ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২০, ১৬ আশ্বিন ১৪২৭, ১৩ সফর ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সচেতন হতে হবে

জান্নাতুল মাওয়া নাজ | প্রকাশের সময় : ২২ জুলাই, ২০২০, ১২:০১ এএম

সকল সুখের ও সৌন্দর্যের মূল হচ্ছে সুস্বাস্থ্য। সুস্বাস্থ্য ছাড়া জীবনের সকল অর্জনেই বৃথা। বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য যেমন প্রয়োজন, সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ খাদ্য। যে খাদ্য দেহের জন্য ক্ষতিকর নয় বরং দেহের বৃদ্ধি, ক্ষয় পূরণ ও রোগ প্রতিরোধ করে তাই স্বাস্থ্যসম্মত বা নিরাপদ খাদ্য। নিরাপদ খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টেকসই জীবন ও সুস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প নেই। অনিরাপদ খাদ্য শুধু স্বাস্থ্যের ঝুঁকিরই কারণ নয়, বরং দেহে রোগের বাসা বাঁধারও অন্যতম কারণ। বিশুদ্ধ, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার সুস্থ ও সমৃদ্ধশালী জাতি গঠনে একান্ত অপরিহার্য।

আধুনিক জীবনে শিল্পজাত খাদ্য একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। এ খাদ্যকে স্বাভাবিক এবং ভেজাল ও অন্যান্য দূষণ থেকে নিরাপদ অবস্থায় বিতরণ এখন একটি বিশ্ব সমস্যা। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, দেশের প্রায় সকল খাদ্যেই ভেজাল রয়েছে। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পাওয়া দুষ্কর। খাদ্যে ভেজালের দৌরাত্মে জনজীবন হুমকীর সম্মুখীন।

নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে না পারলে একসময় আমরা রুগ্ন জাতিতে পরিণত হব। শুধু খাদ্যে ভেজালের কারণে দেশে প্রতি বছর তিন লাখ লোক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। কিডনী রোগে আক্রান্তের সংখ্যা প্রয় দুই লাখ। ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার। এ ছাড়া গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা দেশে প্রায় ১৫ লাখ। খাদ্যে ভেজাল ও নকল ওষুধ দেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা শহরের ৭০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৫০ শতাংশ খাদ্যে ভেজাল। এক গবেষণা সূত্রে জানা যায়, আমাদের শরীরে ৩৩ শতাংশ রোগ হওয়ার পেছনে রয়েছে ভেজাল খাদ্য। এই ভেজাল খাদ্য ও নকল ওষুধের বিরুদ্ধে সরকারকে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা নাহলে, এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। খাদ্যে ভেজাল শুধু যে শারীরিক ক্ষতি তা নয়, এর কারণে জাতীয় উন্নতিও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তায় ২০১৩ সালে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৫ সালে গঠন করা হয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তবে এসব আইন ও কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না। মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেজালবিরোধী অভিযান চালালেও খাদ্য ভেজাল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া এবং ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদÐ বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ১৪ বছরের কারাদÐ বিধান রাখা হয়েছে। আমরা আশা করব, ভেজালবিরোধী অভিযান কঠোর হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করা হবে। ভেজাল পণ্য ও অসাধু ব্যবসায়ীদের ঠেকাতে অভিযান নিয়মিত থাকলে ভেজালকারীদেও দৌরাত্ম অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যায়। তবে ভেজাল ঠেকাতে সচেতনতার বিকল্প নেই। শুধু আইন দিয়ে ভেজাল ঠেকানো সম্ভব নয়। এ জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ২৫ লাখ ক্ষুদ্র বা অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়ী ও ১৮টি মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া দেশে প্রায় ৪৮৬টি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে স¤পৃক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের অধীন প্রায় ১২০টি আইন ও নীতিমালা রয়েছে। সর্বস্তরে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যত আইন রয়েছে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সেগুলো কার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়াও ৬৪টি জেলায় ও আটটি বিভাগীয় শহরে ৭৪টি নিরাপদ খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠিত।

নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন আবশ্যক। আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে চাষাবাদেও জন্য কৃষককে আগ্রহী করতে হবে। এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ ও স¤পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্য স¤পর্কে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। সচেতনতার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে।

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে না পারলে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করার কথা চিন্তাও করা যায় না। কৃষিতে ঢালাওভাবে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার হচ্ছে। ফলে শাক-সবজি ও ফলসহ বিভিন্ন খাদ্যের মাধ্যমে কীটনাশক মানুষের দেহে প্রবেশ করছে, যা শরীরের জন্যে খুবই ক্ষতিকর। এই বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করতে হবে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সবজির ১০-১৫ শতাংশ নমুনায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের অস্তিত্ব থাকে। আর ইউরোপিয়ান কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত সহনীয় মাত্রার ওপরে ধরলে এ হার দাঁড়ায় ৫-৯ শতাংশ। এর অর্থ, আন্তর্জাতিক মানস¤পন্ন একটি অ্যাক্রিডেটেড ল্যাবরেটরিতে ৮০-৮৫ শতাংশ নমুনায় বর্তমান বাজার ব্যবস্থাপনাতেই কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ শনাক্ত করা যাচ্ছে না। সরকার কোন কীটনাশক নিষিদ্ধ করেছে, কোনটার অনুমোদন দিয়েছে এবং কীটনাশক ব্যবহারের বিধি-বিধান ইত্যাদি বিষয়ে কৃষকদের সর্বশেষ তথ্য জানা আবশ্যক। কৃষক বাজারজাত করার সময় খাদ্য দূষিত করে, বিক্রেতাও ভালো পণ্যের সঙ্গে ভেজাল পণ্যের মিশ্রণ ঘটিয়ে খাদ্যের দূষণ ঘটায়। এই দূষণ রোধ করার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে, ভালোভাবে ধুলে ও রান্না করলে কীটনাশকের যদি কোনো অবশিষ্টাংশ সবজিতে থাকে, তার ৬০-৮০ শতাংশ চলে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। উৎপাদনের পরিবেশ খাদ্যের মানকে প্রভাবিত করে।

আমাদের উচিৎ, সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপশি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং বিপণন পর্যন্ত নিরাপদ খাবার নিশ্চিতকরণের বিধি-বিধানগুলো পুরোপুরিভাবে অনুসরণ করা দরকার। নাহলে, নিরাপদ খাদ্যও অনিরাপদ হয়ে যেতে পারে। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম জনশক্তি অপরিহার্য। আর কর্মক্ষম জনশক্তির জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাবারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এছাড়া উৎপাদক থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত ভ্যালু চেইন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা হলে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবে। এই চেইন বাস্তবায়নে নারী-পুরুষ সবাইকে কাজ করতে হবে। এতে কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পাবে এবং কৃষি উৎপাদনও বাড়বে। সেই সাথে নিশ্চিত হবে নিরাপদ ও পুষ্টিমানস¤পন্ন খাদ্যের জোগান।

নিরাপদ খাদ নিশ্চিত করতে হলে শহর, নগর ও প্রতিটি গ্রামে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ হলে সভ্যতার ক্রমবিকাশও সহজ হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, পুষ্টির অভাবে মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনার বিকাশ ব্যাহত হয়। মানুষের স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য দুর্বল হয়ে পড়ে। সুস্থ মানুষ সৃষ্টির জন্য পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ জরুরি। এ প্রয়োজনীয়তা পূরণে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি। একটি বাড়ি বা খামারের আকার কী হবে এটা চিন্তা না করে তার প্রতি ইঞ্চি জমিকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব পুষ্টি চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি বাড়তি আয় রোজগারের মাধ্যমে উন্নত মননশীল জাতি গঠন করা সম্ভব। জমির আকার আকৃতি বিবেচনা না করে মাটি ও বেড়ে ওঠার প্রকৃতিকে বিশ্লেষণপূর্বক স্থান ও সময়ানুযায়ী ডিজাইন করে ফসল ও শাকসবজি চাষ করা যেতে পারে। এভাবে পারিবারিক কৃষিশিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।

নিরাপদ খাদ্য যেমন সবার জন্য প্রয়োজন। তেমনি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সকলকে সচেতনতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য পণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিপণন প্রতিটি পর্যায়ে সচেতনতা প্রয়োজন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

 

 

 

 

 

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন