ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৬ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী

সারা বাংলার খবর

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিবেদন রফতানি সবজিতে সাড়ে চার শতাধিক ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত

প্রকাশের সময় : ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

ইনকিলাব ডেস্ক ঃ বাংলাদেশের রফতানি আয়ের অন্যতম সম্ভাবনাময় পণ্য ফল ও সবজি। গত পাঁচ বছরে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে এ পণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছে ১৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে রফতানি হওয়া পণ্যের সঙ্গে গেছে পোকামাকড়, কীটপতঙ্গসহ বিভিন্ন ক্ষতিকারক উপাদান। শুধু ইউরোপের বাজারেই গত পাঁচ বছরে রফতানি হওয়া ফল ও সবজিতে ক্ষতিকারক উপাদান শনাক্ত হয়েছে সাড়ে চার শতাধিক।
ইউরোপে বাংলাদেশী ফল ও সবজির গন্তব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো— যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি, সুইডেন, ফ্রান্স ও ডেনমার্ক। এ দেশগুলোয় রফতানি হওয়া সবজির মধ্যে আছে লাউ, বেগুন, কাঁচামরিচ, শিম, ঝিঙা, করলা, কাঁকরোল, ঢেঁড়স, কাঁচা পেপে ও আলু। এছাড়া ফলের মধ্যে আছে লেবু, কাঁঠাল, পেয়ারা, বেল, কুল, আনারস ও আমলকী।
উদ্ভিদ ও উদ্ভিদজাত পণ্য হিসেবেই এ পণ্যগুলোকে গণ্য করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আর এসব পণ্যে ক্ষতিকারক উপাদান নিয়ে দেশভিত্তিক বার্ষিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করে ইইউ। ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত রফতানি হওয়া সবজি ও ফলের চালানে ৪৫৫ ক্ষতিকারক উপাদান শনাক্ত হয়েছে।
গত বছর জানুয়ারিতে রফতানি হওয়া ফল ও সবজিতে স্বাস্থ্যহানিকর ঝুঁকিপূণ ফেনভেলারেট (এক ধরনের কীটনাশক) শনাক্ত করে যুক্তরাজ্য বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত পাঁচ বছরে রফতানি হওয়া সবজির সঙ্গে ক্ষতিকারক উপাদানের মধ্যে আরো আছে টেফরিটিডি। এটি এক ধরনের কিট। এছাড়া রফতানি হওয়া ফলের সঙ্গে গেছে থ্রিপস, সিট্রাস ক্যানকার, বেমিসিয়া তাবাসির মতো পোকামাকড়। এগুলোর সংস্পর্শে আসা ফল গ্রহণে শরীরে ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান বলেন, গত পাঁচ বছরের প্রতিবেদনগুলোয় সবজি ও ফলে যে ক্ষতিকারক পণ্য শনাক্ত হয়েছে, তার মধ্যে পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গই বেশি। ব্যাকটেরিয়াল রোগ বহনকারী ক্ষতিকারক উপাদানও আছে। দেশের কৃষিপণ্যের রফতানি সম্ভাবনা ধরে রাখতে এগুলো কাম্য নয়। সংশ্লিষ্টরা সতর্ক হলেও এতে ক্ষতিকারক উপাদান থাকার প্রবণতা এখনো আছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পণ্যে স্বাস্থ্যহানিকর ক্ষতিকারক উপাদানের উপস্থিতিসহ সার্বিক মান নিয়ন্ত্রণজনিত সমস্যার কারণে বিভিন্ন সময় হোঁচট খেতে হচ্ছে ফল ও সবজি রফতানিকারকদের। চালান আটকসহ রফতানি নিষেধাজ্ঞার মতো সিদ্ধান্তেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। তার পরও রফতানি হওয়া পণ্যে ক্ষতিকারক উপাদান শনাক্ত হচ্ছে। সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার মতো মানজনিত ত্রæটির কারণে যুক্তরাজ্যে পান রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। বর্তমানে শিথিল হলেও পান বা শাক-সবজির মতো পণ্য রফতানি এখন কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, সবজি ও ফলের মতো পণ্যগুলোয় ক্ষতিকারক উপাদান থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে এটা কমিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান কঠোর। ফাইটোস্যানিটারি সনদ ছাড়া সবজি বা ফলের মতো কোনো পণ্যই রফতানি করা যাচ্ছে না। এছাড়া কন্ট্র্যাক্ট ফার্মিংয়েও উদ্যোগী হয়েছি আমরা। তার পরও ইইউ কর্তৃপক্ষ ক্ষতিকারক উপাদান শনাক্ত করছে। তবে এটা যে কমছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বাংলাদেশ থেকে ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ হলো কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি অধিদফতর। আর কৃষি অধিদফতরের দেয়া ফাইটোস্যানিটারি সনদ দেয়া হয় প্রক্রিয়াজাত ছাড়া উদ্ভিজ্জ কৃষি বা খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে।
সূত্র অনুযায়ী, ফাইটোস্যানিটারি সনদ জাল করেও অনেক নামসর্বস্ব ভুয়া রফতানিকারক সবজি ও ফল রফতানি করছিলেন। আবার সনদ নেয়ার পরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ঘাটতিতে ক্ষতিকারক উপাদানসহ সবজি ও ফল রফতানি করেছেন অনেকে। এমন ৩০ জন রফতানিকারকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে রফতানি নিবন্ধন।
বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আছেন, যারা শুধু মুনাফার আশায় মানের বিষয়টি তোয়াক্কা না করেই রফতানি করতেন। সরকারের কঠোরতায় এখন এ পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো। তার পরও ক্ষতিকারক উপাদান পণ্যে থেকে যেতে পারে। সেজন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা জোরদার করতে হবে।
বাংলাদেশে উৎপাদিত শাক-সবজি, আলু ও পান, ফলমূলসহ ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ও রফতানিযোগ্য করার বিষয় পরিবীক্ষণ ও সুপারিশ প্রণয়নের জন্য বাণিজ্য সচিবকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছে সরকার। বিষয়টি নিয়ে কাজও শুরু করেছে কমিটি।
ব্যবসায়ীদের মতে, নজরদারি বাড়িয়ে সবজি রফতানির মান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পচনশীল হওয়ায় পণ্যটির মান নিয়ন্ত্রণে বিমানবন্দরের পাশে একটি হিমাগার স্থাপনের দাবি অনেক দিনের। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে মান পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব।
বাণিজ্য সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, দেশের সুনামের কারণেই সরকার মান নিয়ন্ত্রণজনিত বিষয়ে অনেক কঠোর। দু-তিন বছর সময় লাগলেও একটি কুল সাপ্লাই চেইন তৈরির উদ্যোগ শুরু হয়েছে। মানের প্রশ্নে কোনো সমঝোতা চায় না সরকার। ফলে নিকট ভবিষ্যতে ক্ষতিকারক উপাদান শনাক্তের চিত্র বদলে যাবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন