বুধবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২২, ০৫ মাঘ ১৪২৮, ১৫ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী

ইসলামী জীবন

তাওহীদের আলো যেভাবে ছড়িয়ে গেল

মোহাম্মদ শরীফ | প্রকাশের সময় : ২১ মে, ২০২১, ১২:০৪ এএম

মুসলমানগন মদিনায় আগমনের ফলে তাওহীদের দাওয়াতের ভিত্তি আরো মজবুত এবং সু-প্রতিষ্ঠিত হবে। এবং মদীনা বাসীদের কে মক্কাবাসীদের বিপক্ষে যুদ্ধে অংশ নিলে তা হবে মক্কাবাসীদের জন্য অত্যন্ত বিপদজনক। মক্কার মুশরিকরা উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ সচেতন ছিল। সমস্ত কুফ্ফারে মক্কাবাসীদের নিকট রাসুলুল্লাহ সা:কে ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ালো ।এবং তারা রাসুলুল্লাহ সা: কে প্রতিহত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। কিন্তু কিভাবে তাকে ঠেকানো যায় সে বিষয়ে সকলেই চিন্তিত, অতঃপর দারুন নদওয়াতে(কুরাইশদের সংসদ ভবন) পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়। এবং সেই বৈঠকে সকল কুরাইশ গোত্রের নেতৃবৃন্দ দের কে দাওয়াত দেওয়া হয় এবং সকলেই এতে অংশগ্রহণ করে। দুনিয়ার ইতিহাসে সবচাইতে নিকৃষ্টতম এ পরামর্শ সভার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা হয় যে, এমন একটি পরিকল্পনা করা যার মাধ্যমে তাওহীদের পতাকাবাহী রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার মাধ্যমে দ্বীন ইসলামের অস্তিত্বকে চিরতরে মুছে ফেলা।

এই নিকৃষ্টতম অধিবেশনে যেসকল কোরাইশ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলো তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আবু জাহেল হিশাম বনি মখযুম থেকে, জুবায়ের বিন মুতঈম এবং তুয়াইমা বিন আদি এবং হাশেম বিন আমের বনি আবদে শামস বিন আবদে মানাফ থেকে। শাইবা বিন রাবিয়াহ ,উৎবা বিন রাবিয়া এবং আবু সুফিয়ান বিন হারব বনি আবদার থেকে। নজর বিন হারেস বনি আসাদ বিন আব্দুল উযযা থেকে। আবুল বুখতারী বিন হিশাম , যাযমা বিন আসওয়াদ, হাকিম বিন হেযাম , বনি আসাদ বিন আব্দুল উযযা থেকে। নরিহ বিন হাজ্জাজ ও মুনাব্বা বিন হাজ্জাজ বনি সহম থেকে। উমাইয়া বিন খলফ বনি জুমাহ থেকে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো সকলেই যখন দারুন নদওয়ায় পৌঁছাল তখন ইবলিশ সম্ভ্রান্ত পন্ডিতের রূপ ধরে অনুপ্রবেশ করে, এবং সে নিজেকে নজদের শাইখ পরিচয় দিয়ে বলল, আমি শুনেছি যে আপনারা এক মহৎ সভার আয়োজন করেছেন। এজন্য আমি উপস্থিত হলাম সম্ভব হলে কিছু পরামর্শ দিব। তথাকথিত গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সভায় উপস্থিত হয়ে আলোচনা শুরু হলো। এবং সেখানে কিছুটা বিতর্কও তৈরি হলো। প্রথমে আবুল আসওয়াদ প্রস্তাব পেশ করল যে, আমরা মুহাম্মদকে আমাদের মধ্য থেকে আলাদা করে , শহর থেকে বের করে দেওয়া যেতে পারে। অতঃপর সে কোথায় থাকবে কোথায় যাবে তার ব্যাপার। তার সাথে আমাদের কোন রকম সম্পর্ক থাকবে না। এতে করে আমাদের আর কোন সমস্যা থাকবে না। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের ধর্ম নির্বিঘেœ পালন করতে পারব। সে আমাদের মধ্যে আর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবেনা। আবুল আসওয়াদ প্রস্তাবটি শেষ করতে না করতেই নজদের শাইখ ( ইবলিশ) বলে উঠলো, আল্লাহর কসম! এটা কোন ভালো প্রস্তাব হলো না। তাছাড়া তোমরা দেখতেই পারছ যে, তার কথা কত চমৎকার এবং বাগ্ধারা কতটা মিষ্ট। সে কিভাবে মানুষের মন জয় করে চলছে ? আল্লাহর কসম! তোমরা যদি তাকে দেশান্তর করো, তবে সে অন্য কোথাও গিয়ে আশ্রয় নিবে, এবং সেখানে জনমত তৈরি করে বিপুল সংখ্যক অনুসারী তৈরি করবে। অতঃপর তাদের সাথে সখ্যতা করে তোমাদের শহরে আক্রমন করবে এবং তোমাদের কোণঠাসা করবে। তাতে করে সবকিছুই তার ইচ্ছা অনুযায়ী হবে।
সুতরাং এটা কোন সমাধানের পথ হতে পারে না। তাই ভিন্ন কোনো পথ চিন্তা করো। এবার আবুল বুখতারি বলল, মোহাম্মদকে শক্ত শিকলে বেঁধে বন্দি অবস্থায় তালাবদ্ধ ঘরে ফেলে রাখা হোক। এবং অবশ্যম্ভাবী পরিণতির জন্য (মৃত্যুর) অপেক্ষা করতে থাকবো। যেমনটি যুহাইর, নাবেগা, ও অন্যান্য কবিদের কে রাখা হয়েছিল। এবারও ইবলিশ আপত্তি করল যে, আল্লাহর কসম! এই প্রস্তাব সঙ্গ মনে হচ্ছে না। কারণ কোনো-না-কোনোভাবে তার সঙ্গীদের নিকট খবর পৌঁছে যাবে, তখন তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আক্রমণ করে তাকে মুক্ত করে নিয়ে যাবে এবং তোমরা পরাজয় বরণ করবে । সুতরাং এ প্রস্তাবও সমর্থনযোগ্য মনে হচ্ছে না। বরং ভিন্ন কোন রাস্তা বের করা প্রয়োজন। পরপর যখন দুইটা প্রস্তাব বাতিল বলে বিবেচিত হলো। এবার অভিশপ্ত, কুখ্যাত আবু জাহেল বলল,এ ব্যাপারে আমার একটি অভিমত রয়েছে। আমি লক্ষ্য করছি যে, কেউই সে লক্ষ্য পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। উপস্থিত সকলে বলল আবুল হাকাম সেটা কি? কুখ্যাত আবু জাহেল বলল, আমার প্রস্তাব হচ্ছে যে প্রত্যেক গোত্র থেকে সুঠামদেহী ও শক্তিশালী যুবক নির্বাচন করা হোক। এবং প্রত্যেকে একটি করে ধারালো তরবারি দেওয়া হোক। অতঃপর সকলেই তার দিকে অগ্রসর হয়ে অতর্কিতভাবে হামলা করে তাকে হত্যা করুক। যার দরুন আমরা সকলেই তার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে যাবো। আর এভাবে হত্যা করার ফলে এই হত্যার দায় সকল গোত্রের উপর বর্তাবে। ফলে একটি বিশেষ সুবিধা হবে যে, বনু আবদে মানাফ একা সকলের সাথে যুদ্ধ করতে সক্ষম হবে না। যার কারণে দিয়ত(খুনের বদলা একশত উট) গ্রহণে রাজি হবে। আমরা সকল গোত্র মিলে তা দিয়ে দিব এতে করে তেমন কোনো সমস্যা হবে না।
এবার ইবলিশ আর কোন আপত্তি না করে বললো যে, এই যুবকের কথায় গ্রহণযোগ্য। আর কোনো কথা বা খেয়াল আসলে তারপরও এটা বহাল থাকবে। দারুন নদওয়ার নিকৃষ্টতম অধিবেশন এমনই এক কাপুরুষোচিত, ঘৃণ্য ও জঘন্য সিদ্ধান্ত শেষে সমাপ্তি ঘটলো। এবং সকলেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংকল্পবদ্ধ হয়ে নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করল। এদিকে জিবরীল আমীন আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা: কে মুশরিকদের ষড়যন্ত্রের কথা অবগত করলেন, তিনি বললেন “আপনার প্রভু আপনাকে মক্কা ছাড়ার অনুমতি প্রদান করেছেন। আপনি এযাবৎ যে বিছানায় শয়ন করেছেন আজ রাতে সে বিছানায় শয়ন করবেন না”। এই কথার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা:কে হিজরতের সময় জানিয়ে দেয়া হলো।
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সা: ঠিক দুপুরে মাথা মোবারক ঢেকে হযরত আবু বকর রাযিআল্লাহু আনহু এর বাড়িতে তাশরিফ আনলেন। হযরত আবু বকরের রা: এর সাথে হিজরতের সময় ও বিভিন্ন পন্থা নিয়ে আলোচনা করে নিজ গৃহে ফিরে এলেন। এবং রাতের অপেক্ষা করতে লাগলেন। এদিকে পাপিষ্ঠরা নদওয়ার গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করে দিল। তাদের জঘন্যতম উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ১১ জন পাপিষ্ঠ, নালায়েক কে নির্বাচন করল। আবুজাহেল বিন হিশাম, উকবা বিন আবু মুয়িত , উমাইয়া বিন খলফ, তুয়াইমা বিন আদী, উবাই বিন খলফ, মুনাব্বাহ বিন হাজ্জাজ, হাকাম বিন আস, ইসার বিন হারেস,যাময়াহ বিন আসওয়াদ, আবু লাহাব, হুবাইহ বিন হাজ্জাজ এবং তার ভাই। সন্ধ্যা লগ্ন শেষ হওয়ার পর রাতের অন্ধকার যখন চতুর্দিকে ছেয়ে গেল। পাপিষ্ঠরা তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাড়ির আশেপাশে উৎপেতে রইল। রাসুলুল্লাহ সা: শুয়ে পড়লেই তারা প্রিয় নবীজির উপর ঝাপিয়ে পড়বে। অভিশপ্ত আবু জেহেল ঘেরাও কারি পাপিষ্ঠদের সাথে উপহাস ও তাচ্ছিল্য করে যা তা বলতেছিল। এবং তারা বিজয়ী হবে বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে ছিল। কিন্তু আল্লাহ যাকে বিজয়ী করতে চান সেই কেবল বিজয়ী হয়। তিনি যাকে বাঁচাতে চান কেউ তাকে মারতে পারেনা। পক্ষান্তরে তিনি যাকে পাকড়াও করতে চান পৃথিবীর কোন মহাশক্তি তাকে রক্ষা করতে পারেনা ।
এদিকে রাসুলুল্লাহ সা: মুশরিকদের বেষ্টনীর মধ্যেও হযরত আলীকে সবুজ হাযরামা চাদর জড়িয়ে তিনার বিছানায় শুইয়ে দিলেন। এবং বললেন তোমার ভয় নেই তারা কিছুই করতে পারবেনা। অতঃপর প্রিয় নবীজি গৃহের বাহিরে বের হয়ে এক মুষ্টি মাটি ছিটিয়ে দিলেন মুশরিকদের উপর। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদের দৃষ্টিশক্তি আটকে দিলেন ফলে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম কে দেখতে পেল না। এ সময় কোন মুশরিক বাকি ছিল না যে, তাদের মাথায় বালুকণা যায়নি। অতঃপর হযরত আবু বকরের গৃহে প্রবেশ করে তাকে নিয়ে ইয়েমেন অভিমুখে রওনা হলেন। রাতের অন্ধকার থাকতেই তারা মক্কা থেকে বেশ কিছুদূর “সাওর” নামক পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিলেন। এদিকে ঘেরাও কারি পাপিষ্ঠরা প্রিয় নবীজিকে হত্যার উম্মখতায় উম্মত্ত হয়ে সুবর্ণ সুযোগের অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকলো। কিন্তু এক ব্যক্তির খবরের মাধ্যমে যখন রাসুলুল্লাহর হিজরতের খবর জানতে পেরে তারা সকলেই হতচকিত হয়ে পড়লো। দৌড়ে গিয়ে নবীজি সা: এর ঘরের কাছে গিয়ে দরজার ফাক দিয়ে দেখতে পেল যে, তিনি চাদর গায়ে শায়িত অবস্থায় রয়েছে। তারা বলল আল্লাহর কসম ! মোহাম্মদ শুয়ে রয়েছে। পাপিষ্ঠরা ঘরে প্রবেশ না করার কারণে হযরত আলী রা:কে রাসুলুল্লাহ মনে করলো। এবং তারা এই ভ্রান্ত বিশ্বাস নিয়ে সকালের অপেক্ষায় থাকলো। এদিকে যখন ভোর হলো, হযরত আলী চাদর সরিয়ে বিছানা থেকে উঠলেন , তখন কুফফাররা বুঝতে পারল যে ব্যাপারটা কি ঘটেছে। তারা রাগান্বিত হয়ে আলীকে জিজ্ঞেস করল, মোহাম্মদ কোথায়? হযরত আলী বললেন আমি জানিনা। অতঃপর তারা রাসুলুল্লাহ কে খোঁজার জন্য চতুর্দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল এবং একেবারে রাসুলের নাকের ডগায় গিয়েও প্রিয় নবীজিকে দেখতে পেল না। অতঃপর তারা হতাশ হয়ে ফিরে এলো।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন