ঢাকা মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ০৫ মাঘ ১৪২৭, ০৫ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

বানভাসিদের দুর্ভোগ বাড়ছে

আরও অবনতির আশঙ্কা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুড়িগ্রামে এ পর্যন্ত পানিতে ডুবে ১৬ জনের মৃত্যু

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২০ জুলাই, ২০২০, ১২:০২ এএম

দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় মানিকগজ্ঞ, ফরিদপুর, শরিয়তপুর, চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জ জেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মধ্যাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার আশপাশের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নতুন করে চরাঞ্চলের নীচু এলাকার ফসল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। পানিতে তলিয়ে গেছে ফসলী জমি। ভেসে গেছে অনেক মৎস খামার। পানি বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন স্থানে তীব্র হচ্ছে নদী ভাঙন। বন্যা দুর্গত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন বানভাসী মানুষ। বন্যার্তদের দুর্ভোগ এখন চরমে। অনেক স্থানে বানভাসীরা ত্রাণ পাচ্ছে না। ত্রাণের জন্য চলছে হাহাকার।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আবারও বন্যার অবনতির আশংকা করছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০-২১ জুলাই থেকে ৪ দিন পুনরায় ভারতের আসাম, হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-প‚র্ব ভারতে ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। ফলে দেশের উত্তর, উত্তর-প‚র্ব ও মধ্যাঞ্চলে একইভাবে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশংকা রয়েছে। গতকাল পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

উল্লেখ্য, জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারতের আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তর-প‚র্ব ভারতে ৪ দিনে প্রায় ৯০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। ফলে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বন্যা সৃষ্টি হয়, যা পদ্মা নদীর মাধ্যমে নামার সময় দেশের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত জেলাসম‚হ রাজবাড়ি, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও চাঁদপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করে। এছাড়া দেশের উত্তরবঙ্গেও বন্যা চলমান রয়েছে।

চাঁদপুর থেকে বি এম হান্নান জানান, ভারত থেকে ধেয়ে আসা বানের পানিতে মেঘনা নদী উত্তাল হয়ে উঠেছে। মেঘনার স্রোতধারা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝুঁকিতে রয়েছে চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধ। ঝুঁকি এড়াতে বাঁধের বড়স্টেশন মোলহেড এলাকায় ৩ হাজার ৩শ’ বালিভর্তি জিইও টেক্সটাইল ব্যাগ (বস্তা) প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৩ হাজার ৩শ’ ৬০ মিটার এলাকা নিয়ে চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধের অবস্থান। প্রতিবছর বর্ষা আসলে ঝুঁকিতে পড়ে বাঁধের বিভিন্ন এলাকা। প্রায় প্রতি বছর কিছু কিছু এলাকার বাঁধ দেবে যায় বা নদীতে ধসে পড়ে।

ফরিদপুর থেকে নাজিম বকাউল জানান, ফরিদপুর সদর উপজেলার সাদীপুরে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের ২২মিটার জায়গা ধ্বসে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। স্থানীয়রা জানান, গত শনিবার বিকাল থেকেই বাঁধের ওই অংশে নিচ দিয়ে চুইয়ে পানি প্রবেশ করছিলো, গতকাল সকালে হঠাৎ করেই ফাঁটল ধরে তা বড় হতে থাকে এক পর্যায়ে বাঁধের ২২মিটার এলাকা ভেঙ্গে পানি প্রবেশ করতে থাকে।

জামালপুর থেকে নুরুল আলম সিদ্দিকী জানান, যমুনার পানি এখনও বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় জেলার ৪ উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গতকাল ব্রহ্মপুত্রের পানি জামালপুর ফেরীঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে জেলার দেওয়ানগঞ্জ, ইসলামপুর, বকশীগঞ্জ ও সদর উপজেলার নতুন নতুন এলাকা বন্যা কবরিত হয়ে পড়েছে। বন্ধ হয়েছে জামালপুর-শেরপুরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। দুই দফা বন্যা ও করোনায় দীর্ঘদিন কর্মহীন হয়ে পড়া দিনমজুর ওনি¤œআয়ের শ্রমজীবী মানুষরা খাবার সংকটে থাকলে প্রয়োজনীয় সরকারি ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তাদের। দ্বিতীয় দফার বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার প্রায় আড়াই লাখ পরিবারের বাড়ি-ঘর ও সাত উপজেলার রাস্তা। এতে পানি বন্দি হয়ে পড়েছে সাড়ে আট লাখ মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। বন্যা কবলিত এলাকায় পানি বন্দি মানুষের মাঝে খাদ্য, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সংকট দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রাম থেকে শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সামান্য কমলেও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। এখনও ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৭ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়ায় বিপদসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার ও ধরলার পানি ব্রীজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৪২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে। প্রথম দফায় ১২দিন এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফা বন্যায় টানা এক সপ্তাহ ধরে প্রধান নদীগুলোর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে চরম দুর্ভোগে রয়েছে জেলার ৩ লাখ মানুষ। প্রায় ৫০ হাজার বাড়িঘর বিনষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ১০ হাজার জমির ফসলি ক্ষেত। ৩৭ কিলোমিটার সড়কপথ এবং সাড়ে ৩১ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ২২ হাজার নলকুপ ডুবে গেছে। ৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদী ভাঙনে বিলিন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরো ১৩৯টি বিদ্যালয়। বন্যায় বিভিন্ন জায়গায় আশ্রিতরা রয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটে। এছাড়া রয়েছে পয়:নিস্কাশন সমস্যা। আছে শিশু ও কিশোরীদের নিরাপত্তা সমস্যা। সরকারিভাবে বরাদ্দ ত্রাণ অপ্রতুল বলে জানিয়েছে বানভাসীরা। এখনো অনেকে ত্রাণ পায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট এলাকায় তিস্তার ভাঙ্গন তীব্র হয়ে উঠেছে। বালুর বস্তা ফেলে ভাঙ্গন ঠেকানোর চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

নওগাঁ থেকে এমদাদুল হক সুমন জানান, আত্রাই নদীর বেশ কয়েকস্থানে বাঁধ ভেঙ্গে, যমুনা নদীর শহররক্ষা বাঁধের আউটলেট দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে জেলায় কমপক্ষে ৪ হাজার ১শ ৯৪ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল এবং বীজতলা তলিয়ে গেছে। আত্রাই উপজেলায় আত্রাই নদীর তিনটি স্থানে বাঁধ ভেঙ্গে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের সবগুলো প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় নিমজ্জিত ফসলের মধ্যে রয়েছে ৩ হাজার ৩শ ২৯ হেক্টর জমির রোপা আউশ, ৫০ হেক্টর জমির রোপা আমন, ৩৭৬ হেক্টর জমির রোপা আমনের বীজতলা, ২শ হেক্টর জমির বোনা আমন, ১৪৭ হেক্টর জমির বিভিন্ন জাতের সব্জি, ১১ হেক্টর জমির মরিচ এবং ৮১ হেক্টর জমির পাট।

রাজবাড়ী থেকে মোঃ নজরুল ইসলাম জানান, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে পদ্মার তীব্র স্রোতে ফেরি চলাচল ব্যহত হচ্ছে। এতেকরে দৌলতদিয়া ঘাটে নদী পাড়ের অপেক্ষায় সিরিয়ালে আটকা পড়েছে অন্তত ৩ শতাধিক যানবাহন। পদ্মা নদীর পানি গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ১০৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তীব্র ¯্রােতের বিপরীতে আজও ফেরি স্বাভাবিক ভাবে চলতে পারছে না। বিআইডবিøটিসি দৌলতদিয়া ঘাটের ব্যাবস্থাপক আবু আব্দুল্লাহ রনি জানান, দৌলতদিয়া পাটুরিয়া নৌরুটে বর্তমানে ১৩ টি ফেরি দিয়ে পারাপার করা হচ্ছে। তীব্র ¯্রােতের কারনে সাবধানতা অবলম্বন করে ফেরিগুলো চালাতে হচ্ছে। তাছাড়া নদীতে প্রচন্ড ¯্রােত থাকায় ফেরিগুলোকে পারে আসতে দ্বিগুন সময় লাগছে, যে কারনে ঘাট এলাকায় যানবাহনের সিরিয়াল তৈরি হচ্ছে।

কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে সেলিম আহমেদ জানান, কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার চালিয়াভাঙ্গা ইউনিয়নে প্রতিবছরই বর্ষার মৌসমে মেঘনা নদীর ভাঙ্গনের কবলে দিন দিন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐ ইউনিয়নের গ্রামীন জনপথ। মেঘনা উপজেলার চালিয়াভাঙ্গা, নলচক, ফরাজিকান্দি, মইশারচর, চালিয়াভাঙ্গা, রামপ্রসাদের চরের মানুষ বর্ষা মৌসম এলেই আতংকের মধ্যে দিন এবং রাত যাপন করেন। কখন শুরু হয় নদীর ভাঙন থাকতে হয় সেই টেনশনে। গত ১০ বছরে প্রায় ২০০ বসত ঘর ফসলি জমি, মসজিদ, মাদ্রাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয় সহ অসংখ্য স্থাপনা নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পদ্মা পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে চরাঞ্চলের নীচু এলাকার ফসল প্লাবিত হয়েছে। দৌলতপুরে বন্যার কারনে কৃষকরা তাদের অপরিপক্ক ফসল কেটে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক স্থানে আউশ ধান কাটার যোগ্য না হওয়ায় ধানচাষীরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন