ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে হবে

| প্রকাশের সময় : ৬ জুন, ২০২০, ১২:০১ এএম

দেশের পোশাকশিল্পে করোনার ক্ষতিকর প্রভাব ব্যাপক হয়ে উঠেছে। বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খাতটি বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছে। খরচ কমাতে বিজিএমইএ বাধ্য হয়ে এ খাত থেকে শ্রমিক ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিজিএমইএ-এর সভাপতি রুবানা হক বলেছেন, দেশের পোশাক খাতের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ খাতকে এখন ৫৫ শতাংশ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে হবে। এই সক্ষমতা দিয়ে ১০০ শতাংশ শ্রমিক ধরে রাখা সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়ে, মালিকরা শ্রমিকদের ছাঁটাই করবে। এটা মেনে তিনি হবে। এছাড়া কোনো উপায় নেই। এই ছাঁটাই এ মাস থেকেই শুরু হবে। তিনি আরো বলেছেন, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের কোন পন্থায় সহযোগিতা করা যায়, এ বিষয়টিও মালিকদের বিবেচনায় নিতে হবে। ভবিষ্যতে কাজ বাড়লে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হবে। তিনি পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলেছেন, করোনায় পোশাক খাত ৪২ হাজার কোটি টাকার ধাক্কা খাবে। বর্তমানে ২২৭৪টি কারখানার মধ্যে ১৯২৬টি চালু রয়েছে। বাকিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এ খাতের ক্ষতি পোষাতে শ্রমিক ছাঁটাই করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। আমাদের দেশে গার্মেন্ট খাতের ট্র্যাডিশন হচ্ছে, শ্রমিক ছাঁটাই করতে গেলে তা নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের এই উদ্যোগের কারণেও হয়তো এ ধরনের আন্দোলনের আশঙ্কা রয়েছে। তবে যারা আন্দোলন করে বা করতে যাবে, তাদের বুঝতে হবে, সক্ষমতার বাইরে কোনো মালিকের পক্ষেই অতিরিক্ত শ্রমিক রাখা বা নিয়োগ করা সম্ভব নয়। তাই আমরা মনে করি, মালিকদের চাপ দিয়ে কোনো লাভ হবে না। বাস্তবতা সবাইকে মেনে নিতে হবে।
করোনার ছোবলে বিগত কয়েক মাস ধরে বিশ্বের অর্থনীতি তছনছ হয়ে গেছে। পুরো বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়েছে। এ থেকে উত্তরণে উন্নত বিশ্বগুলো হিমশিম খাচ্ছে। এর প্রভাব আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে পড়া অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং তা পড়েছেও। দেশের সরকারি-বেসরকারি উৎপাদনশীল খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে খাতগুলোকে অনন্যোপায় হয়ে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। এর মধ্যে লোকবল কমিয়ে খরচের সমন্বয় করা অন্যতম। পোশাক খাত এর বাইরে নয়। এ খাতের আয়ের উৎস অর্ডার অনুযায়ী পোশাক উৎপাদন এবং রপ্তানি করা। করোনার আগে এ খাতে যে অর্ডার ছিল, করোনা পরবর্তীতে তা প্রায় ৬৫ শতাংশ কমে গেছে। এর অন্যতম কারণ, বিশ্বব্যাপী মানুষের পোশাকের চেয়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে নজর দেয়া। স্বাভাবিকভাবেই এ শিল্পে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং খরচ কমাতে গার্মেন্ট মালিকরা জনবল কমানোর দিকে নজর দিয়েছে। যেখানে কাজ অর্ধেকে নেমে এসেছে, সেখানে শতভাগ শ্রমিক নিয়ে কাজ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এটা বাস্তবতা। এ বাস্তবতা শুধু পোশাক খাতেই নয়। অন্যান্য খাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এদিকে অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেও বাংলাদেশী শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। এ দেশগুলো, বিশেষ করে সউদী আরব এখন তার নিজের শ্রমিক নিয়োগের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে সউদী, ওমান, কুয়েতসহ অন্যান্য দেশ থেকে প্রায় দশ লাখ শ্রমিক এখন দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে। একদিকে প্রবাসী শ্রমিকের দেশে ফেরত আসা, অন্যদিকে দেশে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের কারণে বেকারের সংখ্যাটি অভাবিত রূপ লাভ করবে। এমনিতেই দেশে শিক্ষিত-অশিক্ষিত মিলিয়ে চাকরি প্রত্যাশী বেকারের সংখ্যা প্রায় চার-পাঁচ কোটির মতো। এর সাথে লাখ লাখ কর্মজীবী বেকার হলে, এ পরিস্থিতি যে শোচনীয় হবে এবং তা সমাল দেয়া দুরুহ হয়ে পড়বে, তা বোধকরি ব্যাখ্যা করে বলার অবকাশ নেই। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কপর্দকহীন অবস্থায় প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে ফিরলে তাদের পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থার মধ্যে নিপতিত হবে। সব মিলে একটা অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। বিশাল সংখ্যক এই বেকারের কর্মসংস্থানের চাপ এবং চ্যালেঞ্জ সরকারের ওপরই বর্তাবে।
দেশের অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারের নিজস্ব উদ্যোগ ও পরিকল্পনা থাকা স্বাভাবিক। তবে দেশে বেকারত্বের যে নতুন চাপ সৃষ্টি এবং কর্মহীন হওয়া শুরু হয়েছে, তা মোকাবেলায় সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই। বেকারত্ব নিরসন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাজেটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাত সৃষ্টি করা জরুরি। অর্থনীতির মন্দা পরিস্থিতিতেও আশার বিষয় হচ্ছে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভ রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এ রিজার্ভ এখন ৩৪.২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদষ্টা সালমান এফ রহমান বলেছেন, চীন থেকে বিপুল বিনিয়োগ আসছে। ইতোমধ্যে মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক জোনে বিদেশি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে আইএমএফ আগামী অর্থবছরের মাঝামাঝি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনার কথা বলেছে। এসব অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়নের দিক অত্যন্ত ইতিবাচক। অর্থনীতিকে সচল করতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিদেশী বিনিয়োগের সুযোগসহ সম্ভাবনাময় সব খাতকে সুষম পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজে লাগাতে হবে। সরকারের যেসব উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি বেকারত্ব বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে।

 

 

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন