ঢাকা সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১১ মাঘ ১৪২৭, ১১ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

সারা বাংলার খবর

ঝালকাঠী-পিরোজপুর সীমান্তের ভিমরুলীর ভাসমান হাটে শত শত মন পেয়ারা বিক্রি হলেও দর পতনে ক্ষতিগ্রস্থ উৎপাদকগন

বরিশাল ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ১৪ আগস্ট, ২০২০, ৩:৩৮ পিএম

ঝালকাঠির সীমান্তে ‘প্রাচ্যের ভেনিস’ খ্যাত ভিমরুলীর পেয়ারার ভাসমান হাট জমে উঠলেও করেনা সংকটে ক্রেতাদের আস্থার ঘাটতিতে দরপতনে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন উৎপাদকরা। তবে বাজার মূল্য কিছুটা মন্দা হলেও ক্রেতা বিক্রেতার উপস্থিতিতে আশায় বুক বাঁধছেন পেয়ারার উৎপাদকরা। এবার ভিমরুলী’তে নেই পর্যটকদের আনাগোনা। বিগত বছর দশেক ধরেই সারা দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক পর্যটক ছুটে আসতেন ঝালকাঠীর ভিমরুলীর ভাসমান পেয়ারার হাট দেখতে। এমনকি ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদুত এবং ভারতীয় হাই কমিশনারও গতবছর ভিমরুলী’র ভাসমান পেয়ারার হাট ঘুরে দেখে উচ্ছাস ধরে রাখতে পারেন নি।

ঝালকাঠী ও পিরোজপুরে সীমান্তবর্তী আটঘর-কুড়িআনার প্রায় ১ হাজার হেক্টরের বিশাল বাগান থেকে ভিমরুলীর ভাসমান হাটে পেয়ারা’র বিপনন হয়ে থাকে পুরো মৌশুম যুড়ে। ছোট ও মাঝারী নৌকায় করে চাষিরা এ ভাসমান হাটে পেয়ারা নিয়ে এসে নৌকাতেই তা বিক্রী করে থাকেন। আর সারা দেশ থেকে আসা পাইকাররা এখান থেকে পেয়ারা কিনে সড়ক ও নৌপথে নিজ নিজ মোকামে নিয়ে বিক্রী করে। স্বাদ ও গন্ধে আটঘর-কুড়িআনার পেয়ারার সুখ্যাতি সারা দেশ যুড়ে। এমনকি এখানের পেয়ারা বিভিন্ন পথে ভারতের কোলকাতা সহ পশ্চিসবঙ্গের সীমান্তবর্তি বিভিন্ন বাজার ছাড়াও ত্রিপুরার আগরতলাতেও যাচ্ছে।

কিন্তু এ বছর পেয়ারার দাম গতবছরে প্রায় অর্ধেক। সরেজমিনে খোজ নিয়ে জানা গেছে সাইজ ও মানভেদে এবার ভিমরুলীতে প্রতিমন পেয়ারা বিক্রী হচ্ছে ২৫০ টাকা থেকে সাড়ে ৩শ টাকার মধ্যে। যদিও কয়েক হাত ঘুরে তা খুচরা পর্যায়ে ৩০-৫০ টাকা কেজি বিক্রী হয়। কিন্তু প্রকৃত উৎপাদদের ভাগ্যে ১০ টাকাও যুটছে না। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে কেউই এবার ঝুঁকি নিয়ে বাগান কিনতে চাচ্ছে না। ক্রেতা বিক্রেতা সবার মধ্যেই এক ধরনের আতংক কাজ করছে।
তারপরও প্রতিদিন পেয়ারা কেনা-বেচায় ভীমরুলী, আটঘরÑকুড়িয়ানার ভাসমান বাজারে পেয়ারা চাষি ও পাইকারদের ভিড় থাকছেই। স্থানীয় ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিশেষ করে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, নোয়াখালী ও ফরিদপুর থেকে আসা বেপারীরা নৌকা থেকেই পেয়ারা কিনে ট্রলার অথবা ট্রাকে করে তাদের গন্তব্যে নিয়ে আবার খুচরা বিক্রাদের কাছে বিক্রী করছে। সকালে ভরপুর এ বাজার দুপুরের মধ্যেই শুনশান হয়ে যায়। আটঘর-কুড়িআনা এলাকায় মুকুন্দপুরী, লতা ও পুর্নমন্ডল জাতের পেয়ারা খেতে মিষ্টি ও অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন। আটঘর, শতদশকাঠি, কাফুরকাঠি, ভীমরুলি, জিন্দাকাঠি, ডুমরিয়া, খাজুরিয়া, বাউকাঠি, বেতরা, হিমানন্দকাঠি, পোষন্ডা, রমজানকাঠি, সাওরাকাঠি, কাচাবালিয়া গ্রামে প্রতিবছরই দেড় থেকে দু হাজার টন পেয়ারা উৎপাদন হয়ে থাকে।

শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে ঝালকাঠির ব্রান্ডিং পণ্য পেয়ারার ভরা মৌসুম। ঝালকাঠির ১২টি গ্রামের প্রায় এক হাজার হেক্টর এলাকায় এই অঞ্চলের প্রধান অর্থকারী ফসল হিসেবে শতবর্ষ জুড়ে পেয়ারা চাষ হচ্ছে। প্রতিদিন পেয়ারা চাষিরা খুব ভোরে বাগান থেকে ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকায় করে ৩-১০ মন করে পেয়ারা এই হাটে এনে নৌকায় বসেই বিক্রি করছেস।

আবার এ ভাসমান বাজারেই বরিশালে বিখ্যাত আমড়া প্রতি মণ ১ হাজার ৪শ থেকে দেড় হাজার টাকা দরে পাইকারী বিক্রি করছেন বাগান মালিকরা। লেবুও বিক্রী হচ্ছে প্রচুর। পেয়ারার সাথি ফসল হিসেবে আমড়া ও লেবুর চাষ হচ্ছে।

তবে দক্ষিণাঞ্চলের এ কৃষপণ্যের সঠিক বাজার সহ উৎপাদকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করনে আজ পর্যন্ত বাস্তব কোন উদ্যোগ গ্রহন করা হয়নি। দক্ষিণাঞ্চলের ইলিশ, পেয়ারা, আমড়া সহ আরো কয়েকটি কৃষিপণ্য প্রক্রীয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানীর লক্ষ্যে এ অঞ্চলে একটি রপ্তানী প্রক্রিয়াকরন অঞ্চল গড়ে তোলার দাবী দীর্ঘদিনের। এক সময়ে ইপিজেড-এর চেয়ারম্যান সহ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাগন এলাকাটি ঘুরে ইতিবাচক মাতামত দিলেও পরবর্তিতে আর কিছু হয়নি।
এ বিষয়ে ঝালকাঠির রমজানকাঠি কারিগরি ও কৃষি কলেজের বিভাগীয় প্রধান কৃষিবিদ ড. চিত্ত রঞ্জন সরকার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘পেয়ারা চাষ খুব লাভজনক হয়ে উঠছে। হালকা বেলে ও দো- আঁশ মাটি এ ফল ভাল হয়। বীজ দ্বারা এর বংশ বিস্তার হলেও কলম দ্বারাও খুব সহজে বংশ বিস্তার হয়ে থাকে। তবে পেয়ারা ‘অ্যানথ্রাকনোজ’ নামে এক ধরনের সংক্রমক রোগে আক্রান্ত হয়। এতে ফল ও পাতায় দাগ পড়ে। এ রোগ দমনে প্রতি সপ্তাহ কম্পেনিয়ন ২ গ্রাম /লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে এ বছর বৃষ্টির কারণে পেয়ারা বাজারে আসতে ১৫ দিন বিলম্ব হয়েছে। প্রায় ২শ বছর ধরে এ অঞ্চলে মাটি কেটে সার্জন পদ্ধতিতে পেয়ারার চাষ হয়ে আসছে।’বলেও জানান তিনি।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন