ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, ১৯ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী।

জাতীয় সংবাদ

যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে হস্তক্ষেপেই সম্মেলন বর্জন : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত

প্রকাশের সময় : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬, ১২:০০ এএম

কূটনৈতিক সংবাদদাতা
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার বিরাজমান পরিস্থিতিতে ভারত, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও ভুটানের পক্ষে সম্মেলনে অংশ নেয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। গতকাল বুধবার সম্মেলন স্থগিতের ঘোষণা দেয়া হলো। এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, সার্কে না যাওয়া বাংলাদেশের একক সিদ্ধান্ত। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে হস্তক্ষেপেই সার্ক সম্মেলন বর্জন : তবে পরবর্তীতে সম্মেলন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হলে সেটি বিবেচনা করা হবে।
গতকাল সকালে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সার্কের বর্তমান সভাপতি দেশ নেপালের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। দেশটির প্রভাবশালী গণমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট এ খবর দিয়েছে। আসছে নভেম্বরে ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সংগঠন সার্কের এবারের শীর্ষ সম্মেলনে অংশ না নিতে পারার সিদ্ধান্ত এরই মধ্যে নেপালকে জানিয়ে দিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিয়ম অনুযায়ী কোনো সদস্য রাষ্ট্র অংশগ্রহণ করতে না পারলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বাতিল বা স্থগিত হয়ে যায়।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের একটি সেনাশিবিরে প্রবেশ করে ১৮ সেনাসদস্যকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এই সন্ত্রাসীরা পাকিস্তানি বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে ভারত। আর এরপর থেকেই দেশ দুটির মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গতকাল দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার নিজ কার্যালয়ে বলেন, সার্কে না যাওয়া বাংলাদেশের একক সিদ্ধান্ত। য্দ্ধুাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অব্যাহতভাবে পাকিস্তানের হস্তক্ষেপের কারণেই নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় ১৯তম সার্ক সম্মেলন বর্জন করেছে বাংলাদেশ। তবে পরবর্তীতে সম্মেলন নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হলে সেটি বিবেচনা করা হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা মঙ্গলবার নেপালে সার্কের চেয়ারম্যানকে জানিয়ে দিয়েছি বাংলাদেশ সার্কে অংশগ্রহণ করবে না। আমরা এর জন্য যথার্থ কারণও দেখিয়েছি। সার্ক সচিবালয়কে লেখা চিঠিতে জানানো হয়েছে, সার্কের প্রতিষ্ঠাতা দেশ হিসেবে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তবে আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিবেশি রাষ্টগুলোর মধ্যে একটি (পাকিস্তান) রাষ্ট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অব্যাহতভাবে হস্তক্ষেপ করার প্রচেষ্টাকে এই ধরনের সম্মেলনের জন্য উপযোগী নয়। তবে বাংলাদেশ সার্কের আঞ্চলিক সহযোগিতা ও যোগাযোগকে বিশ্বাস করে। সময় সুযোগ যখন আসবে তখন বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, বঙ্গবন্ধু, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার ও পরবর্তীতে ফাঁসির প্রশ্নে বাংলাদেশ কখনোই কারো সঙ্গে আপোস করেনি, আর করবেও না।
ভারত এ সম্মেলনে যাচ্ছে না দেখে বাংলাদেশ ও কি অংশগ্রহণ করছে না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্য কোনো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের সিদ্ধান্তের সম্পর্ক নেই। এটা আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। সার্ক প্রতিষ্ঠা হয়েছে ৩০ বছর আর এ সম্মেলনটি হচ্ছে ১৯তম। যেকোনো দেশের মতামত ব্যক্ত করার যে বিষয় তা নতুন কিছু নয়।
সম্মেলনটি পাকিস্তানে হচ্ছে বলেই কি যাচ্ছেন না? এর উত্তরে বলেন, স্থান বিষয় নয়, এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলেই যাচ্ছি না। নতুন করে প্রস্তাব এলে ভেবে দেখা যাবে।
পাকিস্তানের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার চিন্তা আছে কি না? সাংবাদিকদের এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা এই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা তো বড় বিষয়, তাই সময় হলে বলব।
সার্ক বহুপক্ষীয় ফোরাম কিন্তু দ্বিপাক্ষীয় থেকে সরে আসা যায় কি না? প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১৮তম সম্মেলন থেকে রাষ্ট্রগুলোর সাথে যে ঘটনা প্রবাহ তা তো আমলে নিতেই হবে। আমলে নেয়ার ফলে এ প্রবাহ ঘটেছে।
প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আগামী নভেম্বরের ৯ ও ১০ তারিখে এবারের সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে এবারের সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান ও ভুটান অংশ না নেবার সিদ্ধান্ত নেয়ায় এ সম্মেলন স্থগিত হয়ে যায়। সার্ক সনদ অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার আট-জাতির আঞ্চলিক জোটের কোনো সদস্য দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান না গেলে শীর্ষ সম্মেলন স্থগিত হয়ে যায়।
গত মঙ্গলবার ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় সার্ক সম্মেলন থেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বিকাশ স্বরূপ টুইটারে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সার্কের বর্তমান সভাপতি দেশ নেপালকে ভারত জানিয়েছে, এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসী হামলা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একটি দেশের হস্তক্ষেপের ফলে এমন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, যা আগামী নভেম্বরে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় ১৯তম সার্ক সম্মেলনে যোগদানের পক্ষে সহায়ক নয়। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে, ভারত সরকার ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত সম্মেলনে যোগদান করতে অসমর্থ।
ভুটান জানিয়েছে, আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ বেড়ে যাওয়ার কারণে সার্ক সম্মেলন সফলভাবে করার মতো পরিবেশ রয়েছে কিনা সে ব্যাপারে শঙ্কা থাকার কারণে এবারের সম্মেলন বর্জন করা হচ্ছে। আর আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশটিতে আরোপিত সন্ত্রাসবাদের কারণে সহিংসতা ও লড়াইয়ের মাত্রা বেড়ে গেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি এবং কমান্ডার ইন চিফকে সে পরিস্থিতি মোকাবেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে। আর সেকারণে আফগানিস্তান সম্মেলনে যোগ দিতে পারছে না।
পাকিস্তান বলছে, যদিও এ ব্যাপারে তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি, তারপরও সম্মেলনে যোগ না দেয়ার ঘোষণা দুঃখজনক। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারতের অজুহাতের পরিপ্রেক্ষিতে বক্তব্য হচ্ছে, সমগ্র বিশ্ব জানে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকা-ের মূলহোতা এবং অর্থদাতা ভারত।
অন্যদিকে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের না যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী নয়াদিল্লীতে সাংবাদিকদের বলেন, উপমহাদেশের শান্তি, নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছিল। উপমহাদেশে যে অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে সার্কের মতো শীর্ষ সম্মেলনের পরিস্থিতি নেই। এই অবিশ্বাস ও অনাস্থার পরিস্থিতিতে কোনো আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সফল হবে না। এ ধরনের অনুষ্ঠান অর্থহীন হয়ে যাবে বলেই মনে করে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের হাইকমিশনার বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ কিছু ঘটনায় আস্থার জায়গায় নেই। পাকিস্তান যেভাবে বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে, তাতে আস্থার সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ একাধিকবার তার মতো করে প্রতিবাদ জানিয়েছে, পাকিস্তানের হাই-কমিশনারকে তলব করেছে। তবে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। পাকিস্তান মনোভাব বদলায়নি। বাংলাদেশ অসন্তুষ্ট হয়েছে। সার্কের স্বরাষ্ট্র ও অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনেও বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। এই নীরব প্রতিবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার মনোভাব জানিয়ে দিয়েছে। তবে প্রতিবেশীদের ব্যাপারে পাকিস্তানের মনোভাব বদলায়নি।
পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা উচিত কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতে বাংলাদেশের হাই-কমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বলেন, এটা জাতিসংঘের বিষয়।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ এশিয়াকে এক সূত্রে গাঁথার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮৫ সালে গঠিত জোট সার্ক এখনও আশার সঞ্চার ঘটাতে পারেনি। কাক্সিক্ষত লক্ষ্য পূরণের পথে বারবারই দিশা হারিয়েছে এই জোট।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন