ঢাকা সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ১১ শ্রাবণ ১৪২৮, ১৫ যিলহজ ১৪৪২ হিজরী

সম্পাদকীয়

ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের অবসান ঘটেনি

তৈমূর আলম খন্দকার | প্রকাশের সময় : ২১ জুন, ২০২১, ১২:০২ এএম

নাগরিকদের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত করাই হলো স্বাধীনতার মূলমন্ত্র (বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ)। স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব স্বাধিকার আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল ‘কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না।’ এখন ব্রিটিশ, পাকিস্তানির পরিবর্তে বাঙালিরা হয়েছে বাঙালিদের নির্যাতনের হাতিয়ার। বাংলাদেশ এখন স্পষ্টই দুইভাবে বিভক্ত: ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীন। আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য সাংবিধানিক অঙ্গীকারের পরিবর্তে রাষ্ট্রযন্ত্র যেন ক্ষমতাবানদের সেবকে পরিণত হয়েছে। সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্টই বলা হয়েছে: ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের সব ব্যয় বহন করে দেশের জনগণ। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যা ১৮ কোটি। এ ১৮ কোটি জনগণের উপার্জিত অর্থে লালিত পালিত হচ্ছেন দেশের প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি। তাদের বেতনভাতা, গাড়ি, বাড়ি সবকিছুই জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের আমলাতন্ত্র অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিরা কি জনগণকে সমভাবে সম্মানের চোখে বা একই মর্যাদায় মূল্যায়ন করে?

আমাদের দেশের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুই শতাধিক বছরের পুরনো। ব্রিটিশরা যে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছিল সে আদলেই বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র চলছে। ‘সেবার’ চেয়ে ‘শাসনের’ মনোভাব ও মানসিকতা নিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশের আমলাদের পথচলা। ব্রিটিশরা যখন ভারত উপমহাদেশের শাসনভার গ্রহণ করে তখন বিভিন্ন পদ-পদবি সৃষ্টি করে এ দেশবাসীকে শাসন করত। ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা অর্থাৎ দেশবাসীকে গোলাম বানিয়ে শাসন করতো; সেই শাসন ও বর্তমান শাসনের কোনো পার্থক্য নেই। এ দেশকে শাসন করার জন্য ব্রিটিশরা যে আইন প্রণয়ন করেছিল সে আইনে এখনো দেশ চলছে। The Official Secrecy Act ১৯২৩-এর মতো অনেক আইন আজো কার্যকর রয়েছে, যা ব্রিটিশরা তাদের স্বার্থরক্ষায় প্রণয়ন করেছিল। স্বাধীনতাকামীদের দমন করার জন্য ব্রিটিশরা ১৯০৮ সালে Explosive Substance Act নামে আইন প্রণয়ন করে। সে আইন ব্যবহৃত হচ্ছে অধিকার আদায়ে আন্দোলনকারীদের ওপর। পুলিশ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। The Police Act১৮৬১ প্রণয়ন করে ব্রিটিশরা এ দেশে পুলিশি প্রশাসন চালু করেছিল। আইনের শাসন সমভাবে প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে জনগণকে শাসন-শোষণের মাধ্যমে ব্রিটিশের হাতকে কিভাবে শক্তিশালী রাখা যায়, সে চিন্তাধারাকে সামনে রেখেই পুলিশ বাহিনী ১৮৬১ সালে অনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয়, যা বর্তমানে একটি স্বাধীন দেশে ঢেলে সাজানো বাঞ্ছনীয়। ‘পুলিশ হবে জনতার’ এ শ্লোগানের বাস্তবায়ন দেখা যায় না।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, সম্পদের সুষম বণ্টন, ব্যবসায়-বাণিজ্য ও নিয়োগ বা প্রমোশনের ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং ১৯৭০ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর ছলচাতুরির কারণেই পশ্চিমাদের থেকে আলাদা হওয়ার জন্য বাঙালিরা মানসিক প্রস্তুত গ্রহণ করেছিল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য রাষ্ট্রীয় কোনো পদক্ষেপ নেই। দেশের ব্যবসায়, বাণিজ্য, টেন্ডার, সরকারি-বেসরকারি খাত সব কিছুই ক্ষমতাসীনদের দখলে। টেন্ডার দখল করতে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে গোলাগুলি, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিছু বহুরূপী মানুষ আছে, যারা যে দল যখন ক্ষমতায় যায় তখন সে দলে ভিড়ে নিজেদের ব্যবসায়-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা ক্ষমতাসীনদের ‘বখরা’ দেয়ার মাধ্যমে। বিরোধী দলের সাথে সম্পর্ক ছিল এমন লোকদের বা কোনো আত্মীয়স্বজন বিরোধী দলে থাকলেও নিয়োগ বা পদোন্নতি হচ্ছে না। এগুলো কি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের মধ্যে চরম বৈষম্যের আওতায় পড়ে না? এ বৈষম্যের কারণে ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য প্রজাতন্ত্রে নিযুক্ত ব্যক্তিরা সবাই এখন ‘সরকারি দল’ হয়ে গেছে। তারা বিরোধী দলের নেতাদের সাথে ভিন্ন টেলিফোনে কথা বলেন, যে ফোনে আড়িপাতার সম্ভাবনা নেই। ভিন্ন মতাবলম্বীরা এখন রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে বঞ্চিত, কারণ আমলারা বিরোধী দল দেখলেই নাক সিঁটকানো শুরু করে। তারা মনে করে, বিরোধী দলের সাথে কথা বললে এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন) যদি খারাপ হয়ে যায়, যদি তাদের প্রমোশন না হয়! তবে ব্যতিক্রম কিছু আছে, যাদের সংখ্যা মাইক্রোস্কোপে দেখার মতো।

একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে ৩৯ লাখ ৩৩ হাজার মামলা বিচারাধীন। জাতীয় পত্রিকার ভাষ্য মতে, এর কারণ হিসেবে আইনজীবীরা বলেছেন, ‘মামলার জট কমাতে প্রথমত দরকার সুশাসন। মামলার উৎপত্তিস্থল কমাতে হবে। মিথ্যা মামলা, রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মামলার কারণে মামলার জট বাড়ছে। তাই এ জট কমাতে সুশাসনের পাশাপাশি সরকারের মহাপরিকল্পনা দরকার। আর যদি মামলার জট কমানো না হয় তাহলে বিচারের প্রতি মানুষের অনীহা জন্মাবে।’ দেশের আইনজীবী সমাজও মনে করে, বিরোধী দলের বিরুদ্ধে অধিক পরিমাণে রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক ফৌজদারি মামলা অসহনীয় মামলা জট সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ। ব্রিটিশ সরকার যেভাবে পুলিশি মামলা দিয়ে স্বাধীনতাকামীদের হয়রানি করেছে, পাকিস্তান তার ব্যতিক্রম করেনি এবং স্বাধীন বাংলাদেশেও যদি বিরোধী দলের ওপর অনুরূপ নির্যাতন করা হয়, তবে এ স্বাধীনতার স্বাদ দল, মত, নির্বিশেষে সমগ্র দেশবাসী পেলো কোথায়? স্বাধীনতা সার্বিকভাবে মূল্যায়িত না হওয়ার কারণ কী? বিরোধীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্যাতনের অর্থই হলো, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। প্রশাসন জনগণের অর্থে লালিত পালিত, এ প্রশাসনকে ব্যবহার করা হয় মিথ্যা বানোয়াট মামলা তৈরি করার জন্য।

১৯৯৭ সালে সরকার ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে আমাকে আটক করে ডিটেনশনে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে প্রথমে বন্দী রাখে। দুই দিন পরে রাতে আমাকে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর সময় মাইক্রোবাস ভর্তি পুলিশ ছিল এবং আমাকে হাতে হ্যান্ডকাফ লাগিয়েই মাইক্রোবাসে নিয়ে যাচ্ছিল। গাড়িতে উঠিয়েই একজন বয়স্ক পুলিশ আমার হ্যান্ডকাফটি আরো টাইট করে দেয়ায় একজন জুনিয়র পুলিশ বললেন, আসামি তো গাড়ির ভেতরেই আছে। হ্যান্ডকাফ এত টাইট করার দরকার কী? বয়স্ক পুলিশটি বললেন, ‘এখন টাইট করে দেই, মন্ত্রী হলে স্যালুট করব’। এ হলো আমাদের দেশের আমলাদের মানসিকতা। যে কোনো হীন পন্থায় হোক না কেন, নির্যাতন নিপীড়ন করাই যেন পুলিশের পেশা। বিআরটিসির চেয়ারম্যান থাকাকালে আমার কাছে একটি ফাইল উপস্থাপন করা হলো। সেখানে দেখলাম, সংস্থার জেনারেল ম্যানেজার (কারিগরি) বাবু অশোক কুমার সাহা একটি ঘটনার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে তদন্তের সময় বৃদ্ধি করার জন্য আবেদন করেছেন। ফাইলটি পর্যালোচনা করে দেখলাম, ৯ বছর আগে নিম্নপদস্থ এক কর্মচারীর অপরাধের বিভাগীয় তদন্তের জন্য অনেক তদন্তকারী কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন, কিন্তু তদন্ত শেষ হয়নি। এ মর্মে অশোক বাবুকে শোকজ করলে তদন্ত প্রতিবেদন আসে। বিআরটিসির অনেক ঘটনার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হতো। কমিটি আমাকে (চেয়ারম্যান থাকাকালে) জিজ্ঞাসা করত, রিপোর্ট কীভাবে দেবো? আমি বলতাম, আপনারা যা পেয়েছেন সে রিপোর্টই দেবেন। প্রতিউত্তরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলতেন, স্যার, ‘কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী রিপোর্ট দেয়াই প্রশাসনে একটি অলিখিত নিয়ম হিসেবে চালু রয়েছে।’ অর্থাৎ সত্য-মিথ্যার কোনো বালাই নেই। আমলাদের বিবেক বলতে কোনো বিষয় কাজ করে না কেন? যেন কর্তার ইচ্ছায়ই কর্ম। এটাই আমলাতন্ত্রের সংস্কৃতি। তবে ব্যতিক্রম কিছু যে নেই, তা বলা যাবে না।

২০০১ সালের ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জ (চাষাঢ়া) আওয়ামী লীগ অফিসে পৈশাচিক বোমা হামলায় ২২ জন নিহতসহ প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষ আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন। ওই মামলায় আমাকে প্রধান আসামি করে বিএনপির ২৭ জন সক্রিয় নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। জামিন নিয়ে প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা, সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপারের সাথে সাক্ষাৎ করি। তিনি বললেন, ‘আমিও জানি, আপনারা বোমা বিস্ফোরণ করেননি। কিন্তু সরকার যেভাবে চাইবে, সেভাবেই চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট দিতে হবে।’

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১(২) মোতাবেক, স্বাধীন বাংলাদেশে একটি গণমুখী প্রশাসন চালু থাকার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের অবসান ঘটেনি। জনগণের চাহিদা নয়, বরং কর্তাদের তৈল মর্দন, তথা তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোই যেন প্রজাতন্ত্রে কর্মরত ব্যক্তিদের প্রধান দায়িত্ব বলে তারা মনে করেন। দেশে যত দিন গণমুখী প্রশাসন তৈরি না হবে তত দিন ধর্ম, বর্ণ, দল, মত নির্বিশেষে গণমানুষ স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারবে না।
লেখক: রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন