ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২০, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৩ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাত ভেঙে পড়া এবং রাষ্ট্রের ব্যর্থতা

জামালউদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ৮ জুলাই, ২০২০, ১২:০১ এএম

সম্মিলিত শক্তি ও সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি ও সমষ্টিগত মানুষের নিরাপত্তাসহ সমাজে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করার জন্যই মানুষ রাষ্ট্র গঠন করেছিল। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে, সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করা। ব্যক্তিগতভাবে, রাজনৈতিক-সাংগঠনিকভাবে যা সম্ভব নয়, রাষ্ট্র তা সহজেই সমাধা করতে পারে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে একদিকে রাষ্ট্র খাজনা আদায়, রাজার হুকুমদারি ও প্রজাপীড়নের সামন্তবাদী ধারণা থেকে আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছে, অন্যদিকে মুনাফাবাজির করপোরেট অর্থনীতির হাত ধরে পুঁজির পুঞ্জিভবন ও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সম্পদের অসম বন্টন ব্যবস্থা রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষ্যকে অকার্যকর করে দিয়েছে। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীর এই কঠিন সময়ে দেশে দেশে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও অসহায়ত্ব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা চীনের মত অগ্রসর পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো হাজার হাজার কোটি ডলারের বেইলআউট প্রোগ্রামসহ মানুষের জীবন-জীবীকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে সেই ব্যর্থতা ঢাকার সর্বাত্মক চেষ্টা দেখা গেলেও আমাদের মত উন্নয়নশীল রাষ্ট্র কোনোভাবেই তার দৈন্যদশা আড়াল করতে পারছে না। বিশেষ সময়ে মানুষের বাড়তি চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার মাত্রা বুঝে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা যেমন পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে বাড়তি মুনাফাবাজির প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে, এখন রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকেও যেন প্রায় একই ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে। যেখানে অধিকাংশ মানুষের আয় কমে গেছে, লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে,এমন এক বাস্তবতায় আমাদের দেশে বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল, গ্যাস ও পানির মূল্যবৃদ্ধি, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন সেবার মূল্যবৃদ্ধির অপতৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রাজনৈতিক ধারণার শুরুতে জনগণের নিরাপত্তা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বিকাশকেই মূল লক্ষ্য হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। অর্থাৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মাত্রই কল্যাণরাষ্ট্র। আমাদের সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নি¤œলিখিত বিষয়সমুহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়:
(ক) অন্ন. বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
(খ) কর্মের অধিকার, অথার্ৎ কর্মের গুণ ও পরিমান বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
(গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার, এবং
(ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজণিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজণিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার।
এখানেই শেষ নয়। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতার মূল অর্জনই হচ্ছে একটি কল্যাণকামী সংবিধান। এই করোনা মহামারীতে বিশ্বের দেশগুলো যখন মাত্রাভেদে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে সাধারণ জনগণের পাশে দাঁড়াচ্ছে, তখন আমাদের সরকার আমাদের সংবিধানে অর্পিত দায়িত্বের কতটা পালন করতে পারছে তার একটি তুলনামূলক বিচারের মানদÐ উঠে আসছে। সেখানে ইউরোপ-আমেরিকা তো বটেই, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে পড়ার চিত্রই দেখা যাচ্ছে। করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর জনগণের নিরাপত্তায় এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ১৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে পড়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিল ইউএনডিপি।
জিডিপি’র ধারাবাহিক উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের তালিকা থেকে নিম্মমধ্য আয়ের দেশে পদার্পণের দ্বারপ্রান্তে এসে সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো উচ্ছ¡াস আমরা দেখেছি। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে কয়েক ধাপে লক্ষকোটি টাকার প্রণোদনা ও সহায়তা তহবিল ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে আমাদের সরকার অর্থনৈতিক সামর্থ্যের প্রমান রেখেছে। তবে এসব অর্থ আদতে কতটা জনগণের কল্যাণে. কতটা ধণিক ব্যবসায়ীদের কল্যাণে আর কতটা দুর্নীতি-লুটপাটের ভাগে পড়বে, তা এখন এক ধরনের রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হওয়ার কথা থাকলেও, দেশে এখন আদতে কোনো সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও পরিবেশ নেই বললেই চলে। অথচ আমাদের গণতান্ত্রিক সংবিধান সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা এবং সরকারের কর্মকাÐের সাথে ভিন্নমত পোষণের অধিকারের নিশ্চয়তা দিয়েছে। দেশে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ যতটাই রুদ্ধ বা সঙ্কুচিত হোক না কেন, এখনকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জরিপ ও পরিসংখ্যান থেকে প্রকৃত অবস্থা বেরিয়ে আসতে বেশি সময় লাগে না। দেশের মানুষ যখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির উচ্চহারের পাশাপাশি সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতির চিত্র দেখে আনন্দিত ও গর্বিত হয়েছে। আর এখন একটি বৈশ্বিক মহামারীতে কোটি মানুষের বেকারত্ব, কর্মহীনতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা ও ভঙ্গুরতা, মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের উৎকণ্ঠা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্বহীনতা দেখে নাগরিকরা ততটাই হতাশ ও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সমাজিক নিরাপত্তার অনুসঙ্গগুলো একেক দেশে একেক রকমের হলেও এই করোনাকালের অপ্রত্যাশিত-অনাকাক্সিক্ষত কঠিন বাস্তবতায় তা জনগণের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষাপটে মানুষের অসন্তোষ ও হতাশাজনিত বিক্ষুব্ধতা কোথাও কোথাও গণবিস্ফোরণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনা সূচিত গণআন্দোলন একজন জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর প্রতিবাদ নয়, আইনের সমতা উপেক্ষা করে যুগ যুগ ধরে চলে আসা বর্ণবৈষম্য ও হোয়াইট সুপারমেসিস্টদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিবাদের অভূতপূর্ব প্ল্যাটফর্ম এটি। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অস্বচ্ছতা, বৈষম্য ও ব্যর্থতার কারণে মার্কিন সমাজে এই অবিচারের সংস্কৃতি ক্রমে শক্তি সঞ্চয় করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত ব্যক্তিকেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা বসাতে সক্ষম হয়েছে।
করোনাকালে বিভিন্ন দেশে সরকার জনগণের কাঠগড়ায় বিচারের সম্মুখীন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে আসা রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার চিত্রগুলো সরকারকে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতায় বাধ্য করছে। গত কয়েক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরের শীর্ষ কর্মকর্তা দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত, গ্রেফতার ও বিচারের সম্মুখীন হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেন অনেকটাই ব্যতিক্রম। এখনে করোনাভাইরাসের মহামামরীর শুরু থেকেই একের পর এক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও ব্যর্থতার কারণে শত শত কোটি টাকার অপচয়-লুটপাট ছাড়াও হাজার হাজার সম্মুখ সারির করোনাযোদ্ধা ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ ও সেনাসদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেও অভিযুক্ত সংশ্লিষ্টরা কার্যত জবাবদিহিতার বাইরে। উপরন্তু নি¤œমানের নিরাপত্তা সামগ্রী নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ডাক্তারকে পদচ্যুত করে সরিয়ে দেয়ার খবরও বেরিয়েছে। সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ডাক্তার স্বাস্থ্যকর্মীদের এক মাসের খাবারের বিল হিসেবে ২০ কোটি টাকার অঙ্ক উঠে এসেছে। এ নিয়ে ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদেও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। যথারীতি বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলা হলেও এই ‘খতিয়ে দেখতে’ কিতদিন লাগবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। অতীতে বড় বড় চুরিদারির অভিযোগ খতিয়ে দেখার কথা শোনা গেলেও জনগণের চোখে ধুলা দিতে দু’একজনকে গ্রেফতার দেখানো ছাড়া মূল হোঁতাদের বিচারের সম্মুখীন করার দৃষ্টান্ত এখনো দেখা যায়নি। ক্যাসিনোকাÐে কিছু মধ্যমসারির নেতাকে গ্রেফতার করা হলেও আলোড়ন সৃষ্টিকারি বালিশকাÐ, পর্দাকাÐের মত ক্ল্যাসিক্যাল চুরির সাথে জড়িত নেপথ্য ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো অজানা। এই করোনাযুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা সামগ্রী কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগে ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশে মন্ত্রী-আমলাদের গ্রেফতার হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। জিম্বাবুয়ে এবং বলিভিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রীরা এ ধরনের অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন। আমাদের দেশ সত্যিই ব্যতিক্রম। এখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারা ব্যবস্থা নেবেন, তাদের দুর্নীতির অভিযোগ দেখার কেউ নেই।
করোনায় এখনো প্রতিদিন ক্রমবর্ধমান হারে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগ হাসপাতালেও যাচ্ছে না। করোনা হাসপাতালের রোগীদের শতকরা ৯০ ভাগের বেশি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। তবে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত না হয়েও দেশের শতকরা ৯০ ভাগের বেশি মানুষ এই পেন্ডেমিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কোটি কোটি মানুষ বেঁচে থাকার ন্যুনতম অবলম্বন আয়ের পথ ও কর্মসংস্থান হারিয়ে নি:স্ব হয়ে পড়েছে। দেশে দেশে সরকার এসব মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তার চাদরে নিয়ে আসার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকা, কানাডার মত দেশগুলোতে কর্মসংস্থান হারানো কোটি কোটি মানুষ বেকারভাতার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় কোটি কোটি মানুষকে বেকারভাতা দিয়ে তাদের পারিবারিক-সামাজিক জীবন সুরক্ষিত রাখার কথা ভাবা যায় না। অথচ আমাদের সংবিধানে নাগরিকদের জন্য এমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব বলে স্বীকার করা হয়েছে। কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও ঘরে বসে খাদ্য নিরাপত্তার জোরালো কোনো দাবী কেউ সরকারের কাছে তুলেনি। খাদ্যের অভাবে কোনো মানুষ মারা গেছে, এমন অভিযোগও কেউ তুলতে পারেনি। প্রাকৃতিক নিয়মে নিজ নিজ অবস্থানে সবাই খেয়ে পরে বেঁচে আছে। তবে জরুরী চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। ইতিমধ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এ ধরনের মৃত্যুর জন্য দায়ী হাসপাতালগুলোকে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করার নির্দেশনা দিয়েছে। গত তিন মাসে শত শত মানুষ এভাবে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর শিকার হলেও একটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি। আমাদের সরকার এখনো একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক, চিকিৎসা না দিয়ে ফেরত পাঠানো রোগীদের মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও দেখাতে পারছে না সরকার।
আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে দ্বিতীয়ভাগের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা শিরোনামে বলা হয়েছে: রাষ্ট্র (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য;
(খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজনসিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য;
(গ)আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য; রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।
আমাদের বর্তমান সামাজিক- সাংষ্কৃতিক-অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে র্রাষ্ট্রের দায়িত্ব-কর্তব্যের অবহেলা ও ব্যর্থতার নিবিড় যোগসুত্র খুঁজে পাওয়া যায়।
সার্বজনীন মানসম্পন্ন বৈষম্যহীন ও অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলবে রাষ্ট্র, আমাদের সংবিধান সরকারের উপর এই দায়িত্ব অর্পণ করেছে। দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মূল্যবোধ লালন ও বিকাশের পাশাপাশি বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে জীবনমানের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলবে রাষ্ট্র, এমনটাই ছিল প্রত্যাশিত। যেকোনো জাতির বিকাশ, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের এটাই হচ্ছে পূর্বশর্ত ও রোডম্যাপ। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে এসেও আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার যে দশা দেখতে পাই, তা আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকদের অদূরদর্শিতা, অপরিনামদর্শিতা, অদক্ষতা ও ব্যর্থতার প্রমান বহন করছে। বৈশ্বিক মহামারীতে জাতি যখন বিপর্যস্ত তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতের ভগ্নদশা দেখে রীতিমত আঁৎকে উঠতে হয়। রাষ্ট্র মানসম্পন্ন, সার্বজনীন ও অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রæতি দিলেও তা বাস্তবায়নে শুধু ব্যর্থই হয়নি, পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে অনৈতিক মুনাফাবাজি, দুর্নীতি ও বৈষম্যমূলক স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা অনুপাতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অপ্রতুলতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সঠিক মান ও জবাবদিহিতা না থাকা এবং উচ্চ শিক্ষায় রাজনৈতিক দলবাজি, সন্ত্রাস ও সেশনজটের বাস্তবতায় শ্রেফ বিনিয়োগ ও মুনাফাবাজির লক্ষ্যে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে হাজার হাজার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কিছু তথাকথিত নামি-দামি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষাকে সার্টিফিকেট বাণিজ্য ও অর্থব্যয়ের মাধ্যমে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দাঁড় করে ফেলেছে। রাষ্ট্র যেমন শিক্ষার বৈশ্বিক মানদÐে উন্নত, বৈষম্যহীন ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পৃক্ত করে গড়ে তুলতে পারেনি, তেমনি বেসরকারি ও সরকারিভাবে গড়ে ওঠা নানা স্তরে, নানান মাধ্যম ও বিভাগের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধণ ও অনৈতিক শিক্ষাবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। এখন এই করোনাকালীন দুর্যোগে এসে শিক্ষাব্যবস্থার সেই হুজুগে অংশটি ধসে পড়তে বসেছে। শিক্ষার্থীদের মাসিক টিউশন ফির উপর নির্ভরশীল দেশের হাজার হাজার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ হওয়ার পথে। বাড়ি বিক্রি, জমি-দোকান বিক্রির মত এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিক্রির করতে দেখা যাচ্ছে। এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের অংক নেহায়েত কম নয়। এই দুর্যোগে কর্মহীন, সহায়সম্বলহীন লাখ লাখ অভিভাবক নিজেদের সন্তানদের ভরন-পোষণে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকে বাড়িভাড়া দিতে না পারায় পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এহেন বাস্তবতায় চার মাস ধরে অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানের টিউশন ফি পরিশোধ করা বেশিরভাগ অভিভাবকের পক্ষেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ শিক্ষক এভাবেই এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। সরকারি ব্যবস্থার অপ্রতুলতা ও ব্যর্থতার কারণেই এরা নামমাত্র বেতনে শিক্ষকতা করে জাতির মহান দায়িত্ব পালনে রত ছিলেন। জাতির এই দুর্যোগময় সময়ে বেসরকারি ননএমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সরকার অস্বীকার করতে পারে না।
bari_zamal@yahoo.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন