ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১, ০৪ জৈষ্ঠ্য ১৪২৮, ০৫ শাওয়াল ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

তদবিরে ঘুরে যায় তদন্ত

গণপূর্তে ঝুলছে ৭৬ বিভাগীয় মামলা : প্রমাণিত অপরাধীরাও পেয়ে যায় অব্যাহতি

পঞ্চায়েত হাবিব | প্রকাশের সময় : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১:১১ এএম

চাকরিবিধি লঙ্ঘন, অসদাচারণ, চাকরি না করে বেতন উত্তোলন, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা কিংবা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্তাব্যাক্তিকে ম্যানেজ করে মামলা থেকে অব্যাহতি নিয়ে ফের অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে দুর্নীতিবাজ কিছু কর্মকর্তারা। সম্প্রতি আলোচিত কয়েকটি মামলা থেকে অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেয়ার বিষয়টি সামনে এনে প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ রেহাই পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
চাকরিবিধি লঙ্ঘন, অসদাচারণ, চাকরি না করে ৬ মাসের বেতন উত্তোলন, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ছিল গণপূর্তের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আলী আকবর সরকারের বিরুদ্ধে। বার কয়েক সতর্ক করার পরও কোনো কাজ না হওয়ায় স্ট্যান্ড রিলিজ করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করে গণপূর্ত অধিদফতর। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ২০১৭ সালে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এরপর কেটে যায় চার বছর। এই সময়ের মধ্যে দফায় দফায় চলে মামলার তদন্ত-পুণ:তদন্ত। অবশেষে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে দেয়া হয় তাকে। বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একেক জনের বিরুদ্ধে একেক নিয়ম মোটেই সমীচিন নয় বলে মনে করেন আইন ও অপরাধ বিষয়ক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিভাগীয় মামলায় যাদেরকে দায়ী করা হয় তাদের ৯৫ শতাংশেরই শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
এবিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) নির্বাহী সদস্য আলী ইমাম মজুমদার ইনকিলাবকে বলেন, বিভাগীয় মামলা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। বর্তমানে যে পদ্ধতিতে বিভাগীয় মামলার নিষ্পত্তি হয়, তাতে দুর্নীতির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা একই বিভাগের অন্য কর্মকর্তা তদন্ত করায় তা নিরপেক্ষ হয় না। বেশির ভাগ বিভাগীয় মামলার নিষ্পত্তি হয় আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়য়ের সচিব মো, শহীদুল্লাহ খন্দকার ইনকিলাবকে বলেন, বিভাগীয় মামলাগুলোর তদন্তকারী কর্মকর্তার বদলীজনিত কারণে অনেক সময় নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হয়। যে কারণে তদন্তে অনেকটা সময় ক্ষেপণ হয়।
পাবনার রুপপুরের আলোচিত বালিশকান্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত পাবনা গণপূর্ত সার্কেলের সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) রকিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয় ২০১৮ সালে। দীর্ঘসময় তদন্তে তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতাপাওয়া যায়। কিন্তু চাকরিতে নতুন যোগদান করার কারণ দেখিয়ে দায়মুক্তি দিয়ে দেয়া হয় তাকেও। শুধু এ দু’জনই নয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণাধিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শত শত অভিযুক্ত কর্মকর্তা ফাঁক ফোকর গলে এভাবেই বেরিয়ে যাচ্ছেন।
গণপূর্ত ডিজাইন বিভাগ-৪ এর সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) আবু সুফিয়ান মোহাম্মদ আছিবের বিরুদ্ধে ছুটি মঞ্জুর না হওয়া সত্বেও ৪০দিন কর্মস্থলে না আসার অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়। ২০১৭ সালে হওয়া এ মামলাটির তদন্ত করেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী প্রধান মো. নজরুল ইসলাম। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মেলায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এভাবেই লঘু অপরাধে গুরুদন্ড আর গুরুতর অপরাধে লঘুদন্ড এমনকি অব্যাহতিও মিলছে এ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক, পূর্তভবন, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন দপ্তর- অধিদপ্তরে সংশ্লিষ্টদের মাঝে এনিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিভাগীয় মামলার তদন্ত সেলের প্রধান ও মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং মামলার রায় প্রদানকারী ও মন্ত্রণালয়ের সচিবের বিরুদ্ধে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অনৈতিক লেনদেন ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সচিব ও অতিরিক্ত সচিব দু’জনই। তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে অনেক অভিযোগ সত্য মনে হলেও তদন্তে প্রকৃত ঘটণা উদঘাটন হলে দেখা যায় অনেকেই নির্দোষ। এক্ষত্রে তাদের অব্যাহতি দিতে হয়। তবে প্রকৃত দোষীরা শান্তি পান বলেও দাবি করেন তারা।
গণপূর্ত অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বিরুদ্ধে ৭৬টি বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে। এরমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তাই বেশিরভাগ। নানা অপরাধে এ তালিকায় অভিযুক্ত ৬৩ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। আর ১৩ জন রয়েছেন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারি। তথ্যমতে, অনিষ্পন্ন অবস্থায় থাকা এ মামলাগুলোর সবগুলোই এক বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলছে। এরমধ্যে দুই, তিন, চার বছর ধরেও ঝুলে থাকা মামলা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রাথমিকভাবে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ মামলার পরিণতিই ভালো হয়না। অভিযুক্তের নানামুখি তদবির ও অনৈতিক লেনদেনের কারণে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মামলাগুলো একসময় নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। এরপর তদন্তকারী কর্মকর্তা কিংবা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্তাব্যাক্তিকে ম্যানেজ করে মামলা থেকে অব্যাহতি নিয়ে ফের অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে দুর্নীতিবাজরা। সম্প্রতি আলোচিত একটি মামলা থেকে অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেয়ার বিষয়টি তারা সামনে এনে প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ রেহাই পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ পিডব্লিউডি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সমিতির সাবেক সাধারন সম্পাদক আলী আকবর সরকারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। ২০০৪ সালে চাকরি জীবন শুরুর পর থেকেই লাগাতার চাকরি বিধি লঙ্ঘন করে আসেন তিনি। নানা নেতিবাচক কর্মকান্ডের সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের মাধ্যমে উপার্জন করেন কাড়ি কাড়ি টাকা। প্রকৌশলীদের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙ্গে একের পর এক অনিয়ম ও লুটপাট চালিয়ে যান তিনি। যে কারণে সংশ্লিষ্টরা ২০১৬ সালের ০৯ অক্টোবর তাকে সাভার গনপূর্ত বিভাগ থেকে খুলনা গনপুর্ত বিভাগে বদলির আদেশ জারি করে। কিন্তু এই কর্মকর্তা দাফতরিক নির্দেশ লঙ্ঘন করে দায়িত্বে যোগ না দেয়ায় পরদিন ১০ অক্টোবর কর্তৃপক্ষ তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করেন। এর পরপরই এই কর্মকর্তা তার বদলির আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রীট করেন। এক মাস মামলা চলার পর ২২ নভেম্বর প্রধান বিচারপতির নের্তৃত্বে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তার রীট খারিজ করে দেন। এরপর দীর্ঘ ৬ মাস ঢাকা, চাঁদপুর বা খুলনা কোথাও যোগ দান না করেই বেতন ভাতাদি উত্তোলন করেন তিনি। এনিয়ে অপত্তি তুলে একাউন্টস অফিসও। প্রাথমিক তদন্তে এসবের সত্যতা মেলার কথা সচিব নিজেও গণমাধ্যমে স্বীকার করেছেন। কিন্তু এরপরই অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার নানামুখি তদবিরে ঝুলে যায় মামলা। একে একে চারবার পুণঃতদন্তে সময়ক্ষেপণ করা হয়। সর্বশেষ তাকে দায়মুক্তি দেয়া হয়।
অন্যদিকে ৩৩তম বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গণপূর্ত ডিজাইন বিভাগ-৪ এর সহকারী প্রকৌশলী আবু সুফিয়ান মোহাম্মদ আছিব যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে অংশগ্রহণের জন্য তিন বছরের শিক্ষা ছুটির আবেদন করেন, যা মঞ্জুর করা হয়নি। পরবর্তীতে তিনি ৪০ দিনের অর্জিত ছুটির আবেদন করেন। তার অর্জিত ছুটির আবেদনটি মঞ্জুর হওয়ার আগেই তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। এ অভিযোগে তাকে সরকারীকর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩ এরউপবিধি (খ) ও (গ) অনুযায়ী অসদাচরণ” ও (ডিজারশন) অর্থাৎ “পলায়ন” এর প্রমাণিত অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে একই বিধিমালার বিধি ৪ এর উপবিধি ৩ এর (১) (ঘ) অনুযায়ী “চাকুরী হতে বরখাস্ত করা হয়।
এদিকে নানা অনিয়মের কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. শওকত আকবর, উপ-প্রকল্প পরিচালক হাসিনুর রহমান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান ও মো. মাহবুব, পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মাসুদুল আলম, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী তাহাজ্জুদ হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্ত ঢিমেতালে চলছে বলে জানা গেছে। এছাড়া উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোস্তফা কামাল, আহম্মেদ সাজ্জাদ খান, মো. তারেক, সহকারী প্রকৌশলী রুবেল হোসাইন ও আমিনুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফজলে হক, সুমন কুমার নন্দী, মো. রফিকুজ্জামান, জাহিদুল কবীর, মো. শাহীন উদ্দিন, আবু সাঈদ, শফিকুল ইসলাম ও রওশন আলী, পাবনার তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী দেবাশীষ চন্দ্র সাহা, রাজশাহী গণপূর্ত সার্কেলের উপ-সহকারী প্রকৌশলী খন্দকার মো. আহসানুল হক, খোরশেদা ইয়াছরিবা, পাবনা গণপূর্তের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সুমন কুমার নন্দী, রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নজিবর রহমান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন, শাহনাজ আক্তার, নির্বাহী প্রকৌশলী তানজিলা শারমিন, আশরাফুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. শফিউজ্জামানের তদন্তের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়।
গণপূর্তের বিভাগীয় মামলা তদন্তকারী দলের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব মো. হেমায়েত হোসেন এবিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে সচিবের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন