ঢাকা মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২১, ১২ মাঘ ১৪২৭, ১২ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

এমএলএআর’র ফাঁদে মানিলন্ডারিং মামলা

জবাবের প্রতীক্ষায় বছরের পর বছর অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার বাগাড়ম্বর একই অপরাধের একাধিক তদন্ত সংস্থা

সাঈদ আহমেদ | প্রকাশের সময় : ১১ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০০ এএম

মাত্র তিন বছরে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান নৌবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা কর্মকর্তা মাসুম রেজা। দেশে একাধিক বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট করার পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের এইচএসবিসি ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা, যুক্তরাষ্ট্রে ঘন ঘন যাতায়াত। কি করে সম্ভব? প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানতে পারে মাসুম আন্তর্জাতিক একটি চোরাকারবার চক্রের সদস্য। বেনামী একাধিক প্রতিষ্ঠান এবং কনসালটেন্সির আড়ালে তিনি চোরাচালানে সম্পৃক্ত।

অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অপরাধলব্ধ অর্থপাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ২০১৬ সালে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। ঘটনার নানা মোড়-বাঁক পেরিয়ে মাসুমের পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে সংস্থাটি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট-(এমএলএআর) পাঠানো হয় দুদক থেকে। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের মাধ্যমে পাঠানো এমএলএআর’র জবাব আসেনি দুই বছরেও। মাসুমের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও হাইকোর্টের আদেশে তা রহিত হয়ে যায়। মুক্ত মাসুম রেজা দুদকের অনুসন্ধানের পদে পদে সৃষ্টি করছেন বাধা। বিস্তার করছেন প্রভাব।

এ কারণে পাচারকৃত টাকা ফেরত আসার সম্ভাবনা যেমন ক্ষীণ হয়ে আসছে। তেমনি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার অভিযোগের অনুসন্ধানও। ফলে এ বিষয়ে আদৌ মামলা দায়ের হবে কি-না এ বিষয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

এক-দু’বছর নয়। এমএলএআর পাঠিয়ে এক দশক ধরে অপেক্ষা করছে দুদক আরেকটি অর্থ পাচার অনুসন্ধানে। আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং অর্থ পাচারের অনুসন্ধান চলছে ২০১০ সাল থেকে। এর মধ্যে ‘অগ্রগতি’ বলতে ২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর দুদক থেকে জানানো হয়, বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনের অর্থ পাচার সংক্রান্ত তথ্য পেতে মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রে এমএলএআর পাঠানো।

এরপর অনুসন্ধানের পরিণতি জানা যায়নি। তার ‘পাচারকৃত অর্থ’ও ফেরত এসেছে মর্মেও কোনো কৃতিত্ব দাবি করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এমএলএআর পাঠিয়ে দুই বছরের বেশি সময় ধরে জবাবের প্রতিক্ষায় আছে দুদক।

‘আটলান্টিক এন্টারপ্রাইজ’ এবং ‘স্কাই অ্যাপারেলস’ নামে দু’টি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে দেড়শ’ কোটি টাকার বেশি পাচারের অভিযোগ চট্টগ্রামের সাইফুল হকের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানটি চলছে তিন বছরের বেশি সময় ধরে। গতবছর ২৮ অক্টোবর দুদক চেয়ারম্যান জানান, এবি ব্যাংক থেকে পাচার করা সাইফুল হকের ১৬৫ কোটি টাকা ফেরত আনতে দুবাইয়ে এমএলএআর পাঠানো হয়েছে। এরপর অনুসন্ধানটির অগ্রগতি জানা যায়নি।

এরকম একটি-দু’টি নয়, মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ অনুসন্ধান এবং তদন্ত পর্যায়ে আটকে আছে এমন ডজন ডজন বিষয়। বছরের পর বছর ধরে চলছে শুধু চিঠি চালাচালি। পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার জন্য এমএলএআর পাঠানো পর্যন্তই এসবের পরিণতি। অর্থ ফেরত এসেছে- এমন কোনো তথ্য নেই প্রতিষ্ঠানটির হাতে। বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী এম. মোরশেদ খান এবং তার পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে হংকংয়ে পাচার হওয়া ৩২১ কোটি টাকা ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ১৬ কোটি টাকা ফেরত আনতে হংকংয়ের অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে এমএলএআর পাঠানো হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আইনগত সীমাবদ্ধতা, সংশ্লিষ্টদের অদক্ষতা সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই এগোচ্ছে না অর্থপাচার মামলার তদন্ত। পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার বিষয়েও নেই তেমন মনযোগ। অর্থ ফেরত আনার বিষয়টি পরিণত হয়েছে মুখরোচক সে্লগানে।

সংস্থাটির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াটি খুবই জটিল ও সময়সাপেক্ষ। বাংলাদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার নজির রয়েছে। এর আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা অর্থ ফেরত এসেছে। ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিন দফায় সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংকে থাকা ২১ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ফেরত আনা হয়েছে।

যদিও এ অর্থ দুদকের ট্রেজারি আসেনি কিংবা এ অর্থ দুদক খরচও করেতে পারেনি। তবে মানিলন্ডারিংয়ের পুরনো কিছু মামলার বিচারে প্রতিষ্ঠানটি ‘শত ভাগ সাজা’ হওয়ার কৃতিত্ব দাবি করছে দুদক। যদিও এটিকে শুভংকরের ফাঁকি বলে মনে করছেন আইনজ্ঞ এবং বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফএফআই) প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসানের মতে, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা একটি জটিল প্রক্রিয়া। অর্থ পাচার হয়েছে এটা প্রমাণ করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। তারপর দুই দেশের আদালতের বিষয় থাকার কারণে সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মানিলন্ডারিং তদন্তে অভিজ্ঞ একজন দুদক কর্মকর্তা জানান, অর্থপাচারের ব্যাপারে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকতে হয়। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশের আদালতে রাষ্ট্রপক্ষকে মামলা করতে হয়। স্থানীয় আদালতে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার পক্ষে রায় থাকতে হবে। আদালতের এই রায়ের কপি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে যে দেশে অর্থপাচার করা হয়েছে, ওই দেশের অ্যাটার্নি জেনারেলের অফিসকে অবহিত করতে হয়।

অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আগ্রহের ওপর নির্ভর করে পাচারের অর্থ ফেরত আসবে কি-না। বাস্তবতা হচ্ছে, অর্থ পাচারের অভিযোগ বিচারে প্রমাণিত হয়েছে- এমন ঘটনা নেই বললেই চলে। এমএলএআর চাওয়া হচ্ছে, অভিযোগের অনুসন্ধান কিংবা মামলার পর তদন্ত পর্যায়ে। সুইস ব্যাংক কিংবা এইচএসবিসি ব্যাংক থেকে কোনো ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য চাওয়া হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো জবাব আসে না। দু’য়েকটি জবাব এলেও তাতে স্পষ্ট করে লিখে দেয়া হয়, এই তথ্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্য তথ্যও দুদক কর্মকর্তারা কোনো কাজে লাগাতে পারছেন না। এ কারণে অর্থ পাচারের অভিযোগগুলো এখন পর্যন্ত অনুমান নির্ভর। বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রমাণিত নয়। বিচারে দন্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরই কেবল পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কর্মকর্তাদের মতে, সবকিছু অনুকূলে থাকলেও প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে ৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত লেগে যায়। ফলে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার বিষয়টি প্রচারণার বাগাড়ম্বর ছাড়া কিছুই নয়। কারণ, অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্ত করছে একাধিক প্রতিষ্ঠান।

দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সিআইডি এবং মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। দুদক শুধু ঘুষ ও দুর্নীতিসম্পৃক্ত মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধেরই তদন্ত করছে। এ সংক্রান্ত বাকি ২৬টি অপরাধ সংশ্লিষ্ট মানি লন্ডারিংয়ের তদন্ত করছে অন্য সংস্থাগুলো। একই ধরণের অপরাধের তদন্ত ক্ষমতা বিভিন্ন সংস্থার হওয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। একই কারণে জটিলতর হয়ে উঠেছে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনাও।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পীস ফর বাংলাদেশ’র প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের মতে, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে নানামুখি জটিলতা রয়েছে। যেমন ধরুন, বাংলাদেশের আইনের দৃষ্টিতে যেটি ‘পাচার’ যে দেশে অর্থ পাচার হয়েছে সেই দেশের আইনের দৃষ্টিতে সেটি ‘বিনিয়োগ’। উভয় দেশের সংজ্ঞা অভিন্ন না হলে ‘পাচারকৃত অর্থ’ ফেরত আনা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রসঙ্গত: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা গেøাবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই)র তথ্যমতে, ৭ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫ হাজার ২৭০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় যা সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা। আর সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড’র প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় ৫ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন