ঢাকা, বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭, ১৪ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

দুশ্চিন্তায় খামারিরা

কোরবানির পশুর হাট নিয়ে দ্বিধা-দ্ব›দ্ব ঢাকাসহ চার সিটিতে পশুর হাট না বসানোর পরামর্শ করোনা মোকাবেলা উপদেষ্টা কমিটির

বিশেষ সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১১ জুলাই, ২০২০, ১২:০০ এএম

কড়া নাড়ছে ঈদুল আজহা। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন পশুর হাট ইজারার বিজ্ঞপ্তি দিলেও এখনও দ্বিধাদ্ব›দ্ব কাটেনি। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে কোরবানির হাট না বসানোর জন্য পরামর্শ দিয়েছেন করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা। গতকাল শুক্রবার ওই কমিটির এক ভার্চুয়াল সভায় পরামর্শের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডাক্তার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। ওই সভায় করোনাভাইরাস প্রতিরোধে আরো বেশ কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হয়। কমিটি ওই সভায় চার মহানগরী থেকে অন্য কোনো স্থানে যাতায়াত বন্ধ রাখার জন্য সরকারকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

এর আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বলেছে, স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনেই রাজধানীসহ সারাদেশে কোরবানির পশুর হাট বসবে। যদিও একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে কোরবানির পশুর হাটে কোনোভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব নয়। শত শত মানুষ ঠেলে কে যাবে পশুর হাটে? যারা কোরবানি পশু কিনবেন সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণি কি কোরবানি দিতে পারবেন? এসব প্রশ্নের প্রভাব পড়ছে পশুর খামারি-ব্যাপারীদের ওপর। তাদের দুচিন্তায় এবার পশুর দাম পাবে তো? এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, বগুড়া ও নওগাঁর খামারিদের সাথে কথা বললে তারা জানান, প্রতি বছর এই সময়ে তাদের কাছে হাটের ইজারাদারের লোকজন যোগাযোগ করে থাকেন। অনেকে সশরীরে হাজির হয়ে তাদের হাটে পশু নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা জানিয়ে অনুরোধ করেন। এবার এখনও পর্যন্ত কেউই যোগাযোগ করেন নি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর সারাদেশে কোরবানিযোগ্য পশু আছে ১ কোটি ২০ লাখের মতো। এর মধ্যে গরু-মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য পশুর সংখ্যা আলাদা করেনি অধিদপ্তর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা জানান, গত বছর কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল এক কোটি ১৮ লাখ। এবার ১ কোটি ২০ লাখ। তিনি বলেন, দেশের পর্যাপ্ত পশু আছে। তবে করোনার কারণে কোরবানির সংখ্যা একটু কমে যেতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ওই কর্মকর্তা জানান, গত দুই-তিন বছর থেকে আমাদের কোরবানির পশু অন্য দেশ থেকে আনতে হচ্ছে না। গত বছরও ১০ লাখের মতো পশু অবিক্রিত ছিল। এর মানে আমরা গবাদি পশুতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছি। এবারও পশু চাহিদার চেয়ে বেশিই আছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় কোরবানির পশু নিয়ে দিন গুনছেন খামারিরা।
জানা গেছে, এবার কোরবানির ঈদকে টার্গেট করে কুষ্টিয়া জেলার ১৮ হাজার খামারি উৎপাদন করেছেন ১ লাখের বেশি গরু। এছাড়া ৬০ হাজার ছাগল পালন করেছেন তারা। করোনা মহামারীতে এত পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। প্রতিদিন হাট-বাজারে হাজার হাজার পশু বিক্রির জন্য নিয়ে এসে ক্রেতা খুঁজে পাচ্ছেন না খামারিরা। ক্রেতা না থাকায় কমতে শুরু করেছে সব ধরনের পশুর দাম। সবমিলিয়ে প্রায় দুই লাখ পশু উৎপাদন করে বড় লোকসানের মুখে পড়েছেন দেশের সবচেয়ে বড় পশুর মোকাম কুষ্টিয়ার খামারিরা। লাভ তো দূরে থাক, গরু বিক্রি করে আসল তোলায় এখন তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। কুষ্টিয়া জেলার ব্যপারি আব্দুল জব্বার গত বছর ঢাকার শনিরআখড়া হাটে ১৫টি গরু এনেছিলেন। এবারও গরু দাম দর করে রেখেছেন। কিন্তু হাটের ইজারাদারের কাছে থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নি কোন হাটে আসবেন। টেলিফোনে তিনি বলেন, হাট হবে নাকি হবে না বুঝতে পারছি না। কেউ কেউ আবার ইন্টানেটে হাটের কথা বলছেন। আমরা তো ওসব বুঝি না। ঢাকায় এবারও হাটের ইজারা নিতে সিটি করপোরেশনে ঘুরাঘুরি করছেন বেশ কয়েকজন ইজারাদার। তাদের একজন বলেন, ইজারা নিয়ে এখনও দ্বিধা-দ্ব›েদ্ব দুই সিটি করপোরেশন। হাটের ইজারা নিশ্চিত না হয়ে আমরা খামারিদের সাথে যোগাযোগ করি কি করে?
এদিকে করোনার কারণে সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব চলছে। বিপাকে পড়ছেন দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। যারা কয়েকজন মিলে (শেয়ার) কোরবানি দেন। করোনার কারণে এই শ্রেণির সবচেয়ে বিপাকে থাকায় অনেকেই চলতি বছর কোরবানি দিতে পারবেন না। এদের মধ্যে একটা বড় অংশ ইতোমধ্যে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। এতে কোরবানির পশু বিক্রি কমে যেতে পারে। এ কারণে পর্যাপ্ত গরু থাকার পরও দাম পাবেন না খামারিরা। এমন উদ্বেগের মধ্যে কোরবানিযোগ্য পশু নিয়ে দুচিন্তায় পড়েছে দেশের গরু খামারি, প্রান্তিকপর্যায়ের কৃষক। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশ মাংসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর থেকে ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ উলেস্নখযোগ্য হারে কমে গেছে। আগে প্রতি বছর ২৪-২৫ লাখ ভারতীয় গরু আসত। ২০১৯ সালে মাত্র ৮৫ হাজার গরু ঢুকেছে। গত বছর সারাদেশে কোরবানিযোগ্য ৪৫ লাখ ৮২ হাজার গরু-মহিষ, ৭২ লাখ ছাগল- ভেড়া এবং ৬ হাজার ৫৬৩টি অন্যান্য পশুর কোরবানিও হয়েছে। আসন্ন ঈদুল আযহায় এক কোটি বেশি পশুর কোরবানি হতে পারে।
কোরবানির ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে, দেশের পশু খামারিদের দুশ্চিন্তা ততই বাড়ছে। মহামারি করোনার প্রকোপ এখনো কমেনি, বরং দিন দিন বাড়ছে। এ অবস্থায় খামারিরা পশু বাজারে নিতে পারবেন কিনা, বাজারে নিলেও ক্রেতা মিলবে কিনা, ক্রেতা মিললেও দাম সঠিক পাবেন কিনা- এ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন