ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ আশ্বিন ১৪২৭, ০৭ সফর ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

পানি বেড়ে তীব্র হচ্ছে ভাঙন

চাঁদপুর ও মাদারীপুরে নদীগর্ভে দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২৪ জনের মৃত্যু : আরও দুই দিন বাড়তে পারে পানি

ইনকিলাব রিপোর্ট | প্রকাশের সময় : ২৫ জুলাই, ২০২০, ১২:০০ এএম

 পানি বাড়ছে, সাথে সাথে বাড়ছে দুর্ভোগ। প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধিতে তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন। পদ্মা এবং মেঘনার ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা চাঁদপুর সদরের রাজরাজেশ্বর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টারটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া চরাঞ্চলের বাতিঘর হিসাবে খ্যাত মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় গত বৃহস্পতিবার বিকালে বিকট শব্দে নদীগর্ভে চলে যায়।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনার শাখা নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এছাড়া আগামী ২৪ ঘণ্টা পদ্মার পানি বৃদ্ধিও অব্যাহত থাকতে পারে। এতে মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও ঢাকা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকতে পারে। অপরদিকে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নাটোর, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নওগাঁ জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নেত্রকোনা জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। বর্তমানে ১৯টি নদীর পানি ৩০টি স্টেশনে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এক মাস অতিক্রম করেছে চলমান বন্যা। এরই মধ্যে দেশের ২৭টি জেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ৪০ লাখ লোক পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভেঙে গেছে স্কুল-মাদরাসা ও বহু বাঁধ। ডুবে গেছে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, ক্ষেতের ফসল। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। গবাদিপশু, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, থাকা-খাওয়া নিয়ে চরম ভোগান্তিতে বানভাসিরা। পানি যত বাড়ছে বিভিন্ন স্থানে তত তীব্র হচ্ছে নদীভাঙন। বন্যা দুর্গত এলাকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির চরম সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সরকারি ত্রাণ অপ্রতুল হওয়ায় অনেক স্থানে বানভাসিরা ত্রাণ পাচ্ছে না। চরম দুর্ভোগে আছে বানভাসিরা। এদিকে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয় ২৭ জেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সহায়তা হিসেবে ৫৫০ মেট্রিক টন চাল, ৮৭ লাখ টাকা ও ১৪ হাজার অন্যান্য খাবার বরাদ্দ দিয়েছে।

চাঁদপুর থেকে বি এম হান্নান জানান, চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে হু হু করে বাড়ছে পানি। এতে সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নে দেখা দিয়েছে ভাঙন। এ ভাঙনে উদ্বোধনের আগেই নদীগর্ভে বিলীনের মুখে রয়েছে রাজরাজেশ্বর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়। নির্মাণ শেষে মাত্র ২ মাস আগে হস্তান্তর করা হয় দৃষ্টিনন্দন চাঁদপুর রাজরাজেশ্বর ওমর আলী স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার। ত্রিতল বিশিষ্ট ভবনটি নির্মাণে সরকারের ব্যয় হয় ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা। শুধু তাই নয়, ইতোমধ্যে ইউনিয়নের প্রায় দুইশ’ বাড়ি সরিয়ে নিতে হয়েছে এবং আরও পাঁচশ’ বাড়ি নদীভাঙনে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

মাদারীপুর থেকে আবুল হাসান সোহেল জানান, অব্যাহত বর্ষণ ও বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে মাদারীপুরের ৪টি উপজেলায় চলছে নদীভাঙন। শিবচরে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদে অব্যাহত ভাঙনে চরাঞ্চলের বাতিঘর এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ভবনটিসহ এ পর্যন্ত ২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ৫ শতাধিক ঘরবাড়ি ও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। ২১টি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আড়িয়াল খাঁ ও পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম থেকে শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীসহ অন্যান্য নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় টানা প্রায় একমাস ধরে দুর্ভোগে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ। তিস্তায় দেখা দিয়েছে প্রচন্ড ভাঙন। একদিকে ভাঙন আর অন্যদিকে পানিবন্দি অবস্থায় চরম বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষ। এদিকে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে ২০ জন। এর মধ্যে ১৫ জন শিশু। বন্যায় ৫টি স্কুল ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরো ১৩৯টি। এছাড়াও ৩৭ কিলোমিটার সড়কপথ ও ৩১ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভাঙনে গৃহহীন হয়েছে প্রায় দেড় হাজার পরিবার।
শেরপুর থেকে মো. মেরাজ উদ্দিন জানান, ব্রহ্মপুত্র নদেও পানি আবারো বাড়তে শুরু করেছে। ফলে গত ২৪ ঘণ্টায় শেরপুর জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আবারো অবনতি হয়েছে। এতে পানিবন্দি হাজার হাজার মানুষের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। টানা বর্ষণের কারণেও দুর্ভোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলায় গত ৩ দিনে বন্যার পানিতে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ থেকে সৈয়দ শামীম শিরাজী জানান, বৃহত্তর চলনবিলসহ তাড়াশে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। শতশত ঘরবাড়ি, আশ্রয় কেন্দ্র ও গুচ্ছগ্রাম, ২ হাজার হেক্টর রোপা আমন বীজতলা, প্রায় ২ শতাধিক পুকুর বন্যার পানিতে ডুবে গেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে খ আ ম রশিদুল ইসলাম জানান, তিতাস নদীর পানি নবীনগর পয়েন্টে ৭০ সেন্টিমিটার বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান থেকে ইসমাইল খন্দকার জানান, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ঢলে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মধ্যপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাড়ি, কমিউনিটি ক্লিনিক, মহিলা মাদরাসাসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

এদিকে দীর্ঘ এক মাসেও নামেনি নদীবেষ্টিত জেলা গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, করতোয়া ও তিস্তার পানি। এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে এসব নদীর পানি। আর এই পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচতে হচ্ছে নিম্ন ও চরাঞ্চলের বানভাসিদের।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন