ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৩ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

বন্যার্তদের দুর্ভোগ বাড়ছে

তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ৫ জুলাই, ২০২০, ১২:০১ এএম

বৃষ্টি আর ভারতের পানির ঢলে দেশের মধ্যাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পদ্মা ও যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল ও জামালপুর জেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও কিছু কিছু এলাকায় বাড়ছে পানি, বাড়ছে নদীভাঙন। চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে লাখ লাখ পানিবন্দি মানুষের। ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধে বা উঁচু স্থানে। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে ক্ষেতের ফসল। ভেসে গেছে খামার ও পুকুরের মাছ। বন্যাদুর্গত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন জেলায় ২৬ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। কুড়িগ্রামে এ পর্যন্ত বন্যায় ৬ জনের মৃত্যু খবর পাওয়া গেছে।

উত্তরাঞ্চলের ৮ জেলা গত ১০/১২ দিন আগে বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক জেলায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবন্ধা, নীলফামারী ও বগুড়ার ডিসিরা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন কিন্তু এখনো তালিকা প্রস্তুত হয়নি। এর মধ্যে অনেক এলাকার পানি নেমে গেলেও দুর্ভোগ কমেনি। এদিকে জামালপুরে কিছু এলাকায় ত্রাণ দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান ইনকিলাবকে বলেন, বন্যার জন্য ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। চলতি বন্যাদুর্গত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ডিসিদেরও নির্দেশনা দেয়া আছে যখন যা লাগবে তা সঙ্গে সঙ্গে দেয়া হবে।
বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়ে কন্ট্রোল রুম খুললেও তা থেকে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। বলা হয়েছে এ কন্ট্রোল রুম ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকবে। তবে গতকাল কন্ট্রোল রুমের নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর- ০১৩১৮২৩৪৫৬০ এ অনেকবার ফোন দিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি।
সিরাজগঞ্জ জেলা সদরে যমুনার প্রবল স্রোতে একটি বাঁধের ৭০ মিটার নদীতে ধসে গেছে। এ কারণে বাঁধ অভ্যন্তরের পাচঠাকুরী এলাকার প্রায় ৫০টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীনের আশঙ্কায় অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর ভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। ধরলার ভাঙনে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নে সারডোব গ্রামে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৪০০ মিটার অংশ ভেঙেছে। ইতোমধ্যে বাঁধের বেশিরভাগ অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বাঁধটি ভেঙে গেলে নদী তীরের ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ বন্যার কবলে পড়বে। নওগাঁ জেলার আত্রাই নদীতে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। উপজেলার আটগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি চলতি বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ের পিছন দিক এবং খেলার মাঠের কিছু অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। পদ্মায় অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়ে মাদারীপুরের শিবচরের চরাঞ্চলে ব্যাপক নদীভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ভয়াবহ ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে একাধিক স্কুল ভবন, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, কমিউনিটি ক্লিনিক, বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ভাঙন প্রতিরোধে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
বগুড়া থেকে মহসিন রাজু জানান, সারিয়াকান্দি পয়েন্টে ১২ ঘণ্টায় যমুনায় পানি ২ সেন্টিমিটার কমে গত বৃহস্পতিবার বিপদসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জেলার তিনটি উপজেলা সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনটের চরাঞ্চলের প্রায় এক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে বিপাকে পড়েছে। চরাঞ্চলের বাড়ি ঘর, ফসল এখন পানির নিচে। এদিকে যমুনার পানি ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কাছে এসে পড়েছে। বাঁধে বসবাসকারী লোকজনের পাশাপাশি বাঁধের পশ্চিমপাড়ের লোকজন আতঙ্কে আছে।
সিরাজগঞ্জ থেকে সৈয়দ শামীম শিরাজী জানান, একদিন বিরতি দিয়ে আবারও সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনার পানি ৪ সেন্টিমিটার ও কাজিপুর পয়েন্টে ৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল সকাল থেকে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৬ এবং কাজিপুর পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নদী তীরবর্তী এলাকা ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পাঁচ উপজেলার প্রায় ৩৩ ইউনিয়নের ২১৬টি গ্রামের ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৩ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রাম থেকে শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, ধরলা নদীর ভাঙনে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নে সারডোব গ্রামে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৪০০ মিটার অংশ ভেঙে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাঁধের বেশিরভাগ অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বাঁধটি ভেঙে গেলে নদী তীরবর্তী ২০ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ বন্যার কবলে পড়বে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধটি রক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
দুর্ভোগ কমেনি দুর্গত মানুষের। ৭০ ভাগ বানভাসীদের কাছে পৌঁছায়নি ত্রাণসামগ্রী। আশ্রয় স্থানগুলোতে নেই বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা। টানা ৭ দিন ধরে ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমর ও ধরলা নদী অববাহিকায় পানিবন্দি প্রায় ২ লাখ মানুষ চরম ভোগান্তির মধ্যে দিনাতিপাত করছে। ধরলা, দুধকুমর ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল ধরলার পানি ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৭ সেন্টিমিটার এবং নুনখাওয়া পয়েন্টে ৪৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
গত ২৪ ঘণ্টায় বন্যার পানিতে ডুবে ২ শিশু ও একজন বয়স্ক ব্যক্তি মারা গেছেন। এ নিয়ে বন্যার পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে সদর উপজেলার ২ শিশু, চিলমারীর ১ শিশু ও ১ বয়স্ক ব্যক্তি, নাগেশ্বরীর ১ শিশু ও উলিপুরের ১ শিশু রয়েছে।
নওগাঁ থেকে এমদাদুল হক সুমন জানান, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে আত্রাই নদীর পানি। ফলে উপজেলার আটগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি চলতি বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ের পিছন দিক এবং খেলার মাঠের কিছু অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে।
টাঙ্গাইলে আবার বাড়তে শুরু করেছে যমুনা নদীর পানি। গেল দুইদিন যমুনা নদীতে পানি কমলেও বিগত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সাথে বাড়ছে ধলেশ্বরীসহ অভ্যন্তরীণ নদ নদীর পানি। টাঙ্গাইল সদর, নাগরপুর, দেলদুয়ার, ভ‚ঞাপুর, কালিহাতী এবং গোপালপুর উপজেলার ২১টি ইউনিয়নের ৯৩টি গ্রামের ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৭১ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
যমুনায় পানি বৃদ্ধিতে জামালপুরের ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ীতে নতুন করে কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সুরমা ও পুরাতন সুরমা নদীর পানি বাড়ায় সুনামগঞ্জের হাওর পাড়ের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বাড়ায় ডুবে গেছে জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগরের বিভিন্ন এলাকা। রংপুর জেলার চরাঞ্চলে পানিতে তলিয়েছে সবজি ক্ষেতসহ ফসলি জমি। তিস্তা ব্যারেজের সবকটি গেট খুলে দেয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে পানিবন্দি হয়ে আছে দুই হাজারেরও বেশি পরিবার।
রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলা সংবাদদাতা মোজাম্মেল হক জানান, উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাট পয়েন্টে ৩০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিপদ সীমার ৮ দশমিক ৯৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টার চেয়ে ১২ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ১ ও ২নং ফেরি ঘাটে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে।
মাদারীপুর শিবচর থেকে এম সাঈদ আহমাদ জানান, গত কয়েকদিন ধরে পদ্মা নদীতে অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি পেয়ে শিবচরের চরাঞ্চলের চরজানাজাত, কাঠালবাড়ি, বন্দরখোলায় ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীতে বিলীন হয়েছে বন্দরখোলার অস্থায়ী বাঁধের একাংশ। ভাঙন আক্রান্ত হওয়ায় ৩ ইউনিয়নের অন্তত ১২০টি বসত বাড়ি সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন