শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০ আশ্বিন ১৪২৮, ১৭ সফর ১৪৪৩ হিজরী

সম্পাদকীয়

কারখানা চালুতে সুচিন্তিত পরিকল্পনার অভাব

| প্রকাশের সময় : ১ আগস্ট, ২০২১, ১২:০৩ এএম

কঠোর লকডাউনের মধ্যেই আজ থেকে রফতানিমুখী সব ধরনের শিল্পকারখানা চালু হচ্ছে। গত শুক্রবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ। ঈদের পর গত ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত কঠোর লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। তার চারদিন আগে কলকারখানা খুলে দেয়া হয়েছে। অবশ্য গার্মেন্ট ও অন্যান্য শিল্পমালিকরা লকডাউনের মধ্যে কারখানা খুলে দেয়ার জন্য সরকারকে বারবার অনুরোধ করেছে। তাদের এই দাবী সরকার পূরণ করেছে। কলকারখানা খোলার সংবাদে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া অসংখ্য কর্মজীবী মানুষ ঢাকামুখী হয়েছে। ফেরিঘাট থেকে শুরু করে সড়ক-মহাসড়কে মানুষের স্রোত তৈরি হয়েছে। যে যেভাবে পারছে ঢাকা আসছে। ঢাকাভিমুখে মানুষের মিছিল থামছে না। মানুষ কর্মস্থলে ফিরবে, এটাই স্বাভাবিক। অথচ লকডাউন ঘোষণার সময় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেছিলেন, যারা ঢাকা ছেড়ে গ্রামে গেছে লকডাউনে তাদের ঢাকায় আসার প্রয়োজন নেই। এ কথার সাথে যদি তিনি বলতেন, যেসব চাকরিজীবী ঢাকা ছেড়ে গেছে তাদের চাকরির কোনো সমস্যা হবে না, তাহলে ঈদের পর থেকে মানুষের ঢাকা ফেরার স্রোত তীব্র হয়ে উঠত না। গণপরিবহন বন্ধ রেখে অনেকটা হুট করে কলকারখানা খোলার সিদ্ধান্তে কর্মজীবীরা পড়েছে মহাবিপাকে। বাধ্য হয়ে পথে পথে শত দুর্ভোগের মধ্যেই তারা ঊর্ধ্বশ্বাসে ঢাকা ফিরছে।

কঠোর লকডাউন ঘোষণা এবং তা সীমিত করা নিয়ে বিগত দেড় বছরের বেশি সময় ধরেই সরকারের মধ্যে এক ধরনের অপরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে সরকার দফায় দফায় লকডাউন দিচ্ছে, অন্যদিকে শিথিলও করছে। সরকারের এমন দোনোমনো আচরণ নিয়ে স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা করেছেন। তারা বলেছেন, লকডাউন দিলে তা যথাযথভাবে দিতে হবে এবং করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত বলবৎ রাখতে হবে। সরকার তাদের এসব পরামর্শ কখনো গ্রহণ করছে, কখনো গ্রহণ করেনি। ঈদের আগে বলবৎ থাকা লকডাউন সরকার এক সপ্তাহের জন্য তুলে নেয়। একইসঙ্গে ঈদের ছুটির পরদিন থেকে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দেয়। এতে ঈদে ঘরমুখী মানুষের যেমন ঢল নামে, তেমনি পরদিন থেকেই ঢাকামুখী জনস্রোত শুরু হয়। এখন কলকারখানা খুলে দেয়ার সিদ্ধান্তে এ স্রোত অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ঈদের কারণে করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যেই এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন তুলে নেয়ায় মানুষের যে ব্যাপক যাতায়াত ও সমাগম হয় তাতে করোনা সংক্রমণ যে বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিগত প্রায় মাস খানেক ধরে দেশের করোনা পরিস্থিতি ধারাবাহিকভাবে অবনতির দিকে রয়েছে। সংক্রমণ এবং মৃত্যুসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর ঠাঁই হচ্ছে না। শয্যা ও আইসিইউ’র জন্য মানুষের হাহাকার চলছে। গতকাল একটি দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৪২ জেলায় করোনা সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব জেলায় সংক্রমণ বেড়েছে ১ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত। এ পরিস্থিতি কতদিন চলবে তা বলা যাচ্ছে না। এ প্রেক্ষিতে, সরকারের লকডাউন পরিকল্পনায় সমন্বয়হীনতা কাম্য নয়। কিছু গার্মেন্ট মালিকদের দাবীর প্রেক্ষিতে সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, গার্মেন্ট মালিকরা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা যতটা পায়, অন্য শিল্পকারখানার মালিকরা তা পায় না। সরকার গার্মেন্ট মালিকদেরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। লকডাউনেও কারখানা খোলা রাখার সুবিধা পায়। এবারও পাচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কলকারখানা খুলে দেয়ার প্রয়োজন হলে তা খুলে দেয়া যেতে পারে। তবে খুলে দেয়ার ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রতিফলন থাকা বাঞ্চনীয়। হুট করে খুলে দেয়া এক ধরনের হঠকারি সিদ্ধান্ত। কারখানা খোলা সিদ্ধান্ত হয়েছে, অথচ গণপরিবহন বন্ধ রাখা হয়েছে। তাহলে কর্মজীবীরা কর্মস্থলে আসবে কিভাবে? শিল্পকারখানার কর্মজীবীদের ঢাকায় ফেরার জন্য গণপরিবহন চালু করে তিন-চারদিন সময় দিয়ে তাদের ফেরার পথটি নিরাপদ ও মসৃণ করার ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ ছিল। এসব মানুষ কিভাবে ফিরবে তার ব্যবস্থা না করে যেভাবে খুশি সেভাবে ফেরার পথ করে দিয়ে করোনা সংক্রমণের হার আরও ঊর্ধ্বমুখী করে দেয়া সুবিবেচনাপ্রসূত হয়নি। বিকল্প হিসেবে সরকার যদি কলকারখানার মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে তাদের নিজস্ব পরিবহণের মাধ্যমে ফেরার ব্যবস্থা করত, তাহলেও তাদের দুর্ভোগ কমত এবং সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণ করা যেত। গণপরিবহণ চালু করে চাকরিজীবীদের আইডি কার্ড দেখে আনার ব্যবস্থা করলেও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো না। মানুষের মরিয়া হয়ে ঢাকা ফেরার কারণে করোনা সংক্রমণের হার বৃদ্ধির দায়-দায়িত্ব কে নেবে?

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে রফতানিমুখী শিল্পকারখানা চালু রাখা দরকার। ইতোমধ্যে ইউরোপ-আমেরিকার অর্থনীতি ও বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে। এ অবস্থায় রফতানিমুখী শিল্পকারখানা চালু রেখে রফতানি অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে কারো দ্বিমত নেই। তবে লকডাউনে এসব শিল্পকারখানা কিভাবে চলবে, কর্মজীবীরা কিভাবে আসা-যাওয়া করবে এবং স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করবে, তা সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং গাইডলাইন থাকা জরুরী। দেখা যাচ্ছে, এক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্তে যথেষ্ট সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কখনো লকডাউনের আওতায় কখনো বাইরে-এমন এক হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মনে করি, লকডাউনের ক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সমন্বয় থাকা উচিৎ। লকডাউনের আওতার বাইরে থাকা শিল্পকারখানা কিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা হবে, সেক্ষেত্রে কঠোর নির্দেশনা থাকতে হবে। অপরিকল্পিত ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ঘোর থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

 

 

 

Thank you for your decesion. Show Result
সর্বমোট মন্তব্য (0)

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন