ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭, ১৩ সফর ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

মাছে সমৃদ্ধ দেশ

বঙ্গোপসাগর ভরছে অর্থকরী মাছ আর জীববৈচিত্র্যে

শফিউল আলম | প্রকাশের সময় : ৪ জুন, ২০২০, ১২:০০ এএম

প্রকৃতিরাজ্য নবীন বরণে মাতোয়ারা। যার উপলক্ষ নবজন্ম। সৃজন আর নতুনের গড়ার গান। সজীব সতেজতা জাগানো সুন্দর আর আনন্দের বারতা। বৈচিত্র্য ব্যতিক্রমের বহুমুখী সমাহার। সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের সম্পদ সম্ভাবনাকে আজ হাতছানি দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর সীমানা অবধি।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে ভরণ-পূরণ প্রক্রিয়া চলছে মৎস্যসম্পদ আর জীববৈচিত্রে। ৩৬ জাতের চিংড়িসহ সুস্বাদু ৪৭৬ প্রজাতির অর্থকরী সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ৮ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সমুদ্রভাগ থেকে উপক‚ল হয়ে নদী-খাঁড়িমুখ পর্যন্ত এবার ৭ থেকে সাড়ে ৭ লাখ মেট্রিক টন রেকর্ড উৎপাদনের টার্গেটে থাকবে মাছের রাজা ইলিশ। সাইজেও বড় হচ্ছে ‘রাজা’। যার বর্ধিত অর্থনৈতিক উৎপাদন মূল্য লক্ষাধিক কোটি টাকা। অবশ্য ভারতীয় ট্রলার নৌযানে চুরি লোপাট বন্ধের উপরও নির্ভর করছে সাগরের মূল্যবান ফসল ঘরে তোলার সাফল্য কতটা মিলবে।

সমুদ্র বিশেষজ্ঞগণ জানান, গত ২২ মে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস ‘আম্পান’ বঙ্গোপসাগরে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরফলে মাছের দৌঁড়-ঝাঁপ চাঞ্চল্য বিচরণশীলতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তাতে প্রাকৃতিক ব্যায়ামেই মাছের সুস্বাস্থ্য, বর্ধনশীলতা ও উৎপাদন বেড়ে চলে। যেভাবে বন্যার সঙ্গে উর্বর পলিমাটি এলে জমির ফলন বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া গত ২০ মে থেকে বঙ্গোপসাগর ও উপকূলে সরকারের নির্দেশে মাছ শিকার ৬৫ দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। এ সময় মা-মাছ, জাটকা ইলিশসহ অপরিপক্ক বেবি মাছ নিধন যথেষ্ট বন্ধ থাকবে। বাড়বে প্রজননের হার। আশা করা হচ্ছে, এরফলে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের জোগান আসবে আশাতীত।

সারাদেশে হাজারো নদ-নদী, খাল-বিল-ছরা মাছে হচ্ছে ভরপুর। গ্রীষ্মে এবার তাপদাহের বদলে মেঘ-বৃষ্টির ধারা বন্ধ হয়নি। ঘনিয়ে আসছে বর্ষার মৌসুমী বায়ু। গেল ২২ মে সপ্তাহে এশিয়ায় মিঠাপানির মাছের বৃহৎ প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর রুই কাতলা মা-মাছেরা ১৪ বছরের রেকর্ড ভঙ্গকারী ডিম ছাড়ার পর সেই উন্নত রেণু-পোনা বীজ পৌঁছেছে সারাদেশে মৎস্যচাষীদের পুকুর দীঘি খামারে।

করোনাকারণে মানুষের শঙ্কা-পীড়া-দুর্ভোগ অশেষ। তবে মহামারীর অপর পিঠে বাস্তব সত্যেরই মুখোমুখি, সারা পৃথিবীর মতোই বাংলাদেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ-প্রকৃতি গত অন্তত তিন মাস যাবৎ মানুষের নির্মম জুলুম, আগ্রাসন ও অনিষ্টের কবল থেকে আপাতত মুক্ত। বলা যায় প্রকৃতির উপর অবিরাম ধ্বংসের হাত গুটিয়ে নিতে মানুষ বাধ্য হয়েছে। সেই সুবাদে করোনাকালে মানব আগ্রাসন, দূষণমুক্ত পরিবেশ-প্রতিবেশ-প্রকৃতি তার উদার দয়ার দান বিলিয়ে দিচ্ছে মানুষের উপকার ভোগের জন্যই।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন জামাল গতকাল দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, মানুষ গৃহবন্দী। বঙ্গোপসাগরে জাহাজ নৌযান চলাচল, তেল রাসায়নিক শিল্প-কারখানার দূষণ, নিঃসরণ, পর্যটকদের বর্জ্যসহ বিভিন্ন ধরনের দূষণ, শব্দদূষণ, সামুদ্রিক প্রাণিজগতের ক্ষতিসাধনসহ পরিবেশ-প্রকৃতির ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। এরফলে মৎস্যসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের প্রজনন বৃদ্ধি করছে। মুক্ত পরিবেশে ঘুরছে ফিরছে।

সাগরের তলদেশ থেকে উপরস্তর পর্যন্ত ছোট-বড় সব জাতের মাছ বংশ বিস্তার করছে। তাছাড়া ঝিনুক, কচ্ছপ, সাপ, কাঁকড়া, মুক্তাসহ সামুদ্রিক সবধরনের প্রাণির জন্য সহায়ক পরিবেশ বিরাজ করছে। এরফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে সবজাতের মাছ ও ইলিশের। ইলিশ হবে আকারেও বড়সড়। সমুদ্রে প্রাণিজগত পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকে এবং বিচরণ করে। মানুষের হস্তক্ষেপ না থাকার ফলে ওরা আল্লাহর দেওয়া নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুসারে বিচরণ ও জীবনধারণ করছে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, সমুদ্র পরিবেশ-প্রকৃতির উপর মানুষের আগ্রাসী হস্তক্ষেপ বন্ধ থাকার ফলেই করোনাকালে মৎস্যসম্পদ ও প্রাণিজগত মুক্ত পরিবেশে জীবনধারণ করছে। প্রজনন বৃদ্ধি তথা অর্থনৈতিক সম্পদমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবকিছুর পেছনে মানুষের লোভের হাত গুটিয়ে আছে। অন্যদিকে পরিবেশ-প্রকৃতি স্বাধীনভাবে উৎপাদন বৃদ্ধি করছে। দেশের অর্থনীতি হচ্ছে সমৃদ্ধ। মানুষের জীবন-জীবিকার প্রয়োজনেই তা কাজে লাগছে। পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব যতই কমবে ততই বাড়বে প্রকৃতির উদার দান-অবদান।

পরিবেশের এই পরিবর্তনগুলো আজ দৃশ্যমান এবং আমাদের কাছে শিক্ষণীয় হওয়াই উচিৎ। মনে রাখতে হবে প্রকৃতি-পরিবেশের কোন ক্ষতি ও অনিষ্ট না করেই টেকসই উন্নয়নের উপায় খুঁজতে হবে। অন্যথায় প্রকৃতির ক্ষতির সঙ্গে আমরা নিজেরাই নিজেদের বহুমুখী ক্ষতি ডেকে আনছি। পরিবেশ-প্রকৃতির দানগুলো আল্লাহর নেয়ামত। তার সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করাই কল্যাণকর। উন্নয়ন এবং পরিবেশ-প্রকৃতি সুরক্ষা উভয়ের মাঝে ভারসাম্য বজায় রেখেই পথচলা চাই।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
তাকবীরআহমেদচৌধুরী ৪ জুন, ২০২০, ৬:৪৫ এএম says : 0
শুধু ভারত চুরি না করলেই হবে
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন