ঢাকা, শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৬ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী

ধর্ম দর্শন

উম্মতে মুহাম্মদির বিরল প্রাপ্তি: লাইলাতুল ক্বদর

হা. মাও. খন্দকার ফখরুদ্দীন হোসাইনী | প্রকাশের সময় : ৮ মে, ২০২০, ১২:০৬ এএম

মহান আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী রাসূলদের পূত-পবিত্র জামাআতকে প্রেরণ করেছেন মানবকূলকে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিতত্ত¡ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের প্রতি মনোযোগী করার লক্ষ্যে। আখেরী নবী সা. ধরণীতে আগমন করলেন, কুফরীর বেড়াজালকে ছিন্ন করলেন, বর্বর মানুষগুলোকে করে তুললেন সম্মানিত । অপরদিকে এক আল্লাহ লা-শারীকের প্রতি ঈামান আনয়ন করার পর সকলে আমলী প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেন। প্রত্যেকে নেকীর পাল্লা ভারি করতে মহা আগ্রহী, কিন্তু আমলের দফতরের ভলিয়মকে কি বর্ধিত কলেবরে সাজাতে সক্ষম হবেন এত স্বল্প পরিসরের হায়াতে যিন্দেগীতে? যেখানে পূর্বেকার উম্মতগণ পেয়েছেন এক সুদীর্ঘ হায়াত, আর এই আখেরী উম্মততো হায়াতে যিন্দেগীর অবকাশ যাপনের জন্য পাবেন মাত্র ৬০-৭০ বছররের সময়কাল। তাহলেতো পূর্বেকার উম্মতগণ থেকে আমলী ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে যাবেন তারা। বিচার দিবসের ওজনের পাল্লায় যে এ উম্মতের নেকী কমে যাবে। আমরা কি তাহলে কাল হাশর দিবসে শ্রেষ্ঠ উম্মতের খেতাব ধরে রাখতে ব্যর্থ হব? এতসব চিন্তা ভাবিয়ে তোলে যখন সাহাবায়ে কিরাম রা. কে, তখন মহান বিধাতা আল্লাহ তাআলা স্বল্প সময়েও অল্প আমলে বেশি নেকীর সুসংবাদ প্রদান করেন। একদা রাসূলে খোদা সা. বনী ইসরাঈলের জনৈক মুজাহিদ সম্পর্কে বললেন যে, সে একাধারে হাজার মাস পর্যন্ত জিহাদে লিপ্ত ছিলো এবং কখনও অস্ত্র সংবরণ করেননি। এতদ শ্রবণে সাহাবাগণ বিস্ময় প্রকাশ করলে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য মাত্র একটি রজনীর উল্লেখ করে বার্তা পাঠালেন। যে রজনীকে ‘খাইরুম মিন আলফি শাহরিন’ তথা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলে আখ্যা দিলেন। এতে সাহাবাদের বিস্ময়চিত্ততা ও হতাশা মনোভাব কেটে গেল। এ প্রসঙ্গে মহান প্রভু নাযিল করলেন একটি তত্ত¡পূর্ণ সূরা-সূরায়ে ক্বদর।
ইরশাদ হয়েছে : আমি এই কিতাব নাযিল করেছি ক্বদরের রাত্রিতে। (হে মুহাম্মদ!) আপনি কি ক্বদরের রাত্রি সম্বন্ধে জানেন? (অর্থাৎ ক্বদরের রাত্রি কত বরকতময় তা কি আপনি জানেন?) আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রশ্ন করে পরের আয়াতে নিজেই জবাব প্রদান করেছেন- ‘ক্বদরের রাত্রি হল (এমন এক মহিমান্বিত রজনী যা) হাজার মাস থেকেও শ্রেষ্ঠ। এই রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ আপন প্রভুর নির্দেশে প্রত্যেক কাজের জন্যে (যমীনে) অবতরণ করেন। এটা এমন এক নিরাপত্তা যা সুবহে সাদিক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’
বস্তুত এই রজনী মহিমান্বিত হওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণ হল যে, আল্লাহ তাঁর প্রেরিত সর্বশেষ গ্রন্থ আল-কুরআন অবতীর্ণের সুচনা এই রজনীতেই করেন। তাই একে ‘লাইলাতুল ক্বদর’ বলে উল্লেখ করেন। ক্বদরের অর্থ হল- মহিমান্বিত ও সম্মানিত। হযরত আবু বকর ওয়াররাক রহ. বলেন, এ রাত্রিকে মহিমান্বিত বলার কারণ হল- সারাটি বছর ইবাদাতে মশগুল না হওয়ার দরুন মূল্যহীন হয়ে পড়েছিল যে বান্দাটি, সেও এই রাতে ইবাদাতের মাধ্যমে তওবা ইস্তেগফার করে সম্মানিত হয়ে যায়। -মা’আরিফুল কুরআন।
এই রজনীর মাহাত্মের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা অপর স্থানে ইরশাদ ফরমান: ‘সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ! আমি ইহা (কুরআন) নাযিল করেছি বরকতময় এক রজনীতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। (এটা এমন রাত) যে রাতে সকল প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরিকৃত হয়।’ -সূরা দুখান : ২-৪
সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসীরকারকদের মতে আয়াতে বরকতময় রাত্রি দ্বারা ‘শবে ক্বদর ’ তথা ক্বদরের রাত্রিই বুঝানো হয়েছে। সূরা ক্বদরে বলা হয়েছে মহিমান্বিত রজনী আর এই আয়াতে বলা হয়েছে বরকতময় রজনী। এর কারণ, এই রাতে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাকে সম্মানিত করার পাশাপাশি তার জন্য অসংখ্য কল্যাণ ও বরকত বারিও বর্ষণ করেন।
প্রশ্ন হল- এই রাত্রিটি কোন মাসের কত তারিখ ছিল? এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীস দৃষ্টে জানা যায় যে, মাসটি হল রমাযান। যেহেতু কুরআন নাযিল হয়েছে রমাযানে। ইরশাদ হয়েছে: রমাযান এমন একটি মাস যে মাসে কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। -সূরা বাকারা ;১৮৫
তবে রাত্রিটি কত তারিখের রাত্রি তার বর্ণনা কুরআন-হাদীসের কোথাও পাওয়া যায় না এবং রাসূল সা. কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানানোও হয়নি। তবে রাসূল সা. রজনীটিকে রমাযানের শেষ দশকের যে কোন বেজোড় রাত্রিতে তালাশ করতে বলেছেন। উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা রা. বলেন- “তোমরা লাইলাতুল ক্বদরকে তালাশ কর রমাযানের শেষ দশকের যে কোন বেজোড় রাত্রিতে।” -বুখারী, মুসলিম
এই বরকতময় রজনীটি বুযুর্গ মনীষীদের বিভিন্নজন বিভিন্ন তারিখে যথা-২১, ২৩, ২৫, ২৭, ও ২৯ তারিখে পেয়েছেন।
আল্লামা সায়্যিদ মাহমুদ আলুসী রহ. লিখেন : ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমদ, ইমাম তিরমিযী, ইমাম নাসায়ী, ইমাম আবু দাউদ, ইবনে হিব্বান প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ বর্ণনা করেন যে, একদা যর ইবনে হুবাইশ রা. হযরত উবাই বিন কা’ব রা. কে লাইলাতুল ক্বদর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে তিনি বলেন যে, ইহা ২৭ তােিখর রাত্রি। ইবনে হুবাইশ বললেন, হে আবু মুনযির! (হযরত উবাই বিন কা’ব এর উপনাম) ইহা আপনি নির্ধারিতভাবে বললেন কিভাবে? হযরত উবাই বিন কা’ব রা. বললেন, রাসূল সা. এর বর্ণিত কিছ‚ নিদর্শন দেখে। রাসূল সা. বলেন- ‘সেই দিন প্রত্যুষে তোমরা কিরণ বিহীন সুর্য উদিত হতে দেখবে।’ -তাফসীরে রূহুল মাআনী : ১৫:৩৪২
বলাবাহুল্য, পবিত্র কুরআন শবে ক্বদরে নাযিল হয়েছে এর অর্থ- লওহে মাহফূয থেকে পূর্ণ কুরআন দুনিয়ার আসমানে এ রাতেই অবতীর্ণ হয়েছে। এরপর তেইশ বছরের নবুওয়াতী যিন্দেগীতে প্রয়োজন অনুসারে রাসূলুল্লাহ সা. এর প্রতি নাযিল করা হয়েছে। কারো মতে প্রতি বছর যে পরিমাণ অবতীর্ণ হওয়া অবধারিত ছিল ততটুকু শবে ক্বদরে দুনিয়ার আসমানে নাযিল করা হত। পৃথিবীর সূচনা কাল হতে চারটি আসমানী গ্রন্থই রমাযান মাসে নাযিল হয়েছে। -তাফসীরে কুরতুবী
হযরত ইবনে আব্বাস রা. সূরা দুখানে বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, আগামী এক বছরের সৃষ্টি সম্পর্কিত সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ রজনীতে স্থির করা হয়। অর্থাৎ এ বছর কাকে কতটুকু রিযিক দান করা হবে, কি পরিমাণ বৃষ্টি দান করবে ইত্যাদির ফায়সালা সম্বলিত দফতর ফেরেশতাদের নিকট অর্পণ করা হয়। ক্বদর রাতে জিবরাঈল আ. বিরাট বাহিনী নিয়ে যমীনে অবতরণ করেন এবং নারী-পুরুষ যারা নামায, যিক্র ইত্যাদি ইবাদাতে মশগুল আছেন তাদের জন্য রহমতের দু’আ করেন।
-তাফসীরে মাযহারী
এভাবে ফেরেশতাগণ রহমত ও শান্তির বারি বর্ষণ করতে থাকেন সুবহে সাদিক পর্যন্ত। উপরন্তু যেহেতু শবে ক্বদর সম্বন্ধে সুনির্দিষ্ট কোন দিন-তারিখ মহান আল্লাহ রাসূল সা. কে জানাননি,অপরদিকে রাসূল সা. রমাযানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলোতে অন্বেষণ করতে বলেছেন এবং সঠিক তারিখ সম্পর্কে আলেমগণের বিভিন্ন উক্তিও পাওয়া যায়, যা চল্লিশের কোটায় পৌছে যায়। এ সব উক্তির নির্দেশমূলক তথ্য এই যে, সহীহ হাদীস দৃষ্টে রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলোতে শবে ক্বদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই শেষ দশকের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ এ সকল রাত্রিগুলোতে নফল নামায, যিক্র, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি ইবাদাতে সময় কাটিয়ে মহান আল্লাহর দানকৃত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এই রজনীর যথাযথ মর্যাদা রক্ষায় প্রয়াসী হওয়া প্রতিটি মুমিনের একান্ত কর্তব্য। এই মহিমান্বিত রাতে আমাদেরকে সর্বপ্রকার শারারাত থেকে মুক্ত রাখ হে আল্লাহ!

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

গত ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন