ঢাকা শনিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২১, ০২ মাঘ ১৪২৭, ০২ জামাদিউল সানী ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

শিল্প-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের অপার সম্ভাবনা

| প্রকাশের সময় : ১৪ জানুয়ারি, ২০২১, ১২:০১ এএম

ফেনির সোনাগাজী, চট্টগ্রামের মীরসরাই ও সীতাকুন্ডের নিয়ে গড়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরী এখন দেশের শিল্পায়ণ ও অর্থনীতির মহাজাংশনে পরিনত হতে চলেছে। এক সময়ের ধু ধু বালুচর আর গোচারণ ভ’মিতে এখন হাজার হাজার মানুষের কর্মব্যস্ততা জাতিকে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যেই এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। ৩১ হাজার একর আয়তনের এই শিল্প নগরীতে প্রত্যাশিত ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এখানে ১৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে বেজার পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। বর্তমান সরকার সারাদেশে প্রায় ১০০টি ইপিজেড বা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়ে এগোচ্ছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরীর কলেবর সর্ববৃহৎ। অন্যসব প্রকল্পের অবস্থা যেখানেই থাক, সর্ববৃহৎ এই শিল্পনগরী এখন প্রত্যাশিত কর্মচাঞ্চল্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শুরু করেছে, এটা দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় আশাবাদের সঞ্চার করেছে। চীন, জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রসহ দেশীয় শিল্পদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে এটি দেশের শিল্পায়ণ ও ম্যানুফেকচারিং খাতের অন্যতম হাবে পরিনত হতে চলেছে। বিশেষত লাখ লাখ লোকের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ দেশের অর্থনীতির জন্য অনেক বড় একটা ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।

করোনাকালীন বিশ্ববাস্তবতায় সারাবিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড যখন স্থবির হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ তখনো অব্যাহতভাবে গতিশীল ছিল। পদ্মাসেতু প্রকল্প, মাতারবাড়ি সম্রুদ্র বন্দর ও বিদ্যুত প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল ও বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী তার অন্যতম উদাহরণ। শিল্পায়ণ, রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের পাশাপাশি দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটির উন্নয়নে এসব মেগা প্রকল্প দেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ভিত্তি নির্মান করতে চলেছে। শত শত কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এসব শিল্প বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় ম্যানুফেকচারিং হাব হয়ে উঠতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী নেতৃত্ব ও দূরদর্শী চিন্তার ফলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে দেশকে শিল্পায়ণ ও রফতানীমুখী অর্থনীতিতে পদার্পণের এই অভিযাত্রা সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হতে চলেছে। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীসহ দেশের প্রস্তাবিত ইপিজেড ও শিল্পপার্কগুলোর অবকাঠামো খাতের বাস্তবায়ন দ্রুত গতিতে এগিয়ে চললেও এসব শিল্প কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ শ্রমিক ও জনশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগের দিকেও নজর দিতে হবে। বিশ্ব অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে আমাদের বিপুল সংখ্যক ও ক্রমবর্ধমান কর্মহীন জনশক্তিকে কাজে লাগানোর বাস্তবসম্মত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। ইতিমধ্যে গড়ে ওঠা দেশের গার্মেন্টস সেক্টরসহ বিভিন্ন সেক্টরে ঢুকে পড়ার লাখ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের পুনরাবৃত্তি যেন বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীতে না ঘটে সেদিকে আগেই নজর দিতে হবে। অবকাঠামো বাস্তবায়নের পাশাপাশি সম্ভাব্য খাতগুলোর জন্য দক্ষ জনশক্তির যোগান আগেই নিশ্চিত করতে হবে।

গত এক দশক ধরে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে এক প্রকার স্থবিরতা বিরাজ করছে। জনশক্তি রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার সউদি আরব, আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার মত বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত-অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা বিরাজ করছে। এসব নিষেধাজ্ঞা ও আইনগত জটিলতা নিরসনে সরকারকে আরো কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীসহ দেশের প্রস্তাবিত শিল্পপার্ক ও ইপিজেডগুলোতে শ্রমঘন শিল্প উদ্যোগ গ্রহণের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুরসহ যে সব দেশ প্রয়োজনীয় জনশক্তির অভাবে শিল্পকারখানা অটোমেশনের দিকে অধিক মনোযোগ দিতে শুরু করেছে অথবা অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য জনশক্তিবহুল স্থানে কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, সে সব প্রস্তাবের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সরকারের সময়ক্ষেপণের পুরনো বদনাম থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিনিয়োগ অনুমোদনসহ শিল্পকারখানায় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, অবকাঠামো খাত ও সেবাখাতের সংযোগ নিশ্চিত করতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করা জরুরি। শিল্পকারখানা গড়ে তোলার সাথে সাথে টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ দূষণ এবং পরিবেশগত প্রভাব কমিয়ে আনার বিষয়গুলোর প্রতি আরো অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের শিল্পনগরীতে স্থাপিত দেশি-বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পণ্যে দেশের ব্রান্ডিং নিশ্চিত করতে হবে। এসব কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, দক্ষ শ্রমিক এবং কাঁচামালে বিদেশ নির্ভরতা কমিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী, মাতারবাড়ি বিদ্যুতকেন্দ্র ও সমুদ্রবন্দর বাস্তবায়নের পাশাপাশি দেশের চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছে তার সুফল নিশ্চিত করতে হলে সামাজিক-রাজনৈতিক নিরাপত্তা, দুর্নীতিমুক্ত সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন