ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭, ১২ সফর ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

ভ্যাকসিন আবিষ্কারে রাশিয়ার অনন্য সাফল্য

| প্রকাশের সময় : ১৩ আগস্ট, ২০২০, ১২:০০ এএম

করোনাভাইরাস মহামারী শুরুর ৮ মাস পর নানা শঙ্কা, দ্বিধা-দ্ব›দ্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই বিশ্বে প্রথম করোনাভাইরাস ভ্যাকসিনের বাণিজ্যিক উৎপাদন ও ব্যবহার শুরু হয়েছে। রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ান স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়কে এই ভ্যাকসিন অনুমোদন করেছেন। পুতিনের এক মেয়ের শরীরে ভ্যাকসিন প্রয়োগের মধ্য দিয়ে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে রুশ প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন। করোনাভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিকার, ওষুধ, ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় এর সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক ওসামাজিক কর্মকান্ড চরমভাবে ব্যাহত হয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন গবেষণাগার ও বায়োটেক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে করোনার টিকা আবিস্কারে জোর প্রস্তুতি শুরু করলেও একটি সফল ভ্যাকসিন প্রাপ্তির সম্ভাবনার দ্বার পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। অক্সফোর্ড ও চীনের কয়েকটি ভ্যাকসিন পরীক্ষা-নিরীক্ষার শেষ পর্যায়ে এলেও এসব ভ্যাকসিনের শতভাগ সাফল্য এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের উপযোগিতা সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এরই মধ্যে রাশিয়ান ভ্যাকসিনের সাফল্যের কথা প্রকাশিত হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যেই এই ভ্যাকসিন বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারবে এবং ইতিমধ্যে রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ শতকোটি ডোজ ভ্যাকসিন উৎপাদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে জানা যায়। চলতি বছরের শেষ নাগাদ রাশিয়ান ভ্যাকসিন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাজারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। করোনার এই সফল এবং কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করায় রাশিয়ান সরকার ও আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠান গামালিয়া ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের প্রতি আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

করোনাভাইরাস প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন নিয়ে তীব্র আন্তজার্তিক প্রতিযোগিতার দৌড়ে রাশিয়ার গামালিয়া ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা অন্যদের পেছনে ফেলে সাফল্য লাভ করেছে। তবে একটি ভ্যাকসিনের সাফল্য বা কার্যকারিতার বিষয়ে দু-এক মাসের মধ্যেই চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ধরে ব্যবহার ও ফলাফল পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে একটি টিকার কার্যকারিতা নিশ্চিত হতে হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিষেধক পাওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যক্রম শুরু করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অনুমোদন ও সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রে নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যে পড়তে হয়। তবে এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভ্যাকসিনের সাফল্যের স্বীকৃতি এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের সিদ্ধান্ত দ্রুততার সাথে গ্রহণের কারণেই করোনার কার্যকর ভ্যাকসিন আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে। ভ্যাকসিন নিয়ে রাশিয়ার গামালিয়া ইনস্টিটিউটের কর্তৃপক্ষের তাড়াহুড়ার বিষয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করলেও তারা নিজেদের তৈরী ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী ছিল। এ কারণেই দ্রুততম সময়ে ভ্যাকসিনটি আলোর মুখ দেখতে পেয়েছে। একই সঙ্গে আমরা আশা করি, চীন এবং অক্সফোর্ডের উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনগুলোও শীঘ্রই চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করবে এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন ও সার্বজনীন বিপণনের জন্য অনুমোদন লাভ করতে সক্ষম হবে। আশার কথা হচ্ছে, জরুরি পরিস্থিতিতে বিশ্ব করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক পেতে যাচ্ছে এবং তা বিশ্বের সব মানুষের জন্য সুলভ ও সহজলভ্য হবে। মনে রাখা দরকার, আবিষ্কৃত করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন যাতে বাণিজ্যিক লাভের না হয়ে মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সদিচ্ছা নিয়ে সমঝোতায় উপনীত হতে হবে।

করোনাভাইরাসে এখনো সারাবিশ্বে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এ কারণে বিশ্ব অথর্নীতিতে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে অগ্রাধিকারভিত্তিতে করোনাভাইরাসের টিকা প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছুটা পিছিয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে চীনের টিকার তৃতীয় দফা পরীক্ষায় বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেও শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে পিছিয়ে যাওয়ায় এ অনিশ্চয়তা তৈরী হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, যেসব দেশ রাশিয়া, চীন বা অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধাপগুলোতে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছে ভ্যাকসিনের সাফল্য প্রমানীত হওয়ার পর বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেলে সেসব দেশ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা পাবে। এটাই স্বাভাবিক। রাশিয়ান ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ফিলিপাইনের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই ভ্যাকসিনে ফিলিপাইনের অংশীদারিত্ব তৈরী হয়েছে। একইভাবে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের সাথে ভারতের অংশীদারিত্ব তৈরী হয়েছে। এহেন বাস্তবতায়, বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকা দু:খজনক। করোনাভাইরাস চিকিৎসায় বাংলাদেশের অনেক সাফল্য ও সম্ভাবনার পাশাপাশি সিদ্ধান্তহীনতা, দুর্নীতি-অস্বচ্ছতা ও দীর্ঘসূত্রিতার নানাবিধ উদাহরণ তৈরী হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, করোনাভাইরাস বিশ্বকে এক ধরনের অচলাবস্থার মধ্যে নিপতিত করেছে। এই ভাইরাসের চিকিৎসা ও প্রতিষেধকের সাফল্যের উপর আগামী বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের অনেক কিছুই নির্ভর করছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অবশ্যই করোনা পরীক্ষা, চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন প্রাপ্তির প্রতিযোগিতায় আরো সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিকে চীন ও রাশিয়ার ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। সর্বোপরি আমলাতান্ত্রিক অস্বচ্ছতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণ চিহ্নিত করার পাশাপাশি দ্রুত ভ্যাকসিন পাওয়ার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন