শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০ আশ্বিন ১৪২৮, ১৭ সফর ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

টিকা উৎপাদনে জোর দিতে হবে

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ৩০ জুলাই, ২০২১, ১২:০৮ এএম

এর আগে এক নিবন্ধে লিখেছিলাম, আগামী বিশ্বে প্রভাবশালী দেশগুলোর কাছে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে দাঁড়াবে ‘ভ্যাকসিন পলিটিক্স’। প্রভাবশালী দেশগুলো আবিষ্কৃত টিকা নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করে বিশ্বে ছড়ি ঘোরাবে। সেই কথা এখন বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলো টিকা আবিষ্কার চলাকালেই নিজেদের দখলের রাজত্ব কায়েম করে। বেশিরভাগ টিকাই তারা আগেভাগে দখলে নিয়ে যায়। আবিষ্কারের সাথে সাথে তা নিজ দেশের জনগণকে দেয়া শুরু করে এবং ইতোমধ্যে তাদের টিকাদান শেষ করেছে। এখন তাদের হাতে থাকা টিকা দিয়ে আমাদের মতো দেশগুলোতে দান-অনুদানসহ বিক্রি করছে। করোনা পুরোপুরি নির্মূল হবে না এবং করোনাকে সাথে নিয়েই চলতে হবে, এ কথা বহু আগেই বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। তাদের এ কথা এখন বাস্তব হয়ে দেখা দিয়েছে। করোনার এই দীর্ঘকালীন সংক্রমণই ভ্যাকসিন পলিটিক্সের জন্ম দিয়েছে। ফলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো উন্নত বিশ্বের ভ্যাকসিন পলিটিক্সের মধ্যে পড়ে গেছে। এখন টিকার জন্য সেসব দেশের কাছে যেতে হচ্ছে। তারাও আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়ার মতো করে কিছু টিকা দিচ্ছে। প্রথমে উপহার স্বরূপ, পরবর্তীতে চড়া দামে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করছে। এই ভ্যাকসিন পলিটিক্স শুরুর আগে এর শিকার না হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ আমাদের হাতে ছিল। সেই সুযোগ আমরা হাতছাড়া করেছি। তবে অনেক দৌড়াদৌড়ির পর টিকার ক্রাইসিস কিছুটা হলেও সামাল দেয়া গেছে। ইতোমধ্যে পর্যায়ক্রমে মডার্না ও সিনোভ্যাক ও সিনোফার্ম থেকে মোট ৯৫ লাখ টিকা সংগ্রহ করা গেছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ২ কোটি টিকা দেশে আসবে। আরও টিকা আসছে। বলা হচ্ছে, ডিসেম্বরের মধ্যে ১০ কোটি এবং আগামী বছরের শুরুর দিকে ২১ কোটি টিকা পাওয়া যাবে।

দুই.
এ কথা এখন স্বীকৃত, করোনা থেকে রক্ষা একমাত্র উপায় টিকা। যে দেশ যত তাড়াতাড়ি জনগণকে টিকার আওতায় আনতে পারবে, তারাই নতুন বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে। অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক থেকে এগিয়ে থাকবে। বিশ্বে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আবির্ভূত হতে পারবে। এ কাজে যে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো এগিয়ে থাকবে তা আগে থেকেই জানা। বাস্তবেও তা দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তার দেশের ১৪ কোটির বেশি মানুষের টিকা প্রদান কাজ শেষ করে অনেকটাই নিরাপদ অবস্থানে চলে গেছে। এখন দেশটি পশু-পাখিকে এ টিকা দেয়া শুরু করেছে। যে চীন থেকে করোনার উৎপত্তি সেই দেশ করোনার শুরুতেই তা নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। রাশিয়া, যুক্তরাজ্যও একই কাজ করেছে। যুক্তরাজ্যে তো এখন মানুষ গ্যালারিতে গাঁদাগাঁদি করে বসে মাস্ক ছাড়াই ক্রিকেট-ফুটবল খেলা দেখছে। ইউরোপের অন্য দেশগুলোও তাদের টিকা কার্যক্রম শেষ করেছে। এখন শিশু-কিশোরদের টিকা দিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড করোনার নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, উন্নত বিশ্ব করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে বিপর্যস্ত হলেও, তারাই সবার আগে বিপর্যয় কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। তবে টিকা উৎপাদনের শুরুর দিকে এ নিয়ে শুরু হয় বিশ্ব রাজনীতি। চীন ও রাশিয়ার উদ্ভাবিত টিকা নিয়ে যখন কার্যক্রম শুরু হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা তাদের টিকা ব্যবহারের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি। করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় বছরে এসে সংস্থাটি চীনের সিনোফার্ম ও সিনোভাকের টিকা ব্যবহারের অনুমতি দেয়। অন্যদিকে, রাশিয়া এসবের তোয়াক্কা না করে নিজের জনগণকে টিকা দেয়া শুরু করে। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, প্রভাবশালী দেশগুলোতে টিকা নিয়ে এক ধরনের রাজনীতি ও কূটনীতি চলছে। পারমানবিক অস্ত্রের পরিবর্তে এখন টিকাকে ‘সফট উইপেন’ বা ‘কোমল অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছে। একে ‘জীবানু অস্ত্র’ ব্যবহারের বিকল্প হিসেবে ‘জীবানু নাশক’ সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল বলা যায়। বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে এবং প্রভাব বিস্তার করার জন্য এখন এই টিকা রাজনীতিই প্রভাবশালী দেশগুলো অবলম্বন করছে। বিশ্বের বহু দেশ বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল, অনুন্নত কিংবা উন্নয়নকামী দেশগুলোতে টিকা কার্যক্রম পুরোপুরি গতি লাভ করেনি। অনেকে দেশ টিকা সংকটে ভুগছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, জাপানের মতো দেশগুলো এখন এসব দেশকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে রাখার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে টক্কর লেগেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের। এমনিতেই চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বহু আগে থেকেই এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ চলে আসছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের উত্থান এবং প্রভাব বিস্তার যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। করোনা এসে দেশ দুটির স্নায়ুযুদ্ধকে নিয়ে গেছে ভিন্ন কৌশলের দিকে। সেটা এই টিকা নিয়ে। ইতোমধ্যে চীন ৪০টি দেশে টিকা বিক্রিসহ ৮০টি দেশকে ৩৫ কোটির বেশি টিকা দিয়ে সহায়তা করেছে। চীনের টিকা উৎপাদিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিনোফার্মের মাধ্যমে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে, ফাইজার ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা দিয়ে। দামে সস্তা সিনোফার্মের টিকা চীন যতটা পরিকল্পিতভাবে করতে পারছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, ভ্যাকসিন পলিটিক্সে যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে পিছিয়ে পড়েছে। চীন ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভূটানসহ অন্য দেশগুলোতে টিকা সরবরাহ এবং বিক্রি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশেও সরবরাহ শুরু করেছে। অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ঘাটতি দেখা দেয়ায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে টিকা দেয়ার অনুরোধ করেছিল। দেশটি তাদের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) অনুমতি না পাওয়ায় বাংলাদেশকে সে টিকা দিতে পারেনি। টিকা নিয়ে বিপাকে পড়ার পরপরই চীন দুই দফায় ১১ লাখ টিকা বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে পাঠায়। বলা যায়, টিকা রাজনীতির শুরু হয় ‘উপহার’ পাঠানোর মাধ্যমে। সেটা চীন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জাপান যে দেশই হোক না কেন। অথচ গত বছরের শেষ দিকে রাশিয়া ও চীন তাদের টিকা নিয়ে বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ করলেও তাতে সরকার তেমন উৎসাহ দেখায়নি। বিশেষ করে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার প্রস্তাব একেবারে শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়। এটা বাংলাদেশের একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। অথচ টিকা কার্যক্রম চলাকালে ভারত যখন হঠাৎ রফতানি বন্ধ করে দেয় তখন বাংলাদেশ চরম বিপাকে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য যে পরিমাণ টিকার প্রয়োজন তা ভারতের সেরাম ছাড়া একমাত্র চীনের পক্ষেই সরবরাহ করা সম্ভব। তাই শুরু থেকে চীনের টিকা রাখা হলে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারত। এ সুবিধা হেলায় হারিয়েছে বাংলাদেশ।

তিন.
টিকা নিয়ে ভারতও রাজনীতি করতে চেয়েছিল। বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ টিকা উৎপাদনকারি প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউট ভারতে। প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত টিকা উৎপাদন শুরু করে। বাংলাদেশ শুরুতেই এই প্রতিষ্ঠানের সাথে ৬০০ কোটি টাকায় ৩ কোটি টিকা কেনার চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে ৬ মাসের মধ্যে এই টিকা প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহের কথা। শুরুতে কেনা বাবদ এবং ভারত সরকারের উপহরা স্বরূপ পাওয়া প্রায় এক কোটি টিকা দিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জোরেসোরে টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু করে। তবে মাস খানেক না যেতেই ভারত হঠাৎ টিকা রফতানি বন্ধ করে দেয়। দেশটিতে করোনা ভয়াবহ আকার ধারণ করার উছিলায় এ সিদ্ধান্ত নেয়। এতে বাংলাদেশ ভয়াবহ বিপদে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা এ অভিমত ব্যক্ত করেন, বাংলাদেশের একদেশ নির্ভরতাই এই বিপদ ডেকে এনেছে। অথচ গত বছরের শেষের দিকে চীন ও রাশিয়া তাদের টিকা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাতে উৎসাহ দেখায়নি। এক্ষেত্রে বলা যায়, বাংলাদেশ ভারতের ভ্যাকসিন পলিটিক্সের শিকার হয়েছে। ভারত বাংলাদেশকে তার প্রভাব বলয়ে রাখার জন্য অন্য কোনো দেশ থেকে টিকা সংগ্রহ করুক তা চায়নি। বিশেষ করে চীনের টিকা যাতে বাংলাদেশে না আসতে পারে, এমন কূটনৈতিক চাল চালে। তার এই কূটনীতি ধরা পড়ে করোনার একেবারে শুরুতে যখন চীন অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে চিকিৎসক দল পাঠানোসহ করোনার নানা উপকরণ নিয়ে বাংলাদেশে হাজির হয় তখন। চীনের এই তৎপরতায় ভারত নড়েচড়ে বসে। সে বাংলাদেশে তার পররাষ্ট্র সচিবকে দ্রুত পাঠিয়ে টিকা চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে। সরকারও ভারতের প্রতি একক নির্ভরতার নীতি গ্রহণ করে। এটা যে ভ্যাকসিন পলিটিক্সের অন্তর্ভুক্ত তা বিশেষজ্ঞদের তখন বুঝতে অসুবিধা হয়নি। টিকা সংকটে পড়ে অনন্যোপায় হয়ে বাংলাদেশ গত মার্চে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। এ ধারাবাহিকতায় চীনের সঙ্গে চুক্তি করে টিকা আনা শুরু হয়েছে। রাশিয়া থেকে টিকা কেনার প্রক্রিয়া এ মাসে চূড়ান্ত হওয়ার কথা। এটা এখন পরিস্কার, ভারতের ভ্যাকসিন পলিটিক্সের শিকার হয়ে বাংলাদেশ টিকা পাওয়া এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেনি। যদি ভারত চুক্তি অনুযায়ী, টিকা সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পারত, তাহলে দুই ডোজ টিকা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ জুনের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ মানুষের টিকা প্রদান সম্পন্ন করতে পারত এবং তা অব্যাহত গতিতে চলত। ভারত ভ্যাকসিন পলিটিক্স করতে গিয়ে নিজে যেমন বিপদে পড়েছে, তেমনি বাংলাদেশকেও বিপদে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ যদি টিকা পাওয়ার বিষয়টি উন্মুক্ত রাখত এবং যেখান থেকে টিকা পাওয়া যাবে সেখান থেকেই নেয়া হবে-এমন নীতি অবলম্বন করলে এতদিনে টিকার সংকট বলে কিছু থাকত না। ভারত বন্ধ করে দিলেও টিকা কার্যক্রম অব্যাহত থাকত। সরকার যে ভারতের পলিটিক্স বোঝেনি, তা মনে করার কারণ নেই। তবে ভারতকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে টিকা সংকটের মধ্যে পড়ে গেছে। এখন চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া থেকে টিকা আনার জোর তৎপরতায় টিকা আসা শুরু হলেও অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে চীন বাংলাদেশে যৌথভাবে টিকা উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছে। চীনা দূতাবাসের উপপ্রধান হুয়ালং ইয়ান সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশে যৌথভাবে টিকা উৎপাদন শুরু করতে চীন বাংলাদেশ সরকারের সবুজ সংকেত পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। দেশটি দুটি প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাক ও সিনোফার্ম প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের জন্য বিশ্বমানের ফার্মাসিউটিক্যালস রয়েছে। এখন সরকারের সম্মতি পেলেই দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে এখনো সম্মতি দেয়নি। এক্ষেত্রেও যে ভ্যাকসিন পলিটিক্স জড়িয়ে রয়েছে, তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এর নেপথ্যে ভারতের প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশের সাথে চীনের যৌথভাবে টিকা উৎপাদনের বিষয়টি ভারত মেনে নিতে পারছে না। কারণ, বাংলাদেশে টিকা উৎপাদিত হলে টিকা নিয়ে কোনো সংকট থাকবে না। বাংলাদেশ টিকায় যেমন স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে, তেমনি বিদেশেও রফতানি করতে পারবে। বাংলাদেশের ৮০ ভাগ লোককে দুই ডোজ করে টিকা দিতে হলে প্রয়োজন হবে ২৬ কোটি ডোজ। ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার যে ১০ কোটি টিকা পাওয়ার আশা করছে, তা দিয়ে বড় জোর ৩০ শতাংশ লোককে দেয়া যাবে এবং এতে কয়েক বছর লেগে যাবে। তবে তা নির্ভর করছে, বাস্তবে এই টিকা পাওয়ার ওপর। অথচ যদি দ্রুত টিকা উৎপাদনে যাওয়া যায়, তাহলে দেশের টিকাযোগ্য প্রায় সব মানুষকে অল্প সময়ে টিকা দেয়া সম্ভব। ফলে টিকার জন্য হন্যে হয়ে এখানে ওখানে দৌড়ঝাপ না করে চীন হোক আর রাশিয়া হোক, যারাই যৌথ উৎপাদনে রাজি কালবিলম্ব না করে টিকা উৎপাদন শুরু করা উচিৎ। দেশের মানুষের জীবন রক্ষার্থে এখন কারো রাগ-বিরাগের দিকে নজর দেয়ার সময় নেই। কূটনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু-মিত্র বলে কিছু নেই। এটা নির্ভর করে সময় ও স্বার্থের ওপর। যে ভারত একসময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে থাকত, সে এখন দেশটির সবচেয়ে ঘনিষ্ট মিত্র। সময় ও স্বার্থের প্রয়োজনেই তা করতে হয়েছে। আমাদের সরকারকেও তা বুঝতে হবে। চীনের সাথে বাণিজ্যিক ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুসম্পর্ক গড়ে তুললে ভারত নাখোশ হবে, এখন এ নিয়ে ভাবার সময় নেই। ইতোমধ্যে দেশের মানুষ জেনে গেছে, ভারত তার সব স্বার্থ আমাদের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে, বিনিময়ে কিছুই দেয়নি। ভারতের কাছ থেকে আমাদের পাওয়ার কিছু নেই। ভ্যাকসিন পলিটিক্স করে অন্য টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে আমাদের জীবনমরণ সমস্যার সময় সে যে আচরণ করেছে, তা কোনোভাবেই বন্ধুত্বের আচরণ হতে পারে না।

চার.
বাংলাদেশকে এখন ভ্যাকসিন পলিটিক্সের মধ্যে হোক আর বাইরে হোক, প্রয়োজনকে স্বীকার করে চলতে হবে। যে দেশ থেকে সহজে টিকা পাওয়া যাবে, সে দেশ থেকেই তা সংগ্রহ করতে হবে। এক্ষেত্রে কে বিরাগভাজন হবে, সেদিকে খেয়াল করার সময় নেই। বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের প্রশ্নে প্রভাবশালী অনেকে দেশেরই চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে গেছে। তাতে আমাদের কিছু যায় আসেনি। আর করোনার মতো মরণঘাতী রোগের ভ্যাকসিন সংগ্রহের ক্ষেত্রে কে বেজার হলো তা এড়ানো অনেক সহজ। কারণ, এতে জনগণের জীবনমরণের বিষয়টি জড়িত। এক্ষেত্রে যেসব প্রভাবশালী দেশ ভ্যাকসিন পলিটিক্সে লিপ্ত তাদেরও বলার কিছু থাকবে না। আমরা যদি কোনো দেশের ভ্যাকসিন পলিটিক্সের মধ্যে পড়ে চাহিদা মতো টিকা পাই, তাহলে সেই পলিটিক্সে পড়তে আমাদের আপত্তি নেই। এমন পলিটিক্সে পড়তে চাই না যাতে টিকা পাব না, উল্টো দেশের মানুষের জীবন বিপন্ন হবে। চীন যেভাবে টিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছে এবং বিভিন্ন দেশ তাতে শামিল হচ্ছে, এ বাস্তবতায় আমাদেরও পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। চীন যেভাবে আমাদের দিকে টিকা প্রদান এবং যৌথ উৎপাদনের ক্ষেত্রে হাত বাড়িয়েছে, তাতে করোনা থেকে দ্রুত সুরক্ষা পেতে সে হাতকে আমাদের ধরতে হবে। কারণ, ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই চীনের মতো করে আমাদের দিকে হাত বাড়ায়নি। বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনা সহসা বিদায় নেবে না এবং একে সঙ্গে নিয়েই চলতে হবে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের সরকার প্রধান বলেছেন, করোনাকে সঙ্গে নিয়েই তাদের চলতে হবে। এ বাস্তবতা আমাদেরও মানতে হবে। দেশের মানুষকে করোনা থেকে রক্ষা করতে হলে টিকার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। এ ব্যবস্থা একমাত্র সম্ভব দেশে টিকা উৎপাদনের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে। টিকা উৎপাদনের ক্ষেত্রে চীন যে প্রস্তাব দিয়েছে, কাল বিলম্ব না করে তা গ্রহণ করে উৎপাদনে যাওয়া শ্রেয়। এক্ষেত্রে পিছু ফিরে তাকাবার সময় নেই। যেসব প্রভাবশালী দেশ ভ্যাকসিন পলিটিক্স করছে, তাতে আমাদের শামিল হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রয়োজন যেখান থেকে যেভাবে হোক টিকা সংগ্রহ এবং উৎপাদনের সহায়তা পাওয়া।
darpan.journalist@gmail.com

 

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন