ঢাকা, সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ০৭ আষাঢ় ১৪২৮, ০৯ যিলক্বদ ১৪৪২ হিজরী

জাতীয় সংবাদ

ব্যাংকে নতুন নোটের সঙ্কট

বাইরে ছোট নোটের জমজমাট ব্যবসা

হাসান সোহেল | প্রকাশের সময় : ৮ মে, ২০২১, ১২:০২ এএম

আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছাড়লেও সঙ্কট দেখা দিয়েছে নতুন নোটের। বিশেষ করে ছোট ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোটের সঙ্কটই বেশি। কোন কোন ব্যাংকে ২০ টাকার নোট মিললেও ১০ টাকার নতুন নোট মিলছে না। এদিকে মাদকসেবীদের কাছে হেরোইন ও ইয়াবা সেবনের জন্য ২ ও ৫ টাকার নতুন নোটের কদর ও বেশ চাহিদা। পাশাপাশি সীমানা পেরিয়ে ভারতে গেলেই এর দাম হয়ে যাচ্ছে যথাক্রমে ৫ ও ১০ রুপি। আর তাই বাংলাদেশ ব্যাংক আগেই সরকারি ২ ও ৫ টাকার নতুন নোট বাজারে ছাড়া বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে ২, ৫, ১০ ও ২০ টাকার ছোট নোটগুলো বাইরে ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে ছোট নতুন নোট বাইরে চলে যাওয়ায় বাজারে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে বলে বিভিন্ন ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

মুসলমানদের ঈদ আনন্দের অনিবার্য অনুষঙ্গ সালামি। ঈদের সেলামি মানেই টাকশাল থেকে আসা ঝকঝকে নতুন নোট। তাই এই সময়ে এই সব ছোট নোটের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় সঙ্কট আরও ঘণীভূত হয়েছে।
যদিও নতুন নোট সরবরাহের কোন ঘাটতি নেই বলে ইনকিলাবকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, তিন মাসে ১৪ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে ছাড়ার টার্গেট নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইতোমধ্যে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট বাজারে এসেছে। করোনার কারণে এবার অন্যান্য বছরের মতো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গ্রাহককে নতুন টাকা দেয়া হচ্ছে না। তবে নতুন টাকার কোন ঘাটতি নেই।

গত কয়েকদিন সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন ব্যাংকে ঘুরে দেখা যায়, কোনো ব্যাংকেই নতুন ১০ টাকার নোট নেই। শেখ আব্দুর রহিম নামের এক নতুন টাকার গ্রাহক জানান, অগ্রণী, রূপালী, বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) ব্যাংক ঘুরেও ১০ টাকার নতুন নোট পাইনি। সবারই একই কথা ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোটের সঙ্কট। অবশ্য ২০ টাকার দু’একটি বান্ডেল দিতে পারলেও ১০ টাকার নোট কোনো ব্যাংক দিতে পারেনি বলে জানান আব্দুর রহিম। অবশ্য ব্যাংকগুলোতে ছোট নোটের সঙ্কট থাকলেও রাজধানীর গুলিস্তান, মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংক ও সেনাকল্যাণ ভবনের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, নতুন টাকার পসরা সাজিয়ে বসেছেন পুরানো ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কেউ টুল নিয়ে বসে আবার কেউ দাঁড়িয়ে বিক্রি করছেন টাকা। আইন অনুযায়ী, এভাবে পসরা সাজিয়ে টাকা বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও অবাধেই চলছে এ ব্যবসা। এছাড়া এ বছর করোনার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি গ্রাহককে নতুন টাকা না দিলেও সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ঈদকে সামনে রেখে নতুন নোটের গ্রাহকদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিভিন্ন ব্যাংকে দীর্ঘ লাইন ছিল গ্রাহকদের। অনেককেই দিনভর লাইনে দাড়িয়ে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। কেউবা আবার বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে নতুন টাকা কিনে নিয়েছেন।

এদিকে এবার বাইরের মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও আছেন বিপাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যাশ শাখার অসাধু কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা ১০ টাকার এক বান্ডিল নতুন নোট কিনছেন ১শ’ টাকা বেশি দিয়ে ১১শ’ টাকায়। যা বাইরে বিক্রি করছেন ১১শ’ ৫০ টাকায়। অথচ অন্যান্য বছর ব্যবসায়ীদের থেকে ১০ টাকার এক বান্ডিল নতুন নোট কিনতে গ্রাহককে অতিরিক্ত ৫০ টাকা দিলেই হতো। যদিও নতুন নোট নিতে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে এবার নতুন নোটের চাহিদাও কম। অন্যান্য বছরের ন্যয় নতুন নোট বিক্রি করতে না পেরে ব্যবসায়ীরাও আছেন বিপাকে। তাদের মতে, অন্যবারের তুলনায় তাদের বাজার এবার মন্দা যাচ্ছে।

ক্রেতা নেই বললেই চলে, এমনটাই বলছেন নতুন টাকার ব্যবসায়ী ছমিরা বেগম। তাদের কাছে ৫০, ১০০ ও ২০০ টাকার এক হাজার নোট কিনতে হলে ৬০-১০০ টাকা বেশি দেয়া লাগে। তবে ৫, ১০ এবং ২০ টাকার নোট প্রতি এক হাজার কিনলে ১২০-১৫০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয় তাদের কাছ থেকে। ছমিরা বেগম বলেন, এবার ছোট নতুন টাকা কিনতে একটু বেশিই ব্যয় করতে হচ্ছে। কারণ আমাদেরও বাড়তি দিয়ে কিনতে হচ্ছে।

হালিমা খাতুন নামের এক ব্যবসায়ী জানান, ছোট নোটের চাহিদা বেশি। তবে এবার এসব নোটগুলো অধিক বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আর তাই এবারের ঈদে বিক্রি নেই। আমাদের সংসার চলে টাকা বিক্রি করে, কিন্তু এবার ক্রেতা কম, বিক্রিও কম। এখন সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মামুন নামে এক টাকা ব্যবসায়ী জানান, নতুন টাকার মূল উৎস বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখান থেকে কর্মচারীদের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা টাকা বের করে নিয়ে আসেন। এ জন্য কর্মচারীদেরও কমিশন দিতে হয়। তবে এবার কমিশন অন্যান্য বছরের তুলনায় একটু বেশি দিতে হচ্ছে। তাই আমাদেরও গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম রাকতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের ডিজিএম শরীফ হোসাইন ইনকিলাবকে বলেছেন, ১০ ও ২০ টাকার নতুন নোট চাহিদা দিয়েও পাচ্ছেন না। ২০ টাকার নোট কিছু থাকলেও ১০ টাকার নোট নেই বলেই উল্লেখ করেন শরীফ হোসাইন। একই অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন রূপালী ব্যাংক প্রিন্সিপাল শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা। গতকাল তিনি জানান, ১০ ও ২০ টাকার কোন নতুন নোট দেয়া সম্ভব নয়। ব্যাংকে ১০ ও ২০ টাকার কোন নোট নেই। যারা এই দুটি নোট চাচ্ছেন তাদেরকে হয় ৫০ বা ১০০ টাকা দেয়া হচ্ছে অন্যথায় টাকা ছাড়াই ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ১০ টাকার নোটের ব্যাপক সঙ্কট রয়েছে। এছাড়াও ২০ টাকারও কিছুটা সঙ্কট রয়েছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যেও কিছু দালাল রয়েছে যারা বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছে নতুন নোট বিক্রি করে। ওইসব ব্যবসায়ীরা মৌসুমভর এই টাকা বিক্রি করে। তবে ১৪ হাজার কোটি টাকার নতুন এ বছর পর্যাপ্তই বলেন তিনি। কারণ করোনায় এ বছর মানুষের নতুন নোটের চাহিদাও কিছুটা কম।

নতুন ১০ ও ২০ টাকার নোটের সঙ্কট সম্পর্কে মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, এ ধরণের খবর আমার জানা নেই। তিনি বলেন, নতুন টাকার সংকট নেই। ভল্টে পর্যাপ্ত টাকা আছে।

 

 

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন