বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১১ কার্তিক ১৪২৮, ১৯ রবিউল আউয়াল সফর ১৪৪৩ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

বাড়ছে দুর্ঘটনা, ঝরছে প্রাণ

বিশৃঙ্খলাই সড়কে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ : অধ্যাপক শামছুল হক চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি : খন্দকার এনায়েত উল্যাহ

খলিলুর রহমান | প্রকাশের সময় : ২২ মার্চ, ২০২১, ১২:০০ এএম

দিন দিন বেড়েই চলছে সড়ক দুর্ঘটনা। প্রাণ হারাচ্ছেন হাজারো মানুষ। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও মায়ের বুক খালি হচ্ছে। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় বাকরুদ্ধ হচ্ছেন স্বজনরা। আবার অনেকেই বরণ করছেন চিরতরে পঙ্গুত্ব। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার চরম আর্থিক সঙ্কটে দিন কাটাচ্ছে। এভাবেই পথে বসছে অনেক পরিবার। কিন্তু এর দায় কেউ নিতে চাচ্ছেন না। চালকের বেপরোয়া মনোভাব, সড়কে বিশৃঙ্খল চলাফেরা, আইনের তোয়াক্কা না করাসহ বিভিন্ন কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ গতকাল সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ফরিদপুরেই পৃথক দুর্ঘটনায় ১১ জন। এছাড়া হাটহাজারীতে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় দুইজন ও মানিকগঞ্জের সিংগাইরে এক পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।

ফরিদপুর ও ঝিনাইদহ থেকে আমাদের সংবাদদাতারা জানান, গতকাল সকালে ঢাকাগামী একটি হাইস মাইক্রোবাস-খুলনাগামী একটি ট্রাকের সাথে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মাঝকান্দি নামক স্থানে মুখোমুখি সংর্ঘষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই এক নারীসহ মোট ৪ জনের মৃত্যু হয়। এ সময় আহত হয় অন্তত ২০ জন। আহতদের উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হলে সেখানে এক শিশুসহ ৫ জন মারা যায়।

দুর্ঘটনায় নিহতদের বাড়ি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ও কাজিরবেড় ইউনিয়নে। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর দুটি ইউনিয়নে চলছে শোকের মাতম। স্বজন হারানো কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে সীমান্তের কয়েকটি গ্রাম। ডুকরে ডুকরে কান্নার আওয়াজ আসছে ঘর থেকে। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।

নিহতরা হলেন- ঝিনাইদহ জেলা আইনজীবী সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক ও বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপিসাধারণ সম্পাদক, বাগানমাঠ গ্রামের অ্যাডভোকেট আব্বাস আলী, তার ভাগিনা মাইক্রো চালক আল আমিন, ভৈরবা গ্রামের বৃদ্ধ মিয়াজান বিবি (৬৬), মেয়ে আমেনা খাতুন, পুত্রবধূ কুটি বিবি, পোতা জামাই জুয়েল হোসেন, পুতনি মরিয়ম নেছা ও তার ৫ বছরের শিশু এবং নিকটাত্মীয় সামন্তা গ্রামের নজরুল ইসলাম।

অপরদিকে ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ওসি ওমর ফারুক জানান, ঢাকায় অধ্যয়নরত কয়েক বন্ধু মিলে উপজেলার কাউলিবেড়া ইউনিয়নের কাউলিবেড়া গ্রামে পিকনিকের আয়োজন করেন। সারারাত বন্ধুদের সাথে সময় কাটিয়ে গভীর রাতেই মোটরসাইকেল যোগে কাউলিবেড়া থেকে ভাঙ্গা পৌর সদরের উদ্দেশে রওনা দেয় তিন বন্ধু। গোল চত্বরের নিকট মোটরসাইকেলটি পৌঁছালে বিপরীতগামী প্রাইভেটকারের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলে থাকা রনি ফকির ও শাকিল খান ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুত্বর আহত হন তাদের অপর বন্ধু অপু। আহতকে উদ্ধার করে রাতেই ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন কর্তব্যরত ডাক্তার। নিহত রনি ফকির ভাঙ্গা বাজারের ব্যবসায়ী আবু তালেব ফকিরের সন্তান ও নিহত শাকিল করাতকল ব্যবসায়ী শফিকুলের সন্তান। এদের দু’জনের বাড়িই ভাঙ্গা পৌরসদরে। ঘাতক প্রাইভেটকারটি পুলিশ জব্দ করেছে। সেই সাথে প্রাইভেটকারের চালক জাকির আহম্মেদকে আটক করেছে পুলিশ।
হাটহাজারী উপজেলা সংবাদদাতা জানান, হাটহাজারীতে কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় মো. খালেক (৩৫) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছে। সে ফতেয়াবাদ পশ্চিম ছড়ারকুল এলাকার মৃত ইমাম হোসেনের ছেলে। অপর দুইজন গুরুত্বর আহত হয়।

সিংগাইর উপজেলা সংবাদদাতা জানান, মানিকগঞ্জের সিংগাইরে মিরপুর শাহআলী থানায় কর্মরত কন্সস্টেবল মো.মিজানুর রহমান (৪৫) সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হেমায়তেপুর-সিংগাইর-মানিকগঞ্জের আঞ্চলিক মহাসড়কের আজিমপুর এলাকার আজিজ পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন মোটরসাইকেল, সিএনজি ও মাইক্রোবাসের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনি মারা যান। নিহত মিজানুর রহমান ঢাকা জেলার ধামরাই থানার কৃষ্ণনগর গ্রামের জিন্নত আলীর ছেলে।

জানা গেছে, মিজানুর রহমান তার কর্মস্থল ঢাকার শাহআলী থানা থেকে মোটরসাইকেল যোগে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথিমধ্যে সিংগাইর বাসস্ট্যান্ড পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা মাইক্রোবাস ঢাকা মেট্রো-ঠ ১৪-৩৮৫৩ তার মোটরসাইকেল চাপা দেয়। এতে সে গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা গুরুতর অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক অবস্থার অবনতি দেখে ঢাকায় রেফার্ড করেন। পরে এনাম মেডিক্যাল কলেজে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগে গত শনিবার সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বগুড়ায় ৪, চট্টগ্রামে ২, চুয়াডাঙ্গা, ফেনী, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ, যশোর ও আদমদীঘিতে রয়েছেন একজন করে। এছাড়া গত শুক্রবার ছুটির দিনে বাৎসরিক ওরশ শরীফে যোগ দেয়ার আগেই প্রাণ হারিয়েছিলেন তিন বন্ধু। গত বৃহস্পতিবার রাতে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে এ ঘটনা ঘটে। শুধু তাই নয়, রাজশাহীর পুঠিয়ায় ভাইয়ের নতুন বউকে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় মোটরসাইকেল থেকে মহাসড়কে ছিটকে পড়েন টুম্পা নামে এক নারী। এসময় বিপরীতদিক থেকে আসা একটি মালবাহী ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় মোটরসাইকেলে থাকা তার স্বামী ও সন্তান। এছাড়া ওই দিন আরো সাতটি দুর্ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এসকল ঘটনায় ১০ জন আহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ ইনকিলাবকে বলেন, চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। তাদের প্রশিক্ষণ না হলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এছাড়াও সড়ক থেকে নসিমনসহ ছোট যানবাহনগুলো বন্ধ করতে হবে। বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ছোট যানবাহনের জন্যই ঘটে থাকে। মহাসড়কের যেসব এলাকায় ছোট যানবাহন চলে সেই যান চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী ইনকিলাবকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। আমরা প্রতিনিয়ত সোচ্চার থাকার চেষ্টা করি, যাতে করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে। সবাই যদি সঠিক দায়িত্ব পালন করি, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা কাক্সিক্ষতমাত্রায় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, যেসব দুর্ঘটনা হচ্ছে কারো না কারো দায়িত্ব অবহেলার কারণেই হচ্ছে। সকলেই দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) পরিচালিত সর্বশেষ জরিপের তথ্যমতে, চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। ঢাকায় সাম্প্রতিক সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর সবকটিতেই বেপরোয়া চালানোকে দায়ী করেছে এআরআই।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির জরিপ বলছে, ২০২০ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ৬৮৬ জন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৬০০। গত বছরে ৪ হাজার ৮৯১টি সড়ক দুর্ঘটনার বিপরীতে নিহত ও আহতের এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে সংগঠনটি।

২০১৯ এর তুলনায় ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে জানিয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯-এর তুলনায় ২০২০ সালে ১২ শতাংশ দুর্ঘটনা কমেছে। কিন্তু এটাকে কম বলা যাবে না। কারণ, করোনায় দুই মাসের বেশি সময় গণপরিবহন বন্ধ ছিল। সে হিসেবে ২০২০ এ সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। ২০১৯ সালে যেখানে সড়কে মারা গেছে ৭ হাজার ৮৫৫ জন। ২০২০ সালে মারা গেছে ৬ হাজার ৬৮৬ জন।

অপরদিকে, রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব মতে, ২০২০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ৪৩১ জন। সারা দেশে ৪ হাজার ৭৩৫টি দুর্ঘটনায় এই প্রাণাহানি ঘটেছে। এছাড়া আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৭৯ জন।
রোড সেফটি জানায়, নিহতের মধ্যে নারী ৮৭১, শিশু ৬৪৯। ১ হাজার ৩৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৪৬৩ জন, যা মোট নিহতের ২৬.৯৩ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ২৯.১০ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১৫১২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৭.৮৪ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৬৮৩ জন, অর্থাৎ ১২.৫৭ শতাংশ।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল (সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের অধ্যাপক শামছুল হক ইনকিলাবকে বলেন, সড়কে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। এই বিশৃঙ্খলা দিন দিন বাড়লেও কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই। বিশৃঙ্খলা কমিয়ে যদি সুশৃঙ্খল করা যায় এবং এটাকে নজরদারি করে দীর্ঘদিন ধরে রাখা যায় তা হলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, আমাদের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। একই সাথে বিশৃঙ্খলাও বাড়ছে। বিজ্ঞান অনুযায়ী আরো বেশি দুর্ঘটনা হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে আল্লাহর রহমত রয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ ও তা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ সম্পর্কে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপপরিচালক মোহাম্মাদ আব্দুর রাজ্জাকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে জানতে হলে পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানীর সাথে যোগাযোগ করতে হবে। পরে তার সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন