ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭, ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাটে ফের বন্যা

বাড়ছে ধরলা, তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:১৭ এএম


ভাঙনে মালভাঙায় ১৬ ভেন্টের সøুইসগেট এলাকা হুমকির মুখে : গজলডোবা বাঁধ খুলে দিয়েছে ভারত

 

ভারত থেকে আসা ঢল ও টানা বৃষ্টিপাতের ফলে আবারও উত্তরাঞ্চলের ধরলা, তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়ছে। এতে তিস্তা-ধরলা নদী অঞ্চলের মানুষ চতুর্থদফা বন্যার কবলে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল। বাড়িঘর ছেড়ে অনেকেই আশ্রয় নিচ্ছেন উঁচু স্থানে। রোপা আমন ও সবজির ক্ষেত এখন পানির নিচে। ভারতের ঢল ও টানা বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে।

দীর্ঘ বন্যার ধকল এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি উত্তরের জেলা লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের বাসিন্দারা। এর মধ্যে আবারও বন্যার কবলে পড়ে এ অঞ্চলের মানুষ এখন দিশেহারা। শত শত একর আমন ও সবজি ক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৪২ হাজার মানুষ। ধরলার তীব্র স্রোতে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সারডোব বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৩০ মিটার অংশ ভেঙে অন্তত ১০টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। ধরলার ভাঙনে কুড়িগ্রাম সদরের মোগলবাসা ইউনিয়নের মালভাঙায় ১৬ ভেন্টের সøুইসগেট এলাকা হুমকির মুখে। এরই মধ্যে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে কুড়িগ্রাম শহরে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শহরবাসী।
গতকাল ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ও কুড়িগ্রামে ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলায় ১৪ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি নুনখাওয়া পয়েন্টে ৩০ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়েছে ৪২ সেন্টিমিটার। ফলে ধরলার পাশাপাশি ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নিম্নাঞ্চলগুলোতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। অবিরাম ভারীবর্ষণে কুড়িগ্রাম শহরে সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মক পানিবদ্ধতা। কুড়িগ্রাম ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল রোড, হাটিরপাড়, রৌমারী পাড়াসহ শহরের অন্তত ৩০টি পয়েন্টে হাঁটু থেকে কোমর পানিতে নিমজ্জিত।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলেছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টা পানি বৃদ্ধি পাবে। পদ্মার পানি স্থিতিশীল রয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা ব্যতিত আপার মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে।

ভারতের আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টি পাতের ফলে সে দেশের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় গজলডোবা বাঁধ খুলে দিয়েছে। এর ফলে ভারত থেকে আসা পানির ঢলে বাড়ছে নদ-নদীর পানি এবং প্লাবিত হচ্ছে নিম্নাঞ্চল। গত জুন মাসের ২৪ তারিখ থেকে বাংলাদেশে বন্যা শুরু হয়। দেশের ৩৩ জেলা বন্যায় প্লাবিত হয়। ২৫-২৬ দিন পর নদ নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করলে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ভারত ফারাক্কা বাঁধ খুলে দেয়। এতে করে দ্বিতীয় দফায় নদ নদীর পানি বাড়তে থাকে এবং অনেক নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়। এ বন্যা প্রায় দীর্ঘ ২ মাস স্থায়ী হয়।

কুড়িগ্রাম থেকে শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, চতুর্থ দফা বন্যার কবলে পড়েছে এ জেলার মানুষ। অতিবৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে ধরলা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল ব্রীজ পয়েন্টে ৩৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। অন্যান্য নদ-নদীগুলো এখনো বিপদসীমান নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হঠাৎ করে ধরলা নদীতে পানিবৃদ্ধির ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১০ হাজার পরিবার। এছাড়াও বন্যায় ১০০ হেক্টর আমন ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
একদিকে নদনদীতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে বিভিন্ন এলাকায় চলছে তীব্রভাঙন। ধরলার ভাঙনে কুড়িগ্রাম সদরের মোগলবাসা ইউনিয়নের মালভাঙায় ১৬ ভেন্টের সøুইসগেট এলাকা হুমকির মুখে। সøুইসগেট সংলগ্ন বাঁধ বিলীন হলে কুড়িগ্রাম-উলিপুর সড়ক তলিয়ে যাবে। সেই সাথে উলিপুর উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হবে। এদিকে তিস্তা নদীতে তীব্রভাঙন চলছে উলিপুরের থেতরাই, চর বজরা ও গাইবান্ধা জেলার বিচ্ছিন্ন অঞ্চল কাশিমবাজারে। এখানে যোগাযোগের একমাত্র পাকা সড়কের ২০ মিটার নদীগর্ভে চলে গেছে। এছাড়াও চারটি বাড়ি নদীগর্ভে গেছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরো ত্রিশটি বাড়ি।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবাহী প্রকৌশলী মো: আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভারতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় আগামী ২-৩ দিন পানি আরো বাড়তে পারে। এরপর পানি কমবে। এছাড়া নদীভাঙন প্রতিরোধে বিভিন্ন এলাকায় জরুরিভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

লালমনিরহাট থেকে মো. আইয়ুব আলী বসুনীয়া জানান, একটানা ভারীবর্ষণ ও ভারতের ঢলে ধরলার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল জেলার কুলাঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ও তিস্তার পানি ব্যারেজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা ও ধরলার পানি বাড়ায় লালমনিরহাটের নদী অববাহিকার নিমাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে নদী অববাহিকার অন্তত ৪০ হাজার মানুষ। দেখা দিয়েছে তীব্রভাঙন। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার আদিতমারী, হাতিবান্ধা ও সদরের ৮টি ইউনিয়নের ৪৭টি ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে জেলার বেশ কয়েকটি স্থাপনা। পানি বাড়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে তিস্তা ধরলা নদীর মাঝখানে জেগে উঠা ৬৩ চরের মানুষ। বন্যার পানিতে চতুর্থ বারের মতো তলিয়ে গেছে রোপণ করা আমনের ক্ষেত। ডুবে গেছে শীতকালীন আগাম শাকসবজির ক্ষেতও। লালমনিরহাট কৃষি অফিস সূত্র জানায়, গত কয়েক দিনের ভারীবর্ষণ ও উজানের ঢলে তিস্তা ধরলার পানি বৃদ্ধি পেয়ে চরের প্রায় ১২শ’ একর জমির রোপা আমন ক্ষেত ও ৪শ’ একর জমির বিভিন্ন সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে।

সদরের কুলাঘাট ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী জানান, ধরলার পানি ব্যাপকহারে বাড়তে শুরু করেছে। পানি বাড়ার সাথে সাথে দেখা দিয়েছে তীব্রভাঙন। গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলার ভাঙনে ২৩টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে। ভাঙন তীব্র আকার ধারন করায় নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছে নদীপাড়ের মানুষ।

গত ২ মাস আগে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ঘরে ফিরে ছিল চরের মানুষজন। কিন্তু পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় চরের মানুষজন চরম বিপাকে পড়েছে। প্রমত্তা তিস্তা ধরলা শুকিয়ে হয়েছিল খাঁ খাঁ। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে দেশের অভ্যন্তরে ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় তিস্তা ধরলা অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, নদীতে পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে জেলার চর রাজপুর, চর গোকুন্ডা, চর কালমাটি, চর ফলিমারী, ইশোরকোল, পূর্ব ইচলী, রুদ্রেশ্বর, চর ভোটমারী, চর ডাউয়াবাড়ি, সিন্দুনা, গড্ডিমারী, সানিয়াযান, কুলাঘাট, খুনিয়াগাছ, মোগলহাট এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এতে পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। ভাঙন দেখা দিয়েছে এলাকাগুলোতে।

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন