ঢাকা মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২১, ১২ মাঘ ১৪২৭, ১২ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

নামের মিল কাল হলো

পটুয়াখালীর কারাগারে ৮০ বছরের বৃদ্ধ

পটুয়াখালী জেলা সংবাদদাতা : | প্রকাশের সময় : ১১ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০২ এএম

উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেন আর ছবি বিশ্বাস অভিনীত ‘সবার উপরে’ সিনেমার গল্পের মতোই ঘটনা। নির্দোষ হয়েও ১২ বছর জেলের সাজা ভোগার পর আদালতে দাঁড়িয়ে ছবি বিশ্বাসের সেই আর্ত আবেদন মিথ হয়ে গিয়েছে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে। ‘দাও, ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও আমার সেই ১২টা বছর’। বাস্তবতা রুপালি পর্দার চেয়ে অনেক কঠিন। সেই বাস্তবের বৃদ্ধ হাবিবুর রহমান বেসরকারি একটি উন্নয়ন সংস্থার চেক ডিজঅনার মামলায় ৪ অক্টোবর থেকে জেল খাটছেন। তবে ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গতকাল বিকেলে প্রকৃত সাজাপ্রাপ্তকে গ্রেফতারে সক্ষম হয় গলাচিপা থানা পুলিশ।

হাবিবুর রহমান অপরাধী নন, তবুও তিনি জেল খাটছেন। কারণ মিলটা শুধু নামেই। ‘অপরাধ’ বলতে সেটাই। আর সেই অপরাধে সাত দিন জেলে রয়েছেন বৃদ্ধ হাবিবুর রহমান। বাবাকে জেল থেকে ছাড়ানোর জন্য প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ছেলে আবু সালেহ। টাকাও যোগাড় করতে পারছেন না। তবে পুলিশের দাবি, মানুষ মাত্রই ভুল হয়। তাই দারোগারও ভুল হয়েছে। হাবিবুর রহমানকে জেলমুক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে। ইতোমধ্যেই প্রকৃত দন্ডপ্রাপ্ত আসামিকে খুঁজে বের করতে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

ঘটনাটি ঘটেছে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা শহরের কলেজ রোডস্থ বনানী এলাকায়। পুলিশ বলছে, গলাচিপা থানা সংলগ্ন সদর রোডের নাহার গার্মেন্ট মালিক হাবিবুর রহমান। পৌর শহরের বাসিন্দা নূর মোহাম্মাদ মাস্টারের ছেলে তিনি। তার বিরুদ্ধে চেক ডিজঅনার মামলায় এক বছরের কারাদন্ড হয়েছিল। রায়ের পর সে পলাতক ছিল। ওই মামলায় গত ৪ অক্টোবর শুধুমাত্র নামের মিল থাকায় গলাচিপা বনানী এলাকার ৮০ বছরের বৃদ্ধ হাবিবুর রহমানকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করে পটুয়াখালী কারাগারে পাঠায়। নূর মোহাম্মাদ পন্ডিতের ছেলে হাবিবুর রহমান সেই থেকে বিনা দোষে কারাভোগ করছেন।

মামলার নথি থেকে জানা গেছে, গলাচিপা থানা সংলগ্ন সদর রোডের নাহার গার্মেন্ট মালিক হাবিবুর রহমান। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক থেকে ২০১২ সালের ৬ আগস্ট ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি ব্র্যাকের অনুক‚লে উত্তরা ব্যাংক গলাচিপা শাখায় তার নিজস্ব একাউন্টের (হিসাব নং ২২০০) ঋণের সমপরিমান অর্থের একটি চেক জমা দেন। কিন্তু তিনি ওই ঋণ যথাসময়ে পরিশোধ না করায় ব্র্যাক কর্তৃপক্ষ হাবিবুর রহমানের জমাকৃত চেকটি পরবর্তী বছরের ১০ এপ্রিল ওই ব্যাংকে জমা দেন। হিসাবে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় তা ডিজঅনার হয়।

পরবর্তীতে ঋণগ্রহীতা হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্র্যাক কর্তৃপক্ষ আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় পটুয়াখালীর যুগ্ম দায়রা জজ জিন্নাৎ জাহান ঝুনু ২০১৮ সালের ২৫ মার্চ রায় দেন। রায়ে হাবিবুর রহমানকে এক বছরের কারাদন্ড ও ঋণের দ্বিগুণ অর্থ অর্থাৎ ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা অর্থদন্ডের আদেশ দেন। রায়ের দিন ঋণগ্রহীতা হাবিবুর রহমান আদালতে অনুপস্থিত থাকায় আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

গ্রেফতারি পরোয়ানা অনুযায়ী গলাচিপা থানার এএসআই আল-আমিন বনানী এলাকায় গত ৪ অক্টোবর অভিযান পরিচালনা করেন। শুধুমাত্র নামের মিল থাকায় ৮০ বছরের বৃদ্ধ হাবিবুর রহমানকে তার বাসা থেকে গ্রেফতার করেন। ওইদিন বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাকে পটুয়াখালী কারাগারে পাঠানো হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকৃত ঋণগ্রহীতা হাবিবুর রহমান প্রায় ৫ বছর আগে গলাচিপা থানা সংলগ্ন সদর রোড থেকে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে ফেলেন। পার্শ্ববর্তী মহিলা কলেজ সড়কে নতুন করে মুদি-মনোহরি ব্যবসা শুরু করেছেন তিনি। গতকাল দুপুরে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, গত ৪ অক্টোবরের পর থেকেই হাবিবুর রহমান তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসছে না।

এ ব্যাপারে বিনা দোষে কারাগারে থাকা হাবিবুর রহমানের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, আমার স্বামী কোনো দিন ব্যবসা করেননি আর আমরা কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণও নেইনি। আমাদের দুই ছেলে ঢাকায় গার্মেন্টে চাকরি করে। ভরণ-পোষণের জন্য প্রতি মাসে তারা যে টাকা দেয় তা দিয়ে আমাদের দু’জনের চলে যাচ্ছে। পুলিশকে বিষয়টি বলেছি কিন্তু তারা শোনেনি।
হাবিবুর রহমানের ছোট ছেলে আবু সালেহ জানান, বাবাকে কারাগারে পাঠানোর সংবাদ পেয়ে ঢাকা থেকে চলে আসি। আদালত থেকে কাগজপত্র ওঠানোর পর দেখি বাবা নিরপরাধী। শুধুমাত্র নামের মিল থাকার কারণে সাজাপ্রাপ্ত অন্য লোকের পরিবর্তে আমার বাবাকে পুলিশ কারাগারে পাঠিয়েছে। বাবা অসুস্থ, চোখেও ভালো দেখতে পান না, কানে ভালো শুনতেও পান না। এমনকি তার চলাচলের তেমন শক্তিও নেই।

গলাচিপা থানার এএসআই আল-আমিন বলেন, আদালত থেকে একটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানায় তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠাই। কিন্তু পরে জানতে পারি তিনি প্রকৃত আসামি নন। বিষয়টি দুঃখজনক এবং আমার ভুল হয়েছে। তবে নিরপরাধী ওই বৃদ্ধকে জেল থেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছি।
গলাচিপা থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানান, আসামির নাম ও পিতার নামের মিল থাকায় সরল বিশ্বাসে এএসআই আল-আমিন তাকে গ্রেফতার করে। প্রকৃত বিষয়টি অবগত হওয়ার পর গতকাল আসল ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিষয়টি সংশোধন করে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠিয়েছি এবং ওই বৃদ্ধকে দ্রুত কারামুক্ত করার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (8)
Jannatul Tajriyan ১১ অক্টোবর, ২০২০, ১:৫৪ এএম says : 0
কেয়ামতের দিন অপেক্ষায় রইলাম, ন্যায় বিচারের আশায়।
Total Reply(0)
আকবর সোহেল রানা ১১ অক্টোবর, ২০২০, ১:৫৪ এএম says : 0
বুঝলাম নামের মিল আসে,তাই বলে কি বাপের নামও মিল আছে। হায়রে পুলিশ গাজা খেয়ে আসামি দরতে গেলে এই অবস্থা হয়।
Total Reply(0)
Mohammad Ali ১১ অক্টোবর, ২০২০, ১:৫৫ এএম says : 0
হায়রে অভাগা দেশ অপরাধ করে রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ায় আর এইসব অসহায় মানুষ বিনা দোষে কারাভোগ করে, ধিক্কার এই আইন সিস্টেম কে
Total Reply(0)
Harun-Or Rashid ১১ অক্টোবর, ২০২০, ১:৫৬ এএম says : 0
এর জন্য দায়ী কে, পুলিশ না আইনজীবী?
Total Reply(0)
Sherajul Islam ১১ অক্টোবর, ২০২০, ১:৫৭ এএম says : 0
একদিন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে একটা গরু দ্রুতো গতিতে দৌড়াচ্ছে।।সামনে একটা শেয়ালের সাথে দেখা।। শেয়ালঃ ও গরু ভাইডি,অতো জোরে ছোটছো কোম্মে?কেউ কি লড়ানি দেছে নি? গরুঃ (দৌড়াইতে দৌড়াইতে) শেয়াল ভাই গো,,তুমিও দৌড়াও।।এলাকায় মাইনষে মাইনষে মারামারি হইরে একজন মরছে।অহন পুলিশ আইতে রইছে। শেয়ালঃ(গুরুর সাথে সাথে দৌড়াতে দৌড়াতে) হ্যাতে তোমার কি??ধরবে তো মাইনষেরে।। গরুঃ পুলিশ কি বোঝে নি কোনডা মানুষ আর কোনডা গরু??একবার মোরে ধরলে দুই বছরের আগে প্রমান ই হইবোনা মুই মানুষ নাকি গরু।।মুই দোষ না হইরে দুই বছর জেল খাটমু ক্যা?? শেয়ালঃ (নিজেও পিছনের তাকিয়ে দেখে) ও গরু ভাই মোরেও লগে লইয়ে যাও।।পুলিশ এইদিকে আইলে মোরেও ধরতে পারে।(শেয়াল ও গরুর সাথে সাথে দৌড়াতে শুরু করে)।। গল্পটা হাস্যকর হলেও বর্তমান বাস্তবতা এমনই
Total Reply(0)
Kajal Rashid ১১ অক্টোবর, ২০২০, ১:৫৭ এএম says : 0
পুলিশের এই অভ্যেসটা আছে।
Total Reply(0)
Nurul Haque ১১ অক্টোবর, ২০২০, ১:৫৭ এএম says : 0
প্রসাশনের গভির ভাবে তদন্ত করা উচিৎ , জেল ঐ কর্মকর্তার হ‌ওয়া উচিৎ
Total Reply(0)
Nannu chowhan ১১ অক্টোবর, ২০২০, ৬:৪৩ এএম says : 0
Ojoggo bektira ghosh o doliokoroner maddhome chakuri nia manushke onnai vabe hesto nesto kortese taroi folo srotite eakjon nirdosh ashi botsorer ordhe eakjon oshusto briddhoke jele jete hoy, eaita hoyei jachse keho tar jiboner kormo khomotar din haraia felitese, tarporo proshashon eai shob ojoggo durnitibaj shorkari lokder biruddhe bebosta neina ,tai eaita lagamhin vabe eaktar por arekta ghotei jachse....
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন