ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৩ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

সম্পাদকীয়

ভারত কি বাংলাদেশকেও হারাচ্ছে?

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ৩১ জুলাই, ২০২০, ১২:০৩ এএম

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ‘দাদাগিরি’র বিষয়টি নতুন নয়। সুযোগ পেলেই প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর তার ক্ষমতার ছড়ি ঘোরানো তার চিরকালের স্বভাব। আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে মাতব্বরি করা তার এক ধরনের বদ খাসলতে পরিণত হয়েছে। তবে এই দাদাগিরি যেন নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ আর বরদাসত করতে পারছিল না। তারা রুখে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে লাদাখে যখন চীনের সৈন্যদের সাথে তার সৈন্যদের হাতাহাতি যুদ্ধ হয় এবং তাতে ভারতের অনেক সেনা নিহত হয় এবং ভারত বেশি বাড়াবাড়ি করলে তার উচিৎ জবাব দেয়ার জন্য রণপ্রস্তুতি নিয়ে রাখে, তখন উল্লেখিত দেশগুলো ভারতের অনাকাক্সিক্ষত প্রভাব উপেক্ষা করে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। দেশগুলো মোক্ষম সময়টিকে কাজে লাগায়। নেপাল তো রীতিমতো ভারতের সাথে বিতর্কিত এলাকা নিজ মানচিত্রে যুক্ত করে ফেলে। এমনকি হিন্দুদের যে দেবতা ‘রাম’ তাকে নেপালী বলে দাবী করে বসে। স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেয় ‘রাম’ ছিলেন নেপালী। নেপালের এ আচরণে ভারত ক্ষুদ্ধ হয়ে নেপালী প্রধানমন্ত্রী ওলিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য পর্দার অন্তরালে এক চাল দেয়। তাতে শেষ পর্যন্ত কোনো লাভ হয়নি। অন্যদিকে ভুটান তার নদীতে বাঁধ দিয়ে ভারতের আসাম রাজ্যে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। এই যে দেশ দুটি ভারতের বিরুদ্ধে এমন অনমনীয় আচরণ শুরু করে, তা তার কল্পনায়ও ছিল না। আর পাকিস্তানের সাথে তো ভারতের চির বৈরী সম্পর্ক। প্রশ্ন হচ্ছে, নেপাল, ভুটানের মতো দেশ ভারতের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে কেন রুখে দাঁড়ালো? এর জবাব হচ্ছে, তারা ভারতের মতো আগ্রাসী শক্তির বিপরীত শক্তি, যে কিনা তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রগতিতে কোনো ধরনের দাদাগিরি ছাড়া অকুণ্ঠচিত্তে দু হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, সেই চীনের বন্ধুত্বের শক্তিতে তারা রুখে দাঁড়াতে সাহস পেয়েছে। চীন, নেপাল ও ভুটানের সাথে যখন ভারতের এক ধরনের বৈরী সম্পর্ক চলছিল, তখন বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ বা বিপক্ষে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। কাশ্মীর নিয়ে শুধুমাত্র কূটনৈতিক ভাষায় মন্তব্য করেছে। তবে ভারত চীন, নেপাল ও ভুটানের কাছে এক প্রকার নাজেহাল অবস্থার মধ্যে পড়ে এবং তখন তাদের সাথে না পেরে বাংলাদেশের সাথে গুঁতোগুঁতি শুরু করে। বাংলাদেশের সীমান্তে বিএসএফ একের পর এক বাংলাদেশী হত্যা, নির্যাতন ও অপহরণের মতো ঘটনা ঘটাতে থাকে। এ নিয়েও বাংলাদেশ সরকার এবং বিরোধী দলগুলো অনেকটা নীরব ভূমিকা পালন করে। পত্র-পত্রিকায় বিএসএফের এমন হত্যা, নির্যাতন ও অপহরণ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এক্ষেত্রে দৈনিক ইনকিলাব প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে শুরু করে সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয়ের মাধ্যমে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। অবশেষে ভারতের এ ধরনের আচরণের জবাব হিসেবে গত ২১ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেন, সীমান্তে হত্যাকান্ড ও গরু স্মাগলিং বন্ধে সীমান্তে অতিরিক্ত ট্রুপস মোতায়েনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন, সীমান্তে মাত্রারিক্ত হত্যাকান্ড বেড়ে গেছে। বিএসএফ বলেছে, পশু স্মাগলিং বেড়ে যাওয়ায় নাকি হত্যাকান্ড বেড়ে গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশে এখন আর ভারত থেকে স্মাগলিংয়ের মাধ্যমে গরু আসার প্রয়োজন নেই। কারণ, বাংলাদেশ এখন চাহিদা মেটানোর মতো যথেষ্ট পশু উৎপাদিত হয়। তারপরও সীমান্তের যেখান দিয়ে স্মাগলিং হয়, সেখানে অতিরিক্ত ট্রুপ মোতায়েন করা হবে। তিনি এ কথাও বলেন, সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে মারণাস্ত্র ব্যবহার না করার জন্য দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা রয়েছে। বিএসএফের উচিৎ নয়, মারণাস্ত্র ব্যবহার করা।

দুই.
করোনার মধ্যে গত কয়েক মাসে বিশ্ব রাজনীতি তো বটেই, উপমহাদেশের রাজনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। এটা এখন সবার কাছে স্পষ্ট, চীন ড্রাইভিং সিটে বসে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং উপমহাদেশে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভারতের দাদাগিরির রাজনীতির ধারাটিও বদলে দিয়েছে। দেশটি অত্যন্ত সুকৌশলে রাজনীতির নাটাইটি হাতে নিয়ে নিয়েছে। কোনো হুমকি-ধমকির মাধ্যমে নয়, বরং অত্যন্ত বন্ধুত্বসুলভ আচরণের মাধ্যমে নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নতি-অগ্রগতির সহায়তায় আন্তরিকভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই দিনের পর দিন কোনো অসুর বা বৈরী শক্তির আচরণে যদি কেউ ত্যাক্ত-বিরক্ত, অতীষ্ঠ হয়ে পড়ে এবং তখন তার সহায়তায় কেউ যদি সহমর্মী ও বন্ধুত্বসুলভ আচরণের মাধ্যমে পাশে দাঁড়ায়, তখন তার হাতই সে ধরবে। পাশাপাশি বৈরী শক্তির বিরুদ্ধে সাহস নিয়ে দাঁড়াবে। হয়েছেও তাই। দেশগুলো চীনের মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশের সহযোগিতা পেয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। নিজ দেশের স্বার্থে ভারতের দীর্ঘদিনের অন্যায্য আচরণের বিরোধিতা করার শক্তি লাভ করেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, চীনের মতো অর্থনৈতিক ও সমরিক শক্তির অধিকারী দেশ যেভাবে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ দিয়ে তাদের সহযোগিতা করছে, তাতে ভারতের মতো দুর্বল অর্থনীতি এবং তার খবরদারিমূলক আচরণকে তোয়াজ করার সময় এখন আর নেই। ভারত শুধু নিতে জানে, দিতে জানে না। কাজেই পরিবর্তীত বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের মতো অর্থনৈতিকভাবে রুগ্ন দেশকে তারা খুব বেশি আমল দেয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে না। দেশগুলো ভালভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছে, বিশ্ব এখন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বায়ন থেকে চীনকেন্দ্রিক বিশ্বায়নের দিকে বেশি ধাবিত হচ্ছে। বিশ্ব ইতিহাসে বৃহৎ আয়তনের দেশগুলোর মধ্যে চীন সবচেয়ে দ্রুত অগ্রসরমান দেশ। দেশটি বৈশ্বিক পুঁজির প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। তার এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ ট্রিলিয়ন বা ৩ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই অর্থ দিয়ে তারা সবচেয়ে বড় বাজেট তৈরি করতে সক্ষম এবং যে উদ্বৃত্ত থেকে যাবে তা বিশ্বের বৃহত্তম পুঁজি হয়ে থাকবে। অর্থাৎ বিশ্ব পুঁজির প্রধান উৎসগুলোর মূল অবস্থান এখন চীনে। এ তুলনায়, ভারতের অবস্থান তলানিতে। বিশ্ব রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠা যে পুঁজি বা অর্থ, তা ভারতের থাকা দূরে থাক, তাকে এখন নিজের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারেই সংগ্রাম করতে হচ্ছে। তাহলে, ভারত কিসের জোরে উপমহাদেশের রাজীতি নিয়ন্ত্রণ করবে? তার পুঁজি বলতে আগ্রাসন এবং হুমকি-ধমকি ছাড়া কিছু নেই। সে বুঝতে পারছে না, খাদ্যাভাবে বিশাল দেহী হাতিও দুর্বল হয়ে যায়। এ দুর্বল দেহ নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে হাকডাক করা ছাড়া তার কিছু করার থাকে না। ভারতের হয়েছে এই দশা। নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনের ধারা এবং এ ধারার নিয়ন্ত্রক যে চীন, তা খুব ভালভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছে। পেরেছে বলেই দুর্বল হয়ে পড়া ভারতকে তেমন একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না এবং তার অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ভারত বিষয়টি বুঝতে পেরে, এখন ভুটানের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করা শুরু করেছে। একেই বলে, ‘ঠেলার নাম বাবাজি।’ চীন যে শুধু তার প্রতিবেশী দেশের কল্যাণের মাধ্যমে সুস্থধারার উপমহাদেশীয় রাজনীতির সূচনা করেছে তা নয়, তার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকান্ডেরও জবাব দিচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজের মহড়ার কড়া প্রতিবাদ এবং প্রয়োজন হলে যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত এমন মনোভাব পোষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহড়াকে ভারত আমলে নিয়ে মনে করেছে, চীনকে জবাব দেয়ার এটা একটা মোক্ষম সুযোগ। তাই সে-ও যৌথ মহড়ার নামে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুক্ত হয়েছে। বিষয়টি বৃহৎ জাহাজের সাথে ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকার যুক্ত হওয়ার মতো দাাঁড়িয়েছে। এতে কি চীনের কিছু আসছে যাচ্ছে? মোটেও না। আবার যুক্তরাষ্ট্রও ভাল করেই জানে, চীন তার চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে। অগামী বিশ্বের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই থাকবে। তাই তার একমাত্র প্রতিদ্ব›দ্বীকে তটস্থ রাখার জন্য মহড়ার নামে সমরাস্ত্র প্রদর্শনী করে শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে চাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এটা দেখানো খুবই স্বাভাবিক। তার সে সক্ষমতা রয়েছে। তবে ভারতের যে সে সক্ষমতা নেই, তা লাদাখে চীনের কাছে চরম মার খাওয়ার মধ্য দিয়ে সবাই বুঝে গেছে।

তিন.
এই কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের তরফ থেকে খুবই উচ্চস্বরে বলা হতো, পৃথিবীতে ভারতই আমাদের সবচেয়ে ভাল বন্ধু। তার সাথে বন্ধুত্বের যে সম্পর্ক তার উচ্চতা আকাশসম। এ কথাও শোনা যেত, পৃথিবীতে ভারত পাশে থাকলেই আমাদের চলবে, আর কারো প্রয়োজন নেই। তবে গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ যেন খুব ধীরে এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে ভারতের আচার-আচরণ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে পুরো পরিস্থিতি অনুধাবন করে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব’ এই নীতি অবলম্বন করে পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতির সাথে শামিল হচ্ছেন বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছে। বিশ্ব পরিস্থিতির সার্বিক দিক অত্যন্ত দূরদর্শী চিন্তার মাধ্যমে ‘ধীরে চলো নীতি’র মাধ্যমে তিনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রগতি বিশ্ব রাজনীতির কোন ধারায় অর্জন করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে, সেদিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। অতি ভারত নির্ভরশীলতা যে সঠিক নয়, তা তিনি বিচক্ষণতার সাথে উপলব্ধি করে নতুন বিশ্ব রাজনীতি বা ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’-এর দিকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এর কিছু নজির ইতোমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। গত জুনে করোনার মহাদুর্যোগে চীন যে বাংলাদেশের আট হাজারের বেশি পণ্য বিনা শুল্কে রফতানির সুযোগ দিয়েছে, তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই হয়েছে। এতে ভারতের কিছু মিডিয়া যেন অস্থির হয়ে উঠে। কলকাতার একটি দৈনিক তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে একে ‘খয়রাতি’ সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে যখন দেশের মানুষ তীব্র প্রতিবাদ শুরু করে, তখন পত্রিকাটি ভুল স্বীকার করে পরবর্তীতে রিজয়েন্ডার দেয়। এর মধ্যে আরও চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে, যা ভারতের পক্ষে সহ্য করা কঠিন। ঘটনাটি হচ্ছে, গত ২২ জুলাই দুপুর একটার দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেন। তাদের মধ্যে ১৫ মিনিট কথা হয়। টেলিফোনে দুই প্রধানমন্ত্রী কুশলাদি বিনিময়ের পর ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি ও মোকাবেলায় গৃহীত পদক্ষেপ এবং বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। প্রধানমন্ত্রী এ সম্পর্কে তাঁকে বিস্তারিত অবহিত করেন। টেলিফোনের এই আলাপ মূলত ইমরান খানের আগ্রহে হয়েছে। এর আগেও গত বছরের অক্টোবরেও দুই প্রধানমন্ত্রীর টেলিফোন আলাপ হয়। ইমরান খান বঙ্গবন্ধু কন্যার শারিরীক অবস্থা বিশেষ করে চোখের অবস্থার খোঁজখবর নেন। সর্বশেষ টেলিফোন আলাপে ইমরান খান ভ্রাতৃপ্রতীম বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে পাকিস্তান যে গুরুত্ব দেয়, তা তুলে ধরে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ এবং জনগণের সাথে জনগণের আদান-প্রদানের তাৎপর্য তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাইমরান খানের মধ্যকার টেলিফোনের ঘটনায় ভারত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও, সে যে জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে, তা অনুমাণ করতে কষ্ট হয় না। ভারতের কাছে তা ‘শত্রু র শত্রু বন্ধু হয়ে যাওয়ার মতো’ই মনে হওয়ার কথা। এ ঘটনার পরপরই আরেকটি চমকপ্রদ সংবাদ দেয় ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য হিন্দু। প্রত্রিকাটি গত ২৬ জুলাই এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাশ গত চার মাস ধরে চেষ্টা করেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ পাননি। ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগ পুননির্বচিত হয়ে ক্ষমতায় এলে ভারতীয় অর্থায়নে বাংলাদেশে নেয়া সব প্রকল্প ঝিমিয়ে পড়ে। অন্যদিকে অবকাঠামো খাতে চীনের প্রকল্পগুলো ঢাকার সমর্থন আরো বেশি করে পাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের উদ্বেগ সত্তে¡ও সিলেট এমএজি ওসমানি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল নির্মাণের কাজ চীনকে দিয়েছে বাংলাদেশ। বিমানবন্দরটিতে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের কাজ পেয়েছে বেইজিং আরবান কনস্ট্রাকশন গ্রুপ। বিমানবন্দরটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সংলগ্ন হওয়ায় এটি স্পর্শকাতর বিবেচনা করছে দিল্লী। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি ও নাগরিকত্ব (সংশোধিত) আইন নিয়ে বাংলাদেশের সাথে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির উচ্চ পর্যায়ের অনেক নেতা অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশীদের ক্রমবর্ধমান মৃত্যু নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো সোচ্চার হয়ে উঠেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভারতের ক্রমাগত বিরূপ আচরণ এবং দাদাগিরি নিয়ে বাংলাদেশের সিহংভাগ মানুষ সোচ্চার হলেও সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়নি। তবে ভারতের অন্যায্য আচরণের কারণে নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপসহ অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলো সোচ্চার হওয়া এবং পরিবর্তীত বিশ্ব রাজনীতির ধারা বদলে যাওয়ার বিষয়টি উপলব্ধি করে তার বাংলাদেশ সরকারও ভেতরে ভেতরে যে অসন্তুষ্ট তা উল্লেখিত ঘটনাবলী থেকে কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়। ভারত মুখে মুখে বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ককে ‘সোনালী সময়’ বলে উল্লেখ করলেও, সে সময় যে এখন ম্লান হতে শুরু করেছে, তা বোধকরি দেশটি বুঝতে পারছে। এজন্য বাংলাদেশের দোষ বলতে কিছু নেই। বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সর্বদা তৎপরতা চালিয়েছে। ভারত এ আন্তরিকতাকে দুর্বলতা মনে করে বন্ধুত্বের মোড়কে বাংলাদেশের প্রতি বরাবরই অন্যায্য আচরণ করেছে এবং করছে। তার যা প্রয়োজন, তার সবকিছুই বাংলাদেশের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে। বিনিময়ে বাংলাদেশের সামান্য ন্যায্য চাওয়াটুকু পূরণ করে নাই। দিনের পর দিন ভারতের এই অন্যায্য আচরণ সরকার সহ্য করেও আন্তরিকতার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এমনকি ভারতের কোনো কোনো নেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে কথা বলার পরও সরকার কোনো প্রতিবাদ করেনি। ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) সাবেক নেতা তোগাড়িয়া বলেছেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর উচিত বাংলাদেশের একাংশ দখল করে নিয়ে সেখানে ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ থাকার বন্দোবস্ত করা। এছাড়া কেউ কেউ এমন মন্তব্যও করেছেন, একাত্তরেই বাংলাদেশকে দখল করে নেয়া উচিৎ ছিল। বাংলাদেশের প্রতি ভারতের নেতাদের এমন অবমাননাকর মন্তব্যের পরও বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে বাংলাদেশ কোনো ত্রু টি করেনি।

চার.
বাংলাদেশের সাথে ভারতের যে এখন এক ধরনের ‘শীতল’ সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে, এর জন্য যদি কাউকে দায়ী করতে হয়, তবে তার একক দায় শুধু ভারতেরই। অথচ বিশ্বের অন্য যে কোনো রাষ্ট্রের তুলনায় ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকেই তার সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে। তার প্রয়োজনে যখন যা চেয়েছে, নিজের ক্ষতি করে হলেও বাংলাদেশ তাই দিয়েছে। ভারত মনে করেছিল, বাংলাদেশ আজীবন তাই করে যাবে। এটা বুঝতে পারেনি, দাদাগিরি এবং আগ্রাসনমূলক নীতি কারো ওপর চিরকাল চালানো যায় না। তাকে এ শিক্ষা নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ দিয়ে দিয়েছে। আশার কথা, বাংলাদেশ সরকারও বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ভারতের এই একতরফা আচরণের কবল থেকে কৌশলে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে। বিষয়টি এমন, ‘সাপও মরবে লাঠিও ভাঙ্গবে না’। বাংলাদেশে একদিকদর্শী না হয়ে প্রতিবেশী সব দেশের সাথে পারস্পরিক সুসম্পর্ক আরও জোরদার করার দিকে ঝুঁকেছে। এটা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং ইতিবাচক মুভ বা পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে যে চীন আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি হয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তা আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সম্মানজনক অবস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হয়ে উঠছে। দেখা যাচ্ছে, উপমহাদেশের রাজনীতিতে ভারত এখন অনেকটা একা হয়ে পড়ছে। নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও চীন তার কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে নিজেকে তার কাছ থেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। তাহলে ভারতের আর থাকল কে? এজন্য দেশটি কেবল নিজেকে দায়ী করা ছাড়া আর কাউকে দায়ী করতে পারবে না। অথচ ভারত যদি তার প্রতিবেশিদের সাথে দাদাগিরি সুলভ আচরণ ও আগ্রাসী নীতি বাদ দিয়ে সুসম্পর্কের মাধ্যমে এগিয়ে চলত, তাহলে এই উপমহাদেশে তার যেমন একটি সম্মানজনক অবস্থান থাকত, তেমনি এই অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর একটি অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হতো। ভারত এই সুযোগ হারিয়েছে। এখন দেশটির এমন অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে প্রতিবেশির কাছ থেকে সম্মান পাওয়া দূরে থাক, অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়া নিজের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারেই হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে চীন সার্কভুক্ত দেশগুলোতে অর্থের যোগান থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহযোগিতা দিয়ে সবাইকে নিজের করে নিয়েছে। এখন এমন যদি হয়, সার্কভুক্ত অন্যদেশগুলো ভারতকে এড়িয়ে চীনকে অর্ন্তভুক্ত করে নেয় বা না নিয়ে ছায়া সদস্য হিসেবে তাকে গণ্য করে, তবে ভারতের কী উপায় হবে? এজন্য ভারত কি নিজেকে দায়ী করা ছাড়া আর কাউকে দায়ী করতে পারবে?
darpan.journalist@gmail.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (16)
রুহান ৩১ জুলাই, ২০২০, ১:২২ এএম says : 0
রাম তুমি কার,,,,নেপালের নাকি ভারতের,,,,
Total Reply(0)
Abu ৩১ জুলাই, ২০২০, ১২:২৯ এএম says : 0
Eto shundor shomoy upojogi bishoy emon daysharavabe lekha holo jeno tar guruddo hariye gelo. Ei dhoroner lesha bislanshondhormi hite hobe toiththo o jukti nirvor hote hobe jar ghatti baypokvabe chokhe pore. Aupokkohater lekha gurutto binash kore.
Total Reply(0)
Abdul Karim ৩১ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৩ এএম says : 0
জি সঠিক বলেছেন যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা দাদাগিরি এখন ঠিক ভাবে বাহির করবো
Total Reply(0)
Abdullah Al Mamun ৩১ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৩ এএম says : 0
খুব সুন্দর লেখেছেন,পাটিয়ে দিয়েছেন,অনেক অনেক অনেক ভাল লাগছে আপনার লেখা টা পড়ে।
Total Reply(0)
মোঃ তোফায়েল হোসেন ৩১ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৫ এএম says : 0
ভারত তার কর্তৃত্ববাদী আচরণের জন্য একে একে সকল বন্ধুদের হারাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সুন্দর লিখেছেন।
Total Reply(0)
হাসান মুনাব্বেহ সাআদ ৩১ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৬ এএম says : 0
ভারতের পররাষ্ট্র নীতি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বাজে পররাষ্ট্রনীতি। েএই নীতি দিয়ে বন্ধু ধরে রাখা সম্ভব না।
Total Reply(0)
কামাল ৩১ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৭ এএম says : 0
বাংলাদেশের ক্ষমতালোভী রাজনীতিকরা না থাকলে কবেই হারাতো!!! তবে বর্তমানে সম্পর্ক বেশ খারাপ যাচ্ছে।
Total Reply(0)
গাজী ওসমান ৩১ জুলাই, ২০২০, ১২:৪৮ এএম says : 0
বর্তমান বাংলাদেশ-ভারত বাস্তবিক পরিস্থিতি নিয়ে অসাধারণ একটা লেখা। মহান আল্লাহ আমাদের ভারতের কুদৃষ্টি থেকে রক্ষা করো।
Total Reply(0)
Nannu chowhan ৩১ জুলাই, ২০২০, ৮:০৫ পিএম says : 0
Manonio likhok apni jaha khola mela vabe Bangladesher manusher moner onuvoti guli shompurnno vabe dorponer moto tule dhoresen jodio kisu holud shangbadik kisu nij desher shartho shomporke oggo lovi manush shudu nije dhoni howar jonno desher sharthoke porowa korena taderoi gaye chulkani uthese
Total Reply(0)
এ এইচ ভুঁইয়া ৩১ জুলাই, ২০২০, ৫:৪৫ এএম says : 0
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি সঠিক অবস্থানে আছে। ভারত যতই লম্ফ জম্ফ করুক কিছুই করতে পারবেনা যেহেতু চিনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভাল।
Total Reply(0)
Mahbub khan ৩১ জুলাই, ২০২০, ৬:৪৭ এএম says : 0
00 ভারতের পররাষ্ট্র নীতি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বাজে পররাষ্ট্রনীতি এই নীতি দিয়ে বন্ধু ধরে রাখা সম্ভব না।
Total Reply(0)
মোঃ আব্দুর রউফ ৩১ জুলাই, ২০২০, ৬:৫৬ এএম says : 0
ক্ষমতা কেউ কাউকে দেয়না, আপনাআপনি হস্তান্তরিত হয়। ভারতীয়রা সবসময় নিয়েই গেছে বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাশ আর পরাধীনতা।
Total Reply(0)
অাসাদ ১ আগস্ট, ২০২০, ৬:৫৬ পিএম says : 0
চীনের রিজার্ভ মুদ্রা ৩ ট্রিলিয়ন নয়,প্রায় ১৫ ট্রিলিয়ন।অামেরিকার ২১ ট্রিলিয়ন।চীনের অবস্থান অর্থনৈতিক শক্তির দিক থেকে দ্বিতীয়।একটি পত্রিকার সম্পাদকীয়তে এমন তথ্যগত ভুল অাশা করা যায় না।
Total Reply(0)
Masud Ahmed ২ আগস্ট, ২০২০, ১০:১৩ পিএম says : 0
আসলে কি ভারত আমাদের বন্ধু??? আমি মনে করি তাদের আধিপত্যবাদ, আগ্রাসনবাদ আজীবন থাকবে আমাদের মত ছোট দেশের প্রতি। সুব্রামনিয়াম বলেছিলেন বাংলাদেশে কোন হিন্দুর উপর হামলা হলে বাংলাদেশ দখল করে নেবেন। এইসব শুনলে ভারতের প্রতি আর সম্মানবোধ থাকে না, আমি আশা করি বংগবন্ধু কণ্যা প্রধান্ মন্ত্রী শেখ হাসিনা ই পারবেন দিল্লীকে সঠিক শিক্ষা দিতে। জয় বাংলা, বাংলাদেশ চিরজীবি হোক।
Total Reply(0)
Md. Rezaul karim ২ আগস্ট, ২০২০, ৮:০১ এএম says : 0
If India would matured in their foreign policy they would stand beside Bangladesh at the Rohinga issue of As chains are trying to supress Bangladesh to be get it into their palm. Bangladesh realise it but no way. China has created the rohinga issue to bigger it's radias near neibour countries on the other hand he has stood beside Bangladesh with his large loan so that Bangladesh do not go to India to get help about rohinga issue. But foolish India could not realise it.
Total Reply(0)
jashim uddin ৪ আগস্ট, ২০২০, ১১:৩৮ এএম says : 0
দেশ নিয়ে যারা ভাবে তারা বুজতে পেরেছে কনক সরয়ারের সাথে সাবেক সেনা কর্মকর্তার ইন্টারভিউতে যা এসেছে এক ডিলে দুই পাখি সিরকা করা হইছে। যেমন ভারতের দাদা গিরিথেকে বেরহওয়া ও রিরুদী জন সাধারন ও সরকারের প্রতি ভালো ভাব তৈরি হওয়া। হা তাই হোচ্চে।অন্তত এই কৌশলের জন্য সরকার কে ধন্যবাদ।
Total Reply(0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন