ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১০ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

ইসলামী বিশ্ব

‘তুরস্ক বয়কটে’ অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা সউদীর

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ১৯ নভেম্বর, ২০২০, ৫:৫৮ পিএম

মুসলিম বিশ্বের দুই প্রধান শক্তি সউদী আরব ও তুরস্কের মধ্যে রাজনৈতিক রেষারেষি বাণিজ্যিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। নির্ভরযোগ্য ব্রিটিশ দৈনিক 'ফাইনানসিয়াল টাইমস' বলছে, সউদী আরব তুরস্কের পণ্য আমদানির ওপর ‘অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা’ চাপিয়েছে।
গত অক্টোবর মাস থেকে সউদী এবং তুরস্কের মিডিয়া ছাড়াও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দিনের পর দিন যেসব খবর বেরুচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে সউদী আরব তুরস্কের এরদোগান সরকারকে শায়েস্তা করার উপায় হিসাবে বাজার বন্ধের কৌশল নিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের মুখে সউদী সরকার বলছে যে, তুরস্ক থেকে পণ্য আমদানির ওপর রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক এবং তুরস্কের ব্যবসায়ী মহলের মতে, তুর্কি পণ্য বয়কটের যে ক্যাম্পেইন দ্রুত সউদী আরবে ছড়িয়ে পড়েছে তার পেছনে রয়েছে দেশটির সরকার।
সউদী সরকারের ইচ্ছাতেই যে এই বয়কট ক্যাম্পেইন চলছে, তার প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় গত সপ্তাহে, যখন সউদী খাদ্য এবং ওষুধ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ (এসএফডিএ) তুরস্ক থেকে সব ধরনের মাংস, মাছ, ডিম এবং দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত জানায়। তুর্কি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কেও সউদী কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছে।
সউদীতে তুর্কি পণ্যর বয়কট ক্যাম্পেইন ছড়িয়ে পড়ায় দেশটি দোকান ও চেইন সুপার শপগুলোতে টাঙানো হয়েছে ব্যানার, যাতে তুর্কি পণ্য বয়কটের আহ্বান করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ প্রচারণা ছড়িয়ে পড়েছে।
জানা যায়, প্রকাশ্যে এই ‘তুর্কি বয়কট’ ক্যাম্পেইনের নেতৃত্ব দিচ্ছে সউদী আরবের শীর্ষ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সমিতি- রিয়াদ চেম্বার অব কমার্স। সমিতিটি এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে যে, তুরস্কে কোনও বিনিয়োগ নয়, তুরস্ক থেকে কোনও আমদানি নয় এবং তুরস্কে কোনও পর্যটন নয়।
রিয়াদ থেকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, সউদী চেইন সুপারমার্কেটগুলো একে একে তুর্কি পণ্য বয়কটের এই ডাকে সাড়া দিচ্ছে।
সউদী আরবের সবচেয়ে বড় সুপারমার্কেট আথায়াম ছাড়াও দানিউব, তামিমি এবং পান্ডা চেইন শপ বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, তাদের বর্তমান মজুত শেষ হওয়ার পর তারা তুরস্কে তৈরি কোনো পণ্য বিক্রি করবে না।
সরকারপন্থী সউদী বিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবীরা গণমাধ্যমে এই বয়কটের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে জনমত তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি আরব নিউজ পত্রিকায় সুপরিচিত সউদী রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক ড. হামদান আল-সেহরি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তুরস্কের মাথা গলানোর কারণেই এই বয়কট।’
তার ভাষ্য, ‘ইরানের মতো তুরস্কও এখন এই অঞ্চলকে হুমকি দিচ্ছে। সন্ত্রাসী মিলিশিয়াদের সমর্থন দিচ্ছে, মুসলিম ব্রাদারহুডকে উসকানি দিচ্ছে। এতে আরব দেশগুলোর নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ছে।’
২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রতি তুরস্কের অকুণ্ঠ সমর্থনের পর থেকে রিয়াদ-আঙ্কারার সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। এরপর ২০১৭ সালে সউদী জোট কাতারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে তার বিরোধিতা করেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান।
এ ছাড়া ২০১৮ সালে ইস্তান্বুলে সউদী কনস্যুলেটের ভেতর সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যেভাবে সউদী রাজপরিবারকে দায়ী করেন, তাতে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
এ বয়কটের কারণে বিপাকে পড়েছে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোও। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, স্প্যানিশ ব্রান্ড ম্যাঙ্গো, যাদের পোশাকের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ তৈরি হয় তুরস্কে, তারা সউদী আরবে বিক্রির জন্য বিভিন্ন দেশে পোশাক তৈরির বিকল্প রাস্তা খুঁজছে। সউদী আরবে ম্যাঙ্গোর ৫০টির মতো দোকান রয়েছে।
তুরস্ক থেকে পণ্য আমদানিতে সউদী কাস্টমস নানা ধরনের জটিলতা করে রেখেছে। ফলে ম্যাঙ্গো তুরস্কের সরবরাহকারীদের জানিয়ে দিয়েছে, অন্য দেশে পোশাক তৈরি ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।
তুরস্কের আটটি প্রধান ব্যবসায়ী সমিতি গত মাসে এক যৌথ বিবৃতিতে জানায়, তারা সউদী আরবের ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক আচরণের তীব্র নিন্দা করেছে। এই বিরোধ না মিটলে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তুরস্ক সরকারের পক্ষ থেকে সউদী আরবে এই বয়কটের বিষয়ে এখনও স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। তবে সরকারপন্থী তুর্কি সংবাদপত্র ইয়েনি সাফাকে এক উপ-সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে যে, এই বয়কট সউদী আরবের জন্যই আত্মঘাতী হবে।
এতে বলা হয়, তুরস্কের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের তুলনায় সউদী আরবে তাদের রপ্তানির পরিমাণ এতই কম যে তাতে তুর্কি অর্থনীতির তেমন কোনো ক্ষতি হবে না, বরং ৮০ শতাংশ আমদানি নির্ভর সউদী আরব সস্তায় মানসম্পন্ন পণ্য থেকে বঞ্চিত হবে।
তবে সউদী অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আমাল আব্দুল-আজিজ আল-হাজানির মতে, তুর্কি অর্থনীতি তেমন ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও কিন্তু নেতিবাচক অনেক প্রভাব তুরস্ক এড়াতে পারবে না।
তার হিসাব মতে, সউদীরা তুরস্কে স্থাবর সম্পত্তির সবচেয়ে বড় ক্রেতা। একশো’রও বেশি তুর্কি কোম্পানি সউদী আরবে ব্যবসা করছে। এক লাখের মতো তুর্কি নাগরিক সউদী আরবে কাজ করে।
তিনি আরও বলেন, তুরস্ক ২০২৩ সালের মধ্যে আড়াই হাজার কোটি মার্কিন ডলারের সউদী বিনিয়োগ টার্গেট করেছিল, আর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দুই হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। রাজনৈতিক সম্পর্ক বর্তমান অবস্থায় থাকলে তুরস্কের এসব টার্গেট শুধু কাগজে থেকে যাবে, মনে করছেন সউদী এই বিশ্লেষক।
তবে সউদী দৈনিক আল আরাবিয়ায় এই বয়কট নিয়ে এক নিবন্ধে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আমাল আব্দুল-আজিজ আল-হাজানি বলেছেন, রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হওয়ার সাথে সাথে ২০১৭ সাল থেকে সউদী-তুরস্ক বাণিজ্য সম্পর্ক সঙ্কুচিত হচ্ছে। গত দুই বছরে বাণিজ্য হ্রাস পেয়েছে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ।
তুরস্কের নির্মাণ সামগ্রী প্রস্তুতকারী সমিতির প্রধান ফরিদ এরদোগানকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স বলছে, প্রায় বছর খানেক ধরেই সউদী আরবে তুর্কি পণ্য এবং সেবা আমদানির ওপর বাধা তৈরির ইঙ্গিত তারা পাচ্ছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরেই সউদী কাস্টমস বন্দরগুলোতে নানা রকম জটিলতা তৈরি করছে।
বিশ্বের বৃহত্তম কনটেইনার শিপিং প্রতিষ্ঠান মায়ের্সক সম্প্রতি তুরস্কের রফতানিকারকদের জানিয়েছে যে, তুর্কি পণ্য খালাসের সময় সউদী কাস্টমসের পক্ষ থেকে নানাবিধ জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে।
সউদীতে তুরস্কের তৈরি পণ্যের ওপর ‘অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা’র কারণে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো সঙ্কটে পড়ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
লন্ডনের ফাইনানসিয়াল টাইমস খবর দিয়েছে, স্প্যানিশ ব্রান্ড ম্যাঙ্গো - যাদের পোশাকের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ তৈরি হয় তুরস্কে, তারা সউদী আরবে বিক্রির জন্য বিভিন্ন দেশে পোশাক তৈরির বিকল্প রাস্তা খুঁজছে। সউদী আরবে ম্যাঙ্গোর ৫০টির মত দোকান রয়েছে।
ম্যাঙ্গো তুরস্কে তাদের সরবরাহকারীদের জানিয়েছে, সউদী কাস্টমস মাল খালাসে এত দেরি করছে যে অন্য দেশে পোশাক তৈরি ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।
ইস্তান্বুলে তৈরি পোশাক সমিতির প্রধান মুস্তাফা গুলতেপ ফাইনানসিয়াল টাইমসের কাছে স্বীকার করেছেন যে, তুরস্কে তৈরি পণ্য সউদী আরব এবং উপসাগরীয় কিছু দেশে নিতে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর সমস্যা হচ্ছে।
তুরস্কের আটটি প্রধান ব্যবসায়ী সমিতি গত মাসে এক যৌথ বিবৃতিতে তুরস্কের কোম্পানিগুলোর প্রতি সউদী আরবের ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক আচরণের তীব্র নিন্দা করেছে। এই বিরোধ মিটিয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেছে যে, এটা না হলে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সূত্র : বিবিসি

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (1)
Jesmin Anowara ১৯ নভেম্বর, ২০২০, ৯:৩৬ পিএম says : 0
Turkey should take the control of Mocca , Madina and entire KSA on behalf of Muslim world
Total Reply(0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন