ঢাকা মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

এদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২৮ অক্টোবর, ২০২০, ১২:০১ এএম

প্রকাশ্য রাস্তায় নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে পিটিয়ে জখম করার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এটি এমন সময়ে ঘটল যখন সারাদেশে অসংখ্য ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের রোমহর্ষক ঘটনার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ ফুঁসে উঠেছে। এসব ঘটনার সাথে সরকারি দলের সংশ্লিষ্ট ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নামই বেশি উঠে আসছে। সিলেটে এমসি কলেজে নারী ধর্ষণের ঘটনা থেকে নোয়াখালির বেগমগঞ্জে নারী লাঞ্ছনার ভিডিও সর্বত্রই সরকারি দলের স্থানীয়দের নাম উঠে আসায় বার বার বিব্রত হচ্ছে সরকার। এহেন বাস্তবতায় প্রকাশ্য রাস্তায় ঢাকার একজন এমপির পুত্র ও তার দেহরক্ষির হাতে নৌবাহিনীতে কর্মরত ল্যাফটেন্যান্ট ওয়াসিফ লাঞ্ছিত ও রক্তাক্ত হওয়ার দৃশ্য ফেইসবুক, ইউটিউব, হোয়াটস অ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় সারাদেশে তা প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিনত হয়েছে। ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের পুত্র ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইরফান সেলিমের গ্রেফতার ও এই বেপরোয়া ঔদ্ধত্যের বিচারের দাবি গণদাবি হয়ে উঠেছে। তবে সরকারের সংশ্লিষ্টরাও প্রতিশ্রæতি অনুসারে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে পিছপা হয়নি। গত সোমবার দুপুরে হাজী সেলিমের পুরান ঢাকার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ইরফান এবং দেহরক্ষিকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। সেই অভিযানের দৃশ্যপটেও অবৈধ অস্ত্র, টর্চার সেল, অবৈধ মাদক, ওয়াকিটকি, ভিপিএস সেটসহ নানা আলামত জব্দ করা হয়েছে। ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষিকে এক বছর কারাদন্ড দিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে।

নিজের পরিচয় দেয়ার পরও নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে তার স্ত্রীর সামনে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে দাঁত ভেঙ্গে দেয়ার ঘটনাটি ছিল অমানবিক, ববর্রোচিত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় দেশে একশ্রেনীর মানুষের দৌরাত্ম্য কতটা বেপরোয়া ও আমনবিক পর্যায়ে পৌছেছে তা আবারো প্রমানিত হল। তবে সাম্প্রতিক সমাজ বাস্তবতার নিরিখে এটা বলা যায় যে, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি দলের এমপি ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের তথ্য হরহামেশা উঠে আসছে। সরকারি দলের একশ্রেণীর নেতাকর্মী, তাদের ছত্রচ্ছায়াপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেনীর সদস্যের এমন বেপরোয়া আচরণ ও অপরাধ প্রবণতা সামাজিক বিশৃঙ্খলা, নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই তুলে ধরছে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে এ থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে এর পেছনের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক কারণগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। কক্সবাজারে পুলিশের একজন কর্মকর্তার হাতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহত হওয়ার পর এখন একজন এমপিপুত্র ও জনপ্রতিনিধির হাতে নৌবাহিনীর একজন ল্যাফটেন্যান্ট লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা ঘটল। এসব ঘটনার পর সশস্ত্রবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের সংশ্লিষ্টরা যেভাবে ত্বরিৎ ব্যবস্থা গ্রহণে প্রতিক্রিয়া ও সাঁড়া দিয়েছে এবং দ্রুত অপরাধিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, সমাজে সংঘটিত একই ধরণের সব ঘটনায় অনুরূপ প্রতিক্রিয়া ও ব্যবস্থা গৃহিত হলে এ ধরনের ঘটনা দ্রæত কমে আসত।

পরিবর্তিত সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের একটা প্রতিবিম্ব হয়ে উঠেছে। রাস্তার প্রত্যক্ষদর্শিরা ঘটনা সংঘটনের সাথে সাথেই তার চিত্র ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ায় ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়া বা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সুযোগ অনেকটাই কমে যাচ্ছে। সমাজে নানা মত ও পথের মানুষের সহাবস্থান। অতএব প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্যও বহুমাত্রিক হতে বাধ্য। তবে এ থেকে সরকারকে জনমতের সাধারণ অভিব্যক্তিকে বুঝতে হবে । সরকারের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সশস্ত্রবাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও সংক্ষোভের বার্তাগুলোও উঠে আসে। এসব মতামত অনুধাবন করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সব মহলের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বার বার নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের পারিবারিক ঐতিহ্য রয়েছে। সেই সাথে অঢেল বিত্ত-বৈভবের মধ্যে বড় হওয়ার পরও ইরফান সেলিমের মত সম্ভাবনাময় সন্তানরা কি করে মাস্তানের মত আচরণ করে, তার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বুঝতে হবে। তাৎক্ষনিকভাবে অভিযান চালিয়ে ইরফান সেলিমকে তার সাঙ্গপাঙ্গসহ আটক করে র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত এক বছরের সাজা দিয়েছে এবং হত্যাচেষ্টার নিয়মিত মামলার প্রক্রিয়া চলছে। লেফট্যান্ট ওয়াসিফ না হয়ে যদি একজন সাধারণ মানুষ তাদের হাতে লাঞ্ছিত বা নিহত হতো তাহলে এমন প্রতিক্রিয়া ও ব্যবস্থা দেখা যেতো কিনা সে প্রশ্নও উঠে আসছে। বলা হয়, আইন সবার জন্য সমান। অপরাধী ও ভুক্তভোগির পরিচয় বিবেচনায় যখন আইনের প্রতিকারের ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা দেয়, তখনি সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতির লাগামহীন বিস্তার ঘটে। বিশেষত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় সংঘটিত অপরাধমূলক ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ আরো জোরালো ও দৃশ্যমান করতে হবে। ইরফান সেলিমের মত আরো অনেকেই পিতার দাপটে এবং জনপ্রতিনিধি হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন, দলনিরপেক্ষ ভ‚মিকা নিয়ে তাদেরকে আইনগত জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
Jack Ali ২৮ অক্টোবর, ২০২০, ১২:২২ পিএম says : 0
Only answer is to rule our country by the Law of Allah..
Total Reply(0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন