রোববার, ০১ আগস্ট ২০২১, ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮, ২১ যিলহজ ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

ইসরাইলের সর্বোচ্চ পরাজয় এবং নতুন সমরসজ্জা

জামালউদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ১৬ জুন, ২০২১, ১২:০১ এএম

বিশ্বযুদ্ধ বাঁধিয়ে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ। বিশ্ব সভ্যতার চার হাজার বছরের ইতিহাসে রাজা-সম্রাটদের যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রগ্রাসের অনেক ইতিহাস আছে। তবে নিজেদের স্বার্থদ্বন্দ্ব আর বৈরীতার মুকুটে নতুন অলঙ্কার যুক্ত করতে এমন রক্ত পিপাসা অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি। গত শতকের দুইটি মহাযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু এবং কোটি কোটি মানুষের নিঃস্ব ও বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ার পেছনে বাস্তব কোনো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকট ছিল না। হিটলারের নাজিদলের সাথে ইউরোপের অন্যদের মতপার্থক্য ও দ্বন্দ্বের কোনো ধারাবাহিক ইতিহাস নেই। তবে তুরস্ক ও ইউরোপে মুসলমানদের আধিপত্যের পুরনো ইতিহাস এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে জার্মানদের সাথে ইউরোপের অপরাপর শক্তিগুলোর মধ্যে এক প্রকার মতপার্থক্য গড়ে তুলেছিল। ইঙ্গ-ফ্রাঙ্কো ইম্পেরিয়াল শক্তি ও তাদের সহযোগিরা এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকায় শত শত বছরের উপনিবেশ থেকে গড়ে তোলা সম্পদের পাহাড়ে বসে ও ক্ষয়িষ্ণু উসমানীয় সাম্রাজ্য ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যত ঘিরে যে নতুন স্বপ্ন ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, বিশ্বযুদ্ধ সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। আর এসব পরিকল্পনার নেপথ্য শক্তি হিসেবে কাজ করে ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে ইউরোপে গজিয়ে ওঠা জায়নবাদ। শত শত বছর ধরে ইউরোপে সুদি ব্যবসা করে জায়নিস্ট ইহুদিরা দেশে দেশে সম্পদশালী হয়ে উঠেছিল। সেসব সম্পদ তারা একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলে কাজে লাগাতে সদা তৎপর থাকতে দেখা গেছে। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে রাষ্ট্রহীন ইহুদিরা বিশ্বের কোথাও একটি রাষ্ট্র গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। বিশাল রাশিয়া, পূর্ব ও উত্তর ইউরোপ বা আফ্রিকার অনেক দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিরা প্রতিটি দেশেই সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঊনবিংশ শতকের শেষ দশকে জায়নিস্ট কংগ্রেস গঠিত হওয়ার দুই দশক আগে জার্মানির অরিয়েন্টালিস্ট তাত্ত্বিক দার্শনিক পল লার্গাদে প্রথম ইউরোপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিদের জন্য আলাদা একটি আবাসভূমি গড়ে তোলার স্বপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। লার্গাদে ১৮৭৮ সালের এক লেখায় ইউরোপের ইহুদিদের ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কারে স্থানান্তরের প্রস্তাব করেছিলেন। ১৮৯৭ সালে প্রথম জায়নিস্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হওয়ার ৬ বছর পর ১৯০৩ সালে ৬ষ্ঠ জায়নিস্ট কংগ্রেসে জায়নবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিউডর হার্জেল ইউরোপের ইহুদিদের জন্য র্প্বূ আফ্রিকার বৃটিশ প্রোটেক্টরেট উগান্ডায় ভবিষ্যতের হোমল্যান্ড গড়ে তোলার প্রস্তাব করেছিলেন। পরবর্তীতে জায়নিস্ট কংগ্রেস উগান্ডা প্রস্তাব থেকে সরে দাঁড়ালেও ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র গড়ার চিন্তা তাদের মাথায় তখনো আসেনি। এর মূল কারণ হচ্ছে, ফিলিস্তিনের পুরো ভূ-খণ্ড ছিল বংশানুক্রমিকভাবে মুসলমানদের ঘনবসতিপূর্ণ। তবে সেখানে ঐতিহ্যগতভাবেই একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে ইহুদিদের সহাবস্থান ছিল। মাত্র ৭-৮ শতাংশ ইহুদি জনগোষ্ঠী নিয়ে ফিলিস্তিনে একটি আলাদা ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল না। এতদসত্ত্বেও প্রথম মহাযুদ্ধে ইহুদি ধনকুবের ও মার্কিন লবির সহযোগিতা নিশ্চিত করতে ১৯১৭ সালে বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বালফোর ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের এক অবাস্তব প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। বৃটিশ ঔপনিবেশিকদের সেই বালফোর ডিক্লারেশনই হচ্ছে ফিলিস্তিনের জমি দখল করে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের সাম্রাজ্যবাদি চক্রান্তের তুর্যবাদক।

গত শতাব্দীতে সংঘটিত দুইটি মহাযুদ্ধ ছিল মূলত ইউরোপের ঔপনিবেশিক স্বার্থদ্বন্দ্বের ফল। কিন্তু এর চরম পরিনতি ভোগ করতে হচ্ছে মূলত মুসলমানদের। প্রথমত উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উপর ভাগাভাগির সাম্রাজ্যবাদি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, দ্বিতীয়ত: নাজিদের ইহুদি নির্মূল অভিযানের কারণে বাস্তুচ্যুত ইহুদিদের জাহাজে তুলে তাদের হাতে অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র তুলে দিয়ে জবরদস্তিমূলকভাবে আরব ভূমিপুত্রদের উচ্ছেদ করে সেখানে একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের নীলনকশা বাস্তবায়ন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ইঙ্গ-মার্কিনীদের নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থায় জাতিসংঘের প্রস্তাবনায় ফিলিস্তিনে আরবদের ভূমিতে একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের ফর্মুলা স্বাভাবিক কারণেই আরবদের কাছে ন্যুনতম সমর্থনযোগ্যতা ছিল না। বৃটিশ এবং জাতিসংঘের প্রস্তাবে ইহুদিদের জন্য গঠিত রাষ্ট্রে সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার এবং সমমর্যাদার কথা বলা হলেও শুরু থেকে ইসরাইল মুসলমানদের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছিল। মুসলমানদের বাড়িঘর, কৃষিখামার দখল করে সেখানে ইউরোপ থেকে ইহুদিদের এনে বসতি গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রের সূচনা হয়েছিল, ৭২ বছর পেরিয়ে এসেও তাদের রাষ্ট্রশক্তি দখলবাজি অব্যাহত রয়েছে। বৃটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের দুই শতাব্দী পেরিয়ে এসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বের এক নম্বর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী শোষণযন্ত্রের লাঠিয়াল ও অনুঘটকে পরিণত হয়েছে জায়নবাদী ইসরাইল। যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে আধুনিক গণতন্ত্রের মূল প্রবক্তা বলে দাবি করে, সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চরম সাম্প্রদায়িক ও আগ্রাসি জায়নবাদের রক্ষক হয়ে উঠল কীভাবে, সে এক বিশাল বিষ্ময়। দার্শনিক তাত্ত্বিক লাগার্দে মাদাগাস্কারে ইহুদি বসতি গড়ে তোলার প্রস্তাব এবং বৃটিশ উগান্ডা প্রস্তাবের যেকোনো একটা প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সেখানে হয়তো বহু আগেই একটি স্থিতিশীল ইহুদি রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারতো। এডলফ হিটলার মাদাগাস্কার প্ল্যান অনেকটা এগিয়ে নিয়েছিলেন। ইহুদি কমিউনিটি লিডাররাও সে প্রস্তাব মেনে নিয়েছিল বলে জানা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল ভিন্নতর হলে ১৯৪৮ সালের আগেই হয়তো মাদাগাস্কারে ইহুদিরা তাদের হোমল্যান্ড লাভ করতো। সেটি হলে ইহুদি রাষ্ট্রটিকে পরের জমি দখল করে রাষ্ট্রগঠনের কলঙ্কিত ইতিহাসের কুশীলব হতে হতো না। বলাবাহুল্য, জায়নবাদ আর জুদাইজম এককথা নয়। ধর্মপ্রাণ ইহুদিরা কখনোই জবরদস্তিমূলক পরের জমি দখল করে রাষ্ট্র গঠনকে সমর্থন করেনি। ইসরাইল রাষ্ট্রের ৭২ বছর পেরিয়ে এসেও বেশকিছু জুইশ ধর্মীয় গ্রুপ জায়নবাদী ইসরাইল রাষ্ট্রের চলমান বাস্তবতার বিরোধিতা করছে।

মানব সভ্যতার বিবর্তনের ইতিহাস কখনো অস্বচ্ছ নয়। গত তিন হাজার বছরে ইহুদি জাতি বেবিলন, রোম ও খৃষ্টান যাজকতন্ত্রের দ্বারা বার বার আক্রান্ত ও নিগৃহিত হয়েছে। মিথলজি ও বিশ্বাসের সাথে ইতিহাসের ধারাক্রমে অনেক ব্যবধান শক্তির আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে মুছে ফেলা যাবে না। বিবর্তনের ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক ডেমোগ্রাফিক প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আজ যেসব জায়নবাদি ইহুদি ফিলিস্তিনের জমি দখলের অন্যায় তৎপরতার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে আড়াই হাজার বছর আগে হৃত রাষ্ট্রের কথা বলে থাকে। ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি, ইহুদি টেম্পলের পতন এবং এক্সোডাসের ইতিহাসের সাথে মুসলমানদের কোনো ভূমিকা নেই। ফিলিস্তিনের ভূমিপুত্র আরব মুসলমানরা, আশকেনাজি ইহুদিরা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বোমা ফাটিয়ে যুদ্ধজয়ের অন্যতম অনুঘটক যদি কাউকে মানতে হয় তা হচ্ছে, পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। জায়নবাদী ইহুদিরা আইনস্টাইনকে ইজরাইলের প্রথম প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে তারিখটি ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিবস হলেও ফিলিস্তিনিরা দিবসটিকে বিপর্যয় বা নাকবা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় ইসরাইল প্রতিষ্ঠার একমাস আগে ১৯৪৮ সালের ১০ এপ্রিল আমেরিকান ফ্রেন্ডস অব দ্য ফাইটার্স ফর দি ফ্রিডম অব ইজরাইল নামের একটি সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক মি. শেফার্ড রিফকিনের কাছে লেখা এক চিঠিতে আইনস্টাইন লিখেছেন, ‘ডিয়ার স্যার, হোয়েন অ্যা রিয়েল অ্যান্ড ফাইনাল ক্যাটাসট্রফি শুড বি ফল আস ইন প্যালেস্টাইন দি ফার্স্ট রিসপন্সিবল ফর ইট উড বি দ্য বৃটিশ অ্যান্ড দ্য সেকেন্ড রিসপন্সিবল ফর ইট দ্য টেররিস্ট অর্গানাইজেশন বিল্ডআপ ফ্রম আওয়ার অউন র‌্যাঙ্কস। আই অ্যাম নট উইলিং টু সি এনিবডি অ্যাসোসিয়েটেড উইদ দোজ মিসলেড অ্যান্ড ক্রিমিনাল পিপল।’ ইহুদি বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ইসরাইলের জন্মের আগেই এভাবে একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের জন্য বৃটিশ এবং বিভ্রান্ত ইহুদি নেতা ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে দায়ী করেছেন। ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সম্ভাব্য বিপর্যয়ের জন্যও বৃটিশ এবং ইহুদি জায়নবাদি সন্ত্রাসীরা দায়ী থাকবে বলে নিজের সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করেছিলেন। তিহাত্তর বছর আগে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠণের প্রাক-মুহূর্তে আইনস্টাইন জায়নিস্ট ইসরাইলের যে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করেছিলেন, সেই মুহূর্ত এখন প্রায় সমাগত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার ওয়েস্ট চেষ্টার ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক ও প্রফেসর এমিরেটাস লরেন্স ডেভিডসনের লেখা একটি নিবন্ধের শিরোনাম ‘ইসরাইল লসেস ইট্স বেস্ট’ গত সপ্তাহে আইসিএইচ অনলাইনে এটি প্রকাশিত হয়েছে। ইসরাইলি বাহিনীর গাজায় বোমা হামলা এবং হামাসের প্রতিরোধ ও প্রত্যাঘাত এবং ইসরাইলের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে প্রফেসর ডেভিডসন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তিনি কোনো মনগড়া তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত দেননি। ইসরাইলি ঈল্ফ-পত্রিকা ও বিভিন্ন ইহুদি গ্রুপের মতামত ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রবণতার মধ্য দিয়ে তিনি ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটির হেরে যাওয়ার সর্বোচ্চ প্রবণতা দেখতে পেয়েছেন। নিবন্ধের শুরুতেই তিনি ২০১২ সালে ইসরাইলি পত্রিকা হারেজ’র একটি জনমত জরিপ উল্লেখ করেছেন, যেখানে বলা হচ্ছে, সুযোগ পেলে ইসরাইলের বর্তমান ইহুদি জনসংখ্যার অন্তত একতৃতীয়াংশ ইসরাইল ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে চান। নিউজউইক পত্রিকায় প্রকাশিত ২০১৮ সালের একটি নিবন্ধের উল্লেখ করেছেন ডেভিডসন, যেখানে বলা হচ্ছে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করলেও নানাবিধ সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইসরাইল এখনো অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। এ প্রসঙ্গে হারেজ পত্রিকায় ২০২০ সালের ২৩ মে তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইসরাইলে বসবাসরত বেশকিছু বুদ্ধিজীবী, লেখক, চিন্তাবিদ, মানবাধিকার কর্মীসহ বিভিন্ন পেশার উচ্চ শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামত তুৃলে ধরা হয়েছে, যারা বিভিন্ন কারণে ইসরাইলে আর নিরাপদ বোধ করছেন না। এটি শুধু যুদ্ধের হুমকির বিষয় নয়, নৈতিকতার মানদন্ডেও ইসরাইলে বাসযোগ্যতা তাদের কাছে এখন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। চরম সাম্প্রদায়িকতা ও জায়নবাদের উগ্র ক্ষমতায়ণকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন অনেকে। জায়নবাদী উগ্রতা ও দখলবাজির সাথে জড়িত লোকগুলো না থাকলে ইসরাইল আরো ভালো হতো বলে অনেকের ধারণা। এ সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসওম্যান ইলহাম ওমর রিপাবলিকান ও তার নিজদলের কিছু ডেমোক্রেট কংগ্রেস সদস্যের তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। কংগ্রেসে দেয়া বক্তৃতায় ইলহান ওমর সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধে ইসরাইলের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন এবং এ অপরাধের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও সম্পৃক্ততার প্রশ্নে অভিযুক্ত করেছিলেন। এ প্রেক্ষিতে, হাউজ রিপ্রেজেন্টিভ ও কংগ্রেসের রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট সদস্যরা একযোগে ইলহাম ওমরকে আক্রমণ করেছেন। তাদের এহেন ভূমিকায় কোনো কোনো ইহুদি সংগঠনও বিরক্তি প্রকাশ করেছে। ইফনটনাউ নামের একটি জুইশ অ্যাডভোকেসি সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যারা ইলহাম ওমরকে আক্রমণ করে ইসলামোফোবিক জুজু দেখাচ্ছে তারা আসলে আমেরিকান ইহুদি কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব করেন না, তারা আসলে ইহুদিদের নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিন ও ইসরাইলী নাগরিকদের সম অধিকারের চাইতে ইসরাইলের দখলবাজ এবং বর্ণবাদিদের রক্ষায়ই বেশি তৎপর।’ ইলহান ওমরের অপরাধ হচ্ছে, তিনি নাকি ইসরাইল এবং আমেরিকাকে হামাস ও তালেবানের সাথে একই পাল্লায় মেপেছেন। মূলত: মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও নৈতিকতার মানদণ্ডে ইলহান ওমরের বক্তব্যের জবাব দেয়ার কোনো যুক্তি তার প্রতিপক্ষের হাতে নেই। ইলহান ওমরকে ডেমোনাইজ করে কোনঠাসা করাই জায়নবাদি লবির এখনকার মূল লক্ষ্য।

আমেরিকাকে ইসরাইল, হামাস, তালেবান বা আইসিসের সাথে তুলনা করা চলে না। কারণ এসব শক্তি ও সংগঠনকে যদি সন্ত্রাসী অপশক্তি বলা হয়, এদের স্রষ্টা হচ্ছে আমেরিকা। বৃটিশরা ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল বটে, গত সাত দশক ধরে ইসরাইলকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে, অর্থ দিয়ে, কূটনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে লালন পালন করে মধ্যপ্রাচ্যের দানবীয় শক্তিতে পরিনত করেছে আমেরিকা। চীনের উইঘুরে মুসলমানদের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও মানবাধিকার হরণ অবশ্যই নিন্দনীয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা এ নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে নানা ধরণের নিষেধাজ্ঞার কথা বলছে। কিন্তু ইসরাইল যখন নিরীহ নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের উপর শত শত যুদ্ধ বিমান ও ট্যাঙ্ক-মিসাইল নিয়ে হামলা করে শত শত নিরস্ত্র মানুষ ও শিশু হত্যা কর তখন তাদের নীরবতায় শয়তানও লজ্জা পায়। মে মাসে ইসরাইলের গাজা আগ্রাসনে আড়াই শতাধিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে, অর্ধলক্ষাধিক মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালত ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করে তদন্ত শুরু করেছে। যারা উইঘুর মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের দায়ে বৃহৎ শক্তি চীনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার কথা বলে, তারা প্রকাশ্য বোমা হামলা, বিমান হামলা চালিয়ে একটি জনগোষ্ঠিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জায়নবাদি হিংস্রতার বিরুদ্ধে কোনো কথা তো বলছেই না, বরং তাদেরকে নতুনভাবে সমরসজ্জিত করে আরো শক্তিশালী করছে। ভবিষ্যতের যুদ্ধে যেন হামাস-হিজবুল্লাহকে পরাস্ত করে গাজাসহ পুরো উপত্যকার উপর নির্বিঘ্ন দখলদারিত্ব চালাতে পারে। তবে এবার মার্কিনী ও পশ্চিমারাও জায়নবাদী হিংস্রতার বিরুদ্ধে সচেতন ও সরব হয়ে উঠেছে। সেই সাথে মার্কিন প্রশাসনও ইসরাইলের শক্তি বৃদ্ধিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ইসরাইল যতই আগ্রাসী মনোভাব দেখাচ্ছে, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধারাও ততই জানবাজ ও কঠোর হয়ে উঠতে বাধ্য হচ্ছে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলে যুদ্ধ ও সামরিক সহায়তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পিছপা হচ্ছে না। আইসিএইচ অনলাইনে গত ১০ জুন প্রকাশিত মার্কিন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম হারটুংয়ের একটি নিবন্ধের শিরোনাম-এখনো সময় আছে ইসরাইলে ৭৩৫ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি বাতিল করার (দেয়ার ইজ স্টিল টাইম টু স্টপ ৭৩৫ মিলিয়ন ডলার আর্মস সেইল টু ইসরায়েল)। তিনি বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরাইলকে এ পর্যন্ত ২৩৬ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দেয়া হয়েছে, এর এক তৃতীয়াংশের বেশি দেয়া হয়েছে সামরিক সহায়তা হিসেবে। সাম্প্রতিক দশকে ইসরাইল তার আগ্রাসী শক্তির মাধ্যমে বার বার ফিলিস্তিনে হামলা চালিয়ে হাজার হাজার নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। ফিলিস্তিনের শহর, জনপদ ও উদ্বাস্তু শিবিরগুলোকে ধ্বংস্তুপে পরিণত করেছে। প্রতিবারই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে নতুনভাবে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়েছে। এসব মার্কিন সহায়তা ইসরাইলকে আর রক্ষা করতে পারছে না। পারবে না। ইসরাইলের ধর্মপ্রাণ ইহুদিরাও জায়নবাদের অনৈতিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। অধিকাংশ সাধারণ ইসরাইলি তাদের প্রমিজড ল্যান্ডের স্বপ্ন ছেড়ে পশ্চিমে চলে যেতে চাইছে। সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে ইসরাইল একটি অকার্যকর ও অনিরাপদ রাষ্ট্র হয়েই টিকে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলে শাসকের পরিবর্তন ঘটলেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। ট্রাম্পের বদলে বাইডেন, নেতানিয়াহুর স্থানে নাফতালি বেনেত এসেছেন। এরা সবাই জায়নবাদী ডিপস্টেটের কাছে জিম্মি। অপশক্তির মোকাবেলায় হামাস-হিজবুল্লাহর সামরিক শক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান রাষ্ট্রগুলোর সাধারণ ঐক্যই পারে এই দানবীয়, দখলবাজ ও রক্তপিপাসু শক্তির আস্ফালন বন্ধ করতে।
bari_zamal@yahoo.com

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (2)
Zak ১৬ জুন, ২০২১, ৭:১১ এএম says : 0
Jazak Allah for the thoughtful report. It’s a very informative topic and hopefully it will will enable everyone about the conflict in Palestine.
Total Reply(0)
Dadhack ১৬ জুন, ২০২১, ১২:৪৭ পিএম says : 0
যখন মুসলিমরা কোরআন দিয়ে দেশ শাসন করত তখন সারা বিশ্বের কাফেররা মুসলিমদেরকে প্রচন্ড ভয় পেত এবং শ্রদ্ধা করত যখনই মুসলিমরা কোরআন ছেড়ে দিলো তখন কাফেররা সবাই মিলে মুসলিমদেরকে পিপড়ার মত পায়ের তলে দলিত করছে এবং এখনো করে যাচ্ছে আল্লাহ কুরআনে বলেছেন. সূরা: আল-আনফাল:আয়াত:73: “এবং যারা অবিশ্বাস পোষণ করেছে তারা একে অপরের মিত্র, [এবং] যদি আপনি [সমগ্র বিশ্বের মুসলমানগণ সম্মিলিতভাবে] তা না করেন [যেমন: মিত্র হয়ে যান, যেমন ঐক্যবদ্ধভাবে এক খলিফা] (সমগ্র মুসলিম বিশ্বের প্রধান মুসলিম শাসক) ইসলামী একেশ্বরবাদের ধর্মকে বিজয়ী করার জন্য, পৃথিবীতে ফিতনা [যুদ্ধ, ধর্ষণ, ব্যভিচার, খুন, শিরক] এবং নিপীড়ন থাকবে এবং একটি মহান দুষ্টামি এবং দুর্নীতি বিশ্বের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়বে।”
Total Reply(0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন