব আয়াত ও হাদীস দ্বারাই আরো বোঝা যাচ্ছে:
১। একজন মুসলমান হিসাবে সর্বপ্রথম মনে রাখা চাই যে, জীবন ও মৃত্যু মহান আল্লাহর হাতে এবং তাঁর নির্দেশে হয়। কোনো মহামারী বা তার ভাইরাসের হাতে মৃত্যু হতে পারে না। তবে হ্যাঁ, কারও কারও ক্ষেত্রে তা-ও একটা কারণ বা উপলক্ষ্য হতে পারে মাত্র; সকলের ক্ষেত্রে নয়।
২। ছোঁয়াচে বা লক্ষ্মী-অলক্ষ্মী ইত্যাদি ধারণা ইসলাম ধর্মে গ্রাহ্য ও বিশ্বাস্য নয়। তবে হ্যাঁ, মানবিক দূর্বলতার কারণে হাদীস ও ফিকহে বলা হয়েছে তেমন বিশেষ মহামারী যে অঞ্চল/এলাকাতে দেখা দেয় সেখানে অন্য এলাকা থেকে না আসাই উত্তম; জরুরী নয়। আবার যাদের এলাকা/অঞ্চলে তা দেখা দিয়েছে সেখানকার কাউকে আবার তার ভয়ে এলাকা ছেড়ে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। এর কারণ সেই একই যে, অদৃষ্টে মৃত্যু লেখা থাকলে অন্যত্র পালিয়েও মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না
৩। ইসলাম-পূর্ব যুগে যেমন ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তারকারী ও প্রতিক্রিয়াশীল বিভিন্ন রকম মহামারী প্রকৃতির রোগ বালাই ছিল; ঠিক তেমনি তা মহানবী (সা:) এর আবির্ভাব পরবর্তী ইসলামের প্রচার-প্রসারের সময়কালে এবং সাহাবাগণ ও খোলাফায়ে রাশেদার সময়কালেও ছিল। বিশেষ করে মদীনা শরীফের যে মারাত্মক ‘জ¦র’ রোগে একাধারে অনেকই মারা যেতেন; সেই (তা’উন) মহামারী তো বলা যায় অনেকটা বর্তমানকার করোনা ভাইরাসকেন্দ্রিক জ¦র-সর্দি-কাশি বিশিষ্ট রোগেরই অনুরূপ।
৪। মুসলিম শরীফের ইমারত পর্বের ‘শহীদ অনুচ্ছেদে’ বর্ণিত হয়েছে-
“আর যে-ব্যক্তি মহামারীতে মৃত্যুবরণ করলো, সেও শহীদ” (মূল আরবী: খ-২, পৃ-১৪৩; মাকতাবা সা‘দ, দেওবন্দ, ভারত)। অবশ্য মহামারী ইত্যাদিতে মৃতগণ যেহেতু ‘সরাসরি আল্লাহ্র রাস্তায় ইসলামকে সমুন্নত করার জিহাদে শহীদগণের অনুরূপ শহীদ নন; তাই, তাঁদের অনুরূপ গোসল ব্যতীত রক্তমাখা কাপড়-চোপড়সহ জানাযা ও দাফনের বিষয়টি এদের বেলায় প্রযোজ্য হবে না। সুতরাং এমন কথা বলা যাবে না যে, ‘করোনা’য় মৃত মুসলমানরা যেহেতু শহীদ, তাই তাদেরকেও গোসল ব্যতীত কেবল কাফন-দাফন ও জানাযা পড়া হোক’।
রোগীর সেবা করা ওয়াজিব:
১। যে-কোন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকেই সেবা-শুশ্রূষা করার সরাসরি নির্দেশও রাসূল (সা) প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন “তোমরা রোগির সেবা শুশ্রূষা কর” (নাসাঈ/তিরমিযী/দারেমী: মিশকাত:পৃ-৩৯৭-৩৯৮; রেজা একাডেমী, মুম্বাই-৩ )।
২। ইমাম বুখারী র. একটি অনুচ্ছেদের শিরোনামই প্রদান করেছেন এভাবে-
‘রোগীর সেবা করা ওয়াজিব’। এর অধীনে রোগীর সেবা করা ওয়াজিব হওয়া মর্মে তিনি তিনটি হাদীস পেশ করেছেন; যার অন্যতম ছোট্ট হাদীসটি হল-
“হযরত আবূ মূসা আশ‘আরী রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ স. ইরশাদ করেছেন: তোমরা ক্ষুধার্তকে খাবার দাও, রোগীর সেবা কর (নির্দেশ-আম্র) এবং কয়েদীকে মুক্ত করে দাও! (বুখারী: প্রাগুক্ত: খ-৯, পৃ. ২৪২-২৪৩)।
সুতরাং যেখানে স্বজন ও আপনজনদের জন্য নিজ নিজ রোগীর সেবা-শুশ্রুসা করা ওয়াজিব সেখানে সংক্রমণের ভয়ে দূরে থাকার উপদেশ দেয়া যায় কিভাবে! হ্যাঁ, সেবাকারীদের এ মর্মে সচেতন করা যেতে পারে যে, ‘অধিক মাখামাখি না করে , হাঁচি-কাশি ইত্যাদি থেকে সতর্ক অবস্থানে থাকবেন; প্রয়োজনীয় মাক্স ইত্যাদি ব্যবহার, এবং সর্বত্র ও সার্বিকভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবেন’। সর্বোপরি উপরে আলোচিত আয়াত ও হাদীসগুলো সামনে রেখে, আল্লাহ্র ওপর ভরসা রাখবেন।
প্রতিকার ও সতর্কতা অবলম্বন:
আর আল্লাহ যেসব ব্যধি তাঁর বান্দার ওপর পাঠিয়েছেন তার প্রতিকার প্রতিষেধকের ব্যবস্থাও তিনি রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন, “আল্লাহ যেসব রোগ ব্যাধি প্রেরণ করেছেন তার শিফা তথা প্রতিষেধকও তিনি দান করেছেন”। সুতরাং আমাদের করনীয় হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের পরামর্শ ও নির্দেশনা মোতাবেক প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করে চলা। কেননা চিকিৎসা’র পাশাপাশি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনাটিও সহীহ হাদীস দ্বারাই বোঝা যাচ্ছে। যেমন রাসূল (সাঃ) বলেছেন :
“যখন কোন অঞ্চলে মহামারীর সংবাদ পাও, তোমরা সেখানে প্রবেশ করবে না। আর আক্রান্ত অঞ্চলে তোমরা অবস্থান করে থাকলে সেখান থেকে বের হবে না (বুখারী: হাদীস নং-৫৭২৭)
সেখান থেকে বের না হবার নির্দেশ এর মধ্যে সতর্কতা অবলম্বনের বিষয়টি যেমন আছে, তেমনি মৃত ব্যক্তির কাফন দাফন এর জন্য অধিবাসীদের আক্রান্ত স্থানে অবস্থান করারও বিকল্প নেই। এ ছাড়া, আমরা আরো সতর্কতা অবলম্বন করবো যেমন: আতঙ্কিত না হয়ে আল্লাহ্র উপর ভরসা করবো। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবো। উত্তমরূপে উযূ করে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করবো। বাইর ও টয়লেট থেকে এসে সাবান/সেনিটাইজার দিয়ে ভালভাবে হাত ধুয়ে নিব। সব রকম খাবার ও পানীয়’র পাত্র ঢেকে রাখবো। সর্বোপরি বেশি বেশি তাওবা ইস্তেগফার করবো। হাত না ধুয়ে চোখ, মুখ ও নাক স্পর্শ করবো না। হাঁচি কাশি দেয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখবো। অসুস্থ পশু বা পাখির সংস্পর্শে যাবো না। মাছ মাংস ভালোভাবে রান্না করে খাবো। (চলবে)

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন