মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট ২০২২, ০১ ভাদ্র ১৪২৯, ১৭ মুহাররম ১৪৪৪

সম্পাদকীয়

রিজার্ভের অর্থ কাজে লাগাতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১০ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০৭ এএম

গতকাল দৈনিক ইনকিলাবসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত অর্থনৈতিক বিষয়ক দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে উল্লেখ করা হয়েছে, করোনার কারণে চলতি বা ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে দেশের জিডিপি ১.৬ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। অন্য প্রতিবেদনটি হলো, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। জিডিপি কমে যাওয়া নিয়ে বিশ্বব্যাংক শুধু বাংলাদেশের কথাই বলেনি, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের কথাও বলেছে। তাদের জিডিপি কমে যাওয়া এবং অর্থনীতিতে চরম মন্দাবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে। তার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থ বছরে ভারতের ৫.৪, পাকিস্তানের ০.৫, শ্রীলঙ্কার ৩.৩, নেপালের ০.৬, ভুটানের ১.৮, আফগানিস্তানের ২.৫ এবং মালদ্বীপের ৯.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংস্থাটির মূল্যায়ণ হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ দ্রুতই জিডিপি’র এই নিম্নগামীতা ইউ-শেপ বা ইউ-টার্নের মতো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তা সঠিক পথেই রয়েছে। তবে এক্ষত্রে টেকসই উন্নয়ন এবং আর্থিক খাত ও ঋণ ব্যবস্থায় সুশাসন এবং স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হবে। রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে সংস্থাটি বলেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ হারিয়ে দেশে ফেরার আগে প্রবাসীরা তাদের সব সঞ্চয় দেশে পাঠিয়ে দেয়ায় রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিভিন্ন বৈদেশিক ঋণ তাতে যুক্ত হয়েছে।

করোনা পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ওপর যে ভয়াবহ ছোবল হেনেছে, তার বাইরে বাংলাদেশ নয়। এক্ষেত্রে জিডিপি হোক আর মানুষের জীবনযাপনের সূচক হোক, সবক্ষেত্রে যে অবনমন ঘটেছে তা সকলেরই জানা। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপেই বলা হয়েছে, করোনার কারণে ২০ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। ৬৮.৩৯ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে, এ সংখ্যা আরও বেশি। তাদের হিসাবে, কাজ হারিয়ে দেশে বেকারের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি দাঁড়িয়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বেকার হয়েছে ৬ কোটির বেশি মানুষ। অবশ্য করোনার শুরুতে সরকার অর্থনীতি ধরে রাখতে বৃহৎ শিল্পকারখানা, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষিখাত, সামাজিক সুরক্ষাসহ ৫০ লাখ পরিবারকে আর্থিক প্রণোদনার জন্য প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করে। এ প্যাকেজের পুরোটাই বিতরণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এতে কিছুটা হলেও আপৎকালীন দুর্দশা কাটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া সরকার তার অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ জোরেসোরে শুরু করেছে। বলা বাহুল্য, দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে সরকারের চেষ্টা করা স্বাভাবিক এবং তা সে করছে। ইতোমধ্যে রপ্তানি খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ গার্মেন্ট অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। করোনাকালে এ খাতের ৭০ শতাংশ অর্ডার স্থগিত হয়ে গেলেও তা ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার আরেক প্রধান উৎস প্রবাসী শ্রমিকদের কয়েক লাখ দেশে ফিরে এলেও তারা এখন কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছে। কর্মস্থলে যোগ দেয়ার জন্য যাত্রাও শুরু করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে ফেরত আসা শ্রমিকরা সেখানে যাওয়া শুরু করেছে। করোনার কারণে সেসব দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি চালু না হওয়ায় অনেক শ্রমিককে ফেরতও আসতে হচ্ছে। বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের শ্রমবাজার টালমাটাল অবস্থার মধ্যে রয়েছে। আগামী অর্থ বছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা রয়েছে, তা এ কারণেই করা হচ্ছে। এখনই এ খাতে বিকল্প বাজার তৈরির উদ্যোগ না নিলে খাতটিতে ধস নামতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে গর্ব করার কিছু থাকবে না। দেশের অর্থনীতির চরম মন্দাবস্থার মধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থা অত্যন্ত করুণ অবস্থায় রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্ব গতিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থাই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। মজুদদার, আড়তদার সিন্ডিকেটের কারসাজির কাছে যেন সরকার অসহায় হয়ে পড়েছে। দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার কার্যকর কোনো নেই। ফলে সাধারণ মানুষের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ছে। দরিদ্র আরও দরিদ্র হচ্ছে। নতুন করে প্রান্তিক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। দারিদ্র্যের এ অভিঘাত পুরো অর্থনীতির ওপর পড়ছে এবং গতি শ্লথ করে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি ঠেকানো না গেলে, সার্বিক অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

লকডাউনের সময়কালের জিডিপি’র হিসাব করলে দেখা যাবে, তা শূন্যে ছিল। দেশজ উৎপাদন বন্ধ থেকে শুরু করে সবকিছু অচল হয়ে পুরো অর্থনীতি ব্যাকফুটে চলে যাওয়ায় তা হওয়া স্বাভাবিক। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। একে ‘নতুন শুরু’ বলা যায়। এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিজস্ব সম্পদ ও অর্থের যথাযথ বিনিয়োগ এবং ব্যবহার নিশ্চিত করা। রিজার্ভের অর্থ জমিয়ে না রেখে কীভাবে তা উৎপাদনশীল, কর্মসংস্থানপ্রসারী ও উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে ভাবা ও ত্বরিৎ উদ্যোগ নেয়া। যে খাতে বিনিয়োগ করলে দ্রুত সুফল পাওয়া যাবে, এমন খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। ব্যাংক থেকে যারা ঋণ নিয়েছে এবং যাদের প্রণোদনা দেয়া হয়েছে, তারা এ অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করছে কিনা এবং তাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কিনা, তার কার্যকর তদারকি করতে হবে। অর্থনীতির এই চরম মন্দাবস্থায় অর্থের অপচয় কিংবা অলস ফেলে রাখা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন