ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ১০ আষাঢ় ১৪২৮, ১২ যিলক্বদ ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

সাবধান না হলে সামনে বড় বিপর্যয়

সুলেখা প্রয়াসী | প্রকাশের সময় : ১৯ মে, ২০২১, ১২:০২ এএম

করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতার মুখে দেশ। সরকারি হিসেবে মৃত্যুহার কম হচ্ছে বলে জানিয়েছে। কিন্তু বিষেশজ্ঞরা বলছেন বাস্তব চিত্রটা আমাদের অজানা। করোনা মোকাবেলায় এক বছরের বেশি সময় পেয়েও আমরা খুব বেশি সফল হইনি। তখনও যে অবস্থা এখনোও প্রায় একই অবস্থা। বরং রোগী বাড়ায় আরো সঙ্কট দেখা দিয়েছে। করোনা এমন একটি ভাইরাস যা প্রকৃতিগতভাবে ধরণ পাল্টাতে সক্ষম এবং অধিকতর শক্তিশালী। যেটা পার্শ্ববর্তী ভারতের নাজেহাল অবস্থা দেখে বোঝা যায়। ভারতের করোনার ভেরিয়্যান্ট আরো অনেক দেশেই পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে আমাদের দেশেও শনাক্ত হয়েছে ভরতীয় ভেরিয়্যান্ট, যা দ্রæত ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে এখনই যদি সাবধানতা অবলম্বন না করা হয়, তাহলে সামনে আমাদের জন্য বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, লকডাউনের ফলে দেশে করোনা শনাক্তের হার কমেছিল। কিন্তু বর্তমানে দেশে চলছে ঢিলেঢালা লকডাউন। মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা অনেক মানুষের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। প্রায় সকলেই আমরা ভেবে নেই আশপাশের সবাই আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও অন্তত আমার কিছু হবেনা, আমাদের সাথে এমন ঘটনা ঘটবে না, এ ধারনা খুবই ভয়ংকর। যতক্ষণ না নিজে আক্রান্ত না হচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত হুঁশ হচ্ছে না। ভারতে মৃত্যুর মিছিল, শারিবদ্ধ লাশ, গণচিতা, গণকবর দেখেও শিক্ষা না নিয়ে আমরা একই ভুল করছি। ঈদকে ঘিরে শপিংমলগুলোতে মানুষ ভিড় ঠেলে দিনভর শপিং করা হয়েছে, মানা হয়নি স্বাস্থ্যবিধি। আবার ভেঙ্গে ভেঙ্গে পিকআপ, ট্রাক, মোটরসাইকেল এমনকি হ্যাচারির গাড়িতে করে মানুষ যেভাবে বাড়ি গেছে তাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিল্ড হাসপাতালসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যদি বাড়ানোও হয় তবুও মানুষ যদি সচেতন না হয় তবে পরিস্থিতি মোবাবিলা করা আমাদের পক্ষে শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই জনসাধারণের সতর্কতা ও সচেতনতা অতিব জরুরী। এই ক্রান্তিকালেও যদি মানুষের বোধ জাগ্রত না হয় তবে চরম মূল্য দিতে হবে জাতিকে।

করোনা প্রথমেই ফুসফুসে আক্রমন করায় অধিকাংশ করোনা রোগীর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়ায় অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু বর্তমানে অক্সিজেন সঙ্কট না থাকলেও রোগী বাড়লে অক্সিজেনের সঙ্কট দেখা দেবে বলে জানিয়েছেন অক্সিজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও জনস্বাস্থ্যবিদগণ। এদিকে ভারত থেকে তরল অক্সিজেন আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে, ভারত যে বাস্তবতার মুখে আছে তাতে কবে নাগাদ অক্সিজেন আমদানি করতে পারবে দেশ তা সঠিক ভাবে বলা যাচ্ছেনা। যেহেতু অক্সিজেন উৎপাদনে বিশেষ কোনো কাচামাল প্রয়োজন হয়না তাই, অক্সিজেন সঙ্কট কমাতে আমদানী নির্ভর নীতিতে না থেকে দেশেই আরো অক্সিজেন প্লান্ট বসিয়ে উৎপাদন বাড়াতে হবে। বর্তমানে ভ্যাকসিন নিয়ে যে সংকট তা সরকারকে আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে। মানুষের জীবন বাঁচাতে অন্যান্য দেশ থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা জরুরী। ভ্যাকসিনের আবশ্যিকতা পূরণের জন্য দেশেই ভ্যাকসিন তৈরির পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা পৃথিবীতে লম্বা সময় ধরে থাকবে, এজন্য জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। গণস্বাস্থ্য’র ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ’র, গণস্বাস্থ্য ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের ঘরে ঘরে, তাঁরা বাড়িতে গিয়ে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করছে স্বল্পমূল্যে এবং পরিবারের একজনকে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেছেন কিভাবে করোনা রোগীকে সেবা দিতে হয়, ফলে হাসপাতালগুলোর উপর চাপ কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এই ক্রান্তিকালে যদি এমন আরো অনেকে এগিয়ে আসে তবে করোনা মোকাবেলা করা আমাদের জন্য আরো সহজ হয়ে যাবে। পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাওয়ার আগেই পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ প্রস্তুত করতে হবে স্বেচ্ছাসেবী সম্মুখযোদ্ধাদের, মজুদ রাখতে হবে করোনার চিকিৎসা সামগ্রী।

এই মহামারিতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ কাজ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। দেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমবহুল তৈরি পোশাক খাতেই ৩ লাখ ৫৭ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাপডন ইন বাংলাদেশের সমীক্ষায় এমনটিই বলা হয়েছে। টিআইবির আরেক গবেষণা থেকে জানা যায়, মহামারীতে ৭৭ ভাগ শ্রমিকের পক্ষে পরিবারকে খাদ্য সহায়তা করা সম্ভব হয়নি। ফলে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। যদিও সরকার করোনা রোধকল্পে সার্বিক কার্যাবলী/ চলাচলে বিধি নিষেধ আরোপ করায় সিটি করপোরেশন এবং জেলা প্রশাসকগণের অনুকূলে মানবিক সহায়তা হিসেবে বিতরনের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। ৩৩৩ নম্বরে ফোন করলে তার জন্য খাদ্য সহায়তার কার্যক্রমও চালু রেখেছে। তবে তা চাহিদানুযায়ী পর্যাপ্ত না হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বের হচ্ছে জীবন-জীবিকার সন্ধানে, বেছে নিচ্ছে বিভিন্ন পন্থা, এমনকি ভিক্ষাবৃত্তিও। দরিদ্র ও অসহায় মানুষ যাতে ঘরে থাকতে পারে তার জন্য সাধ্যনুযায়ী এগিয়ে আসতে হবে আমাদের। মানুষের প্রাণ বাঁচানোই এই মূহুর্তে সবচেয়ে বড় অর্জন।

স্বল্পন্নোত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে বাংলাদেশ। গত ২২-২৬ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কে সিডিপি বৈঠকে বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়। সাধারণত সিডিপি’র চূড়ান্ত সুপারিশের ৩ বছর পর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেয়া হয়। সেই হিসেবে ২০২৪ সালে এই তালিকা থেকে বাংলাদেশের বের হওয়ার কথা থাকলেও করোনার প্রভাব মোকাবিলায় আরও ২ বছর বেশি সময় চেয়েছে বাংলাদেশ। সুতরাং ২০২৬ সালের পর আর এলডিসির তালিকায় থাকছেনা বাংলাদেশ। এটা আমাদের জন্য যেমন গৌরব এবং সম্মানের, তেমনি দায়িত্বেরও। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের কাতারে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যসহ অন্যান্য অনেক সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে সকলের দায়িত্ব বহুগুণে বেড়ে যাবে। ডা. লুৎফর রহমানের ভাষায় বলতে গেলে, ‘এক একটা মানুষ নিয়েই এক একটা জাতি’। দেশকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে ধরে রাখতে প্রত্যেক মানুষকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাই এই ক্রান্তিকালে স্বাস্থ্যখাতসহ অন্যান্য সকল খাতকে রাখতে হবে দূর্নীতিমুক্ত। বলা হয়, শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, শিক্ষার জন্য যেমন বিদ্যালয় জরুরী তেমনি সুস্থ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ সৃষ্টির জন্য স্বাস্থ্যখাতকে এগিয়ে নেয়াও জরুরী। দেশকে এগিয়ে নিতে সুস্থ ও কর্মক্ষম মানবসম্পদ তৈরির কোন বিকল্প নেই।

সংক্রমণ চরমে উঠার আগেই সরকারকে বিশষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে, প্রয়োজনে হতে হবে আরো কঠোর। আর সাধারণ মানুষের করনীয় হলো সর্বোচ্চ সচেতনতা অবলম্বন করা। শুধু সরকারকে দায় দিয়ে সংক্রমণ এড়ানো যাবে না। মনে রাখা জরুরী, নিজের জীবন অতি মূল্যবান, পরিবারের সদস্যদের জীবনের মূল্য অনেক, অসচেতন হয়ে সেই মূল্যবান জীবনকে যেনো মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দেয়া হয়। করোনা মোকাবেলায় মাস্ক পরা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। অতিতের মহামারীগুলোতে পৃথিবী কিভাবে মুক্ত হয়েছিল তা থেকে শিক্ষা নিয়ে, নিতে হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। শতবছর আগে ‘স্প্যানিশ ফ্লু’র সময় সরকার মানুষকে মাস্ক পরিধানে বাধ্য করতে আইন পাশ করেছিল এবং দীর্ঘদিনের জন্য বড় জমায়েত নিষিদ্ধ করেছিল। পূর্বে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব বেশি প্রসারিত না হওয়ায় মহামারীগুলো এত দ্রæত এক দেশ থেকে আরেক দেশে সংক্রমিত হয়নি। কিন্তু বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রসারিত হওয়ায় দ্রুতই এক দেশ থেকে আরেক দেশে সংক্রমিত হয়েছে। তাই আমরা যখনই বাইরে বের হবো অবশ্যই মাস্ক পরবো। হাত ধোয়ার আগে চোখে মুখে হাত দিবো না, এড়িয়ে চলবো জনসমাগম। করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার প্রায় ৮০ শতাংশই হলো ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সের। এ সময় এদের রক্ষার্থে নিতে হবে বাড়তি সতর্কতা। একটু জ্বর, শর্দি-ঠান্ডাতেই হাসপাতালে গিয়ে বিভ্রান্তিতে না ভুগে বাড়িতে সঠিক পরিচর্যায় থাকাটায় সমিচীন, তাহলে হাসপাতালের উপরও চাপ কমে আসবে। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, করোনা একজনের মাধ্যমে অন্যজনের শরীরে প্রবেশ করে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তির ঘরের বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকা এবং আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নূন্যতম ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখা অতিব জরুরি। কিন্তু উপসর্গ ছাড়াও এখন অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। ঠিক এই মূহুর্তে আমি, আপনি বা পাশের কে করোনা পজিটিভ তা কেউ জানিনা। তাই সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে সকলকে। বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে আরো সচেতন করে তুলতে হবে। মহল্লায় মহল্লায় টিম গঠন করে হলেও সবার মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, প্রয়োজনে রাখতে হবে জরিমানাসহ শাস্তির ব্যবস্থা। বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং পরবর্তী ঢেউ রুখতে নিজে সুরক্ষিত থাকি অন্যকেও সুরক্ষিত রাখি। সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমেই আমরা করোনা মোকাবেলা করবো ইনশাআল্লাহ।
লেখিকাঃ প্রাবন্ধিক।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন