ঢাকা শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭, ১৩ রজব ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় সকলকে সচেতন হতে হবে

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ২২ জানুয়ারি, ২০২১, ১২:০৭ এএম

কটি শিশুর জ্ঞান-বুদ্ধি নিয়ে বেড়ে উঠার মূল সুতিকাগার তার পরিবার। শুধু শারীরিকভাবে বেড়ে উঠাকে প্রকৃত মানুষ হওয়া বোঝায় না। দৈহিক শক্তি-সামর্থ্য বা পালোয়ান হলেই সে মানুষ হয় না। শারীরিকবৃদ্ধির সাথে ভাল-মন্দ বোঝা এবং নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠার মধ্যেই মানুষ হওয়ার সার্থকতা নিহিত। একটি শিশুকে মানুষের মত মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে তার পিতা-মাতা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য। তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, নীতি-নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ কাদামাটিসম শিশুর মন ও মননে স্থায়ীভাবে ছাপ ফেলে। তারা যা করে শিশুটিও তা দেখে এবং শেখে। পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য যে পথে গমন করে শিশুটিও সেই পথ ধরে। গ্রামে-গঞ্জে একটি প্রবাদ প্রচলিত, জমিতে চাষের সময় আগের লাঙল যেভাবে যায়, পেছনের লাঙলও সেভাবে যায়। সোজা গেলে সোজা, বাঁকা গেলে বাঁকা যায়। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এখন শিশুর লালন-পালন ও বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে বাঁকা পথটিই যেন বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা এতটাই ব্যস্ত যে শিশুর যত্ন ও বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছে না। বিশেষ করে কর্মজীবী বাবা-মায়ের পক্ষে সন্তানকে বেশি সময় দেয়া সম্ভব হয়ে উঠছে না। ফলে অনেক শিশুর যথাযথ বৃদ্ধি ঘটছে না। শারীরিকভাবে বেড়ে উঠলেও মানসিক বৃদ্ধির অপরিপূর্ণতা থেকে যাচ্ছে। এই আধুনিক যুগে অনেক বাবা-মাকে দেখা যায়, শিশুকে সময় না দিয়ে তাদের সঙ্গী করে দেয় মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার। এসব ডিজিটাল ডিভাইস এবং এর মধ্যকার বিভিন্ন গেম ও কনটেন্ট তাদের নিত্যসঙ্গী হয় এবং এর সাথেই তারা বেড়ে উঠে। তারা ডিজিটাল শিক্ষা পাচ্ছে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে যে শিশুটির নীতি-নৈতিকতার গল্প বা কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ, কিংবা ধর্মীয় আচার-আচরণের কথাবার্তা শোনার কথা, তা শুনছে না। ডিজিটাল শিক্ষার স্বরূপ আর বাবা-মায়ের বাস্তব শিক্ষা যে এক নয়, তা তারা বুঝতে পারছে না। এর ফলে আমাদের চিরায়ত পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, আচার-আচরণ এবং মূল্যবোধ থেকে তারা পিছিয়ে পড়েছে। নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশই এভাবে বেড়ে উঠছে। ডিজিটাল শিক্ষার মাধ্যমে তারা মূলত পশ্চিমা ও বিজাতীয় সংস্কৃতির ধারক-বাহক হয়ে উঠছে। এর কুফল এখন সমাজের সর্বত্র দৃশ্যমান। এই যে কিশোররা গ্যাং সৃষ্টি করে পাড়া-মহল্লায় ‘হিরোইজম’ দেখানোর নামে ভয়ংকর সব অপরাধ করে বেড়াচ্ছে, তা ঐ ডিজিটাল শিক্ষারই কুফল। ইন্টারনেটে পশ্চিমা অপসংস্কৃতির গ্যাং কালচার দেখে তারাও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে গ্যাং গড়ে তুলেছে। গ্যাং টু গ্যাং আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে মারামারি, রাহাজানি এমনকি খুন করার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এই বিপথে চলে যাওয়া আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের দেয়াল ধসে পড়ার একটি খন্ডচিত্র মাত্র। পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মায়া-মমতা, একের দুঃখে অন্যের দুঃখী হওয়া, পাশে দাঁড়ানো, সংঘবদ্ধ হয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মতো মানবিক গুণগুলো যেন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। হিংস্রতা, নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা, পারস্পরিক অশ্রদ্ধাবোধ সমাজে শেঁকড় গেড়ে বসছে। পরিবার ও সমাজ এক চরম অস্থিরতার মধ্যে নিপতিত হয়েছে। এর নমুনা এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছে, যা শোনা, দেখা ও বর্ণনা করা যায় না। একেকটি লোমহর্ষক ঘটনা মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় যেসব অপরাধমূলক ও অমানবিক ঘটনা ঘটে চলেছে, তা অভাবনীয় ও অকল্পনীয়।

দুই.
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের এবং সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার দায়িত্ব সম্পর্কিত অতি জরুরি এই নীতিকথাগুলো নিয়ে এখন আলোচনা হয় না বললেই চলে। অনেকে কথাগুলো স্মরণ করেন কিনা, সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। পারস্পরিক এই দায়িত্ব ও কর্তব্য সদা স্মরণে থাকলে সন্তানের হাতে পিতা-মাতা এবং পিতা-মাতার হাতে সন্তানের খুন হওয়ার মতো অকল্পনীয় ঘটনা ঘটত না। হ্যাঁ, পিতা-মাতাকে হত্যাকারী সন্তান বা সন্তানকে হত্যাকারী পিতা-মাতার বিচার হবে, জেল হবে, ফাঁসি হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, জেল বা ফাঁসি হলেই কি এসব ঘটনার শেষ হবে? এসব তো স্বাভাবিক কোনো অপরাধমূলক ঘটনা নয় যে, হিংসা-প্রতিহিংসা বা শত্রুতামূলকভাবে ঘটানো হয়েছে এবং জেল-ফাঁসি হলে নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিকার করা যাবে। এসব ঘটনা মনস্তাত্তি¡ক এবং পিতা-মাতা বা সন্তানের মানসিক বিকৃতির ফল। পারিবারিক নীতি-নৈতিকতার চরম অবক্ষয় না হলে এমন ঘটনা কোনোভাবেই ঘটানো সম্ভব নয়। এই অবক্ষয় এতটাই ঘটেছে যে পিতা-মাতাকে সন্তানের এবং সন্তানকে পিতা-মাতার শত্রুতে পরিণত করছে। এর দায় পিতা-মাতাকেই নিতে হবে। কারণ সন্তান জন্মের পর তাকে সঠিকভাবে পরিচর্যার মাধ্যমে বড় করে তোলা পিতা-মাতারই দায়িত্ব। এক্ষেত্রে তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালিত হচ্ছে না বলেই সন্তান বিপথে যাচ্ছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, পারিবারিক বন্ধনের শৈথিল্য এবং সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের উদাসীনতা, নীতি-নৈতিকতার চর্চার অভাব এবং অনাকাক্সিক্ষত প্রশ্রয় তাদের উচ্ছৃঙ্খল ও অবাধ্য করে তোলে। এছাড়া সামাজিক রীতি-নীতি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধের শৈথিল্য এবং অভিভাকের ভূমিকা পালনকারীদের নিষ্ক্রিয়তাও বাড়ন্ত শিশু-কিশোরদের সুষ্ঠুভাবে গড়ে উঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। বলা বাহুল্য, বাড়ন্ত শিশু শ্রেণী অনেকটা কাদা মাটির মতো। যে পরিবেশে এবং যে সংস্কৃতিতে তাদের গড়ে তোলা হবে, সেভাবেই গড়ে উঠবে। প্রকৃতিগতভাবেই অনুকরণ ও অনুসরণের মাধ্যমেই শিশুদের মেধা ও মনন বিকশিত হয়। স্বচ্ছ পানির মতো যে পাত্রে রাখা হবে, সে পাত্রেরই আকার ধারণ করবে। এক্ষেত্রে পাত্রটি যথাযথভাবে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন আছে কিনা, তা সংরক্ষণকারীর পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে। সমাজে ভাল এবং মন্দ দুই রয়েছে এবং থাকবে। তবে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা এবং নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় রীতি-নীতির সুদৃঢ় ভিত্তির কারণে ভাল’র আধিপত্য চিরকাল ধরেই বিদ্যমান। মন্দ বিষয়টি বরাবরই কোনঠাসা হয়ে থাকে। দুঃখের বিষয়, দিন দিন সমাজের এই বৈশিষ্ট্য ক্ষয়ে যাচ্ছে। ভাল দিকটি নিষ্ক্রিয় হয়ে মন্দ দিক প্রকট হয়ে উঠছে। সমাজের অভিভাবক শ্রেণীর এই অবক্ষয় ঠেকানোর কথা থাকলেও, তাদের উদাসীনতা ও মন্দ’র প্রভাবের কাছে সমাজ তার চিরায়ত বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। এক্ষেত্রে মন্দ কাজে লিপ্তদের পরিবারের অভিভাবকদের চরম ব্যর্থতাও রয়েছে। তারা সন্তানের আচার-আচরণ ও চলাফেরার বিষয়টি খেয়াল করেন না। সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, কখন বাসায় ফিরছে, এ ব্যাপারে কোনো ধরনের খোঁজ-খবর না রাখায় সন্তান বিপথগামী হয়ে পড়ছে। আমাদের গ্রাম, পাড়া বা মহল্লায় উঠতি বয়সীদের আচার-আচরণের দিকে খেয়াল রাখা বা ডাক-দোহাই দেয়া আবহমান কালের সংস্কৃতি। নিজের সন্তানকে শাসন-বারণের পাশাপাশি প্রতিবেশির সন্তানকেও একই দৃষ্টিতে দেখার রীতি রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের আচার-আচরণে উচ্ছৃঙ্খলা বা অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে সাথে সাথে শাসন বা সচেতন করা এবং পরিবারের অভিভাবকদের জানানো হতো। সমাজের এই রীতি ও সংস্কৃতি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে শহরভিত্তিক পাড়া-মহল্লা এবং এতে বসবাসকারীরা অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যে যার মতো চলছে। পাশের বাড়ি বা ফ্ল্যাটে কারা থাকছে বা কী হচ্ছে, তার খোঁজ কেউ নেয় না। অনেকটা পশ্চিমা সংস্কৃতির মতো ‘যার যার মতো’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারও সন্তানের অস্বাভাবিক আচরণ চোখে পড়লেও ডাক দেয়ার তাকিদ অনুভব করেন না। সামাজিক এই রীতি-নীতি চর্চার অভাবে শিশু-কিশোররা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। সামাজের এই নেতিবাচক পরিবর্তন যেমন দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে, তেমনি সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার মূল দায়িত্ব পালনকারী পরিবারের অভিভাবকদের উদাসীনতাও লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে। সন্তানের প্রতি যথাযথ খেয়াল না রাখার প্রবণতার কারণে তারা নিঃসঙ্গ, হতাশ ও উগ্রতার কবলে পড়ছে। ফলশ্রুতিতে একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনা তাদের দ্বারা সংগঠিত হচ্ছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, যেসব অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছে সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। এসব ঘটনা ভেতরে ভেতরে পরিবার ও সমাজের চরম নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়েরই আলামত।

তিন.
পরিবার ও সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রাতারাতি ঘটে না। আবার সামাজিক নীতি-নৈতিকতা ধরে রেখে সময়কে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়াও হঠাৎ করে হয় না। দশক ধরে এর পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তন পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অটুট রেখে হচ্ছে কিনা, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। মানুষের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, সভ্যতার দিকে ধাবিত হওয়া। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের যে বিবর্তন, তা সভ্য হওয়ারই ধারাবাহিকতা। এই সভ্য হতে গিয়ে মানুষ ভাল-মন্দ দুটো পথের দিকেই এগিয়ে চলেছে। দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষই ভাল পথের পথিক হয়েছে। পরিবার ও সমাজ গঠনে নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন মানবিক গুণাবলি প্রতিষ্ঠা করেছে। যুথবদ্ধ সমাজ গড়ে তুলেছে এবং তাদেরই আধিপত্য স্থাপিত হয়েছে। তারাই সমাজকে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং দিয়ে আসছে। বলা হচ্ছে, আধুনিক প্রযুক্তির এ যুগে মানুষের আবেগ কেড়ে নিয়েছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকের মধ্যেই স্বাবলম্বী ও স্বনির্ভর হওয়ার প্রবল ইচ্ছা শক্তি জেগেছে। তাদের গতি এতটাই বেড়েছে যে, পারিবারিক ও সামাজিক রীতি-নীতি, মূল্যবোধ এমনকি ধর্মীয় অনুশাসন এই গতির কাছে হার মানছে। এসব গুণাবলীর দিকে তাকানোর প্রয়োজনীয়তাবোধ করছে না। এর ফলে আমাদের দেশের আবহমান রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থা এবং সামাজিক বন্ধন ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে পড়ছে। শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের এই উদাসীনতার সুযোগ নিচ্ছে, সমাজের সবচেয়ে সংখ্যালঘু অথচ ভয়ংকর দুর্বৃত্ত শ্রেণী। তারা প্রাধান্য বিস্তার করছে এবং একের পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটাচ্ছে, যার শিকার হচ্ছে, উদাসীন সুশীল ও সচেতন শ্রেণী। একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তা যিনি বিয়ে ও ডিভোর্স সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখাশোনা করেন আলাপ প্রসঙ্গে জানান, গুলশান-বনানী-উত্তরার মতো অভিজাত এলাকা থেকে মাসে গড়ে প্রায় তিন হাজারের মতো ডিভোর্সের আবেদন করা হচ্ছে। আর একটু কম অভিজাত এলাকায় এই হার গড়ে এক হাজার। পুরুষের চেয়ে নারীরাই ডিভোর্সের আবেদন করছে বেশি। ওই কর্মকর্তার মতে, অভিজাত এলাকায় ডিভোর্সের হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ নারীদের মধ্যে অধিকমাত্রায় স্বনির্ভর হওয়ার প্রবণতা। এছাড়া নীতি-নৈতিকতার স্থান দুর্বল হয়ে যাওয়া, পুরুষদের মধ্যে চরিত্রহীনতা বৃদ্ধি এবং ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে নারী-পুরুষের যোগাযোগ স্থাপন, বিয়ে ও অবশেষে প্রতারণার শিকার হওয়া। বলাবাহুল্য, এসবের মূল কারণ সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়। শুধু অভিজাত এলাকাই নয়, দেশের সামগ্রিক পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থায়ও মূল্যবোধের অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। কেউ কেউ বলছেন, মূল্যবোধে পচন ধরেছে। এ ধরনের কথাবার্তা একেবারে অমূলক বা উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন পারিবারিক কলহের জের ধরে গড়ে খুন হচ্ছে ১৩ জনের মতো। আত্মহত্যা করছে ২৯ জন। পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলে যেসব খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রকাশিত হচ্ছে, এসব অপরাধের ধরণ ও পেছনের কারণ হিসেবে সামাজিক ও ধর্মীয়মূল্যবোধের অবক্ষয়কেই দায়ী করা হচ্ছে। সমাজবিদরাও বলছেন, নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাবে পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। যান্ত্রিক জীবনে বাড়ছে অস্থিরতা ও হতাশা। অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে মানুষ। শহরাঞ্চল ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে পারিবারিক অপরাধের মাত্রা বেশি। এসব ক্ষেত্রে ভিনদেশি বিশেষ করে ভারতীয় টেলিভিশন সিরিয়ালের বিকৃত গল্প, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব দায়ী। এছাড়া অর্থনৈতিক দুরবস্থা, পরকীয়া সম্পর্ক, মাদকাসক্তি, আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা, অসুস্থ প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব মানুষের মূল্যবোধকে নষ্ট করে দিচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা এ কথাও বলছেন, সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে সংহতি ও বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়ায় মারাত্মক অপরাধের ঘটনা ঘটছে।

চার.
পারিবারিক, সামাজিক নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন-এসব কোন আইনের মাধ্যমে হয়নি। জীবনকে সুশৃঙ্খল ও সঠিকপথে পরিচালিত করার লক্ষ্যেই মানুষ নিজস্বার্থে এসব মানবিক গুণাবলী ধারণ করেছে। তা নাহলে মানুষ সেই আদিম যুগেই পড়ে থাকত, আজকের সভ্যযুগে বসবাস করত না। আইনের মাধ্যমে অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে হয়তো দৃষ্টান্ত স্থাপন ও অন্যদের সতর্ক করা সম্ভব। তবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে শোধরানো সম্ভব নয়। এজন্য পরিবার ও সমাজের মহৎ ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা উচিত। পরিবার ঠিক থাকলে সমাজে তার প্রতিফলন ঘটে। পরিবারের অভিভাবক শ্রেণীকেই এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। পরিবারের নবীন সদস্যদের আচার-আচরণ ও চলাফেরার দিকে তী² নজর রাখতে হবে। তাদের সামনে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয়মূল্যবোধের চেতনাগুলো তুলে ধরতে হবে। পাড়া-মহল্লায় প্রভাবশালীদের নিজ নিজ এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে উদ্যোগী হতে হবে। প্রয়োজনে অপকর্মে লিপ্তদের পরিবারের অভিভাবকদের সাথে কথা বলতে হবে। স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয়মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে শিক্ষকদের মোটিভেশনাল ভূমিকা রাখা অপরিহার্য। জুম্মার নামাজের সময় মসজিদের ইমামদের এ ব্যাপারে বয়ান দিতে হবে। এখন আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি, কেউ ধর্মীয় কথা বললে তাকে বক্রদৃষ্টিতে দেখা হয়। কেউ কথা বলা থামিয়ে দেয়। অথচ সারাবিশ্বেই এখন মানুষ স্ব স্ব ধর্মের প্রতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছে। এমনকি উন্নত বিশ্বের সিনেমাগুলোও ধর্মকে গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করছে। এর মূল অর্থই হচ্ছে, মানুষকে মানবিক করে তোলা। আমাদের দেশ তাদের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত নয়। তবে আমরা যে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয়মূল্যবোধ থেকে তাদের চেয়ে এগিয়ে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণী, যারা সোস্যাল মিডিয়া নিয়ে সারাক্ষণ পড়ে থাকে, যার কারণে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সেই তাদেরকে দেখা গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অসহায় হয়ে পড়তে। অনেকেই ধর্মীয় কথাবার্তা লিখে এবং অন্যকেও ধর্মীয় আচার-আচরণে উদ্বুদ্ধ করতে লেখালেখি করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা সাময়িক মোহে ধর্মীয় অনুশাসন থেকে বিস্মৃত হলেও, ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা পেতে ধর্মের কাছেই আত্মসমর্পণ করছে। তাদের এই বিস্মৃতপ্রায় ধর্মীয় শাসন-বারণকে জাগিয়ে তুলতে পরিবার ও সমাজের অভিভাবকদের ভূমিকা রাখতে হবে। তা নাহলে, আত্মহত্যা, পরিবারের সদস্যদের খুনের মতো অপরাধ কোনভাবেই ঠেকানো যাবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের কাছ থেকে অপরাধীর প্রতি কঠোর ও সাধারণ মানুষের প্রতি বন্ধুসুলভ আচরণ কাম্য। সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে এ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শুধু অপরাধ বা অপরাধীদের ধরণ নিয়ে গবেষণা করলে চলবে না। পারিবারিক ও সামাজিক পরিবর্তন কিভাবে হচ্ছে, কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে, এসব বিষয় নিয়েও গবেষণা করতে হবে। দলীয় আনুগত্যর দিকে না তাকিয়ে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের দিকে তাকাতে হবে। অপরাধীর ক্ষমতার উৎসের কথা বিবেচনা না করে অপরাধকে আমলে নিতে হবে।
darpan.journalist@gmail.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন