ঢাকা, বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৩ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী

সাহিত্য

করোনাকালে একদিন

জয়া সূত্রধর | প্রকাশের সময় : ৮ মে, ২০২০, ১২:০৬ এএম

বিশ্বজুড়ে করোন ভাইরাসের তান্ডব। প্রাণীজগতের গোটা গ্রহটাকে যেন একসাথে গিলে খেতে বসেছে সর্বনাশা ভাইরাস। প্রতিদিন হাজার হাজার লোকের প্রাণহানিতে স্তব্ধ পৃথিবী। বিশ্বের সকল দেশ আজ এক মানচিত্রে দাঁড়িয়ে আছে। লক ডাউন,লকডাউন আর লকডাউন। ভিন্নমতের, ভিন্নপথের গণতান্ত্রিক স্বাদ আস্বাদনে অভ্যস্ত পৃথিবীর দেশগুলো আজ এক চিন্তায় এক কাজে একমত, stay at home যড়সব. পৃথিবীর সমস্ত দেশের একাত্ম হয়ে যুদ্ধ করা ইতিহাসে এবারই প্রথম। কোন দেশই কোন দেশের প্রতিপক্ষ নয় আর! বোমা,পরমাণু শক্তি,রাসায়নিক শক্তি সব রেখে মুক্ত হাতে সকলের অভিযাত্রা। লক্ষ্য একটাই,ক্ষুদ্র অনুজীবের গতিরোধ করা। শক্তির পরীক্ষা নয়, নিয়মের পরীক্ষায় নতজানু আমরা।আমাদের দেশে ২৭ মার্চ থেকে শুরু হওয়া অঘোষিত লকডাউনের আজ অষ্টম দিন চলছে।রাস্তায় সেনাসদস্যদের টহল।ঘরে ঘরে পরিবার পরিজনের নির্ঝঞ্ঝাট মিলনমেলা। যান্ত্রিক ব্যস্ততা নেই।অফিস যাবার তাড়া নেই।পরীক্ষার ভীতি নেই। বাইরে বেরোতে না পেরে মা বাবা সন্তান সন্ততি সবাই অসামঞ্জস্য খুনসুটি উপভোগ করছে।ইনডোর গেমসগুলো বেশ জমে উঠেছে।ধর্মচেতনারও যে বিশেষ প্রসার ঘটেছে তা জানালা কিংবা ছাদ থেকে আশেপাশের বাসাগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়।বাড়বেই তো! অখন্ড অবসর তাতে আবার মহামারী ব্যাধির বিস্তারলাভের এক অজানা আশঙ্কা! 

সব যেন জৌলুসহীন নীরব। রাস্তায় লোক নেই,স্কুলে কোলাহল নেই,বাজারে ছোটাছুটি নেই, গাড়ির হর্ণ নেই,ফেরিওয়ালাদের হাঁক নেই।আচ্ছা,কেমন আছে ফেরিওয়ালা লোকগুলো? ফেরি না করলে যাদের ঘরে চাল কেনা হয়না তারা ব্যবসাপাতি গুটিয়ে কিভাবে চালাচ্ছে সংসার? সরকারী সাহায্য দশ হাত ঘুরে যতটুকু পৌঁছায় তা কী সবাই পায়? না জানি বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে কতই কষ্ট করতে হচ্ছে তাদের! দিনমজুরদের ধার দেবার মত মানুষও এই দুর্যোগে অপ্রতুল। আর রাস্তার প্রতিবন্ধী ভিখারিরা? কেউ কী তাকিয়েছে তাদের দিকে? তারা আমাদের সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাল দিনেই ওদের পাশ দিয়ে যাবার বেলায় পাশ কেটে চলে যাই আজ কী আর ঘরে বন্দী হয়ে পড়া ভুখা ভিখারিদের কথা মনে পড়বে?
হায়রে অকাল! সরকার প্রতিটি জেলা,উপজেলা,ইউনিয়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছে যেন অভাবী মানুষের ঘরে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দেয়া হয়।আর এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মিডিয়ার লোকজন এনে কয়েকটা পুটলি সাজিয়ে মুখচেনা তালিকাভূক্তদের হাতে মহা সমারোহ করে সাহায্য সামগ্রী তুলে দিচ্ছে আগাম ভোটের প্রস্ততি হিসেবে। নয়তো কী! যারা ভিন্ন ভিন্ন জেলায় কাজের সূত্রে বসবাস করে, এলাকার ভোটার নয় বলে তাদের কোনরকম সাহায্য করা হচ্ছেনা! মুর্খ রাজনীতি এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেল! মানবতার আলোকিত পথ মাড়ালো না।ওরে,দুর্যোগ সহায়তা পেতেও ভোটার আইডি কার্ড লাগে? দুর্যোগের সময় একজন অভূক্তকে খাবার দেওয়া নিষেধ? কে নিষেধ করেছে? রাষ্ট্র,সংবিধান, রাষ্ট্রনীতি নাকি নষ্ট ভ্রষ্ট চিন্তা? এসব দুরাচারী পাপিষ্ঠ গোষ্ঠীর লোকেরা সমাজকে আর এই দেশের মানুষগুলোকেই প্রতিপক্ষ সাজিয়ে কৌশল কৌশল খেলায় মেতে আছে আবহকাল থেকে। কোভিট-১৯ এর মত উষ্ণ বা আর্দ্রতা সবেতেই তারা সই।
আমি দেখে শুনে অন্যদের মতই কিছু না বোঝার ভান করে থাকি।দিনরাত পতন উন্মুখ ঝরাপাতাদের মত প্রহর গণনার নেশায় বুদ হয়ে থাকি।চারদিকে অপরিবর্তিত একই অবস্থা। নিস্তব্ধতায় জড়ানো উৎকন্ঠিত সময়ের আবর্তন। ঘরে ঘরে লোক আছে সাড়া নেই।সন্ধ্যার পর আলো জ্বলছে কিন্তু সে আলো ভূতের থাবায় থমকে থাকে যেন।আলোর মধ্যে নাচন নেই,বাতাসেও নেই ফুলের সুবাস।একা আমি আকাশের উড়ন্ত পাখিদের দেখে দেখে নিজেকে সামাজিক সঙ্গী ভাবি। দুর্দান্ত মৌনতার মাঝে কখনো কখনো সেনা টহলের গাড়ির শব্দে বুকের ভিতর কেমন ছ্যাৎ করে ওঠে। সমাসন্ন বিভীষিকাময় অসহায় পৃথিবীর জন্য বুকের বেদনার লোনাজলে ঢেউ খেলা করে।
বিষন্নতায় ভারি হয়ে থাকা সময়ে দিনভর ভাইরাস প্রতিরোধী চলা সচেতনতা প্রচারণার মধ্যে সেনা সদস্য, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আমার ছাদটেবিলের সামনে হাজির হয় মোমেনা।সিঁড়ি বেয়ে পাঁচতলা ছাড়িয়ে ছাদে আসতে হাঁপিয়ে উঠেছে সে। মুখে মাস্ক নেই। টেবিলের বিপরীত পাশে দাঁড়িয়েছে তাই টেবিলের প্রস্থটাই ওর আমার দূরত্ব। আমি চেয়ার ছেড়ে দিয়ে পিছিয়ে গেলাম।বিরক্তির সাথে বললাম, মোমেনা, কী হয়েছে?
মোমেনা এই শহরেরই একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক। ওর মা একসময় আমার বাসায় ছুটা বুয়া হিসেবে কাজ করে দিত। সেই সূত্রে ওকে চিনি।মোমেনার বিয়ে হয়েছিল। স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় মায়ের সাথে থাকে। এ শহরের পৌর এলাকার শেষ সীমানায় উত্তর প্রান্তের একটি টিনের ঘরে ভাড়া থাকে মোমেনা আর তার মা। মা, মেয়ে দুজনের কাজের আয়ে চলে তাদের সংসার। অবশ্য সংসার বলতে এখানে কিছুই নেই তাদের! মোমেনার বাবা, বড় দুই ভাই, দুই ভাবী, দুই ভাইয়ের পাঁচজন বাচ্চা সবাই থাকে গ্রামের বাড়ি। মোমেনার ভাই দুটো তাদের বাবার মত ভীষণরকমের অলস ও কর্মবিমুখ।ইচ্ছে হলে টুকিটাকি আয় রোজগার করে নয়ত আড্ডাবাজি করে দিন কাটিয়ে দেয়। মাসের খরচ রেখে মোমেনা মায়ের বেতন ও নিজের বেতন একত্র করে রকেটে টাকা পাঠায় প্রতিমাসে। শহর থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পশ্চিমে মোমেনাদের বাড়ি। ছুটিছাটা মিলিয়ে নিয়ে একমাস দুইমাস পর মা, মেয়ে দুজনেই চলে যায় গ্রামের বাড়ি। ফিরে যখন আসে তখন কিছু খুচরা টাকা মাত্র থাকে হাতে। মোমেনার মা এ বাসা ও বাসার খাবার জড়ো করে বাসায় নিয়ে রাতে মেয়ের সাথে একসাথে খায়। এজন্য টাকা হাতে কম থাকলেও মোমেনার মাকে কখনো দুশ্চিন্তা করতে দেখা যায়নি। অথচ আজ মোমেনার চেহারায় দুশ্চিন্তা আর অবসাদের ছাপ!
মোমেনা খুব নম্র স্বভাবের মেয়ে।বসে যাওয়া ঘোলাটে চোখে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।ঠোঁট দুটো কেঁপে কেঁপে উঠছে। নাকের দুপাশের নরম মাংসল অংশ ওঠানামা করছে।
ওর দিকে তাকিয়ে এবার মায়া হলো। কোমল সুরে বললাম,
মোমেনা, কোন সমস্যা?
এবার মোমেনা চোখ নামিয়ে ফেলল। আমি বুঝতে পারছি, ভেতর থেকে চাপা কান্না ওকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাই আর কোন প্রশ্ন করলাম না। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিভিন্ন রঙয়ের ঘুড়ির মাঝে বিবর্ণ পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া রং খুঁজতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর মোমেনা নিজেই নিজেকে সামলে নিয়ে কথা বলল।
বলল, আন্টি, মা আপনার কাছে পাঠালো।
বল মোমেনা।
আমি অভয় দিয়ে বললাম।
অভয় পেয়েও মোমেনা সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।কিছু একটা বলার ইচ্ছা থাকলেও সে বলতে পারছে না, আমি স্পষ্টই বুঝে গেলাম। আগ বাড়িয়ে তাই বললাম,
মোমেনা, তোমরা এখানেই আছো তাহলে?
মোমেনা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
খাওয়া দাওয়া সমস্যা হচ্ছে ? এখনতো তোমরা কাজে যাচ্ছ না।
মোমেনা মাথা নেড়ে কী উত্তর দিল তা দেখার দিকে আর মনোযোগ ধরে রাখতে পারলাম না।দুটো ঘাস ফড়িং অযাচিতভাবে এই সুউচ্চ ভবনের ছাদের রেলিং ঘেঁষে উড়াউড়ি করছে তা দেখে আপ্লুত হয়ে গেলাম মুহূর্তেই। নিজস্ব গন্ডি পেরিয়ে আসা এই অতি ছোট দুটো ফড়িংকে প্রাণীকুলের প্রতিনিধি মনে হতে লাগল। উড়ন্ত পতঙ্গজোড়াকে কী করে কিছুক্ষণ আমার আশেপাশে রাখা যায় তার উপায় বের করার চেষ্টা করছি।
আন্টি, যাই--।
যারপরনাই অবাক হলাম। ফড়িং চিন্তা জলাঞ্জলি দিয়ে মোমেনার দিকে ঘুরে দাঁড়াই।এবার একটু কায়দা করে বললাম,
বেড়াতে এসেছিলে বুঝি? এখন সবারই এমন হচ্ছে।ঘরে আর কত থাকা যায়!
না, বেড়াতে আসি নাই।
মাথা নিচু করে মলিন মুখের উত্তর মোমেনার।
আমি ওকে আরেকটু সহজ করার জন্য বললাম,
কয়েকদিন থেকেই তোমার মাকে ফোন দিব ভাবছিলাম। বেতন পেয়েছ হাতে? সরকার তোমাদের বেতন পরিশোধের দায়িত্ব নিয়েছেন।
শুনছি দিতে নাকি কিছুদিন দেরি হবে।
মোমেনা লেখাপড়া জানা মেয়ে। কথাও বলে বেশ গুছিয়ে। আজ তাকে অস্থির মনে হচ্ছে।
আন্টি, মায়ের খুব জ্বর।
মোমেনার কথায় আঁতকে উঠি আমি।
বল কী! সর্দি আছে?
হাঁচি, শুকনো কাশি?
শ্বাসকষ্ট?
ডায়রিয়া?
উত্তরের অপেক্ষা না করে প্রশ্ন করতে থাকি দ্রুত।
থামিয়ে দিয়ে মোমেনা শান্ত গলায় বলল,
খালি জ্বর।
আমার কন্ঠে উৎকন্ঠার সীমাহীন প্রকাশ,
এসময় জ্বর হওয়া চিন্তার বিষয়।
ওইজন্যই এসেছি, আন্টি। কাউকে বলতেও পারছি না। কে কী ভাবে! মা বলল,আপনি যদি জ্বরের জন্য কোন ঔষধ এনে দিতেন! মোমেনা বলল।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন