ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৪ কার্তিক ১৪২৭, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

পেঁয়াজের মূল্য কারসাজি এবং কনজিউমার পাওয়ারে সাফল্য

জামালউদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:০২ এএম

গতবার পেঁয়াজ নিয়ে দেশে যে কান্ড ঘটেছিল, তা ছিল মূলত একটি সিন্ডিকেটেড মুনাফাবাজি। ভিন্নভাবে এক কথায় বলতে গেলে তা ছিল, দেশের মানুষের সাথে এক ধরণের প্রতারণা ও জোচ্চুরি। দেশে যে পরিমান পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছিল এবং যে পরিমান বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছিল, তাতে পেঁয়াজের সংকটের কোনো কারণ ছিল না। দেশীয় মজুদদার আর ভারতীয় রফতানিকারণ ও আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেট একটি কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা বাড়তি মুনাফা করেছিল। দেশীয় বাজারে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মূল্য না পেয়ে ভারতীয় কৃষক নি:স্ব হয়ে পড়ছে। দেশটিতে প্রতি বছর শত শত কৃষক হতাশ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেঁেছ নেয়। বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি করে তারা কিছুটা বাড়তি মূল্য পেয়ে থাকে। সীমান্তবর্তী দেশ হওয়ায় ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার রফতানি বাণিজ্য নানাভাবে মূল্য সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক হওয়ায় দুই দেশের ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা এই সুবিধা ভোগ করে থাকে। তবে এখানে বাণিজ্য ভারসাম্যের কোনো বালাই নেই। কোনো প্রচেষ্টাও দেখা যায় না। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় পুরোটাই ভারতের অনুকুলে হওয়ায় যৎসামান্য যেসব পণ্য বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায় সেসবের উপর কোনো রকম রাজস্ব সুবিধা দেয়া বা ছাড়ের মানসিকতাও ভারত সরকারের নেই। বাংলাদেশের রাষ্ট্রয়াত্ব পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশের পাট রফতানি অনেকটা ভারত নির্ভর হয়ে পড়ায় এর মাশুল গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশী কৃষক ও রফতানিকারকদের। ভারতের রফতানি বাণিজ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়া সত্তে¡ও বাংলাদেশের কোনো স্বার্থেরই পরোয়া করছে না ভারত। মূলত: বাংলাদেশের কাঁচাপাটের উপর নির্ভর করে ভারতে নতুন নতুন পাটকল গড়ে উঠলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রয়াত্ব পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পাট রফতানিতে ভারত নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার সুযোগে ভারত বাংলাদেশের পাটের উপর এন্টি-ডাম্পিং ট্যাক্স আরোপ করে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ২৫টি পাটকলের উপর এন্টিডাম্পিং ট্যাক্স আরোপে ভারতের একতরফা ঘোষণার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান সরকারের মন্ত্রীসভায় তোফায়েল আহমদের ঠাঁই হয়নি। বাণিজ্যমন্ত্রী হয়েছেন টিপু মুন্সী। তিনি আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করেন, তা নিয়ে মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিতর্ক সৃষ্টি হতে দেখা যায়।

গত বছর সেপ্টেম্বরে আকস্মিক ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় ভারত। দেশে পেঁয়াজের কোনো সঙ্কট ছিল না। দেশের চাহিদা অনুসারে পেঁয়াজ উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছিল। দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ টন। পেঁয়াজ অতিমাত্রায় পচনশীল পণ্য হওয়ায় এর এক-চতুর্থাংশ নষ্ট হয়ে গেলে সারা বছরে দেশে ৬ লাখ টন পেয়াজের ঘাটতি থাকার কথা। কিন্তু বছরের তিন মাস বাকি থাকতে এবং নতুন পেঁয়াজ কৃষকের গোলায় আসার দুইমাস আগের হিসাব অনুসারে ইতিমধ্যেই শুধুমাত্র ভারত থেকেই পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছিল ৮ লাখ টনের বেশি। এছাড়াও পাকিস্তান চীন, মিশর, মিয়ানমারসহ আরো কয়েকটি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছিল। যা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। সামগ্রিক হিসাব-নিকাশ ও বিবেচনায় ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণায় বাংলাদেশের বাজারে তেমন কোনো প্রভাব সৃষ্টি হওয়ারই কথা নয়। কিন্তু অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, দেশে পেঁয়াজের জন্য হাহাকার পড়ে যায়। চল্লিশ টাকা কেজির পেঁয়াজ আড়াইশ টাকায় পর্যন্ত বিক্রি হয়। পেঁয়াজের ফলন নষ্ট হয়নি, গুদামে আগুন লাগেনি, জাহাজ ডুবেনি, শুধুমাত্র ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণাকে পুঁজি করে শত শত কোটি টাকার মুনাফাবাজি করেছে বাংলাদেশ-ভারতের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বাজারে ধস নামানো এবং কৃষকের মেরুদÐ ভেঙ্গে দিতে বহু বছর ধরেই একটা চক্রান্তের অভিযোগ উঠতে দেখা যায়। দেশে ধানের বাম্পার ফলনে লক্ষ্যমাত্রার অধিক ধান উৎপাদনের পরও ভরা মওসুমে ভারত থেকে লাখ লাখ টন চাল আমদানির সুযোগ দিয়ে ধান-চালের মূল্যে ধস নামিয়ে দেশের কৃষকদের বঞ্চিত করার এই তৎপরতার সাথে সরকারের প্রভাবশালী আমলাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

গত বছর পেঁয়াজের মূল্য কারসাজির অভিজ্ঞতায় ভারত ও বাংলাদেশের কৃষকরা পেঁয়াজ উৎপাদনের উপর বেশি জোর দিয়েছিল। ফলে চলতি বছর চাহিদার চেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম পেঁয়াজ রফতানিকারক দেশ। দেশের চাহিদা পূরণ করে সে বিভিন্ন দেশে পেঁয়াজ রফতানি করে থাকে। নিজদেশে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে শুধুমাত্র বাংলাদেশে রফতানী বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকেই বোঝা যায়, তারা বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নিজেদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব হিসেবে দেখে। বার বার ভারতের এই বাণিজ্যিক আধিপত্যবাদী তৎপরতার শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ ভোক্তারা। বিনা নোটিশে যখন তখন হঠাৎ করে নিত্যপণ্যের সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দিয়ে পরিকল্পিতভাবে আমাদের মূল্যস্ফীতির উপর ঝড় তুলে শত শত কোটি টাকার বাড়তি মুনাফা ভাগাভাগির এই কারসাজি কোনো নতুন বিষয় নয়। বিশ্বের আর কোথাও আঞ্চলিক বা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে এমন একচেটিয়া আধিপত্যবাদী কারসাজি বাস্তবায়নের নজির বিরল। বাংলাদেশের সাথে হাজার হাজার কোটি টাকার স্থল বাণিজ্য ভারতের অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখে চলেছে। বিশেষত বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের বিপরীতে ভারতের পণ্য প্রবেশের যে তৎপরতা দেখা যায়, তাতে বাংলাদেশের কৃষকের স্বার্থ চরমভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। আবার ভারতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের উপর বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত কখনো কখনো শাপে বর হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বের বৃহত্তম গোশত রফতানীকারক দেশ ভারতে গরুর গোশত খাওয়ার অপরাধে (!) নিরীহ মুসলমানদের হত্যা-নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। দেশটি আরববিশ্বে এবং ইউরোপে (হালাল) গরুর গোশত রফতানি করে যে পরিমান আয় করে বাংলাদেশে গরু রফতানি করে তার চেয়ে বেশি হারে মুনাফা করার পরও শুধুমাত্র রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদী নীতির কারণে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে গরু রফতানি বন্ধ করে দেয়। বন্ধ করার পাশাপাশি বিজেপি নেতারা এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্যও দিয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, তারা গরু না দিলে বাংলাদেশের মানুষের গরুর গোশত খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে, ঈদে কোরবানি দিতে পারবে না। গোশতের দাম হবে হাজার টাকা কেজি। সাধারণ মানুষ খেতে পারবে না। তাদের সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ভারতের গরু ছাড়াই গত ৫ বছর ধরে কোরবানি ঈদে এবং সারা বছর গোশতের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছে দেশের কৃষক ও খামারিরা। এ থেকেই বুঝা যাচ্ছে, ভারত নির্ভরতা বাদ দিয়ে বাংলাদেশের কৃষক ও খামারিরা যে কোনো পণ্যের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। ধান উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন ছাড়াও ইতিমধ্যে পোল্ট্রি শিল্প, মৎস্য উৎপাদন, ডেয়ারি ও দুগ্ধজাত সামগ্রির চাহিদা পূরণের মধ্য দিয়ে এ দেশের কৃষকরা যে বার্তা দিয়েছে তা নস্যাতের ষড়যন্ত্র চলছে। ভারতের সাথে নিয়ন্ত্রণহীন অবাধ বাণিজ্য এ ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

গত বছর পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজিমূলক তুলকালাম কাÐ সৃষ্টির পর এবারো একই রকমের পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের মূল্য ছিল প্রকারভেদে ২৫ থেকে ৩৫ টাকা পর্যন্ত। বন্ধুত্বের নির্দশন স্বরূপ ভারতে বাংলাদেশী ইলিশের চালান পৌঁছানোর একদিন পর অপ্রত্যাশিতভাবে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়। অমনি হু হু করে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। তিরিশ টাকার পেঁয়াজ তিন দিনের মাথায় আশি-নব্বই থেকে একশ’ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দেখা যায়, ২০-২৫ টাকা দরে আমদানি করা পেঁয়াজ ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এলসি হওয়া ভারতীয় পেঁয়াজের ট্রাকগুলো স্থল বন্দরে ৮-১০দিন ধরে আটকে থাকার কারণে হাজার হাজার টন পেঁয়াজে পচন ধরে। বাড়তি মূল্য আদায় করে এসব পঁচা ওপঁয়াজ পাঠানো হয় বাংলাদেশে। গত ৯ মাস ধরে দেশে পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল ছিল, গত বছর সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে এবার ভারত ও বাংলাদেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বেশি হয়েছে। গত বছর ভারতের পেঁয়াজ রফতানি আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম হয়েছিল। এ বছর ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রেখে দেশের স্বার্থরক্ষা এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখার দাবি জানিয়েছিল কৃষকরা। ধারণা করা হয়, ভারতীয় কৃষকদের স্বার্থে তাদের সেই দাবি রক্ষিত হয়নি। এখন দেশে সারা বছর চলার মত পর্যাপ্ত পেঁয়াজের মুজদ থাকা সত্তে¡ও আকস্মিকভাবে ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের নাটক সাজিয়ে বাজার অস্থিতিশীল করে তোলার পাশাপাশি বাজার সিন্ডিকেটের শত শত কোটি টাকার বাড়তি বাণিজ্য করার পাঁয়তারা চলছে। তবে এবার সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অভিযানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা সৃষ্টির কারণে তাদের কারসাজির অভিসন্ধি আপাতত ভেস্তে গেছে বলেই মনে হয়। দেশীয় পেঁয়াজের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পাশাপাশি লাখ লাখ টন ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানির পরও হঠাৎ দু’তিনগুণ দাম বাড়িয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে সাধারণ ভোক্তাদের নীরব প্রতিবাদ যথেষ্ট ফলপ্রসু হয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ বেশি দামে পেঁয়াজ কেনা থেকে বিরত থাকায় বিপাকে পড়েছে আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতারা। শত শত টনের মজুদ আটকে থাকায় পচন ধরা পেয়াঁজ নিয়ে বেগতিক অবস্থায় মূল্য কমাতে বাধ্য হচ্ছে তারা। আশি-নব্বই টাকা থেকে এখন ৬০-৭০ টাকায় নেমে এলেও মাসের শুরুর মূল্য থেকে এখনো তা দ্বিগুণ।

ভারতের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি উৎপাদনের মধ্য দিয়ে পেঁয়াজ উৎপাদন ও রফতানিতে বিশ্বে শীর্ষ দেশ চীন। এরপর পর্যায়ক্রমে নেদারল্যান্ডস, ভারত, মেক্সিকো, ব্রাজিল, তুরস্কের অবস্থান। দেশে পেঁয়াজ নিয়ে আবারো মূল্য কারসাজি শুরু হওয়ায় বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির তৎপরতা চলছে। তুরস্ক সরকার ২৩ টাকা কেজি দরে ১৫ হাজার টন পেয়াঁজ বাংলাদেশে রফতানি করবে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়। এরপর সীমান্তে আটকে থাকা পেঁয়াজের ট্রাকগুলোও ছাড়তে শুরু করার পর বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে আসতে থাকে। সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী একমাসের মধ্যে পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করলেও ভোক্তাদের সচেতন ভূমিকায় দাম ইতিমধ্যে েেকজিতে ২০-২৫ টাকা কমে গেছে। তা নাহলে, হয়তো গত বছরের মত এরই মধ্যে মূল্য সেঞ্চুরি পার করত। দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্বাভাবিক বর্ধিত দামে পেঁয়াজ কেনা বন্ধ করে দেয়ার পর মজুদদাররা বিপাকে পড়ে যায়। এটাই জনতার শক্তি বা কনজিউমার পাওয়ার। পেঁয়াজের উৎপাদন কম হওয়ায় ভারতে মূল্য কারসাজির সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৯৮ সালে। ৯-১০ টাকা কেজির পেঁয়াজ ৩০-৪০ থেকে কোথাও কোথাও ৫০-৬০ টাকায় উঠে গেলে সারা ভারতে হইচই পড়ে যায়। সে সময় ভারতের বিখ্যাত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মাধু ত্রেহান, কবি ও গীতিকার জাবেদ আখতার, ক্রিকেটার কপিল দেব জনগণকে পেঁয়াজ কেনা থেকে বিরত থেকে কনজিউমার পাওয়ার প্রয়োগের আহŸান জানিয়েছিলেন। দশ টাকার পেঁয়াজ তিরিশ থেকে পঞ্চাশ টাকায় উঠে যাওয়ার সেই ঘটনাটি ভারতে ‘গ্রেট অনিয়ন ডিজাস্টার’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। মূল্যবৃদ্ধি কারসাজির রহস্য বের করতে এ নিয়ে তদন্ত কমিশনও গঠিত হয়েছিল। আমাদের দেশে পেঁয়াজের দাম ৮-১০ গুণ বাড়িয়ে পেঁয়াজের মূল্য সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার অনেক বাইরে নিয়ে যাওয়ার পেছনেও যে সিন্ডিকেটের তৎপরতা কাজ করেছে তাতে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। কিন্তু এত বড় ঘটনার পেছনের কার্যকারণ উৎঘাটনের মধ্য দিয়ে এর পুনরাবৃত্তি রোধে কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় এ বছর আবারো পেঁয়াজের সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু রফতানি বন্ধের পরও দেশে গরুর গোশতের আকাল পড়েনি। গত ৫ বছর ধরে দেশে গরুর গোশতের দাম স্থিতিশীল আছে। গতবারের মূল্য কারসাজির অভিজ্ঞতার আলোকে এবার কৃষকরা বেশি পরিমানে পেঁয়াজ উৎপাদন করেছেন এবং ভারতের পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের দাবি তুলেছে। এরপরও বছরের শেষ পর্যায়ে এসে ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ধোঁয়া তুলে আবারো সিন্ডিকেটের আস্ফালন দেখলো দেশের মানুষ। এবার দেশের অনেক জেলার মানুষ তিন দফায় দীর্ঘ মেয়াদী বন্যার শিকার হয়েছে। আগামী মওসুমের কৃষি উৎপাদনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যদি আগামী বছর ধান, পেঁয়াজ বা অন্যকোন পণ্য উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হয়, তাহলে কি আবারো মানুষ আমদানি ও বিক্রেতাদের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়বে? এ ক্ষেত্রে ভোক্তাদেরও দায় আছে। কথিত সংকটের আশঙ্কায় অনাবশ্যক বেশি পরিমান পণ্য ক্রয় করাকে ইংরেজিতে বলে ‘প্যানিক বায়িং’। করোনাভাইরাসের লকডাউনের আগে সারাবিশ্বে এমন প্যানিক বায়িংয়ের চিত্র দেখা গেছে। এর ফলে কোথাও কোথাও বিক্রেতারা অস্বাভাবিক মূল্য বাড়ানোর সুযোগ নিয়েছে। গুজব ছড়িয়ে বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মূল্য বাড়ানোর যে কোনো তৎপরতা রুখে দেয়ার সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে ভোক্তারাই। তারা বেশি দামে বেশি পন্য কেনার মানসিকতা পরিহার করে অস্বাভাবিক বেশি মূল্য দিয়ে পণ্য না কেনার সিদ্ধান্তে অটল থাকলে সিন্ডিকেটের কারসাজি মার খেতে বাধ্য হবে।

ভোগবাদিতা থেকে মুক্ত হওয়া মুসলমানের অন্যতম ধর্মীয় শিক্ষা। ইসলামের সাথে পশ্চিমা ভোগবাদী সমাজের মূল দ্ব›দ্ব এখানেই। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশ চানক্যবাদী অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্রের নিগড় থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে পরনির্ভর পণ্যের ভোগবাদিতার প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একাদশ শতকের সূফীবাদী দার্শনিক, লেখক ইমাম গাজ্জালির কিমিয়ায়ে সায়াদাত গ্রন্থে ভোগবাদীতার শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক কুফল থেকে মুক্ত হওয়ার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। কিমিয়ায়ে সাআদাত ইংরেজীতে হয়েছে অ্যালকেমি অব হ্যাপিনেস বা সুখ-শান্তির রসায়ন। সেখানে এক স্থানে বলা হয়েছে, “হযরত ইব্রাহিম আদহাম (র:) লোকের নিকট বিশেষ কোনো পণ্যের দাম জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা বলিত, ইহা বড়ই দুর্মূল্য, তখন তিনি বলিতেন, তোমরা সকলে ইহার ব্যবহার ত্যাগ করিয়া ইহাকে সস্তা করিয়া ফেল।” এটাই হচ্ছে, কনজিউমার পাওয়ার। আমাদের দেশে ব্যাপারটা ঘটে বিপরীত, মূল্য আরো বেড়ে যেতে পারে বা বাজার থেকে উধাও হয়ে যেতে পারে, এই ভয়ে প্যানিক বায়িং করে বাজারে চাহিদা ও সংকট বাড়িয়ে তোলা হয়। অথচ মূল্য কারসাজির বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব দেয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ভোক্তাদের হাতেই। পণ্যমূল্যের সিন্ডিকেটেড কারসাজি রুখে দিতে সাধারণ ভোক্তারা পণ্য কেনা বন্ধ রেখে কারসাজির জবাব দিতে শুরু করার পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোকে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসলে জনগণ মূল্য কারসাজির আপদ থেকে রক্ষা পেতে পারে।
bari_zamal@yahoo.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
Jack Ali ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ১২:৫৯ পিএম says : 0
Our so called muslim populated country -- we don't want the Law of Allah as such our Beloved country is ruled by the Munafiq/Taghut/Murtard government.. We will suffer more if we failed to rule our Beloved Country by the Law of Allah.
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন