ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৪ কার্তিক ১৪২৭, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ভারতের পচা গোশত খাব কেন?

স্টালিন সরকার | প্রকাশের সময় : ৩ অক্টোবর, ২০২০, ১২:৩২ এএম

‘ওরে মেরেছে কলসীর কানা/তাই বলে কি প্রেম দিব না’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই উক্তি যেন বাস্তবে ধরা দিয়েছে। পূজার উপহার হিসেবে বাংলাদেশ থেকে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ইলিশের প্রথম চালান ভারতে যায়। ইলিশ পাওয়ার প্রতিদান হিসেবে সেদিনই বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় দেশটি। পরবর্তীতে দেন-দরবারের পর দিয়েছে পচা পেঁয়াজ। ভারতের কৃষকদের সর্বনাশ করে মোদি সরকার বাংলাদেশের মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বিপদে ফেলতে সীমান্ত দিয়ে গরু প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছিল। এরপরও কেন ভারত থেকে মহিষের পচা গোশত আমদানি করতে হবে? যাদের কলমের খোঁচায় ইলিশ যাওয়ার দিনই পেঁয়াজ আসা বন্ধ হয়েছে, তারাই আবার ভারত থেকে পচা গোশত বৈধ পথে আমদানির অনুমতি দিয়েছে। কবির উক্তিই যথার্থ নয় কি? ওরা কলসী কানা করলেও আমরা প্রেম বিলিয়েই যাব! প্রশ্ন হলো আমরা কেন ভারতের পচা গোশত খাব?

গত ২৯ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পাগলা বাজারে হোটেলে ‘কুকুরের গোশতের বিরিয়ানি’ বিক্রি নিয়ে ভয়াবহ কান্ড ঘটে। পরে দেখা যায় ভারত থেকে আমদানি করা আধা-পচা গোশত দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো বাজারে বিপুল পরিমাণ দেশি গরুর গোশতের সরবরাহ থাকার পরও কেন আমাদের ভারতের পচা গোশত খেতে হবে? প্রশাসনের দায়িত্বশীল চেয়ারে বসে যারা ভারত থেকে পচা গোশত আনার অনুমতি দিচ্ছেন তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী নাকি দিল্লির এজেন্ট? জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যাদের বেতন হয় তারা কেন দেশের স্বার্থের বদলে দাদাদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন?

খবরে প্রকাশ, ভারত থেকে আমদানি করা কনটেইনারভর্তি পচা গোশত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে। বন্দর শ্রমিক ইউনিয়ন জানায়, পচা গোশতে দুর্গন্ধে গত ৫-৬ দিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকরা শ্বাস নিতে পারছেন না। শ্রমিকদের ত্রাহি অবস্থা। বন্দর স‚ত্র জানায়, ইগলু ফুডস লিমিটেড (ঠিকানা-রাজধানীর সিআর দত্ত রোড) ভারত থেকে কনটেইনারভর্তি মহিষের পচা গোশত আমদানি করেছে। কনটেইনারটি ইয়ার্ডে আনার পরই পচা দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগরের পরিচালক নুরুল্লাহ নুরী জানান, গত ২৭ সেপ্টেম্বর বন্দরে কনটেইনারে পচা গোশত শনাক্ত করে। গোশত থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশ দ‚ষিত করায় ইগলু ফুডস এবং খালাসের দায়িত্বে থাকা চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের সিএন্ডএফ এজেন্ট কর্ণফুলী লিমিটেডকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করে। প্রশ্ন হচ্ছে জরিমানা করেই কি দায়িত্ব শেষ? কারা কী কারণে, কাদের খাওয়ানোর জন্য ভারতের পচা গোশত আমদানি করা হলো সে রহস্য উদঘাটনের দায়িত্ব কার? যারা দেশের স্বার্থের বিপক্ষে গিয়ে ‘পচা গোশত’ আমদানির অনুমতি দিয়েছেন তাদের চিহ্নিতের দায়িত্ব কার? দেশ যখন গোশতে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে তখন ভারত থেকে গোশত আনতে হবে কেন?

ভারত থেকে কন্টেইনারে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা মহিষের পচা গোশতের দুর্গন্ধ যেন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। গরু-ছাগল প্রতিপালন করা মানুষ বলছেন, করোনার মধ্যে অনেকেই বেকার। কিন্তু দেশের ডেইরি ফার্ম, বাতান এবং গ্রামের সাধারণ কৃষকরা পশুপালনের কাজ করে যাচ্ছেন। এতে অনেক কর্মসংস্থান হয়েছে। মূলত দেশের পশুর গোশতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠা ঠেকাতে ভারত থেকে গোশত আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, বøগ, টুইটার এবং গণমাধ্যমের নিউজের পাঠকের মন্তব্যে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা-প্রতিবাদ-পাল্টা প্রতিবাদ, বিতর্ক হচ্ছে। একজন লিখেছেন ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মতো। সে কারণে ভারতের পচা গোশত স্ত্রীকে খাওয়াচ্ছে’। অধিকাংশ নাগরিক প্রশ্ন তুলেছেন, পদ্মার ইলিশের ট্রাক কলকাতায় পৌঁছার দিনই পেঁয়াজ বন্ধ করে দেয়ার পরও প্রশাসনের দায়িত্বশীল যারা ভারতের মহিষের পচা গোশত আমদানির অনুমতি দিয়েছেন; তারা কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন?

বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির লাইসেন্স দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অতঃপর ব্যাংকে ঋণপত্র খুলতে হয়। বাংলাদেশকে বিপদে ফেলতে কয়েক বছর আগে ভারত গরু আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে; সেখানে তাদের গোশত আমদানি করতে হবে কেন?

বাংলাদেশ এখন গরুর গোশতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশে হাজার হাজার ডেইরি ফার্ম গড়ে উঠেছে। এ ছাড়াও কৃষক এবং গৃহিণীরা ঘরে ঘরে গরু-ছাগল প্রতিপালন করছেন। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা নদীর চরাঞ্চলগুলোতে গরুর ফার্ম এবং বাতানে গরু প্রতিপালন করে দেশের গোশতের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চাহিদাও দেশি গরু মেটাচ্ছে। অথচ মোদি সরকার ভারতীয় গরু বাংলাদেশে পাঠানো বন্ধ করে বিপদে ফেলার চেষ্টা করে উল্টো ভারতের কৃষকদের বিপদে ফেলেছেন। ভারতে যারা গরু প্রতিপালন করেন; তারা বিক্রি করতে না পেরে বিপদে পড়ে গেছেন। দিল্লি ও কলকাতার বেশ কয়েকটি পত্রিকায় খবর বেরোয়, গরু নিয়ে বিপদে ভারতের কৃষকরা। প্রতিপালন করে গরু না পারছেন বিক্রি করতে না পারছেন খাদ্য দিতে। খাবার দিতে না পারায় বাধ্য হয়ে ভারতের কয়েকটি রাজ্যের কৃষকরা রাতের আঁধারে বয়োবৃদ্ধ গরু দূরদূরান্তে ছেড়ে দিয়ে আসছেন। বাংলাদেশের পথে প্রান্তরে কুকুর-বিড়ালের মতোই।

বাংলাদেশে গরু প্রতিপালন ভোক্তাদের শুধু গোশতের চাহিদা মেটাচ্ছে না; কৃষি জমির জৈব সারের জোগান দিচ্ছে। গোবর সার জমির উর্বরা বৃদ্ধি করে। ফলে বাংলাদেশের অনেক জেলায় একই জমিতে বছরে তিন দফায় শস্য ফলানো হয়। গোশতের চাহিদা মেটানো ছাড়াও গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি প্রতিপালনে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। অনেক শিক্ষিত যুবক চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেই উদ্যোক্তা হয়েছেন। নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থান করেছেন। সরকার নানাভাবে এই উদ্যোক্তাদের সহায়তা করছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং জাতীয় সংসদে দেশের শিক্ষিত তরুণদের চাকরির পেছনে না ছুটে স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা হয়ে অন্যদের জন্য কর্মসংস্থান গড়ে তোলার আহŸান জানিয়েছেন। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশের অনেক শিক্ষার্থী ও ছেলেমেয়ের মধ্যে এমন প্রবণতা রয়েছে যে, লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করতে হবে। সবাই চাকরির পেছনে ছুটবে কেন? বরং এ দেশের ছেলেমেয়েদের নিজ উদ্যোগে ব্যবসা-বাণিজ্য করে আত্মকর্মসংস্থান করতে হবে। পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষিত তরুণরা নিজেরা উদ্যোক্তা হয়ে অন্যের চাকরির ব্যবস্থা করবেন’।

দেশের শিক্ষিত তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিনা সুদে ঋণসহ নানাভাবে তরুণদের স্বাবলম্বী করে তোলার চেষ্টা চলছে। সরকার ডেইরি ফার্ম, কারখানা, খামারের জন্য উদ্যোক্তাদের প্রমোট করছে। যখন দেশ উৎপাদিত গরু-মহিষ-খাসির গোশতে ‘বাজার রমরমা’; তখন বিদেশ থেকে গোশত আমদানি তথা ভারতের পচা গোশত আমদানির অনুমতি দিতে হবে কেন? দেশের স্বার্থের বদলে ভারতের স্বার্থকে অধিক গুরুত্ব দেয়া প্রশাসনের এই কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার সময় এসেছে। এদের মুখোশ খুলে দিতে না পারলে আবারও এমন কান্ড ঘটতেই থাকবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের উদ্যোক্তারা। এর আগে দেশের কোটি কোটি মানুষের বিরোধিতার মুখে ভারতকে ট্রানজিট, নৌ-বন্দর ব্যবহার এবং ট্রানশিপমেন্ট দেয়া। সে সময় বিশেষজ্ঞ কমিটি ভারতীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী নির্ধারিত শুল্ক নেয়ার প্রস্তাব করেন। কিন্তু প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ‘বন্ধুর কাছে শুল্ক নেয়া অশোভন’ থিওরি তুলে ধরেন। পরে নামেমাত্র শুল্ক নিয়ে ভারতের মূল ভূখন্ড থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭ রাজ্যে পণ্য আনা-নেয়া ২টি নৌ-বন্দরসহ ৭টি রুট ব্যবহার করতে দেয়া হয়। গ্রামীণ প্রবাদে আছে ‘ভাত খায় ভাতারের/গান গায়.....’।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (17)
সৌরভ ২ অক্টোবর, ২০২০, ৫:১২ এএম says : 0
ভারত থেকে ধীরে ধীরে সব ধরনের আমদানি বন্ধ করতে হবে।
Total Reply(0)
Jahangir Hussain Ali ২ অক্টোবর, ২০২০, ৫:২৪ এএম says : 0
যারা আমদানি করছে তারা ভালো করেই জানে বাঙালির হজমি শক্তি ভালো, পঁচা গান্ধা কোনো সমস্যাই না , তাই জেনেশুনেই তারা এগুলো আমদানি করছে ।
Total Reply(0)
বুলবুল আহমেদ ২ অক্টোবর, ২০২০, ৫:২৪ এএম says : 0
খা ভারতের দালালেরা ভুনা করে খা .
Total Reply(0)
সোলায়মান ২ অক্টোবর, ২০২০, ৫:৫৫ এএম says : 0
ভারতের প্রতিটি পদক্ষেপই আমাদের ক্ষতি করার জন্য নেয়া হয়, তাই আমাদেরকে তাদের কালো থাবা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
Total Reply(0)
পথিক ২ অক্টোবর, ২০২০, ৫:৫৬ এএম says : 0
এই বিষয়ে লেখার জন্য স্টালিন সরকার সাহেবকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি
Total Reply(0)
বুলবুল আহমেদ ২ অক্টোবর, ২০২০, ৫:৫৭ এএম says : 0
আবার বুঝে আসে না, কোন বিবেকবোধহীন ব্যবসায়ীরা এগুলেঅ আমদানি করে।
Total Reply(0)
জসিম ২ অক্টোবর, ২০২০, ৫:৫৮ এএম says : 0
দেশের স্বার্থের বদলে ভারতের স্বার্থকে অধিক গুরুত্ব দেয়া প্রশাসনের এই কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার সময় এসেছে।
Total Reply(0)
রিপন ২ অক্টোবর, ২০২০, ৫:৫৮ এএম says : 0
এটা এখন জাতীয় প্রশ্ন
Total Reply(0)
কাওসার ২ অক্টোবর, ২০২০, ৫:৫৯ এএম says : 0
আমাদেরকে সকল ক্ষেত্রে ভারত নির্ভরতা কমাতে হবে।
Total Reply(0)
তানবীর ২ অক্টোবর, ২০২০, ৬:০০ এএম says : 0
বাংলাদেশকে বিপদে ফেলতে কয়েক বছর আগে ভারত গরু আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে; সেখানে তাদের গোশত আমদানি করতে হবে কেন?
Total Reply(0)
Jesmin Anowara ২ অক্টোবর, ২০২০, ৭:১৬ এএম says : 0
Because there are paid dalal for India in Bangladesh government administration
Total Reply(0)
আনোয়ার হোছাইন ২ অক্টোবর, ২০২০, ৭:৩৩ এএম says : 0
চাণক্যের দেশ ভারতকে সবদিক থেকে বয়কট করতে হবে। ভারতের মতো স্বার্থান্ধ, হীনমন্য, ইতর দেশ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।
Total Reply(0)
Abdus Salam ২ অক্টোবর, ২০২০, ৮:২৫ এএম says : 0
Indian meat is HARAM not HALAl.
Total Reply(0)
Abdus Salam ২ অক্টোবর, ২০২০, ৮:২৬ এএম says : 0
Indian meat is HARAM not HALAl.
Total Reply(0)
মহিউদ্দিন ফারুক ২ অক্টোবর, ২০২০, ১০:৩৪ এএম says : 0
ভারত থেকে যে গোস্ত আমদানী করা হয়েছে তা কি হলাল? হালাল না হলে সেটা কি বাংলাদেশের মুসলমান রা খেতে পারবেন? এই হারাম খাওয়ালোক দায়ভার কার?
Total Reply(0)
মহিউদ্দিন ফারুক ২ অক্টোবর, ২০২০, ১০:৩৪ এএম says : 0
ভারত থেকে যে গোস্ত আমদানী করা হয়েছে তা কি হলাল? হালাল না হলে সেটা কি বাংলাদেশের মুসলমান রা খেতে পারবেন? এই হারাম খাওয়ালোক দায়ভার কার?
Total Reply(0)
Jack Ali ২ অক্টোবর, ২০২০, ৫:০৪ পিএম says : 0
Unfortunate most of us we do not love our country only we want to make money.
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন