শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২ আশ্বিন ১৪২৮, ০৯ সফর ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২৮ জুলাই, ২০২১, ১২:০৩ এএম

দেশের সাংবাদিক সমাজ, সম্পাদক পরিষদ, গণমাধ্যমকর্মী ও নাগরিক সমাজ এবং অ্যামনেস্টি ইান্টারন্যাশনালসহ দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার আপত্তি ও তীব্র প্রতিবাদের মুখে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করা হয়। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আইনটির অপব্যবহার রোধ করা হবে এবং আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু সে সব প্রতিশ্রুতির কোনো প্রতিফলন গত তিন বছরে দেখা যায়নি। যত দিন যাচ্ছে ডিজিটাল সিকিউরিট অ্যাক্টের অস্বচ্ছ ও নিবর্তনমূলক ধারাগুলোর অপব্যবহার বেড়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক মহল আইনটিকে ভিন্নমত দমনের অস্ত্র হিসেবে অভিহিত করছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, মানুষের আকাক্সক্ষা এবং দেশের ভাব-মর্যাদার প্রশ্নে এই আইনের কতিপয় অস্বচ্ছ ধারা নির্বতনমূলক ও আগ্রহণযোগ্য। আইনের ২৫, ২৯ এবং ৩১ নং ধারায় অস্বচ্ছতা থাকায় শত শত সাংবাদিক, শিল্পী, কার্টুনিস্ট, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীকে এই আইনে গ্রেফতার ও হয়রানি করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের পর্যালোচনায় মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে গত সোমবার একটি ওয়েবিনার করেছে। সেখানে বাংলাদেশে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের অপব্যবহারের মাধ্যমে মামলা করে ভিন্নমত দমনের বেশকিছু অভিযোগ উদাহরণসহ তুলে ধরা হয়।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। আমাদের সংবিধানে নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি ও নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার পাশপাশি এর অপব্যবহার রোধেও দেশের সিভিল ও ক্রিমিনাল অ্যাক্টে আইন আছে। অতীতে সেসব আইনেও লেখক-সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার সরকার ডিপজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে শুধু সংবাদপত্র, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম কর্মীদেরই কণ্ঠ রোধ করছে না, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাথে যুক্ত কোটি কোটি মানুষকে এক অপ্রত্যাশিত আতঙ্ক ও বিড়ম্বনার শিকারে পরিনত করেছে। যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহ প্রশাসনে একটি শ্রেণীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাথে যুক্ত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার, হয়রানিতে ফেলা সম্ভব। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না গেলেও এই আইনে গত এক বছর শত শত সাংবাদিক-গণমাধ্যম কর্মী, লেখক-শিল্পী ও মানবাধিকার কর্মীর গ্রেফতার নির্যাতনের শিকার হওয়ার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাকে রাজনৈতিক স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে কোনো কালো আইন দ্বারা নিবৃত্ত করা হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রগতি, মননশীলতা ব্যহত হয়। অধিকারের প্রশ্নে নাগরিক সমাজের সচেতনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা দমনের ফলাফল কখনো কল্যাণকর হয়না।

নানা প্রতিকুলতা ডিঙ্গিয়ে দেশ অর্থনৈতিকভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একই সাথে বেড়ে চলেছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। সরকারের আমলাতন্ত্র থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরেই দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা, লুটপাট ও স্বেচ্ছাচারিতা প্রবল হয়ে উঠেছে। সংবাদপত্র, গণমাধ্যম, লেখক-সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিক সমাজ সেসব নিয়ে সংবাদ ও মতামত প্রকাশ করলে রাষ্ট্রের পক্ষে এবং আইনশৃঙ্খলা সংস্থার পক্ষে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া সহজতর হয়। দুর্নীতি, অর্থপাচার ও লুটপাটের সাথে জড়িতরা ক্ষমতাবান। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও পদমর্যাদা ব্যবহার করে দুনীর্তিতে জড়িত হওয়ার প্রবণতা বিদ্যমান। স্বাভাবিকভাবেই তারা সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করতে চাইবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো সেসব ক্ষমতাবান দুর্নীতিবাজদের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে ৭ মাসে ৪৩৩ জনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতারের কথা তুলে ধরেছে। এদের মধ্যে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুবরণের ঘটনাও রয়েছে। ডিজিটাল আইনে মামলার শিকার বেশিরভাগই সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী, শিল্পী, গায়ক, শিক্ষার্থী এবং মানবাধিকারকর্মী। এ ধরণের তথ্য বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে বার্তা যায় তা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। গত মার্চ মাসের শেষদিকে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক রেপোটেয়ারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মন্দ দিক ও অপব্যবহারের যে সব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে তা মোটেও অমূলক নয়। বিতর্কিত আইনের বিরুদ্ধে এখনো দেশের সাংবাদিক সমাজ সোচ্চার। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও আইনের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চলেছে। সকলেই নিবর্তনমূলক আইন বাতিল বা সর্বোচ্চ সংশোধন দাবি করছেন। আইনমন্ত্রীও বিভিন্ন সময়ে আইনের অপব্যবহার রোধ ও আইনের সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত তা সংশোধন ও পরিমার্জন করা হয়নি। কথা ও কাজে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, সাংবাদিকরা বিভিন্ন প্রতিবেদনের মাধ্যমে সরকারের ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেয়। দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে সরকার এসব ভুল-ত্রুটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে এবং নিচ্ছেও। তবে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে গ্রেফতার ও হয়রানির শিকার হওয়া মোটেও কাম্য হতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসনসহ কেউই ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। তবে তা সংশোধনেরও উপায় রয়েছে। এর অর্থ এই নয়, নিবর্তনমূলক আইনের মাধ্যমে কণ্ঠরোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কিছু থাকলে তা যথাযথ তথ্যসহ ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিকারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি যে, স্বাধীনমত ও বাকস্বাধীনতা হরণের কারণ হয়ে উঠেছে, তা দেশ-বিদেশে স্বীকৃত। এ আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করা উচিৎ।

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

এ সংক্রান্ত আরও খবর

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন