ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৩ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

করোনা ভ্যাকসিনে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই

| প্রকাশের সময় : ৩০ জুলাই, ২০২০, ১২:০৩ এএম

দেশের স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা কোনো নতুন বিষয় নয়। করোনাভাইরাস মহামারীতে আমেরিকা-ইউরোপের মতো উন্নত রাষ্ট্রগুলোও প্রথম দিকে সামাল দিতে পারছিল না। সে হিসেবে অনেকটা ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়েই আমরা করোনা মহামারীর ধাক্কা অনেকটাই সামলে নিতে সক্ষম হয়েছি। করোনাভাইরাসের কোনো কার্যকর ওষুধ বা ভ্যাকসিন না থাকায় অনেকটা দিশাহারা অবস্থায় যেসব ওষুধের উপর নির্ভর করে কিছুটা আশার আলো দেখা দেয় তার মধ্যে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন, ডেক্সামেথাসোন, রেমডিসেভিরের মতো ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশের উৎপাদকরা বেশ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রথমদিকে মাস্ক, পিপিই, সেনিটাইজারসহ সুরক্ষা সামগ্রীর অভাব দেখা গেলেও সময়ের সাথে সাথে দেশীয় উদ্যোক্তারা এসব সামগ্রী উৎপাদন ও বিপণনেও সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি ছুটি, লকডাউন, মার্কেট ও গণপরিবহন বন্ধসহ সরকারের নানামুখী উদ্যোগের মধ্য দিয়ে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণেও আমাদের সাফল্য অকিঞ্চিৎকর নয়। তবে করোনাভাইরাস টেস্টের নামে কতিপয় অসাধু মেডিকেল প্রশাসনের ভুয়া রিপোর্টের বাণিজ্য দেশের ভাবমর্যাদাকে বিনষ্ট করেছে। এ কারণে দেশের লাখ লাখ প্রবাসী এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সার্ভিসে এখনো বাংলাদেশকে অনাকাক্সিক্ষত-অপ্রত্যাশিত নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

করোনা মহামারী চিকিৎসায় সাফল্য ও ব্যর্থতার উপর এখন অনেক কিছুই নির্ভর করছে। দেশে দেশে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতায় ফিরে আসার অন্যতম মানদন্ড হয়ে উঠেছে করোনা মহামারী সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিকে দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করার সক্ষমতা ও ব্যর্থতার উপর। করোনা মহামারী মোকাবিলায় তাচ্ছিল্য ও হঠকারিতাপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে নিজ নিজ দেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বা ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসেনারোর জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। তাদের ব্যর্থতার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি হারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সম্মুখীন হচ্ছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, একটি ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশ যথেষ্ট সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গৃহীত পদক্ষেপ ও উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত হয়েছে। করোনাভাইরাস টেস্টের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা ও নিয়ন্ত্রণ দেখা গেলেও ওষুধ, সুরক্ষা সামগ্রীর পাশাপাশি ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উপমহাদেশের অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে এগিয়ে ছিল। একটি কার্যকর সফল ভ্যাকসিন প্রাপ্তির উপর আগামীদিনের অনেক কিছুই নির্ভর করছে। এ ক্ষেত্রে যেসব দেশ এগিয়ে থাকবে তারা নিশ্চিতভাবেই রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবেও এগিয়ে থাকবে। কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন তৈরিতে যেসব দেশ এগিয়ে আছে তাদের মধ্যে চীনের কয়েকটি ফার্ম অন্যতম। এ ক্ষেত্রে চীনের সিনোভেক কোম্পানির সাফল্য অগ্রগণ্য। করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবিলায় একমাত্র চীন সরকার সুরক্ষা সামগ্রী ও তাদের বিশেষজ্ঞ টিম পাঠিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। একইভাবে করোনার ভ্যাকসিন প্রাপ্তিতে বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখতে বাংলাদেশে সিনোভেক কোম্পানির ভ্যাকসিন ট্রায়ালের প্রস্তাবে বাংলাদেশ সাড়া দেয়ার পরও তা স্তিমিত হয়ে যাওয়ার বাস্তবতা বিস্ময়কর ও দুঃখজনক।

করোনাভাইরাসের কোনো ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক না থাকায় এর চিকিৎসা নিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে সারাবিশ্ব। গতানুগতিকভাবে করোনা মহামারী মোকাবেলায় বাংলাদেশ ভারত বা পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে থাকার পরও এখন ভারতের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার তথ্য উঠে আসছে। চীনের ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য ট্রায়াল এ সপ্তাহে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও রহস্যজনক কারণে তা কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়লে ইত্যবসরে অক্সফোর্ডের তৈরি ভ্যাকসিনের হিউম্যান ট্রায়ালে এগিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে যায়। ইতিপূর্বে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের র‌্যাপিড টেস্টিং কিট নিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ব্যাপক সংখ্যক টেস্টিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ। করোনা মহামারী মোকাবেলা এবং সংক্রমণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ব্যাপকভিত্তিক টেস্টিং সুবিধার উপর জোর দিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এগিয়ে থাকার পরও আমলাতান্ত্রিক অস্বচ্ছতার কারণে আমরা যেমন র‌্যাপিড টেস্টিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলাম, একইভাবে সিনোভেক কোম্পানির ভ্যাকসিন ট্রায়াল থেকে পিছিয়ে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে পিছিয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হলাম। করোনাভাইরাস ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে চীনের নেতৃত্বে পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে সম্প্রতি একটি উপাঞ্চলিক জোট গঠনের লক্ষ্যে একটি ভার্চুয়াল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা যায়। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, চীন এবং অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনকে ঘিরে এক ধরনের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মধ্যে পিছিয়ে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বের ৭শ’ কোটি মানুষ যখন একটি সফল ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করছে, তখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন প্রাপ্তির একটি বড় সুযোগ বাংলাদেশ কেন হাতছাড়া করছে তা সত্যি রহস্যজনক ও বিস্ময়কর ব্যাপার। করোনাভাইরাসের মহামারী ও এর কুপ্রভাব এখনি শেষ হচ্ছে না। জনদুর্ভোগ কমিয়ে আনতে এবং দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই করোনাভাইরাসের প্রস্তাবিত ট্রায়াল এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি করোনা চিকিৎসায় বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন